কবি গোপাল ভাঁড় - তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীতে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের (১৭১১ -
১৭৮৩) রাজসভায় নিযুক্ত ছিলেন একজন সভাসদ হিসেবে। রাজা তাঁকে তার সভাসদদের মধ্যে নবরত্নদের
একজন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। গোপাল ভাঁড়ের জন্ম-মৃত্যু কিছুই আমাদের জানা নেই। কিন্তু তাঁর
রচনা কাল আমরা
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের শাসনকালকেই ধরছি।

এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং রসিক সভাসদ গোপাল ভাঁড় ও
মহারাজাকে নিয়ে যে বিশাল সংখ্যক গল্প প্রচলিত
আছে, তা তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালীর ঘরের মানুষ করে দিয়েছে। গোপাল ভাঁড় আজ বুদ্ধিমত্তা ও
রসকৌতুকের জন্য কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। প্রায় আড়াইশত বছরেরও অধিক সময় ধরে প্রচলিত
তার জীবন-রস সমৃদ্ধ গল্পগুলো বাংলার মানুষের মাঝে এখনো স্বমহিমায় টিকে আছে।

তাঁকে মোল্লা নাসীরুদ্দীন, বীরবল ও দক্ষিণভারতের তেনালিরামার সমতুল্য হিসাবে পরিগণিত করা হয়।

সেই আমলের,
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদের সামনে নির্মিত তার একটি প্রতিকৃতি ভাষ্কর্য এখনো সেখানে
অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। এই প্রতিকৃতির ছবি আমরা এখনও পাই নি। হাতে পেলেই পাতায় তুলে দেওয়া
হবে।

আমরা গোপাল ভাঁড়ের একটি কবিতা পেয়েছি, যামিনীমোহন কর সম্পাদিত “মাসিক বসুমতী” পত্রিকার
ফাল্গুন ১৩৫৩ (ফেব্রুয়ারী ১৯৪৭) সংখ্যায় প্রকাশিত মুনীন্দ্রপ্রসাদ সর্ব্বাধিকারীর “গোপাল ভাঁড়” নামক প্রবন্ধ
থেকে। সেখানে তিনি লিখেছেন . . .

গোপাল ভাণ্ডারীই বঙ্গের বিক্রমাদিত্য মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রর পঞ্চরত্ন সভার অন্যতম রত্ন। গোপাল ভাঁড় নামে
তাঁহার প্রসিদ্ধি। গোপাল আসন পাইতে পারেন বীরবলের পার্শ্বে। কিন্তু সে মর্যাদা তিনি পাইয়াছেন বলিয়া
মনে হয়ে না। দুর্ভাগ্য গোপালের, না আমাদের দেশ ও জাতির?

পঞ্চরত্ন সভায় বাণেশ্বর,
ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ ও রামরুদ্র বিদ্যানিধির সঙ্গে গোপাল ভাণ্ডারীকেও দেখিতে
পাওয়া যায়। কৃষ্ণনগর তখনকার কালে মহা গৌরবান্বিত, মনীষিবৃন্দের তীর্থক্ষেত্র। সে ক্ষেত্রে মহারাজ
কৃষ্ণচন্দ্র গড়িয়া তুলিয়াছিলেন বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁহার সভাই ছিল সেই বিদ্যালয়। সে বিদ্যালয়ের
একজন “সিণ্ডিক” ছিলেন --- মহারাজার সভাসদ বিদূষক গোপাল ভাঁড়!  

গোপালকে অনেকেই শুধু ভাঁড় বলিয়াই জানে। তাঁহার প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব ছিল অসাধারণ, তিনি সৃষ্টি করিতেন
রস-সাহিত্য। তাঁহার বাণী ছিল মধুক্ষরা। সে বাণী যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ উপভোগ্য।

কিন্তু উপভোগই সবকিছু নহে। গোপাল ছিলেন কবি ও দার্শনিক। আমার স্বগ্রাম
রাধানগরবাসী জরাভারাক্রান্ত স্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ দাসের নিকট হইতে যে সকল কাগজ-পত্র পাইয়াছি, তাহাতে
এ সিদ্ধান্তকে নাকোচ করিবার উপায় নাই। নগেন্দ্রনাথ গোপাল ভাঁড়ের বংশধর এবং গোপাল হইতে নয়
পুরুষ।

কৃষ্ণনগর রাজবাটীতে বাত্সরিক জন্মাষ্টমী মহোত্সবে মহারাজার নির্বন্ধাতিশয্যে গোপাল যে
স্বরচিত পাঁচালীর ছড়া উত্সবানন্দদর্শীদের ছন্দোবন্ধে শুনাইয়াছিলেন, তাহা পাঠকবর্গকে উপহার দিই
।”

এরপর গোপাল ভাঁড়ের রচিত ত্রিপদী ছন্দের পাঁচালীটি রয়েছে, যা আমরা নীচের কবিতার পাতায় তুলে
দিয়েছি।

গোপাল ভাঁড়, সত্যি ছিলেন কি না তা নিয়ে বিদ্বজ্জনদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে তর্ক-বিতর্ক চলে আসছে।
আমরা মনে করি যে মুনীন্দ্রপ্রসাদ সর্ব্বাধিকারীর এই লেখাটি ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রকাশিত হওয়ার
পর সেই বিতর্কের অবসান ঘটা উচিত ছিল। হয়তো কোনো কারণে সেই সময়ে, এই মূল্যবান প্রবন্ধটি
কারও নজরে পড়ে নি। আশা করি এখন সেই তর্ক-বিতর্কের অবসান হবে। গোপাল ভাঁড়কে বাংলার
ইতিহাস ও সাহিত্যে তাঁর প্রকৃত আসন দেওয়া হবে।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি গোপাল ভাঁড়-এর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে  পৌঁছে  দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।



উত্স - যামিনীমোহন কর সম্পাদিত মাসিক বসুমতী পত্রিকার ফাল্গুন ১৩৫৩ (ফেব্রুয়ারী ১৯৪৭) সংখ্যা।
.          
উইকিপেডিয়া           


কবি গোপাল ভাঁড়-এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৬.৫.২০১৬
...