এই পাতার কবিতার ভণিতা -
বৈষ্ণবদাস, বৈষ্ণব, বৈষ্ণবচরণ

বৈষ্ণবচরণ ভণিতার পাতা . . .   
বৈষ্ণব ভণিতার পাতা . . .   
বৈষ্ণবদাস ভণিতার পাতা . . .   
কবি বৈষ্ণবদাস - এর আসল নাম ছিল গোকুলানন্দ সেন। তিনি জাতিতে বৈদ্য এবং তাঁর নিবাস ছিল
টেঁয়া (টেঞা) বৈদ্যপুর গ্রাম, বর্ধমান জেলা। গৌরপদ-তরঙ্গিণীর সংকলক
জগবন্ধু ভদ্রর লেখা থেকে জানা
যায় যে তিনি বৈষ্ণবদাসের কোনো উত্তরসূরী খুঁজে পান নি। তিনি জানান যে, বৈষ্ণবদাসের একমাত্র পুত্রের
নাম ছিল রামগোবিন্দ সেন। রামগোবিন্দের দুই কন্যা জন্মেছিল।

বৈষ্ণবদাস একজন প্রসিদ্ধ কীর্তনিয়াও ছিলেন। তাঁর গানের সুর “টেঞার ছপ” অথবা “টেঞার ঢপ” নামে
বিখ্যাত হয়েছিল।
গুরু রাধামোহন ও বন্ধু উদ্ধব দাস -                                                    পাতার উপরে . . .  
কবি বৈষ্ণবদাসের দীক্ষা-গুরু ছিলেন
শ্রীনিবাস আচার্য্যর পৌত্র, রাধামোহন ঠাকুর। ১১১৫ বঙ্গাব্দে (১৭০৮
খৃষ্টাব্দ)
রাধামোহন ঠাকুরের সঙ্গে কয়েকজন পণ্ডিতের, স্বকীয়া ও পরকীয়ার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এক বিচার সভা
হয়। এই বিচার সভায়
গোকুলানন্দ সেন (বৈষ্ণবদাস) ও তাঁর বন্ধু কৃষ্ণকান্ত মজুমদার ( উদ্ধবদাস ) উপস্থিত
ছিলেন। সুতরাং এঁরা যে সপ্তদশ শতকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরুর ও বিশ্বের বড় বড় সংকলন -                        পাতার উপরে . . .  
বৈষ্ণবদাসের প্রধান কীর্তি হল ১৭৪জন পদকর্তার, ৩১০১টি (বৈষ্ণবদাসের গণনায়) পদ সম্বলিত, বৈষ্ণব
পদাবলীর সংকলন গ্রন্থ “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”। বৈষ্ণবদাসের “রূপমঞ্জরী” নামে আরও একটি রচনার কথা উল্লেখ
করেছেন
দুর্গাদাস লাহিড়ী, তাঁর “বৈষ্ণব-পদলহরী” নামক বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থে (১৯০৫)। ১৮৯৭ সালে
সতীশচন্দ্র রায় “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু” গ্রন্থটিকে সম্পাদনা করে মুদ্রণ করান। পরে এই গ্রন্থটিরই সটীক সংস্করণ,
পাঁচটি খণ্ডে, প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করেন ১৯৩১ সালে।

