কবি বীরবল্লভ দাস - এই পাতায় কেবল “বীরবল্লভ দাস” ভণিতাযুক্ত পদ রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন যে একাধিক কবি “বল্লভদাস” ভণিতায় পদ রচনা করে গিয়েছেন। কবি বল্লভদাস
সম্বন্ধে নানান তথ্য পাওয়া যায়। আমরা তা থেকে কয়েকটি এখানে তুলে দিলাম।

আনুমানিক ১৭৫০ সালে গোকুলানন্দ সেন (বৈষ্ণবদাস) সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯১৫-১৯৩১ সময়কালে,
সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”, সটীক সংস্করণ এর পঞ্চম খণ্ডের
ভূমিকায় লিখেছেন যে “বল্লভ দাস ভণিতার ২৫টী পদ পদকল্পতরুতে সংগৃহীত হয়েছে। জগবন্ধু বাবু (
জগবন্ধু ভদ্র) বল্লভদাসের প্রসঙ্গে তাঁহার উপক্রমণিকায় যাহা লিখেছিলেন, তাও তিনি তাঁর ভূমিকায় উদ্ধৃত
করেছেন, আমরা জগবন্ধু ভদ্রের সেই উদ্ধৃতি এখানে তুলে দিচ্ছি ---

আমরা বল্লভদাস নামে দুই মহাত্মার সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাইয়াছি। ‘ভক্তিরত্নাকর’ মতে :---
(১) বল্লভদাস বা বল্লভীকান্ত দাস ‘ভক্তিমূর্ত্তি’ ও ‘ভক্তি-অধিকারী’। ইনি শ্রীনিবাস আচার্য্যের প্রিয়শিষ্য ছিলেন।
ইনি জাতিতে বৈদ্য ও কবিরাজ উপাধিধারী। ঘনশ্যাম চক্রবর্তী (নরহরি চক্রবর্তী) বলেন যে, বল্লভদাসের
এতই ভক্তিবল ছিল যে ইঁহাকে দেখিলে পাষণ্ডগণ ভয়ে কম্পান্বিতকলেবর হইত। ইনি কুলীনগ্রামবাসী ও
শিবানন্দ সেনের জ্ঞাতি।  চৈতন্যচরণামৃত মতে ; ---

“বল্লভসেন আর সেন শ্রীকান্ত।
শিবানন্দ সম্বন্ধে প্রভুর একান্ত॥”

(২) বংশীবদন দাসের পুত্র চৈতন্যদাসের দুই পুত্র :--- রামচন্দ্র ও শচীনন্দন। শচীনন্দনের তিন পুত্র, যথা
বংশীশিক্ষা গ্রন্থে ---

“শ্রীরাজবল্লভ, শ্রীবল্লভ, শ্রীকেশব।
তিন প্রভু যেন সাক্ষাৎ ব্রহ্মা বিষ্ণু ভব॥”

এই বল্লভদাস “বংশীলীলা” গ্রন্থে স্বীয় প্রপিতামহের চরিত্র বর্ণন করিয়াছেন। তত্তনিধি মহাশয় বলেন,
বল্লভদাস ঠাকুর মহাশয়ের সমসাময়িক এবং তত্প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধা ছিল। একটি পদে লিখিয়াছেন,---

“নরোত্তমদাস, চরণে বহু আশ, শ্রীবল্লভ মন ভোর।” [ পদকল্পতরু, পদসংখ্যা ১০২২পদ ]

অন্য একটি পদে তিনি ঠাকুর মহাশয়ের রূপ বর্ণনা করিয়াছেন। এই জন্য কাহার কাহার মতে ঠাকুর
মহাশয়ের শিষ্য রাধাবল্লভই ‘বল্লভ’-ভণিতার এই পদগুলি রচনা করেন। ইঁহার ‘রসকদম্ব’ নামে একখানি গ্রন্থ
আছে।


কিন্তু সতীশচন্দ্র রায়ের মতে এই ‘বল্লভদাস’ নরোত্তমদাস ঠাকুরের শিষ্য হবার সম্ভাবনা বেশি।

অন্যদিকে জগবন্ধু ভদ্রর মৃত্যুর পর, ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ
সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ তরঙ্গিণী”-এর “পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়” তে মৃণালকান্তি ঘোষ
লিখেছেন ---

জগবন্ধু বাবু দুইজন বল্লভদাসের কথা লিখিয়াছেন। কিন্তু আমরা দেখিতেছি, মহাপ্রভু (চৈতন্যদেব)
সমসাময়িক পাঁচজন “বল্লভ” এর নাম চৈতন্যচরিতামৃতে আছে। যথা - (১) ‘বল্লভসেন’ - শিবানন্দ সেনের
আত্মীয়। (২) ‘বল্লভাচার্য্য’ - মহাপ্রভুর প্রথমা ঘরণী লক্ষ্মীদেবীর পিতা। (৩) ‘বল্লভচৈতন্যদাস’ - গদাধর
গোস্বামীর শিষ্য। (৪) ‘বল্লভভট্ট’ - প্রয়াগে প্রভুর সহিত প্রথমে মিলিত হন ; পরে প্রভুকে দর্শন করিবার জন্য
নীলাচলে (পুরী) গমন করেন। (৫) ‘বল্লভ’ - রুপসনাতনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ও শ্রীজীবের পিতা। এতদ্ভিন্ন আচার্য্য
প্রভুর শিষ্যের মধ্যে ‘বল্লভী কবিপতি’, ‘শ্রীবল্লভ ঠাকুর’, ‘বল্লবী কবিরাজ’ ও শ্রীমতী হেমলতা ঠাকুরাণীর শিষ্য
‘শ্রীবল্লভদাস’ ; এবং রামচন্দ্র কবিরাজের শিষ্যের মধ্যে ‘বল্লভী মজুমদার’ - এই কয়েক জনের নাম পাওয়া
যায়। ইঁহাদের মধ্যে অন্ততঃ ২।৩ জনের পদকর্ত্তা থাকিবার সম্ভাবনা।


ডঃ দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন”, ১৯৭৭-এ লিখেছেন--

বল্লভদাস নামে দুজন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। একজন হলেন নরোত্তম দাসের শিষ্য ‘বল্লভ’। ইনিই
প্রসিদ্ধ ‘বল্লভদাস’। এ ছাড়া ‘বংশীলীলা’ গ্রন্থের রচয়িতা ‘বল্লভদাস’ ছিলেন বংশীবদনের পৌত্র এবং
শচীনন্দনের পুত্র। পূর্বোক্ত বল্লভদাসের সঙ্গে এর কিছু রচনা মিশে যাওয়া সম্ভব।


হরিবল্লভ দাস, আনুমানিক ১৭০০ সালে বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি” সংকলন
করেছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। তিনি ‘হরিবল্লভ দাস’ ভণিতায় পদ রচনা করতেন।
‘হরিবল্লভ’ ভণিতার পদ আমরা অন্য পাতায় প্রকাশিত করছি। গীত ও ছন্দের প্রয়োজনে হয়তো কোনো
কোনো পদে ‘হরিবল্লভ’ থেকে ‘বল্লভ’ করা হয়ে থাকতে পারে। তাঁর নিজের সংকলিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”-এর
পদের ক্ষেত্রে সতীশচন্দ্র রায় লিখেছেন ---

প্রসিদ্ধ কবি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ওরফে হরিবল্লভের রচনায় তাঁহার একটা নিজস্ব বিশেষত্ব আছে। যদিও
পদকল্পতরুর উদ্ধৃত ‘বল্লভ’ ভণিতার পদগুলিমধ্যে ব্রজবুলির পদও আছে, কিন্তু উহা যে, ‘হরিবল্লভের’ রচিত
নহে, উহা উভয়ের পদ অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিলেই প্রতীত হইবে।
”     

দুর্গাদাস লাহিড়ী, ১৯০৫ সালে, তাঁর সম্পাদিত “বৈষ্ণব পদ লহরী” সংকলনে লিখেছেন,

বল্লভদাস, রাধাবল্লভ দাস এবং হরিবল্লভ দাস --- এই তিনজন বৈষ্ণবকবির পরিচয় পাওয়া যায়। ইঁহাদের
তিনজনেরই ভণিতা অনেকস্থলে ‘বল্লভদাস’ প্রদত্ত হইয়াছে। তন্মধ্যে ‘হরিবল্লভ দাস’ ১০৭০ সালে (১৬৬৩ খৃ)
নদীয়া জেলার অন্তর্গত দেবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কৃষ্ণচরণ চক্রবর্ত্তী ইঁহার গুরু ছিলেন। অল্প বয়সেই ইঁহার
সংসার বৈরাগ্য জন্মায়। ইনি তখন সংসার ধর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া বৃন্দাবনবাসী হন হন। এই বৃন্দাবনে
কৃষ্ণদাস কবিরাজের কুটিতে আসিয়া ইনি শ্রীমদ্ভাগবত ও গীতা প্রভৃতির টীকা এবং ‘গৌরাঙ্গ লীলামৃত’,
‘চমত্কার চন্দ্রিকা’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। ‘রাধাবল্লভ দাস’ --- কাঞ্চনগরিয়া নিবাসী সুধাকর মণ্ডলের পুত্র।
ইনি কয়েকখানি সংস্কৃত কাব্যের পদ্যানুবাদ করিয়া কবিপদবাচ হইয়াছেন। ‘বল্লভদাস’ --- ইনি কবিরাজ
উপাধিধারী এবং বৈদ্যবংশ সম্ভুত। শ্রীনিবাসাচার্য্য ইঁহার দীক্ষাগুরু ছিলেন। ইনি বড়ই ভক্তিমান পুরুষ।
কুলীনগ্রামে ইঁহার নিবাস ছিল। শিবানন্দ সেন ইঁহার জ্ঞাতি হইতেন।


আমরা মিলনসাগরে, “বল্লভ” ভণিতাযুক্ত ৪৯টি পদ সংগ্রহ করতে পেরেছি। যার মধ্যে “ভালি গোরাচাঁদের
আরতি বলি” পদটি হৃদয়গ্রাহী এবং আরতির সময়ে অনেক জায়গায় গাওয়া হয়ে থাকে। এই পদটিতে “বীর
বল্লভ দাস” ভণিতা রয়েছে। পদটি তিনটি রূপে আমরা পেয়ে এখানে তুলে দিয়েছি।

এই পাতায় কেবল "বীরবল্লভ দাস" ভণিতাযুক্ত পদ রাখা হয়েছে। আমরা প্রতিটি পদে, সেই পদেটির উত্স-
গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছি। একাধিক ক্ষেত্রে একাধিক রূপে পাওয়া একই পদ একত্রে তুলে দিয়েছি  তুলনার
জন্য।  সংস্কৃত ভাষার  পদগুলির বাংলায় অনুবাদ বা ব্যাখ্যা হাতে পেলেই তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি বীরবল্লভদাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।



“বল্লভ”।    
"বল্লভ দাস"।    
“বীর বল্লভ দাস”।  
“বল্লভ দাসিয়া”।    
“দাস বল্লভী”।  
“শ্রীবল্লভ”।       
“রাধাবল্লভ”।    
“কবিবল্লভ”।    
“হরিবল্লভ”।      



কবি বীরবল্লভদাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১১.৪.২০১৭                                                    
...
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?       
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .