কবি গোলাম কুদ্দুস-এর কবিতা
*
ইলা মিত্র
কবি গোলাম কুদ্দুস

ইলা মিত্র রাজশাহী জেলে |
স্বামী তাঁর শান্ত ঋজু দৃঢ়
ফেরারি এখনো পাকিস্থানে,
উভয়ের শিশুপুত্র কোথা
মাতাপিতা সঙ্গহীন বাড়ে !

এ বেদনা কবিচিত্তে যদি
মাঝে মাঝে আনে ব্যাকুলতা,
তবু জেনো প্রকাশের মত
ভাষা নেই বিদ্যুৎ সঞ্চারী |

এ ব্যথা তো ব্যথা নয় শুধু
ব্যথা-ভাঙ্গা সংগ্রাম যন্ত্রণা !
ফেটে পড়া হৃদয়ের তটে
বন্যাবেগ, মহিমামণ্ডিত !

পূর্ববঙ্গে লোক দেশত্যাগী,
তুমি গেলে দেশের গভীরে ----
কৃষকের হৃদয়ের কাছে !
“ওঠ, জাগো, নাচোলের চাষী !”
ঘরে ঘরে দিলে তুমি ডাক |
“জাগো লাল ঝাণ্ডা নিয়ে জাগো !”
শঙ্কাহীন জানালে আহ্বান |
ক্ষুধাতুর ব্যথাতুর যারা
সাড়া তারা দেয় ধীরে ধীরে !
ধীরে ধীরে চেতনা-কন্দরে
ঝরে পড়ে আশার আলোক !

বাঁশরীর আনন্দের সুরে
ধীরে ধীরে তুলে তারা মাথা !
যত জাগে মানুষের প্রাণ,
নিদ্রা যত ঘোচে পশুদের !
ক্রুদ্ধ তারা দিবা-রাত্রি খোঁজে
ইলা মিত্র - ইলা মিত্র কোথা ?

ইলা মিত্র কৃষকের ঘরে
মিশে যায় কৃষকের মেয়ে !
ইলা মিত্র ঘোরে গ্রামে গ্রামে
কৃষকের খুঁদকুঁড়ো খেয়ে
ইলা মিত্র খালি পায়ে চলে
মেঠোপথে রোদ-বৃষ্টি-জলে |
কে বলিবে পাস করা মেয়ে !
কোলকাতায় স্পোর্টসে হত ফার্স্ট

ইলা মিত্র ইস্পাতের গড়া !
ইলা মিত্র সংগঠন গড়ে !
পুলিশ ঘেরাও করে বাড়ি
দুঃসাহসী মেয়ে অকাতরে
ঝাঁপ দিল কুয়োর ভিতরে !
ক্ষিপ্ত বোকা শিকারীর দল
ফিরে যায় আরো ক্রুদ্ধ হয়ে |

তারপর ছুটে এল তারা,
ধান কাটা নাচোলের মাঠে,
বুলেট বৃষ্টিতে রক্ত ঝরে
নাচোলের শস্যশূন্য মাঠ
পূর্ণ হ’ল কৃষকের লাশে !
ক্ষুব্ধ সাঁওতালের তীর লেগে
পুলিশ মরেছে চার জন,
কৃষক যে মরে কত জনা
হিসেবের নেই প্রয়োজন !
চিরকাল শুধু যারা মরে
তারা কেন বাঁচিবে এখন ?

ইসলামী ন্যায়দণ্ড তলে
ঘাতকের হল না বিচার |
এল তারা দল বেঁধে আরো |
চতুর্দিকে দিল বেড়াজাল ----
ইলা মিত্র পালাবে কোথায় !
খুন-ঝরা নাচোলে সেদিন
একটি নারীর ভয়ে, হায়,
জেগে ওঠে কত না পৌরুষ !

ইলামিত্র এ দেশেরি মেয়ে -----
ইলা মিত্র তবু ভাঙ্গে শাখা !
হাত থেকে টেনে খোলে নোয়া
মুছে ফেলে চিহ্ন এয়োতির !
কেশগুচ্ছ ছেঁটে ফেলে দেয়,
শারি ছেড়ে পরে সাদা ধুতি-----
আবেষ্টনী করে অতিক্রম,
অতিক্রম করে সমাজের
নারীত্বের শাশ্বত নির্মম !
তখন সন্ধ্যার আধো ছায়া,
স্টেশনের চত্বরের পাশে----
ট্রেনের সামান্য মাত্র দেরি----
আই. বি” এর গোয়েন্দার চোখে
অকস্মাৎ জ্বলে ক্রুর হাসি,
রাত্রির নিরক্ত কালো এসে
রুদ্ধ করে আলোকের গতি !

“প্রথমে থানায় নিয়ে যায়,
বল তো সঙ্গী-সাথী কোথা ?”
ইলামিত্র নির্বাক, নিশ্চুপ !
“কোথায় লুকিয়ে আছে বল ?”
ইলা মিত্র নিঃশব্দ, কঠিন |
তারপর যে কাহিনী সেটা
ভাই হয়ে বলিব কেমনে ?
বস্ত্র গেল, লজ্জা গেল, গেল
যা কিছু যাবার পশু গ্রাসে
থানা দেয়ালগুলো যদি
হৃৎপিণ্ড হত, যেত ফেটে
স্তব্ধ রাত্রি, বায়ু গতিহীন
নাচোলের মাঠে তীব্র জ্বালা |

ইলা মিত্র ফাঁসির আসামী !
লোকারণ্য রাজশাহী কোর্ট !
একটি উকিল মেলা ভার,
ওরা ভীত ‘স্বাধীন’ স্বদেশ |
স্ট্রেচারেতে শায়িতা একাকী,
ইলা মিত্র বাকশক্তিহীনা,
পাঁজরের হাড়গোড় ভাঙ্গা,
মুখে চোখে কপালে ব্যান্ডেজ,
রক্তাক্ত আঙ্গুলগুলি ফাটা
তবুও কাগজ টেনে নিয়ে
দুনিয়ার ইচ্ছা শক্তি বলে
আত্মপক্ষ করে সমর্থন
হাতে লিখে ---- রক্তাক্ত অক্ষরে!


.        *************************            
.                                                                             
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর