কবি রীনা তালুকদারের কবিতা
*
নয় আর শোক লালন
কবি রীনা তালুকদার

কেঁদে কেঁদে চল্লিশ বছর
লালন করেছি শোক
শোকের বাগান জুড়ে লতাপাতা উঠেছে বেড়ে
নয় আর শোক শোক লালন পালন
শোককে দিব নির্বাসন
কোনো উন্মুক্ত চরাচর নয়
হৃদয় জেলে পুরে তালাবদ্ধ

শোকের সাথে গায়ে গায়ে
নয় আর দুঃখ সুখ ভাগাভাগি
শোককে যতই আগলে রাখি পাজরের ইলেকট্রনে
পরগাছা শোক স্বর্ণলতায় লকে লকে বাড়ে
বোঝাপড়া হবে এবার কোটি কোটি কর্মঠ হাতের মিছিলে
শস্য সবুজ বিস্তীর্ণ মাঠে মাঠে; কারখানায়
রূপালী জলের কোরাসে প্রযুক্তির গান গেয়ে
হৃদয়ের অন্তর্জালে শোক শক্তি হোক মুজিব আদর্শে।

.                   ****************                                
.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আল্ট্রা সাউন্ড তরঙ্গ
কবি রীনা তালুকদার

সূর্য রশ্মি চোখে আপন কক্ষ পথে
নজরবন্দী এক ক্ষেপার রাজত্ব
তা রে না রে নেই কোনো
একেবারে হাইড্রোজেন বোমার উত্তাপ
গোলকের গভীরে ফুঁসে উঠে লাল দানব
দুরন্ত আল্ট্রা সাউন্ড তরঙ্গ করে নাজেহাল
শ্বাসে শ্বাসে সহর্ষ সংঘর্ষ
স্পার্ক বাধে চৌরাস্তার জয়েন্টে
কলালাপে মুগ্ধ আঁখি যুগল
দ্যাখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কিছু
কার্তিকের হাওয়া গায়ে ক্রোমোজাম
রাজ্য দখলের আয়োজন ঘন্টা বাজায়
বাদামী বামন সংকুচিত শঙ্খচূড়
ঘর্ষণ বলের তেজস্ক্রীয়ায় শান্ত পঞ্চভূত।

.                      ****************                      

বাদামী বামন - গ্রহ আর তারার মাঝামাঝি ভরের বস্তু। এদের ভর হয় সূর্যের ০.০৮ গুণের
কম। এদের ভেতরে তাপ পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটতে পারে না, তবে
মাধ্যাকর্ষণের কারণে এরা সংকুচিত হয় বলে কিছু শক্তির বিকিরণ হয়।

লাল দানব -  বিশাল তারা যার তাপমাত্রা কম। তারার জীবনের অন্তিম অবস্থা
যখন সেটি তার আগের আয়তনের চেয়ে একশ গুণ ফুলে ওঠে।         

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আগে বাড়ো
কবি রীনা তালুকদার

আটপৌরে জীবনে ভাবছ ভালোবাসার নেই জৌলুস
বহুরূপী আগুনের কত রূপ দেখেছো শ্যাম
সলতে, মোমবাতি, লণ্ঠন বড়জোর বিজলী বাতি
লুপ্ত গুহায় ছাই চাপা আগুনের উত্তালতার মুখে
কী আছে; কে আছে দাঁড়ানোর সাহস রাখে!
এমন এক পর্যটক ক্যামেরায় থাকে ধরা তা
যায় না দেখানো ;
কেবল স্মৃতি চিত্রে সুখে হেসে ওঠা ছাড়া
মুখোমুখি হবার বাসনায় -
হতে হয় আগুন সমান সুন্দর হায়েনা
গলাগলি না হলে গলায়, বন্ধু শত্রু হয় না কোনোটাই
চন্ডীদাসিক মন না হলে রজকীনি রাত পাওয়া কঠিন

আগুন ভরা ভিসুভিয়াস কৃষ্ণ প্রহর চেয়ে বিজ্ঞাপন টানিয়েছে
পেখম তোলা ময়ূর ডাক শুনেও দূর্গা ভয়হীন আগে বাড়ো।

.                      ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভালোবাসার বাজেট
কবি রীনা তালুকদার

আর কেউ ভালোবাসি বললে এখন
ইলেকট্রিক গতিতে হই না শিহরিত
বিচলিত নয় ভয়হীন শোনা কথা
প্রয়োজনে খেলা করে ভালোবাসা
বিলাসিতাও লাগে কখনো এই সব
সর্বত্রই দুর্দান্ত অভিনয় করে কাটে বেলা
রঙ বদলায় মুর্হমূহ আবেগী আচরণ
সূর্যমুখী ভালোবাসাও থাকে না ভাল
ভেজালে গা ঢাকা দেয় সময়ের তালে
নষ্ট মন পুলকিত; ভ্রষ্টাচারে হয় লিপ্ত
সময়ের সাথে সবাই সাজে সঙ
জেনোন গ্যাসে দূর করে দিবো কষ্ট
বক্ররেখার চতুর খেলার ব্রেনওয়েভে
হাড় হাভাতে ভালোবাসা নিয়ে কোনো
থাকে না বাজেট চলতি জীবন খাতায়।

.                      ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
অসম বোল
কবি রীনা তালুকদার

ডাকো যখন অদৃশ্য হাত ইশারায় ভীষণ
ব্যস্ত আমি আপন কাজে মনটা উচাটন
এদিক সেদিক ও চোখ মুখ উদ্ভাস আয়নায়
দূরে ডাকে তীর্যক সুরে কুটুম পাখি বায়নায়
বলে কথা কানে কানে সবকটি দেহজ অর্গান
অতিথি মনোচোর চুপিসারে ধড়ফড় প্রাণ
হাওয়ার ঠোট চুমি উড়ায়ে দেই শূন্যে
কুসুমিত চারপাশ সাজে নানা পুর্ন্যে
বাহারি চুলের স্প্রিং রোডে তড়িৎ তাপা হাত
পরশে পরম মমতায় ভুলায় আঘাত
ঘণ্টা বাজে বুকের মন্দিরে দোলে পূজার দোল
অদেখায় কেঁদে ফিরে অকারণ অসম বোল।

.                      ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছাতিম গাছ
কবি রীনা তালুকদার

বোকা ছাতিম গাছ ছিল আমাদের বাগানেও। খুব বেশী নয় পুরনো। সিধে সাদা
সরল রেখা ছাতিমের নরম কচি ডাল। পাতা উপরো মুখো, ছাতিমের কাঠে হয় না খুব
মজবুত আসবাব। বুকের বেড় পেরোলেই যায় হয়ে বিক্রি। না হলে বিক্রি বাড়তি পুরনো
মায়াধরা বস্তুসম। না যায় ফেলা না লাগে কাজে। রাখা তবুও মমতার বন্ধন জাল।
দেয়াশলাইর কাঠি তৈরীতে কাজে লাগে ভাল। টিঙটিঙে লিকলিকে ছাতিম সারাটা বছর
থাকে চুপচাপ।বড় সড় বধির বেয়াকুপ যেনো। লম্বায় ইউক্যালিপ্টাসের ছোট্ট সহোদর।
নীরব এ অলস ছাতিম তর তর করে সুশৃঙ্খল ওঠে বেড়ে। সোজা আকাশের দিকে মাথা
ফুঁড়ে ডালপালা মেলে তালগাছের সাধ মনে। ধুমল বর্ষা পেলেই হলো। ছাতিম ফুলের
সুবাসে মৌ মাতাল দশদিক। তীব্রতর ঘ্রাণ করে তাড়া হারিয়ে যাবার বাধন হারা ইচ্ছে।
দুনিয়ার সব দামী পারফিউমকে সুঘ্রাণে ফেলে দেয় পিছনে অনায়াসে।
... আর বর্ষা এলে তবেই তুমি ছাতিমের সুগন্ধি ফুল।  

.                        ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বেরসিক ঘুম
কবি রীনা তালুকদার

নির্দ্বিধায় সোজা বলো -
উষ্ণ বুকে মাথা রেখে ঘুমাও লক্ষ্মী ...
কত সহজে সুবচন দাও বলে
লক্ষ্মীর ঘুমতো শান্তির দেবদূত
এ ক্ষয়িত চোখ করবে স্পর্শ
কী ভাবে সহজ এতটা সমরেখা বিন্দু
বেঁচে থাকা হাজারো অসংগতি নিয়ে
কানাকুয়ো রাতের সবটাই থাকে জুড়ে
এলেবেলে বিরস ভাবনার ছায়াছবি
প্রশ্নবোধকে সেখানেও থাকো দাঁড়িয়ে
মাঝে মাঝে ভীষণ ভাবেই হতাশ মন
হার্য ঘুম ভাঙে হতাশার আবেশ চোখে
পর মানুষ পরই হয় কখনো কখনো
পারি না চিনতে নিজের চেনা জানা ভুবন
পায়ের তলায় যাকে সমকোণে সুষম মাটি ভাবি
ফ্যালে উপড়ে সেই বিশ্বাসী বৃক্ষের মূল শুদ্ধ
বন্যা, খরা, ঝড় জলোচ্ছাসে করে অনিকেত
মুখর বিশ্বাস ভাঙ্গে নৈমিত্তিক ছুটি
মুকুরে ফের সাজানো সুখদ তীর
ছোপ ছোপ বালুচরে আশায় বসত
কুঁড়েঘর নড়বড়ো পরবাসী হাওয়ায়
কৃষ্ণ বিবর তাপে পরকীয়া গান গায়
অদূরে সুদূরে আরশি পড়শী
সাহংকারে তবুও কী বলবে -
মুক্ত বুকে মাথা রেখে ঘুমাও লক্ষ্মী !

.                     ****************                      

কৃষ্ণবিবর - মহাকাশের এমন জায়গা যেখানে মাধ্যাকর্ষণ এমন প্রবল যে সেখান
থেকে আলোও বেরিয়ে  আসতে পারে না। সূর্যের চেয়ে দশগুণ ভরের কৃষ্ণবিবর
অতিনবতারা বিস্ফোরণের জন্ম দিতে পারে। কোয়াসারের ভেতরে সূর্যের ভরের
চেয়ে দশ লক্ষগুণ ভরের কৃষ্ণবিবর দেখতে পাওয়া যায়।

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
দূরে চলে যেতে হয়
কবি রীনা তালুকদার

সময় হলে যেতে হয় চলে সুদূরের দূরত্বে
যতখানি দূরে গেলে হয় ভাল
না হলে সম্পর্কের দেয় দেখা টানাপোড়েন
সুসময়ই করে আপন দুঃসময়ই যেতে বলে দূরে
মানুষ এখানে অসহায়, নেই কিছু করার
পোড়া দুঃখ স্মৃতির পাকস্থলীতে হয় না হজম সহজে
মানতে হয় তবুও অহেতুক
জলমগ্ন দুঃখ নদীর জল শুকালে
পাথর চোখে আগুন বেরোয়
নিঃশ্বাস চাপা আগ্নেয় বিস্ফোরণ ঘটাবেই সন্দেহাতীত
রেটিনায় ক্ষয়ে যাওয়া শত চিহ্ন বিস্মৃতি
মানুষের জীবনে ব্যক্তিগত থাকে কতটা দুঃখ
সার্বজনীন দুঃখের আঘাতেই ব্যক্তি জীবন নিঃশেষ
ব্যক্তিই করে দুঃখ ধারণ; যায় না বাতাসে উড়িয়ে দেয়া
নৈর্ব্যৃত্তিক দুঃখের নেই কোনো অস্তিত্ব
বিড়ম্বিত দুঃখ যতই হোক ভারী যেতে হলে দূরে
সঙ্গী বলেই তাকে ভাবতে হবে
তার বেশী বিকল্প কিছু থাকে না জানা ।

.                     ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আরো কিছু অতৃপ্তি
কবি রীনা তালুকদার

না হয় আরো কিছু অতৃপ্তি যোগ হবে হোক। স্বপ্লায়ু জীবনে সব কিছু পেতে নেই।
সব কিছু পেয়ে গেলে থাকে না জীবনের কোনো জীবন্তিকা। তাগিদ না থাকলে জীবন হয়ে
যায় একঘেঁয়ে। সোনালী সুখও সেখানে লাগে পানসে। কি আর এমন পরম সুখের তৃপ্তি
দেবার ক্ষমতা রাখো! না পেতে পেতে অনুভূতির কোলাজে এক সময় যায় সয়ে না পাবার
অঙ্কণ চিত্রটা।  ওঠে অভ্যস্থ  হয়ে না পাবার কষ্টেরা।  মনোযোগ নষ্ট করে সামান্য পাবার
আকাংখা। নেই যা তার জন্য দুঃখ শোকের পরাগায়ন কেন? দেবার ক্ষমতা যেখানে
অপ্রতুল; আশা পুষে রাখাও নিরর্থক সেখানে। এই ভালো নেই যা তার জন্য মিছে ক্যালরী
খরচায় বিরত থাকা।  

.                                      ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
অনুমান নির্ভরতা
কবি রীনা তালুকদার

ভালো না বাসলে তাতে কি ...
দায়ী করবো না কোনও অপরাধে
নয় তুলনা যা পারি না;
আছে যা তা নিয়ে যেতে পারি কতদূর
হৃদপিন্ডে লালন করি না অস্বস্তি
নেই ম্যানিয়া রোগ মনোজগতে
থাকে যার যা নিজস্ব বেসাত
আছে যা যা সেই তো আমি
নেই যা দুঃশ্চিন্তাও নেই পাবার
আছে স্বপ্ন মৌলিক কণা ভেঙ্গে
এগিয়ে যাবার প্রয়াসে নিরন্তর
ল্যাবরেটরী চলমান দু’চোখে
ভক্তিকে মনে করো না দুর্বল
শক্তিতে দৃঢ়তা রাখি মেরুদন্ডে
ভক্ত হৃদয়ের গভীরতা না জানলে
তার সুযোগ্য হয়ে ওঠা প্রশ্নবিদ্ধ

কারো জীবনে ভালোবাসা বাণ বন্যায়
আসলে যেতে চায় না; কেউ চায় না চায়
কারো কারো জীবনে পরম যত্মে
আগলে রাখতে হয় ঝড় জলোচ্ছাসে।

.                     ****************                      

.                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর