প্রিয়ম্বদা দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
সাধনা      
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

বক্ষে তব বক্ষ দিয়ে শুয়ে আছি আমি
হে ধরিত্রী, জীবধাত্রী ! নিত্য দিন যামী
মাতৃহৃদয়ের মোর ব্যাকুল স্পন্দন
প্রবাসী সন্তান লাগি, নিয়ত ক্রন্দন
তারি লুপ্ত স্পর্শ তরে, করি' দাও লয়
বিপুল বক্ষের তব মহাশব্ দময়
অনন্ত স্পন্দন মাঝে ; শিখাও আমায়
সে পুণ্য রহস্যমন্ত্র--যার মহিমায়
প্রত্যেক নিমেষে সহি' বিয়োগবেদন
লক্ষ কোটি সন্তানের, প্রশান্ত বদন ;
তবু ফুটাতেছ ফুল, জ্বালিছ আলোক
উজলিয়া রাত্রিদিন দ্যুলোক, ভূলোক!

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
ব্যর্থ চেষ্টা  
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

শুধু চতুর্দশ পদে বাখানিতে চাই
যে প্রেমে অন্ত নাই নাহি যার শেষ,
প্রতি ছত্রে, প্রতি পদে তাই বাধা পাই,
তাই কবিতার মোর হেন দীন বেশ |
এ যেন মুকুরতলে ব্রহ্মাণ্ডের ছায়া
অসীমেরে টেনে আনা সীমার মাঝারে,
নিত্য নব রূপময়ী প্রকৃতির মায়া
গড়িয়া রাখিতে চাই মর্মের আকারে,
সব পড়েনা'ক চোখে কত থেকে যায়,
চঞ্চল জীবন-লীলা নাহি দেয় ধরা,
হাসিটি ফুটিলে, অশ্রু ফোটে না'ক হায়
হেরি যদি নভস্থল, শ্যাম বসুন্ধরা
পড়ে থাকে বহুদূরে, নির্ঝর নিক্কণে--
সমুদ্রের বজ্রনাদ জাগে না স্মরণে ||

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
খেলা
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

ছেলেদের ছুটোছুটি তট বালুকায়,
হেসে খায় লুটোপুটি ; কি কথা রটায় ?

ছায়াছবি নেচে ফিরে আলো সাখী সনে,
নীল-পায়রার ঝাঁক ভোরের গগনে |

তারাদল ঘরে-ফেরা পাখী
এক সাথে ওঠে সবে ডাকি,
সাঁঝের বেলায় |

লুকোচুরি খেলে ফিরে ফিরে
চাঁদ যে রবিরে ঘিরে ঘিরে,
আকাশের গাছের তলায় |

এক খেলা চিরদিন ছেলেদের মত ;
নাচনের সুর ছাঁদ তেমনি নিয়ত |

এ নিখিলে দেখি বারে বারে,
গগনে ভূবনে পারাবারে,
সকল মেলায়--
সেই সে পাতার বাঁশী বাজে,
তেমনি খেলনা সারি রাজে
নীল নভে সাগর বেলায় |

খোলা মাঠে বন ছায়ে তটিনীর তীরে
নাগর-দোলায় কে যে দোলে ফিরে ফিরে |

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
সত্য
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

তুমি যাবে, স্বপ্নের অতীত,
তবুও স্বপনে এসে বলেগেলে মোরে,
তখনও আঁধার চারিভিত
উষার আলোক উঁকি দেয় নাই ভোরে !
"সত্য গেল" -- কোন সত্য, আহাকেন যাবে
কাঁদিয়া চোখের জলে উঠিলাম জাগি,
ব্যথায় ভরিল বুক, কাহার অভাবে ?
এমোর মায়ের মন, কাঁদে কার লাগি ?
উঠিয়া খুলিনু বাতায়ন,
কাঞ্চন শৃঙ্গের শিরে কনক @@@,
চেয়ে দেখে মানস নয়ন,
মানসের সরোবরে কমল উদ্ভাস !
অঝোরে  ঝরিছে ঝোরা, ঝাউনুয়ে পড়ে
তুষারের শিশিরের নিশ্বাসের ভারে,
গোলাপ উঠিছে ফুটি চোখে জল ভরে'
পাখী যেন কেঁদে কারে ডাকে বারে বারে |
সব যায় সত্য তবু থাকে,
সুখ হোক দুঃখ হোক, শুধু তারই জোরে,
মানুষ যে প্রাণে করে রাখে
স্মৃতির আভাস টুকু বুকের @@@
আজ
সেই স্মৃতি নিয়ে বার বার যাই ফিরে ফিরে,
তোমার স্মরণে ভরা গুটি কত দিনে,
তোমার সে স্বল্প-ভাষ প্রাণে আসে ঘিরে,
আরো কিছু এনে দেয় সুধু দুঃখ বিনে !
সত্য বটে স্বর্গ নয় ধরা --
জন্ম নিয়ে তোমরাই স্বর্গ কর তারে !
আপনি যে স্বর্গ দেয় ধরা
সুখের কথায় আর, পরাণের তারে !
ভালোজানি তোমা তরে নয় সুধু সুখ,
--রাত্রির শুধুই @@@@@@@@@ |
তোমার সে প্রাণ-পণ সত্য সবটুকু,
বেঁচে থাক, চায় প্রাণ এই বরাভয়

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
আশাতীত
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

তোমায় পারি না ধরিতে, পারি না ধরিতে,
মনেতে মিশায়ে আপনা করিতে
.                        ওরে আকাশের আলো,
তোমায় পারি না ধরিতে, পারি না ধরিতে,
.                        যতই বাসি না ভালো |

তোমায় পারি না বাঁধিতে, পারি না বাঁধিতে,
.                        নিত্য নবীন ছন্দে গাঁথিতে,
.                        ওরে মোর ভালোবাসা,
তোমারে পারি না বাঁধিতে, ভাবে রূপ দিতে,
.                        তোমন নাহিকো ভাষা |

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
"চিঠি কই"
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী

আজি এ বাদল দিনে হেন আশা নাই,
আসিবে পথিক কেহ কোন যে অতিথি,
তবু দুরু দুরু বুক ফিরে ফিরে চাই,
যদি আসে চিঠিখানি পরবাসী প্রীতি!

গুঁড়ি গুঁড়ি ঝরে জল, বাতাস শিহরে,
ঘুরিতে ছাড়ে না তবু আঁধার কাননে |
পাখির নাহিক সারা, হরিণী কাতরে
উদার মাঠের লাগি ডাকে ক্ষুণ্ণ মনে |

খাকি বেশ হরকারা, ভিজে ভিজে আসে,
সহসা পড়ে না চোখে, আশা-দুখে-মেশা
কালো লালে বাঁধা তার পাগড়ি বিকাশে
দুরাশা আধারে রাঙা বাসনার নেশা!

চিঠি আসে, চিঠি আসে! ওঠে আর পড়ে
হিয়ার শোণিত, দৃষ্টি কেন ছুটি নেয় ?
নিশ্বাস পড়ে না, হায় কোন ক্লান্তি ভরে
নিতে গিয়ে ব্যগ্র হাত সব ফেলে দেয় ?
কোথা তার হাতের আখর ? ভারে ভারে
মাসিকে দৈনিকে এল দুনিয়ার কথা!
আকাশে আলোর আশা গেল একেবারে,
ভাঙিয়া নামিল মেঘ, মুক্ত আকুলতা!

.         *************************            
.                                                                                
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
ঝড়ের মুখে, পাখীর বাসা যেমন টলমল
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী  
(এই গানটিতে সুরারোপ করেন চারণকবি মুকুন্দদাস। পরে এই গানটিকে মুকুন্দদাসের বলেই অনেকে ভুল করেন।)


ঝড়ের মুখে, পাখীর বাসা যেমন টলমল
.        যেমন নলিনদলে জল,
ক্ষণিকের রঙীন জীবন,
.        তেমনি চপল, তেমনি চপল |
আজ আছে কাল রবে কিনা,
.                কে বলিবে বল ||
তাঁরি লাগি ও ভোলা মন,
.        কেন রে এত আয়েজন---
কড়া বুলি কড়া আঁখি,
.        তোদের মন ভরা গরল!
ভোরের বেলায় আলোর খেলায়
.        শিশির উজল ;
সেই আলো তার বুকের মাঝে,
.        শুকিয়ে তোলে জল ||
সুখের দিনে এই যে নেশা,
.        এই আলো আর জলে মেশা ;
দিন না যেতে ফুরিয়ে যে যায়, দিনের সম্বল |
সুখ যে হবে দুঃখের সাথী,
.        নিভবে প্রদীপ রাতারাতি |
তারার পানে লক্ষ্য রেখে,
.        আপন পথে চল ||

.           ******************   
.                                                                                   
সূচিতে. . .     


মিলনসাগর
মুক্তির সংবাদ
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী
কবি স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত, “ভারতী” পত্রিকার চৈত্র ১৩১৬ সংখ্যা (মার্চ ১৯১০) থেকে
নেওয়া।

সুদূর সিন্ধুর বার্ত্তা করিয়া বহন
অধীর আনন্দ ভয়ে’ দক্ষিণ পবন
প্রবেশ লভিল কক্ষে উল্লাস চঞ্চল ;
পুথি, পত্র, বেশবাস কুন্তল, অঞ্চল,
আন্দোলিত, উচ্ছসিত, বিক্ষিপ্ত ব্যাকুল
চারিদিকে স্পর্শে তায় ; অপার অকূল

ভাস্কর-উজ্জ্বল-জল স্ফুরিত অধীর
তরঙ্গ বিক্ষোভ মত্ত, মুক্ত করণীর
পূর্ণ পালে, লীলানৃত্যে গমন সত্বর
দেখা দিল নেত্র পরে। পাষাণের স্তর
সঙ্কীর্ণ আবদ্ধ গৃহ, রুদ্ধ অন্ধতম
মুহূর্ত্তে মিলাল মায়া মরীচিকাসম!

.           ******************   
.                                                                                
সূচিতে. . .     


মিলনসাগর
বর্ষাগমে
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী
স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত, “ভারতী” পত্রিকার আষাঢ় ১৩১৭ সংখ্যা (জুন ১৯১০) থেকে
নেওয়া।

.           ******************   
.                                                                                
সূচিতে. . .     


মিলনসাগর
বর্ষাপ্রভাত
কবি প্রিয়ম্বদা দেবী
স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত, “ভারতী” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩১৭ সংখ্যা (জুলাই ১৯১০) থেকে
নেওয়া।

বর্ষা এল, প্রিয়তম অসীম অন্বর
সীমাগত পুঞ্জমেঘে, প্রাতঃ সূর্য্যকর
নিরুদ্যম একেবারে সুখীর মতন,
সুশ্যামল তরুলতা, বন উপবন
মর্ম্মর সঙ্গীত মুগ্ধ পল্লব নিচয়
পবনের আন্দোলনে আজি ছন্দোময়।

.           ******************   
.                                                                                
সূচিতে. . .     


মিলনসাগর