কবি মিঠুন চক্রবর্তীর কবিতা
*
অগ্নিশিখা-কে
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


আমাকে আমার প্রেমিকার নাম জিজ্ঞেস করো না, অগ্নিশিখা
সকালে কারোও হাত ধরে আমি পেড়ে আনি যুবতী রোদ
দুপুরে কারোও হাতের চুড়ির রিনিঝিনি বৃত্তে পেতে রাখি নিরীহ মেদ
আর বিকেলে উদ্বায়ী শ্যাম্পুচুলের গন্ধ, কার জন্য যেন মন কেমন করে ওঠে
সন্ধেতে কারোও নীল আঁচলে বেঁধে রাখি অবৈধ নিশ্বাস..........

আমাকে আমার প্রেমিকার নাম জিজ্ঞেস করো না, অগ্নিশিখা
গহীন রাতে আমি স্নান করবো তোমাতে
তখন তুমি আমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখো প্রশ্ন বিহীন গোপন অঙ্গ দারুণ ভাবে পেতে.......

অগ্নিশিখা, শোন তুমিও আমার প্রেমিকা হবে?

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি না আঁকা ছবি
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


আকাশতো একটি আশ্রয় কল্প।
মনে করো স্বরবর্ণ মানুষগুলি
হাঁটছে ব্যঞ্জনবর্ণের মতো
বন্ধনীর ব্যারিকেড হীন ছায়াপথে,
আলোকবর্ষ গুলি প্রেমিকার শৃঙ্গারে ডোবানো।
      
একটা সহজ সরল ছবি
ইচ্ছে করলেই আঁকা যেত অনায়াসে
অসুখে মায়ের হাতের তৈরি পথ্যের মতো
যদি আকাশের রং সবার মুখস্থ থাকত ।

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আগামীর একদিন
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


দ্যাখো একদিন ঠিক নদীর কাছে গিয়ে দাঁড়াবো ।
দ্যাখো একদিন ঠিক ধুলোয় মাথা ছোঁয়াবো,
চাইবো অরণ্যের আশীর্ব্বাদ।
একদিন তোমার রক্তে আঙ্গুল ছুঁইয়ে খুঁজে পাবো
আমার পিতার স্নেহ ।
একদিন শান্তিগড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াবো।
একদিন দুপুরে ইতিহাস পড়বো ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে ।
একদিন, কোন একদিন, কোন এক শতাব্দীর একদিন
শিশিরে ভিজতে ভিজতে ঘুমিয়ে পড়বো ক্লান্তিহীন ,
সপ্তর্ষিমণ্ডলকে সাক্ষী রেখে কোন এক গোছানো সন্ধ্যায়।

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার অতিপ্রিয় তোমাকে
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


যখন
ভাবনারা ধোঁয়ার মতো , তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই
কিজানি কোন সূত্রবলে তুমি তৎক্ষণাৎ বৃষ্টি এনে দাও
আমি যোজন দূরত্বে থেকেও ভিজতে থাকি সেই বৃষ্টিতে......

কিম্বা
রোজ বিকেল পাঁচটা দশের লোকালের আংটায় যখন
নিংড়ানো শরীরটা টাঙ্গিয়ে দিই তোমার ঠিকানা সেঁটে
জানি শিকড়ে আবার আলোড়ন তুলবো রসালো চাহিদার ।

তোমার শুশ্রুষায় রোজ আলো মুঠো করি, রোজ বেঁচে থাকি
রোজ সোনালী ধুলোর পরাগ সারা গায়ে মেখে প্রেমিক সাজি ।

অথচ
ঘরে, ঘরের বাইরে এমনকি ছাদেও অজস্র অবিশ্বাসী ফাটল
নর্দমা থেকে উঠে আসছে অনর্গল গা ঘিন ঘিন সাদা পোকা
তোমারও বয়স বোধহয় মেনোপজে এসে একটুতেই ঘামছে।

তবুও
দেখেছো আজ আমি কেমন অস্থির হয়ে পড়েছি স্টেশনে
ঘোষনা হয়েছে পাঁচটা দশের লোকাল আজ লেটে চলছে।

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমি, ঈম্বর এবং রাস্তা
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


সেদিন ঈশ্বরের সংগে দেখা।  কুয়াশার মধ্যে। ভোরে।
তিনি দৌড়াচ্ছিলেন। এবং গায়ে হালকা পোশাক।
পায়ে বয়সের মরচে। চোখে কবেকার জমে যাওয়া আঁশ।
ফলতঃ কিছুক্ষণের মধ্যে রাস্তার পাশে হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়লেন।
যেমন অনন্ত জ্যাঠুর পুরানো বুড়ো ট্রাকটা রাস্তার পাশে গভীর কুয়াশায় দাঁড়িয়ে যায়
পিছনে লাল লাইট জ্বেলে।
এদিকে আমি। ঈশ্বরের বিপরীত পাশে। প্রাতঃক্রিয়া রত। কোষ্ঠকাঠিন্য।
তাহলে আমি এবং ঈশ্বর রাস্তার এপাশ - ওপাশ। কাছাকাছি।
তবুও কোন অটোগ্রাফ নিতে ছুটলাম না। মৃদু করুণা হল।
অত্যন্ত সচেষ্ট হলাম প্রাতঃক্রিয়ায়---
এই জোর লাগিয়ে --- হবে হবে
এই আরও জোরে --- হতেই হবে

আর আমাদের দু'জনার মাঝের রাস্তায় চকচকে গাড়িগুলো
শব্দ করে নিমেষে হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াশায়....

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
উত্তরসূরি
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


সন্তানের হলুদ পাতার মতো চোখ দেখে,
রোজ মাথা রাখি ঝলসানো রাতের গন্ধে।
নোনা দেওয়ালে ঠাকুরদার ছেঁড়া রূপকথা,
আমার 'অমরত্ব'  ঘুম হাতে কুয়াশায় ঢাকা।

এইখানে ঠিক এইখানে একদিন দাঁড়াত
নয়ানজুলির গায়ে বট- অশত্থের দীর্ঘ ছায়া।
এইখানে ঠিক এইখানে একদিন নামত
অযুত দূরত্ব মুছে নক্ষত্রের বিশাল পাড়া ।

বাবা এখনো একাকী সেই গল্প পেড়ে আনে।

.                 ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি কালার ফটোগ্রাফি
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


জলের ক্যামেরায় ধরা আছে
কাঁপা কাঁপা কিছুটা কমলা পথ, আবির বিকেল
এবং তোর আমার পাশাপাশি গোলাপি পায়ের মৃদু আলাপে
সবুজ বুনো ঘাসের বুকে নেমে আসা নীল বৃষ্টি
তুই ছাতা উড়িয়ে দিয়ে একটা লাল ডালিম পেড়ে এনে দিয়েছিলি আমার হাতে

তারপর থেকে ডালিম ছাড়িয়ে তার একটা একটা দানার স্বাদের মধ্য দিয়ে
.                                                                    আমি আজও হাঁটছি....

আর উদ্ভ্রান্ত বিকেলে তুই আয়নায় মেপে নিচ্ছিস ধূসর দূরত্ব.....

.                     ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এবং একটি বিসর্জন
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


আগুন।

প্রতিমার বুকের গঠন ফুটে ওঠা দেখতে দেখতে
শিউরে ওঠে সদ্য গোঁফরেখা মিত্তিরদের ছেলে ।

জলের ভাঁজে ভাঁজে ঢেউ উঠছে পূজোর গন্ধ নিয়ে।

আরশিতে রোদ নামিয়ে কিশোরী নেড়ে চেড়ে দেখে,
সদ্য পরিচিত নীল শাড়ি ভিজিয়ে রাখে আকর্ষণে ।

অষ্টমীর দিন ত্রিবেনীর ঘাট ডাকে পবিত্র স্নান মূহুর্ত।

মেঘ।

'গা ছুুঁয়ে বল এই স্নানের কথা আর বলবিনা কাউকে '
'কিন্তু স্নান জনিত বুদবুদ যে ভাসে জল শাড়ি গায়ে '
'তবুও না , তবুও না '

বৃষ্টি।

খড়ের কাঠামোতে কোনোও প্রতিমা থাকেনা।
রং, মাটি,  ডাকসাজ ধুয়ে গেলেও খোঁজার চেষ্টা নেই,
অথচ পচন ধরা খড়ে আটকে থাকা ধান
একদিন সদর্পে মাতৃত্ব ঘোষণা করে.....

.                     ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গল্প টুকুই বৃষ্টি
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


গল্প বলো গল্প বলো
গল্পে বলো তেমন কথা,
রোদের থেকে ফিরলে যেমন
নরম হাওয়া তালের পাখা।
গল্প বলো তেমন করে
যেমন হাতে হাত ঠেঁকে যায়,
গল্প বলো এমন করে
যেমন শেষের রেশ রয়ে যায়।

এপাশে গুন, ওপাশে ভাগ
মধ্যে বিকেল কথার ছায়া,
গল্প বলো গল্প বলো
যা কিছু সব সরল চাওয়া।
গল্পে উড়ুক পক্ষি-রাজ আর
কাকের মেয়ে পান্তা খেয়ে,
গল্পে বাজুক হৃদয়রেখা
সত্যিকারের সকাল ছুঁয়ে।

এসব কেবল কথার কথা
গল্প কথা সত্যি তো নয়,
এসো, তবু দাওয়ায় বসো
গল্প বলো, বৃষ্টি সময়।
এক ছাতাতে আজকে ভিজি,
কালকে আবার ভোর বেলাতে
আমার বাবা কাজে যাবে
তোমার বাবার কারখানাতে।

.                ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
তোমার রোদ্দুর শহরে
কবি মিঠুন চক্রবর্তী


একদিন মেঘ টেনে আনবো তোমার রোদ্দুর শহরে ,
দেখবে এখনও গাছের শিকড় কতটা গভীর।

একদিন তুমি টেবিলে অলস অঙ্ক খাতা নামিয়ে
বিকেলে ভিজবে, জানলা খোলা রেখে এমনি এমনি।

মনে করো সেদিন ফেলে রাখা কাজ গুলোর কোনোও কাজ নেই,
রেল লাইন পেরিয়ে জলফড়িং এসে বসছে মাইনাস পাওয়ার চশমার কাচে।

মনে করো কলেজে যে ছেলেটিকে তুমি বার বার রিফিউস করেছো
অথচ তবুও দূর থেকে তোমাকে যে রোদের ফাঁক দিয়ে রোজ দেখে।

আজ তুমি দেখছো।বৃষ্টির ছাঁটে। তার জামার বুনো উদ্ভিজ গন্ধ।
তার বুক পকেটে গুঁজে রাখা পিচ্ছিল রাস্তা।
আর দেখতে দেখতে অঙ্কুরোদগম হচ্ছে একটি ভালো লাগার।

দেখবে এক মুঠোয় পাঁচ লক্ষ কিউসেক জল ছুঁড়ে একদিন
তোমার শহরে হুলুস্থুল কান্ড ঘটিয়ে তোমাকে ভাসনের গীটার শোনাবো।

.                       ******************               


.                                                                           
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর