কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
আবার যখন
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

আবার যখন প্রলাপ জাগবে ঠোঁটে
তরঙ্গেতে ভাসিয়ে দিও ভাষা
আবার যখন বিরক্তি জন্মাবে
বন্ধ হবে বার্তার যাওয়া আসা।

আবার যখন ইচ্ছে দেবে হানা
আসতে পারো, দুয়োর হয়নি দেওয়া।
আমার মরণ মিথ্যে নিয়ে বাঁচি –
সত্যি মানে মরমে মরে যাওয়া।

নির্লজ্জ আপাদমুণ্ড পেতে
চাইছিলে যা খানিকক্ষণের সুখ।
উজাড় করা মনের তলানিতে
হয়ত পেতে, রাখলে কোথায় মুখ?

আবার যখন খেলতে ইচ্ছা হবে
মুঠো ফোনের বোতাম নিয়ে খেলো
প্রগলভতা এবং নীরবতা
খেয়াল-খুশি পাশার দান ফেলো।

এবার যদি আগুন লাগে মনে
ঘর বাঁচিয়ো আঁচের কবল থেকে
অঞ্জলিতে রাতের শিশির নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছি, দেখতে পারো মেখে।

.             *************************            
.                                                                                        
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
অনর্থক কথকতা
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমি কি শুধুই লিখে যাব
মাসকাবারি আবর-জাবরের স্তুপে
ওজন দরে অপঠিত প্রত্যাখ্যাত পংক্তিমালা?
আমি কি শুধুই লিখে যাব
ঝালমুড়ির ঠোঙায় দশ টাকার টক ঝালের সঙ্গে
ফাউ কিছু মসিকতা?

দেখে যাব অসুরদলনীর ছৌ মুখোশ মাড়িয়ে
রক্তবীজেদের অট্টহাসে ছড়িয়ে পড়া?
অগ্নিপরীক্ষায় মৃন্ময়ী সীতার মহাকাব্যিক গৌরব,
আর ডাঁহা ফেল চিন্ময়ীদের ময়না তদন্ত?
যাজ্ঞসেনীর রন্ধন-বিরতির দিন অসহায় সখা স্মরণ?
দেখে যাব রুদ্ধ অভিমানে দ্বিধান্বিত বসুধায়
হা-হা-হা শ্বাসবায়ুর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া?
শুনে যাব মায়াবী ভবিষ্যতের রূপকথা
আর যাপন করে যাব
ভাঙাজর্জর অপ্রাপ্তির একঘেয়ে অভ্যাস?

শুধু লিখে যাব রবিবারের টাটকা প্রতিবাদ
সোমবারে বাসি হওয়া অব্দি; আর
হিংস্র বিকৃতির খবরে ক্লেদাক্ত কাগজের
ঠোঙা সেজে জিলিপি বিতরণের অপেক্ষায়?

.             *************************            
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
অঙ্কুরে
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ও বই বড়দের তোমায় পড়তে নেই;
গুপি বাঘার গান তো আছে, শুনতে পারে সেই।
পাকা পাকা ঐ সিনামা, তোমার জন্য নয়;
অ্যালিস আছে ওন্ডারল্যান্ডে তোমার অপেক্ষায়।
বড়দের ধারাবাহিক, কী দেখছ ধাৎ!
আইস এজ দেখবে না, ডাকছে ম্যামথ?
বড়দের সব কথা কি বুঝতে পারো সোনা?
তোমার জন্য স্টুয়ার্ট লিট্‌ল, তার সাথে খেলো না।
আজে বাজে বিজ্ঞাপণ চ্যানেল ঘোরাও
পরীক্ষা এল বলে, পড়তে বসবে যাও।

জগৎ ভরা কদর্যতার থেকে পেছন ফিরে,
সুকুমার রায় সুকুমারীকে রেখেছিল ঘিরে।
আত্মজাকে দুধেভাতে ডুবিয়ে আগলে বুকে
অন্তরীক্ষ অভিযানের স্বপ্ন বুনি চোখে।

আড়াল করে রেখেছিলাম শব্দগুলো শুধু
ঘটনা এসে দিল হানা, তপ্ত দুপুর ধূ-ধূ-
থামিয়ে দিল কিচির-মিচির খুশির কলরব  
গাড়িকাকু ছিনিয়ে নিল এ জন্মের শৈশব..

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
আরশোলা
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রাগৈতিহাসিকতার নতুন নাম আধুনিকতা
আমার দু চোখে অভিব্যক্তিহীন অবলোকন।
নৃশংসতার ভালো নাম বীরত্ব
তার কাছে আমার নিঃশর্ত সমর্পণ।
কোমলতার আর এক নাম ভীরুতা
আমার বাঁচার নিজস্ব অবলম্বন।
ভালোবাসার নাম তাই দুর্বলতা
বড় লজ্জা, বড় লজ্জার কারণ?
সভ্যতা হয়ত মুখোশ।
ছিঁড়ে ফেলাই কি একমাত্র সমাধান?
সংস্কার ছুঁড়ে ফেলাই যখন প্রগতি
প্রবৃত্বির দাসত্ব করেই যাপিত হোক মুক্তি!
শিকারীর ব্যক্তি-স্বাধীনতায়
শিকারের মর্ষকামী স্তুতি।

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
অভিযোজন
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

চেতনা বধির হল না বলেই
কষ্টগুলো শিখল না মূক হতে।
হতাশাগুলো বেহায়া এমন
হাসির আড়ালে চাইল না লুকোতে।
প্রতিবাদ? করার কে হই?
খ্যাতির অভাব মস্ত বড় দোষ।
ভাষা থেকেও ভাষ্যহারা
বুকের ভেতর বৃথাই জমা রোষ।
তার চেয়ে বরং কাগজ পড়ি
নিজের কথা পরের মুখে শুনি।
গেলাস হাতে বিশিষ্টজন,
কলম চালান সমস্যাসন্ধানী।
কিংবা চল রাংতা ধরি,
মাথার নীচে থাক বালিশের ওম্;
ইন্দ্রজালে ডুবে থাকা
ভুলে থাকাই ব্যথার উপশম।

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
অভিস্রবণ
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের শোবার ঘরে চলো
সমুদ্র সৈকত নিয়ে আসি;
রাশি রাশি ফেনা লুটোপুটি খাক বর্নময় আবর্তে।
আর শিশুরা ভেজা বালির স্থাপত্যে
গড়ে তুলুক বহুতল অট্টালিকা।

চলো শয্যা পাতা ঘরটাকে
বানাই গহিন অভয়ারণ্য –
হরিণীর ত্রস্ত চাউনির মায়ায়
তীর ছুঁড়তে ভুলে যাবে ধুরন্ধর শিকারীও।
বরং মৌ-শিকারীর আসর জমে যাক
নাম না জানা ফুলে ফুলে,
দুলে দুলে গান শোনাক অচিন পাখিরা।

আমাদের অভ্যাসদীর্ণ শয়নকক্ষে
কিছু কাব্যও কি হয় না রচিত –
যার নির্যাস অক্ষ-দ্রাঘিমা রেখাগুলো
বেয়ে বেয়ে মরূপ্রদেশে
বয়ে নিয়ে যাবে বনমহোৎসবের আহ্বান?

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
ব্যালেন্সশীট
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

কে কাকে বেশি কষ্ট দেয় বোঝা ভার।
তরাজু তুমি ভুল করো, ভুল করো বারবার।

জলের ফোঁটা গুণে কি বাঁধের ক্ষমতা মাপা যায়?
চোখের বাঁধ পরখ করবে এত অবলীলায়?
তবু চোরা রক্তক্ষরণের ওপর অশ্রুর বিজয়।

কে বেশি কাঁদে বোঝা দায়।
হৃদযন্ত্র না অক্ষিগোলক, কে কাকে ছাপিয়ে যায়?
কীসে দোষ বেশি - ভুল করায়, না ভুল বোঝায়?
কে বেঠিক - অন্ধ প্রেম, নাকি তার নাগপাশ থেকে
মুক্তিকামনার সমঝদারি?

অন্ধ নিক্তি, তুমি মেপে যাও, মেপে যাও।
অন্ধ নিক্তি তুমি সর্বজ্ঞ নও।

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
ধারাবাহিক
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

এমনটা রোজ ঘটে চলে
প্রতিক্ষণ অজুতে অজুতে –
মা বসুধা দ্বিধা হয় না তো
কোটাল বসেন খাতা হাতে।
মসি খবরের সন্ধানী –
রোমাঞ্চের ধারা-বিবরণী,
মতামতে নানা গুণীজন।
তাৎক্ষণিকতা মেনে লেখা,
সাময়িকতায় মনে রাখা;
তারপর ভোলা প্রয়োজন।

‘বলাৎকার’এর  প্রতিশব্দ বহু –
সেগুলোও ব্যবহারে ক্লীশে।
তবু এর ধারাবাহিকতা
নতুন পুরোন মিলেমিশে!

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
ধস
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

আয়নায় ঘুরেফিরে দেখা
পোষাকের ধোঁয়াশাখানি মেখে
ইশত আভাষিত যেন
যা কিছু রাখতে চাওয়া ঢেকে।

গাড়ি নেই, নেই পুল কার
দ্বিচাকার লিফ্‌ট নেই কোনও
স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে
পল-অনুপল সব গোনো।

পরপর দুটো চলে গেল
প্রথম ক্লাসটা গেল ফাঁকি;
এরপর উঠতেই হবে-
লেডিজ না হয় ভেন্ডারে থাকি।

মানুষ আজ জীবানুর বাড়া
ভীড় মানে কারও মাঠ ফাঁকা-
ধূলোয় মিশিয়ে গেল যেন
কিশোরীর দুটি অহমিকা..

.           *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
গর্ভগৃহ
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

মুখে রঙের আস্তরণ
দেহে উন্মোচনের ইশারা
আদিম পসারিণী-
নাকি আবহমানের দাসী?

পতিতপাবনী আজ নর্দমার বিকল্প
কোষে কোষে কর্কটের কড়া নাড়া
ফুলের রেণুও আছে চোরা আক্রমণে!
হে উপবীতধারী, গর্ভবাস
কি এর চেয়েও মলিন?

কত উদ্দেশ্যহীন শুক্রকোষ
প্রতিমুহূর্তে উৎক্ষিপ্ত হয়
দাসত্ব, পসার কিংবা একক প্রতিরোধকে
দলবদ্ধ হিংসায় ধ্বস্ত করে ।
সৃজন বেদনাময় নয় বলেই
বীর্যবান, তুমি এত ধ্বংসপ্রিয় !

অনর্থক নির্মাণের খেলা বিশ্বময়-
ঈশ্বরের নামে, কবিতার নামে,
সৌন্দর্যের নামে—নির্মাণের বিপণন ।
সেই নমাস ছিলাম অকৃত্রিম পবিত্রতায়।

.       *************************             
.                                                                              
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর