কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
*
স্বাধীনতা-সঙ্গীত
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
"পদ্মিনী উপাখ্যান" কাব্য থেকে নেওয়া।


স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
              কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
              কে পরিবে পায় |
কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে,
              নরকের প্রায়!
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গসুখ-তায় হে,
              স্বর্গসুখ তায়!
এ কথা যখন হয় মানসে উদয় হে,
              মানসে উদয়!
পাঠানের দাস হবে ক্ষত্রিয়-তনয় হে,
             ক্ষত্রিয়-তনয় ||
তখনি জ্বলিয়া উঠে হৃদয়-নিলয় হে,
             হৃদয়- নিলয় |
নিবাইতে সে অনল বিলম্ব কি সয় হে,
             বিলম্ব কি সয়?
অই শুন! অই শুন! ভেরীর আওয়াজ হে,
             ভেরীর আওয়াজ |
সাজ সাজ সাজ বলে, সাজ সাজ সাজ হে,
              সাজ সাজ সাজ ||
চল চল চল সবে, সমর-সমাজে হে,
              সমর-সমাজ |
রাখহ পৈতৃক ধর্ম, ক্ষত্রিয়ের কাজ হে,
              ক্ষত্রিয়ের কাজ ||
আমাদের মাতৃভূমি রাজপুতানার হে,
              রাজপুতানার |
সকল শরীর ছুটে রুধিরের ধার হে,
              রুধিরের ধার ||
সার্থক জীবন আর বাহুবল তার হে,
              বাহুবল তার |
আত্মনাশে যেই করে দেশের উদ্ধার হে,
              দেশের উদ্ধার ||
কৃতান্ত-কোমল কোলে আমাদ্র স্থান হে,
              আমাদের স্থান |
এসো তার মুখে সবে হইব শয়ান হে,
              হইব শয়ান ||
কে বলে শমন-সভা ভয়ের বিধান হে,
              ভয়ের বিধান?
ক্ষত্রিয়ের জ্ঞাতি যম বেদের নিধান হে,
              বেদের নিধান ||
স্মরহ ইক্ষ্বাকু-বংশে কত বীরগণ হে,
              কত বীরগণ |
পরহিতে দেশ-হিতে ত্যাজিল জীবন হে,
              ত্যাজিল জীবন ||
স্মরহ তাঁদের সব কীর্তি-বিবরণ হে,
              কীর্তি বিবরণ!
বীরত্ব-বিমুখ কোন ক্ষত্রিয়-নন্দন হে?
              ক্ষত্রিয়-নন্দন ||
অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে,
               চল ত্বরা যাই |
দেশহিতে মরে যেই তুল্য তার নাই হে,
               তুল্য তার নাই ||
যদিও যবনে মারি চিতোর না পাই হে,
               চিতোর না পাই |
স্বর্গসুখে সুখী হব, এস সব ভাই হে,
               এসো সব ভাই ||

.               ***********************
.                                                                     
      সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
হায় কোথা সেইদিন
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
"কর্মদেবী" কাব্য থেকে নেওয়া।

হায় কোথা সেইদিন          ভেবে হয় তনু ক্ষীণ,
এ যে কাল পড়েছে বিষম |
সত্যের আদর নাই,          সত্যহীন সব ঠাঁই,
মিথ্যার প্রভুত্ব পরাক্রম ||
সব পুরুষার্থ-শূণ্য          কিবা পাপ কিবা পূণ্য,
ভেদজ্ঞান হইয়াছে গত |
বীর-কার্যে রত যেই,          গোঁয়ার হইবে সেই,
ধীর যিনি ভিরুতায় রত ||
নাহি সরলতা লেশ,          দ্বেষেতে ভরিল দেশ,
কিবা এর শেষ নাহি জানি |
ক্ষীণ দেহ, ক্ষীণ মন,          ক্ষীণ প্রাণ, ক্ষীণ পণ,
ক্ষীণ ধনে ঘোর অভিমানী ||
হায় কবে দুঃখ যাবে,          এ দশা বিলয় পাবে,
ফুটিবেক সুদিন-প্রসূন |
কবে পুনঃ বীর-রসে,          জগত ভরিবে যশে,
ভারত ভাস্বর হবে পুনঃ?
আর কি সেদিন হবে,          একতার সূত্রে সবে,
বদ্ধ রবে মননে বচনে?
পূজিবে সত্যের মূর্তি,          প্রণয় পাইবে স্ফূর্তি
সুখদ সরল আচরণে?

.               ***********************            
.                                                                                     
      সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
দিবাবসানে
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
"কুমারসম্ভব" কাব্য থেকে নেওয়া।


উমার প্রতি শঙ্কর

আরক্তঅপাঙ্গধর          তব নেত্রে দিনকর
পদ্মকান্তি করিয়ে স্থাপন,
দিবসে সংহার করে          ধাতা যথা যুগান্তরে
জগতেরে করেন হরণ ||
অস্তমিত দিনকর-          করে শোভে মনোহর
তব পিতৃ-প্রর্বত-নির্ঝর |
ইন্দ্রধনু-শোভাচয়          করিয়াছে পরাজয়,
অই দেখ শীকরনিকর ||

চক্রবাক চক্রবাকী          মুখেতে মৃণাল-চাকী
গ্রীবাভঙ্গ প্রিয়-অভিমুখে,
সরোবরে ধীরে ধীরে,          ক্রমে গেল দূর নীরে
বিরহে বিলাপ করে দুঃখে ||
শল্লকী-তরুর-ক্ষীর-          গন্ধে সুবাসিত নীর,
তাহে অলিবদ্ধ সরোরুহ,
সারা দিবসের পরে,          সেই নীর পান তরে
চলিয়াছে মাতঙ্গসমূহ ||

অই দেখ প্রাণপ্রিয়ে,          পশ্চিম দিগন্তে গিয়ে
অস্তগত ভানু মহোদয়,
দীর্ঘ প্রতিবিম্বচ্ছলে,             কেমন সরসীজলে
রচিছে সেতু স্বর্ণময় ||
দীঘল-দশনধর                   অরণ্য-বরাহবর
দন্তে ভাঙ্গি' বিস-কিশলয়,
প্রগাঢ় পঙ্কেতে যত          তাপ করি অপগত
উঠিতেছে ত্যজি হ্রদচয় ||

হের অই তরু 'পর          স্বর্ণ-বর্ণ-পুচ্ছধর
বসিয়াছে শিখী রূপরীশি,
দিবা-অবসানকালে,          দিনকর-করজালে
সেই কি ফেলিল সব গ্রাসি?
ভানুর কীরণ-জল          পরিগতে নভঃস্থল,
কিছু শুষ্ক সরসীর প্রায়,
পূর্বদিকে তমোরাশি,          ক্রমে সঞ্চারিল আসি
যেন পঙ্কসম দেখা যায় ||

উটজ অঙ্গনে চলি,           যেতেছে কুরঙ্গাবলী
তরুপূঞ্জ-মূল সিক্ত জলে,
আসে যজ্ঞধেনুগণ,             প্রজ্বলিত হুতাশন,
কিবা শোভা আশ্রম-সকালে ||
শিহরিছে সিরসিজ          বদ্ধ করি কোষ নিজ
ক্ষণদার আগমন-ক্ষণে,
তথাপি সে কিছু স্থান          ভ্রমরে করিতে দান
রাখিতেছে প্রীতিফুল্ল মনে ||...
হৃদয়-সংগত তানে          মিলাইয়ে সাম-গানে
সহস্রেক বন্দনার সনে,
কিরণোষ্ণপায়িগণ          করিছেন সংসতবন
অগ্নিগত ভানুর কিরণে ||

.               ***********************               
.                                                                                    
      সূচীতে . . .     


মিলনসাগর
*
*