কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
নিকষিত হেম
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমরা কেউ স্বার্থহীন নই।
কেউ ভাবি না কাছাকাছি থেকে
পাশাপাশি শুধু বসে রই।

কেউ বলি না খালি হাতে এসো,
কেউ বলি না হাত পেতে নেই।
স্বার্থ অর্থে, যশে, যৌনতায়
চায় যোগী সাজতে সকলেই।

বিনিময়তা শুধু দ্বন্দ্ব করে –
কে দেয়, কে নেয় হাত পেতে?
কত পেলে কতখানি দেব,
হিসাব চলেই অজানিতে।

আমরা কেউ শর্তহীন নই।
বুকে মাথা, আলোকবর্ষে স্নেহ।
আমরা কেউ দ্বিধাহীন নই;
স্পর্শে স্পর্শে শুধু সন্দেহ।

.             *************************            
.                                                                                        
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
নির্লিপ্ত প্রসার
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পর্ক সব কচুরিপানা,
গভীরে শেকড় নেই কারও।
ভেসে ভেসে কাছে আসা,
ভেসে ভেসে দূরে চলে যাওয়া
স্রোতের অনুশাসনে।
বৈতসী আত্মমগ্নতার
বৈশাখী ঝড়ে হেলদোল কি থাকে?

মুঠোভাষে প্রিয় সংখ্যারা
ডাক দেয় বিশেষ ঝংকারে।
প্রলাপ সংলাপে জমানো সময়
নিঃশেষ হতে থাকে
অন্তহীন অন্তরঙ্গতার কামনায়।
তারপরেও নৈঃশব্দের দৈর্ঘ্যে
সংখ্যারা বদলে যায় –
চলভাষও কাঁপে নতুন মূর্ছনায়।

কচুরিপানা দখল চায়
জলাশয়ের সমগ্র তলের।
শেকড় গাঁথার দায় থাকলেই
তো ছিন্নমূল হবার যন্ত্রণাকে ভয়।

.         *************************       
.                                                                               
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
পাগলি স্মরণে
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

তার কথা জানা নেই কারও
হাবভাব সলকের চেনা
খোঁচালেই গালাগালি আরও
শোনা যাবে -পয়সা লাগে না।
কী যেন পড়ার কথা বলে

কে যেন পড়াবার ছলে
সব কিছু কেড়ে নিয়েছিল
পাগোল তো – কত কিছু বলে।
বাছা কাঁচা খিস্তির ঢেউ
দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে কেউ।
কেউ বলে মুখ ভেঙে দেবে
শাড়ি খুলে নিতে চায় কেউ।
সে কাঁদে ভেংচায় লোকে
প্রলাপ কিছু তো কানে ঢোকে
যে বাপ সেই নাকি সব !
মাকে মেরে ফেলে গেছে ওকে।
মাথার ওপর নেই ছাদ
লজ্জার ভেঙে গেছে বাঁধ
পোড়া পেটে শুধু খিদে পায়
এঁটোকাঁটা? হোক তবু খাবারের স্বাদ।
স্টেশনের ধারে রাস্তায়
পাগলি রাত্রে কাতরায়
কুকুর ও শেয়ালের ভোজে
পাগলির পেট বেড়ে যায়।
জানা নেই কারও, পাপ কার?
একজন নাকি জানা যাবে?
প্রাণ দিতে প্রাণ পরিহার
সদ্যোজাত আর কী হারাবে?

.         *************************       
.                                                                               
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
প্রাজ্ঞতা
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

চলার পথে মা উটপাখি ফেলে যায় রুগ্ন সন্তানকে।
সময়ও ফেলে যায় কত অকাল পতন।
নিস্পৃহতাই তার দার্শনিকতা।

আমি সময় নই, পদাতিক পক্ষিমাতাও নই।
পিছুটানে দাঁড়িয়ে থাকি -..
আর সবার ছুটে টপকে চলা দেখি।
আধ্যাত্মিক নয় এ মায়া।
মোহমায়া স্নেহ জড়িয়ে মড়িয়ে
নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছি আগুয়ানদের পথে।
সবাই মাড়িয়ে গেছে;
আমাকেও, আমার সন্ততিদেরকেও।

বিপদপ্রাজ্ঞের মতো আমারও কি উচিৎ ছিল
অশক্তকে ছুঁড়ে ফেলে সমর্থকটিকে
বাঁচার রাস্তা চিনিয়ে দেওয়া?
মহাকাব্যেও তো দেখি সহমৃতা মাদ্রীর চেয়ে
কুলটা কুন্তীর জয়-জয়াক্কার!

নীতিশিক্ষা দিতে এসো না হে প্রাজ্ঞ –
তোমায় লজ্জায় ফেলে দিতে পারে
তোমারই পরিহার।

.         *************************       
.                                                                               
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
সময়ের স্তব্ধতায়
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

ওরা ছজন ছিল না?
সপ্তমজন ছিল লোহার দণ্ড –
নিম্নাঙ্গ থেকে অন্ত্র ভেদ করে
হৃদপিণ্ড এফোঁড় ওফোঁড় করা।
ওরা চারজন ছিল না?
পঞ্চমজন ছিল আগাপাশতলা,
মুখে জুতোসমেত পদাঘাত।
আর ষষ্ঠজন সর্বভূক অনল।
ওরা দশজন ছিল? বারোজন? একে একে?
এক সাথে তিনজন নয়তো?!
ওরা কতজন, কতজন,...?
রক্তাত্ত, বিকৃত, দগ্ধ নারীদেহের মিছিল,
ওরা কতজন ছিল?
ওরা কে ছিল?
ডাকাত, মস্তান, মন্ত্রী, নেতা, ধর্মগুরু?
স্বামী, শ্বশুর, ভাসুর, প্রতিবেশী, দাদু, কাকা,..বাবা?
বোরখা-অবগুণ্ঠনবতী-শৈশব অনুত্তির্ণা
মর্গবাসী পচনশীল লাশের স্তূপ,
কে ছিল? কে ছিল?
ওরা তোর কোন আপনজন ছিল বলতো?
দাদু, ঠাকুমা, বাবা,..মা?
জনম্মাত্র আবর্জনায় তোর সৎকার করেছে যারা?
অবশ্য কড়ি দিয়ে বেড়ি কিনে
কী আর পেত তোর জন্মদাতা?

তোদের দেখে কী করি বলতো –
পরজন্মের হাপিত্যেশ, না শেষ বিচারের অপেক্ষা?
ওপরওয়ালা আবার সাক্ষী চেয়ে বসবেন না তো?
এখানে প্রমাণাভাবে বেকসুর খালাসের দল
দেখ, কেমন অট্টহাস্য করছে!
.......ভ্রূণহত্যায় তাই পাপ দেখি না।
সে তো এই ‘কে’, ‘কতজন’দের
কবল থেকে আগাম মুক্তি।
#
আয় অতৃপ্ত আত্মারা,
আমি তোদের গর্ভে ধারণ করি।
কোটি কোটি কন্যা ভ্রূণ নিরাপদে থাক
আমার অপরিসর জঠরে।
-আয় সোনারা। আর হতে হবে না কোনও
রক্তচক্ষূ বাপের কামনায় অসহায় মায়ের গর্ভস্রাব,
যারা সূক্ষ্ম শব্দতরঙ্গে টের পেয়ে যায় তোদের মাতৃত্ববার্তা।
-আয় মায়েরা, মায়ের গর্ভে আয়।
শৈশব থেকে সাপ সিঁড়ি পথে যুবতী করে
তোদের আর পাঠানো হবে না জতুগৃহে।
প্রকৃতির ঋতুচক্র হয়ত যাবে থেমে।
থামুক। থামুক।
বিবমিসা ঠিকই বন্ধ হবে একদিন।
আর আমি তোদের স্পন্দন, সঞ্চালন
অনুভব করে যাব আমার প্রাণভার বাহী দেহে।
অন্তরে গড়ে উঠুক বালখিল্য নয়,
সহোদরার সুকুমার ভূবন।

নৃশংস, দুষিত ধরায় আনব না কোনওদিনও।
জন্মদ্বারে শাবলের পরিবর্তে
পিতৃজাতের চুম্বনের প্রতীক্ষায়
জরায়ুর নিরাপত্তায় রেখে দেব
হাজার, হাজার বছর।
গর্ভধারিণী থেকে যাব, প্রসবিণী এই ক্ষণে নয়।

ঋতুচক্র থেমে থাকে, থাক।
লজ্জা পাক সদাব্যাস্ত সময়।

.         *************************       
.                                                                               
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর   
*
স্পর্ধা
কবি শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

চামেলির দর তুমি ঠিক করে দেবে
এই অধিকার তোমার জন্মগত –
অযথা অর্থব্যয়ে সুখ খুঁজে যাবে?
শিকার ধরো বরং দলগত।

বিনি পয়সার ভোজে সারা বিকৃতি
তোমার জন্য, আমার আছে ক্ষয়।
কার প্ররোচনায় প্রকৃতি আত্মঘাতী,
তোমায় সৃজন করেই ডুবতে হয়।

জানি না বেলা মালতীরা কোথা থেকে
ক্রীতদাসত্বে বাঁচার খিদে জোটায়
দরাদরি করে দামও নিয়ে নেবে তুমি
বিসুখে ডুবে তোমারই সুখ ফোটায়।

স্রষ্টা রয়েছে সৃস্টির হাতে বন্দি
আমি তো জানি সৃজনে কী যন্ত্রণা ..
ফোকটে পৃথিবী কিনবে অভিসন্ধি
আকাশের কানে পাঠাচ্ছ মন্ত্রণা!

.         *************************       
.                                                                               
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর