কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
কবির প্রতি
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।


কবি আজি কোথা তুমি? কোথা তব সে ভৈরব সুর
যে সুরে বাঁধিলে তুমি বীণা তব ভীষণ মধুর?
কোথা তব কম্বুকণ্ঠে সেই মত্ত সিন্ধুর ঝঙ্কার?
কোথায় লুকালে কবি, সেই দৃপ্ত কেশরী-হুঙ্কার?
কোথা রেখে এলে কবি, সেই তব ঝঞ্ঝার নর্ত্তন?
উন্মত্ত, অশান্ত, ক্ষুব্ধ কোথায় সে দুরন্ত গর্জ্জন
বন্ধন-যাতনা-ক্লিষ্ট শান্তি-হীন মুক্তি-পিপাসুর?
কোথায়, কোথায় কবি, সেই তব রণ-ভেরী-সুর
তরুণের মর্ম্মে যাহা জ্বেলে দিল প্রচণ্ড সাহারা?
লক্ষ লক্ষ যুবকেরে ক’রে দিল মত্ত, গৃহ-হারা?
মনে পড়ে সেই দিন---যেই দিন তুলি জয়-ভেরী
তরুণ জাতিরে তুমি ডাক দিলে, আর নয় দেরী---
জাগো, জাগো, বন্ধু, জাগো---কত কাল ঘুম-ঘোরে রবে?
হৃদয় উপাড়ি আজি মাতৃপদে অর্ঘ্য দিতে হবে।
বিংশবর্ষ পূর্ব্বে সেই দুর্যোগের তামসী-নিশায়
মুক্তির সমর-গীতি শুনাইলে তুমি বাঙলায়।

আজি কবি, ফিরে এস সেই রুদ্র-রণ-তূর্য্য করে ;
নিয়ে এস সেই ঝড়, সেই ঝঞ্ঝা, বক্ষের ভিতরে।
ছেড়ে এস মেঘ-লোক, এস কবি কল্পকুঞেজ ছাড়ি ;
তোমার স্বদেশে আজি লুণ্ঠ্যমান লক্ষ নরনারী
কাঁদিছে ধূলির পরে,---হস্তপদ আবদ্ধ শৃঙ্খলে ;
নির্ম্মম মনিব-দল পৃষ্ঠে বুট হানিছে সবলে!
লেগেছে আগুন আজি ভারতের কুটিরে, কুটিরে ;
মনুষ্যত্ব দগ্ধ আজি ; সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র তীরে,
গোদাবরী-মহানদী-তাপ্তি-কৃষ্ণা-নর্ম্মদার ধারে

.                ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অপরাধী
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।


সৈনিক আমি---সত্য চাহিনু, রাজার হুকুমে তাই
বধ্যমঞ্চে দাঁড়ায়েছি আজে ; মরণের আগে ভাই,
রেখে গেনু এই মরমের ব্যথা সিক্ত আঁখির জলে ;
বুকের জমাট রক্তের মালা হে ধরণী, তব গলে
দোলাইনু আজি জীবনের সাঁজে ; আমার বেদনা কবি,
আঁকিও তোমার করুণ তুলিতে ; দেখায়ো নরের ছবি
অত্যাচারীর সঙ্গীনাহত ক্রুশের উপরে ঝুলে,
পায়ের তলায় অভাগিনী মাতা কাঁদে এলোথেলো চুলে।
রাজার আইন---প্রেম সেথা নাই---নাহি সেথা ভগবান ;
তরবারি সেথা দিবানিশি করে মানব রুধিরে স্নান।

.        বুড়া পিতা মাতা---আমিই তাদের ছিনু অন্ধের আঁখি ;
সৈনিক দলে যোগ দিতে হ’ল, --- রাজার হুকুম নাকি!
পল্লীর বুক ছেড়ে যেতে হ’ল---গ্রামের প্রান্তে আসি
লইনু বিদায় আখি-জলে ভাসি ; ছিল যারা প্রতিবাসী
রহিল দাঁড়ায়ে অনিমেষ চোখে। স্নেহের জননী মোর

.                ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কামধেনু
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।


.                
দেশ যাহা ছিল

বড়দিদি, উঠে পড়, আর বেশী রাত নাই,
ছোট জা, গো! জাগো, জাগো, ভোর হ’য়ে আসে ভাই!
পদি পিসি উঠেছিস্! বেশ বেশে তাড়াতাড়ি
ঘুঁটেগুলো ধরা দেখি---উহু, আজ শীত ভারি!
লাটাইটা খেঁদি দিদি চট্ পট্ নিয়ে আয়,
চরকার সাথে ঐ সৈ মোর গান গায়।
বৌমার পাঁজগুলো সত্যি কি সুন্দর!
বড় দি গো! শুয়ে কেন? সুরু কর ঘর্ঘর।

ঘর্ঘর ঘর্ঘর চরকায় গায় গান---
রায়েদের বৌগুলো এত ভোরে ভানে ধান!
পদি পিসি, কাল বুঝি ও বাড়ীতে বৌভাত?
বড় দিদি, তোর ভাই কত জোরে চলে হাত!
মাগো! আর পারি নাকো, সূতাকাটা হল দায়,
মাসী দুটো ঘুঁটে দেনা, আগুন যে নিভে যায়!
খেঁদি ভাই! তোর কাছে আর দুটো হবে পাঁজ?
শুকতারা ডুবে গেল, এখনও যে কত কাজ!

ঘর্ঘর ঘর্ঘর চরকায় গান গায়---
রামুঘোষ গরু নিয়ে মই ঘাড়ে মাঠে যায়।
রায়েদের মণ্ডপে ঐ বাজে নহবৎ---
ছোঁড়াগুলো এইবার জুড়ে দেবে কসরৎ।
নাটাইটা দাও দিদি, সূতাগুলি তুলে রাখি,
সব পাঁজ শেষ মোর, একটাও নাই বাকি।
শীত এল, বিহারীর জামা দু’টো চাই মাসী ;
সূতাগুলি দাও দেখি, তাঁতীবাড়ী দিয়ে আসি!


.                     প্রভাতে

ওরে জগা, ওরে মাধা, শীগ্ গির উঠে পড়---
দেখে যারে মাঠ-ভরা কাপাস কি সুন্দর!

.                        ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কারার দুয়ারে
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।


কারার দুয়ারে বন্ধু, বিদায়ের লহ সম্ভাষণ।
বেদনা-সিন্ধুর তীরে আমাদের আজিকে মিলন ;
বিচ্ছেদের রাত্রি আসে, ছায়া তার পড়েছে অদূরে ;
আলো আঁধারের তীরে আজি গান গাব কোন সুরে?
গাব না দুঃখের গান ; দুঃখ মিথ্যা, মিথ্যা অন্ধকার ;
সত্য শুধু মুক্তি-পথে মানুষের চির-অভিসার
অনন্ত আলোর পানে ; কারাগার-ফাঁসী-নির্ব্বাসন
সেই অভিসার-পথে ক্ষণিকের ব্যথার বন্ধন।
বন্ধন ঘুচিয়া যায় রজনীর দুঃস্বপ্নের মত ;
চিরন্তন শুধু চলা ; কে করিবে তারে প্রতিহত?
আজিকে তোমার মাঝে নমি সেই পথিক-প্রাণেরে,---
তুচ্ছ করি সর্ব্ব বিঘ্ন, জয় করি সকল ভয়েরে
যে প্রাণ চলেছে নিত্য কূল হতে অকূলের টানে,
বাজায়ে ঝড়ের বাঁশী উদ্বেলিত দুরন্ত তুফানে,
যার কাছে নাহি রাজা, নাহি মৃত্যু, নাহি পরাজয়,
নাহি মাতা, নাহি প্রিয়া, নাহি মোহ, যে চিরদুর্জ্জয়,
তোমার ভিতরে আজ হেরি তারে জয়ী জ্যোতিষ্মান।
বন্ধু, এই গানে সেই পথিকের গাহি জয়গান।

.                        ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পথিকের গান
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।


নীল গগনের নীল পেয়ালায় ওরে পথিক দাও চুমুক ;
আলোর সুরায় ভুল্ বরে আজ এ জীবনের সকল দুখ।
ভুল্ ব আমার দুখের অতীত, ভুল্ ব কালো ভবিষ্যৎ ;
কূলের নোঙর তুল্ ব এবার, ডাক দিয়েছে অসীম পথ।
নীল আকাশের পথিক-মেঘের পাখায় চ’ড়ে দিলাম পাড়ি---
দিগ্ বধুদের বাজল যে শাঁখ, বাজায় বাঁশী দূরের গাড়ী ;

.                                  ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গুর্খা-শের
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। আমাদের হাতে এসেছে ১৯৩০ এর
পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ।

গুর্খাবীর দল বাহাদুর গিরির স্মরণে।

ঘুমাও ঘুমাও বন্ধু! রণ ক্লান্ত হে বীর সৈনিক!
মরণ বঁধূর কোলে মাথা রাখি ঘুমাও খানিক!
বহুকাল পাও নাই সুনিবিড় নিশ্চিন্ত বিশ্রাম,
চতুর্দ্দিক হ’তে মিথ্যা আঘাত হেনেছে অবিরাম।
তবু দীর্ঘ রাত্রি দিন যুঝিয়াছ শান্তিহীন একা।
সর্ব্বাঙ্গে ঝরেছে রক্ত---কোন বন্ধু দেয় নাই দেখা।
অবসন্ন ক্রমে তনু---ক্ষীণ হয়ে এলো কোলাহল,
সম্মুখে মরণ-সিন্ধু এল ধেয়ে উন্মত্ত অতল।

.                                  ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নারী স্বর্গের দ্বার
কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
কবির "সবহারাদের গান" (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের কবিতা। সুকুমার সেন সম্পাদিত “বাংলা
কবিতা সমুচ্চয় ১০০০ - ১৯৪১” (১৯৯১) কাব্য সংকলনে অন্তর্ভুক্ত।


.                     
            নারী নরকের দ্বার ---
জানিনা একথা প্রথম ধ্বনিত হইল কণ্ঠে কার।
সে কোনো দিন জীবনে কখনো পায়নি মায়ের কোল?
কচি তনুখানি কোলে করে তার দেয় নাই কেহ দোল?
কপালে তাহার টিপ দিবে বলে চাঁদেরে সাধেনি কেহ?
চোখে তার কেহ দেয়নি কাজল? বুকে বেঁধে তার দেহ
শোনায়নি তারে কোনো নারী কি গো ঘুম-পাড়ানীর গান?
পড়ে গেলে তারে “ষাট” “ষাট” বলে করে নাই চুমা দান?
“হাঁটি” “হাঁটি” বলে চলিতে তাহারে শেখায়নি শৈশবে
কোনো নারী কি গো? হয় তো সেজন এমনি অভাগা হবে!
হয়তো তাহার ছিল না ভগিনী হয়তো ছিল না মাতা!
ঠাকুমার মুখে কল্প লোকের শোনেনি গল্প-গাথা!
অসুখের রাতে মায়ের হাতের পায়নি পরশখানি,
পরম দুঃখে শোনেনি নারীর মধুর কোমল বাণী,
হয়তো সেজন পায়নি জীবনে রমণীর ভালবাসা,
দ্বারে দ্বারে কেঁদে ফিরেছে হৃদয়, মেটেনি প্রাণের আশা ;
এমনি করিয়া রমণীর প্রেমে বঞ্চিত হয়ে যার
কাটিল জীবন, সেই লিখিয়াছে---নারী নরকের দ্বার।

.                       
           নারী স্বর্গের দ্বার ---
নুতন যুগের নুতন বীণায় তোল এই ঝঙ্কার।
এই জগতের যত মহারথী, যত বড় বড় কবি,
যত মহাজন, শিল্পীরা যারা এঁকেছে অমর ছবি,
নারী করিয়াছে সবারে সৃষ্টি। বাল্মীকি কালিদাস,
বুদ্ধ খৃস্ট সবে করিয়াছে নারীর গর্ভে বাস।
অনাগত যুগে আসিছে যাহারা অতি-মানুষের দল
তারাও আসিছে মায়ের গর্ভে। তার প্রেম সুকোমল
এই জগতের যা কিছু কঠোর, যা কিছু অসুন্দর---
সবারে তুলিছে সুন্দর করি। মরেছে লক্ষীন্দর
হিংসার বিষে --- বাঁচাবে তাহারে বেহুলা নূতন করি
সত্যবানেরে দিবে প্রাণ শোন, সাবিত্রী সুন্দরী।
অন্ধ হয়েছে কুরুরাজ আজ রাজ্যের লালসায় ---
ঐ আসে তাই গান্ধারী সতী --- অঞ্চল দেখা যায়।
হিংসা-দ্বেষের গরলে ফেনিল মানব-সাগর-তীরে
নারী গড়িতেছে মিলনের তাজ ব্যাথার অশ্রুনীরে।

.                       
            নূতন যুগের কবি ---
নূতন ছন্দে গাহে আরবার --- নারী স্বর্গের ছবি।
পুরুষের মাঝে যাহা রমণীয় --- সব রমণীর দান ---
পুরুষ হয়েছে প্রেমিক নারীর প্রেম-নীরে করি স্নান।
নিমায়ের প্রেম বিকশিত হল শচীর হিয়ার তলে,
জননী সুনীতি ধ্রুবের হৃদয় ফুটাইল শতদলে,
যুদ্ধ জয়ের মন্ত্র শিখিল অর্জুন-নন্দন
মাতার গর্ভে গোপনে, নরের পিছনে নারীর মন।
পুরুষ প্রথম পাইয়াছে রুপ নারীর রূপের মাঝে,
যা কিছু তাহার কাব্যের মাঝে নারীর ছন্দ বাজে॥

.                                  ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর