মাইকেল মধুসূদন দত্ত - অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলায় কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত
সাগরদাঁরি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন | মাতা জাহ্নবী ও পিতা রাজনারায়ণ দত্ত | পিতা সেকালের রীতি অনুযায়ী
ফার্সি ভাষায় দক্ষ ছিলেন | কলকাতা সদর দেওয়ানী আদালতের ব্যবহারজীবীরূপে তিনি প্রভূত প্রতিষ্ঠা ও
অর্থ উপার্জন করেছিলেন | মধুসূদন শৈশবে গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষা আরম্ভ করে কলকাতায় ১৮৩৩ সালে
এসে হিন্দু কলেজের সর্বনিম্ন শ্রেণীতে ভর্তি হন |

পাশ্চাত্য জীবনের প্রতি প্রবল আকর্ষণের ফলেই হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন |  ১৮৪৮ সালে
মাদ্রাজ যাত্রা করেন | সেখানকার সাত বছর প্রবাসকালে শিক্ষক, সাংবাদিক ও কবি হিসেবে সামাজিক
প্রতিষ্ঠা লাভ করেন | মাদ্রাজ যাবার পরেই তিনি ইংরেজ রমণী রেবেকা ম্যাক্টাভিসকে বিবাহ করেন |   
১৮৪৯ সালে রচনা করেন ইংরেজী কাব্য
The Captive Ladie |

১৮৫৬ সালে তিনি রেবেকাকে ত্যাগ করে এক ফরাসী মহিলা হেনরিয়েটার সাথে বিবাহ করে কলকাতায়
ফিরে আসেন এবং তাঁর রচনার স্বর্ণকালের সূচনা হয় |  কলকাতায় এসে কাজ করেন পুলিস কোর্টে কেরাণী
ও পরে দোভাষী হিসেবে | ১৮৫৮ সালে রচনা করেন
শর্মিষ্ঠা নাটক | ১৮৬০ সালে একেই কি বলে সভ্যতা
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামক দুটি প্রহসন লেখেন | সেই বছরেই সর্বপ্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখেন
তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য | এরপর ১৮৬১ তে রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি মেঘনাদবধ কাব্য | বিপুলভাবে
বন্দিত এবং তীব্রভাবে নিন্দিত এই মহাকাব্য বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্মরণীয়তম রচনা | এর পর লেখেন
ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২) যা তাঁর রচনার মধ্যে অন্যতম |

১৮৬০ সালে
দীনবন্ধু মিত্র তাঁর যুগান্তকারী নাটক নীলদর্পণ রচনা করেন | রেভারেণ্ড জেমস লং তা
ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ করেন | তার জন্য তাঁকে ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয় | কালীপ্রসন্ন
সিংহ সেই জরিমানার টাকা দিয়ে দেন |  কিন্তু কবিতাটির অনুবাদক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
 ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত  "রায় বাহাদুর দীনবন্ধু মিত্র বাহাদুরের জীবনী"  প্রবন্ধে লিখে
গেছেন |

১৮৬২ সালে কবি ইউরোপ যাত্রা করেন এবং চার বছর পরে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফেরেন | ১৮৬৩ সালে
তিনি ফ্রান্সে গিয়ে ভার্সাই নগরে সপরিবারে থাকতে শুরু করেন | এই সময় তাঁর তীব্র অর্থাভাব দেখা দেয়
এবং ঋণের দায়ে জেলে যাবার উপক্রম হলে, তাঁর লেখা পত্র পেয়েই দয়ার সাগর ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
মহাশয় দেড় হাজার টাকা পাঠিয়ে এবং পরে আরও টাকা সংগ্রহ করে পাঠিয়ে, কবিকে সেই বিপদ থেকে
উদ্ধার করেন | ভার্সাইতে থাকাকালীন ইতালীয় ভাষার সনেট বাংলায় প্রবর্তনের চেষ্টা করেন, যার ফল তাঁর
চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬) |

মাইকেলের জীবন নাটকীয় ঘটনায় ভরা | তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের যোগসূত্র
সৃষ্টিতে সফল | তাঁর রচনায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারার প্রথম সম্মিলন ঘটিয়েছেন | বলা হয় যে বাংলা
কাব্য যেন ছিল নারীধর্মাশ্রিত, মধুসূদন তাকে দান করেছেন গুরুগাম্ভীর্য এবং পৌরুষ | বাংলা সাহিত্যের
গতানুগতিকতার ধারা কে তিনি স্বাধীন চিন্তার পথে প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন |

স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনি দিন পরেই কবি পরলোক গমন করেন কলকাতা জেনারেল হাসপাতালে। তাঁকে
কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোড ক্রিশ্চিয়ান সেমেটারিতে সমাহিত করা হয়। তাঁর বিখ্যাত সমাধি-লিপি
তিনি নিজেই লিখে গিয়েছিলেন।

মিলনসাগরে এই পাতা কবির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।



উত্স:  ডঃ ক্ষেত্র গুপ্ত সম্পাদিত মধুসূদন রচনাবলী ও
.         
ডঃ শিশির কুমার দাশ সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩


কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ইমেল
: srimilansengupta@yahoo.co.in         



এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২০০৫।
এই পাতার পরিবর্ধিত সংসেকরণ -
১৩.৪.২০১৬।

...