অষ্টাদশ শতকের পৃথিবীতে, একাহাতে করা এমন একটি সংকলন কেবল বাংলায় কেন সারা ভারতে তথা
বিশ্বে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানার আবিষ্কারের আগে তো নয়ই।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ১৭০৫ সালে চীনের মাঞ্চু বংশের কাংশী সম্রাট, তাঁর অধিকারী কাও-কে আদেশ
দিয়েছিলেন ত্যাং-বংশের "কোয়াং ত্যাং শি" অর্থাৎ "ত্যাং কবিতা সমগ্র" অথবা
"Complete Tang Poems"-
এর সংকলন তৈরী করে ছাপানোর জন্য। তাতে ২২০০ কবির আনুমানিক ৪৯০০০টি কবিতার একটি
সংকলন তৈরী করে ছাপা হয়। সম্রাটের আদেশে হানলিন অ্যাকাদেমির আরও নয়জন বিদ্বান ব্যক্তি বা
পণ্ডিতকে নিয়োগ করা হয়েছিল, ত্যাং-কবিতা বাছাই করে সংগ্রহ করার এবং অধিকারী কাওকে এই কাজে
সাহায্য করতে। বহুসংখ্যাক (সংখ্যা জানা নেই) লিপিকারদের অনুশীলন দিয়ে নিয়োগ করা হয় তা কাঠের
ব্লকের উপর লেখার জন্য। একশতাধিক সুত্রধরকে নিয়োগ করা হয় সেই লিপিকে কাঠে খোদাই করে ছাপার
ব্লক তৈরীর কাজে। এর পর বিশেষ কাগজে তা ছাপা হয়। এটাই সম্ভবত বিশ্বের, সেইসময়ের সর্ববৃহত
কাব্য-সংকলন। তবুও তা কোনো সম্রাটের আদেশে, শত শত মানুষের একত্রে করা কাজ।
বৈষ্ণবদাসের
পদকল্পতরুর সঙ্গে ঠিক তুলনা করাটা অন্যায় হবে। উত্স -
উইকিপেডিয়া॥  


সম্পাদক
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর পদকল্পতরু গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের "ভুমিকা"-য়, "পদ-সমুদ্র" নামের একটি পুথির
উল্লেখ করেছেন যাতে নাকি ১৫০০০ পদ সংকলিত হয়েছিল। হুগলী জেলার বদনগঞ্জ নিবাসী হারাধন দত্ত
ভক্তিনিধি নাকি নানা সময়ে নানা পত্র-পত্রিকায় লিখেছিলেন যে, তাঁর অতিবৃদ্ধপিতামহের সমসায়িক বাবা
আউল মনোহর দাস নামের এক বৈষ্ণব মোহন্ত এই ১৫০০০ (পনেরো হাজার) পদ বিশিষ্ট পদ-সমুদ্র পুথিটি
সংকলন করেন। গৌরপদতরঙ্গিণীর সংকলক
জগবন্ধু ভদ্র এই গ্রন্থের অস্তিত্ব বিশ্বাস করেন নি। তিনি
দীনেশচন্দ্র সেনকে উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন যে একবার কোন এক ব্যক্তি ২০০০টাকার বিনিময় ওই পুথিটি
কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভক্তিনিধি মহাশয় তা বিক্রী করেন নি। তিনি কখনও এই গ্রন্থটি, কাউকে
দেখতেও দেন নি। তাই তাঁরা এই পুথির অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন।
সতীশচন্দ্র রায় মনে করতেন যে
গ্রন্থটি ভক্তিনিধি মহাশয়ের কাছে হয়তো খণ্ডিত অবস্থায় ছিল তাই তিনি দেখাতে চান নি। তিনি নাকি এই
পুথি থেকেই
বিদ্যাপতির আত্ম পরিচয় বিষয়ক "জনমদাতা মোর গণপতি ঠাকুর" ও রামী রজকিনীর "কোথা
যাও ওহে প্রাণ-বঁধু মোর" পদদুটি উদ্ধৃত করেছিলেন।


য়ুরোপে ১৫শ শতকেই ছাপামাধ্যমের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল। তবুও ইংরেজী ভাষায় ১৯০৪ সালের,
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার, জন. ডি. মরিস অ্যাণ্ড কোং থেকে প্রকাশিত,
The World’s Best Poetry নামের
একটি সংকলনে ২২৮৭টি বাছাই রয়েছে বলে শোনা গিয়েছে। এটিও একটি প্রকাশক কোম্পানীর কাজ ছিল।
কোনো একক প্রচেষ্টা নয়। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে,
নিমানন্দ দাসের পদরসসার গ্রন্থটিও এর চেয়ে বড়
ছিলো, ২৭০০টি পদ নিয়ে।

ভারতবর্ষে ছাপামাধ্যমের সূচনার বহু পূর্বে,
বৈষ্ণবদাস একক প্রচেষ্টায়, পদ সংগ্রহ করে, ৩১০১টি পদবিশিষ্ট
সংকলন প্রকাশিত করছেন, তা স্বয়ং একটি যুগান্তকারী ঘটনা বলে আমরা মনে করি।

মনে রাখতে হবে, বৈষ্ণবদাসের কাছে না ছিল ছাপ-খানা, না ছিল আধুনিক কালের কাগজ-পত্র-নোটবই, কালি-
কমল। ছিল না কমপিউটর, ইন্টারনেট, টেলিফোন বা মোবাইল! ছিল না পিচ্-ঢালা রাস্তা, রেল, মোটর-গাড়ী,
বাস ইত্যাদির মতো কোন আধুনিক যানবাহন। ছিল না কোনো সংবাদ-পত্র, রেডিও, এফএম, বা টেলিভিশন,
যা থেকে খবর পাওয়া যেতো কে কোথায় ভাল পদাবলী গাইছেন বা রচনা করছেন। সবই সংগ্রহ করেছেন
লোক মুখে শুনে শুনে, দূর-দূরান্তে গিয়ে গিয়ে, পদ শুনে শুনে, হয় স্মৃতিতে বা কাগজে লিখে লিখে!

গুরু রাধামোহনের কাছ থেকে তিনি একটি "হেড-স্টার্ট" অবশ্যই পেয়েছিলেন। পদামৃত সমুদ্রের ৭৪৬টি পদ।
তবুও তাঁকে অন্তত আরও ২৫০০ থেকে ৩০০০ পদ যোগাড় করতে হয়েছিল! তিনি পদামৃত সমুদ্রর বহু পদ
তাঁর পদকল্পতরুতে নেন নি। কত পদ, উত্কৃষ্টতার নিরিখে তিনি সংগ্রহ ক'রে বাদ দিয়েছেন, তা আমরা
জানিনা!

তাঁর আর্থিক অবস্থার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আমাদের কাছে নেই। তিনি তাঁর গুরু রাধামোহনের মতো
সমাজের কোনো উচ্চ-পদে অধিষ্ঠিত ধর্মনেতা ছিলেন না, যে গুরুগিরি থেকে নির্ভযোগ্য আয় আসবে। এখন
পর্যন্ত অন্য কোনো পদকর্তা সহ অন্য কোনো ব্যক্তির নাম সামনে আসেনি যিনি বৈষ্ণবদাসের শিষ্য ছিলেন।
তিনি জাতিতে "বৈদ্য" ছিলেন বলে কবিরাজী অর্থাৎ চিকিত্সক হিসেবে যদি তাঁর কোনো পশার থেকে থাকে,
তা থেকে আয় ছিল কি না আমরা জানি না। পৈতৃক জমি-জমার ফসল, যদি থেকে থাকে, হয়তো তাঁকে
অনাহার থেকে রেহাই পেতে অবশ্যই সাহায্য করেছিল। কিন্তু তা ছিল কি না আমরা জানি না। তাঁকে
একজন কীর্তনীয়া হিসেবেই আমরা জানি। সে যুগে অর্থকরি দিক দিয়ে, একজন কীর্তনিয়া হিসেবে তিনি
কতটা সচ্ছল ছিলেন সে সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পদব্রজ এবং গোরুরগাড়ী ছাড়া, ঘোড়া বা পালকী
ইত্যাদি ব্যবহার করার সামর্থ তার ছিল কি না তাও আমাদের জানা নেই। গান গাওয়ার বরাত পেলে  
হয়তো তা তিনি তা পেতেন। কিন্তু তা তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, কেবল পদ-সংগ্রহের জন্য পেতেন কি না
সন্দেহ।

তিনি সে যুগের রাজ-সভাসদদের মতো কোনো সৌভাগ্যবান কবি ছিলেন না। তিনি কোনো নবাব-বাদশাহের
কাছ থেকে কিছু প্রাপ্তি, কোনো রাজা-মহারাজার কাছ থেকে কোনো গ্রামের জমিদারী, নিদেন পক্ষে সাম্মানিক
মাসোহারা পেতেন, এমন কথা এখনও পর্যন্ত কোত্থাও শুনি নি! পেলে, তাঁর কোনো না কোনো গীতে সেই কথা
অবধারিত ভাবে লেখা থাকতো। যেমন
বিদ্যাপতি, মালাধর বসু বা রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, যাঁরা তাঁদের
পৃষ্ঠপোষক নবাব-রাজা-জমিদারদের কথা তাঁদের অমর-কাব্যে, তাঁদের ভণিতার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অমর করে
গিয়েছেন।

তাই বৈষ্ণবদাস দূর-দূরান্ত যাতায়াত করে হাজার হাজার গীত-পদ সংগ্রহ, কিভাবে করেছিলেন, তা ভেবেই
বিস্মিত হতে হয়। আরও আশ্চর্য্য হই এই ভেবে যে তাঁর পদ-গীত সংগ্রহ করা দিস্তে দিস্তে তুলোট-
কাগজ বা তালপাতার পুথি, দিনের পর দিন তিনি, যত্ন করে, ঝড়-জল-কীটদষ্ট হওয়া থেকে কি ভাবে
সংরক্ষণ করেছিলেন!?

এবিষয়ে প্রচুর গবেষণার অবকাশ রয়েছে। অন্য তথ্য থাকলে, তা জানিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত পেলে
সবাই উপকৃত হবেন। আমরাও তাঁদের কথা এখানে কৃতজ্ঞচিতে উপস্থাপন করবো।
পদকল্পতরু ও গীতকল্পতরু -                                                             পাতার উপরে . . .  
বৈষ্ণবদাস তাঁর পদাবলী সংকলন গ্রন্থ রচনা শেষ করার পরে, গ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন “গীতকল্পতরু”।  
গ্রন্থের শেষে লেখা দীর্ঘ “অনুবাদ প্রকরণে” অন্তত চার যায়গায় তিনি গ্রন্থের নাম গীতকল্পতরু লিখেছেন।
১। এই গীত-কল্পতরু নাম কৈলুঁ সার। ২৫শ পংক্তি।
২। এই গীত-কল্পতরু তোমা সবাকার। ২৬৭শ পংক্তি।
৩। ইতি শ্রীশ্রীগীতকল্পতরু গ্রন্থস্য অনুবাদ-প্রকরণ সম্পূর্ণং।
৪। ইতি সমাপ্তোহয়ং শ্রীশ্রীগীতকল্পতরু গ্রন্থঃ।

"গীতকল্পতরু" কি ভাবে "পদকল্পতরু" হয়ে গেল তা নিয়ে
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর ৪র্থ
খণ্ডের শেষে ২৬৮-পৃষ্ঠার পাদটীকায় এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন . . .

গীতকল্পতরু ক, খ, ঘ, চ (এগুলো সতীশচন্দ্র রায়ের সংগৃহীত ‘পদকল্পতরু’-র পুথির নাম যা তিনি
আকড় গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন)। সকলগুলি পুথিতেই ‘গীতকল্পতরু’ পাঠ আছে। বস্তুতঃ এই
গ্রন্থখানার নাম প্রথমে ‘গীতকল্পতরু’ ছিল বলিয়াই অনুমান হয়। সাধারণ গীতের সহিত পদের বিশেষ পার্থক্য
থাকায় ‘পদকল্পতরু’ বলিলেই এই গ্রন্থের প্রকৃত পরিচয় দেওয়া হয় মনে করিয়াই বোধ হয়, ইহাকে
‘পদকল্পতরু’ নামে উল্লেখ করা হইত ; ফলতঃ যে কারণেই হউক, ইহার ‘গীতকল্পতরু’ নামটি কেবল পুথি-গত
থাকিয়া, ইহা ইদানিং ‘পদকল্পতরু’ নামেই প্রসিদ্ধ হইয়াছে
।”

সতীশচন্দ্র রায়ের লেখা “ইহা ইদানিং ‘পদকল্পতরু’ নামেই প্রসিদ্ধ হইয়াছে” থেকে বোঝা যায় যে গ্রন্থটি
আধুনিক কাল বা সাম্প্রতিক কালেই “পদকল্পতরু” নামে পরিচিতি লাভ করে। সংকলককে  তাঁর  
জীবদ্দশাতেই, তাঁর প্রাণের গ্রন্থের এই নাম-বিভ্রাটটি দেখে যেতে হয়নি, এটাই সুখের!
বৈষ্ণবদাসের লেখা  
থেকেই জানা যায় যে তিনি তাঁর গুরু
রাধামোহন ঠাকুরের পদামৃতসমুদ্র, থেকে গান গেয়ে গেয়ে বেড়িয়েছেন
(পরের অনুচ্ছেদ, “পদামৃতসমুদ্র ও পদকল্পতরু”-তে দৃষ্টব্য )। স্বাভাবিকভাবে কীর্তনিয়া হবার দরুণ, তাঁর
কাছে পদের থেকে গীতই বেশী মাহাত্ম রাখতো এমন হতেও পারে। এ কারণেও তিনি “গীতকল্পতরু” নাম
দিয়ে থাকতে পারেন।
পদামৃতসমুদ্র ও পদকল্পতরু -                                                           পাতার উপরে . . .  
“গৌরপদ-তরঙ্গিণী”-র সংকলক
জগবন্ধু ভদ্রর মতে বৈষ্ণবদাস তাঁর পদকল্পতরু গ্রন্থটি নিশ্চয়ই, অষ্টাদশ
শতকে তাঁর গুরু
রাধামোহন ঠাকুরের তিরোধাণের পরেই প্রকাশিত করেছিলেন। কারণ রাধামোহন ঠাকুর
তাঁর জীবদ্দশায় “পদামৃতসমুদ্র” নামক পদ-সংগ্রহ গ্রন্থ সংকলন করেন। বৈষ্ণব দাস এই গ্রন্থের সব পদ তাঁর
নিজের সংকলন “পদকল্পতরু” গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করেন।  যার ফলে  গুরুদেবের  গ্রন্থের অস্তিত্ব একরকম লোপ
পায়। জগবন্ধু ভদ্রর মতে এই “অবৈষ্ণবোচিত কাজটি” নিশ্চয়ই বৈষ্ণবদাস তাঁর গুরুর জীবিত অবস্থায়
করেননি।
জগবন্ধু ভদ্র মহাশয় বড় তীক্ষ্ণ বাক্য ব্যবহার করেছেন যা বৈষ্ণবদাসের প্রতি ঘোর অন্যায় ছাড়া
আর কিছুই নয়! কারণ বৈষ্ণবদাস তাঁর গ্রন্থ রচনার শেষে “অনুবাদ প্রকরণ”-এ লিখেছেন . . .

আচার্য্য প্রভুর বংশ শ্রীরাধামোহন।
কে কহিতে পারে তাঁর গুনের বর্ণন॥
যাহার বিগ্রহে গৌর-প্রেমের নিবাস।
হেন শ্রীআচার্য্য প্রভুর দ্বিতীয় প্রকাশ॥
গ্রন্থ কৈলা পদামৃত-সমুদ্র আখ্যান।
জন্মিল আমার লোভ তাহা করি গান॥
নানা পর্য্যটনে পদ-সংগ্রহ করিয়া।
তাঁহার যতেক পদ সব তাহা লৈয়া॥
সেই মূল-গ্রন্থ অনুসারে ইহা কৈল।
প্রাচীন প্রাচীন পদ যতেক পাইল॥
এই গীত-কল্প-তরু নাম কৈনু সার।
পূর্ব্বরাগাদিক্রমে চারি শাখা যার॥

১৩০৪ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৯০১ খৃষ্টাব্দের পদকল্পতরুর প্রথম সংকলন থেকে নেওয়া এই উদ্ধৃতিতে  “তাঁহার
যতেক পদ সব তাহা লৈয়া” -তে “তাঁহার” শব্দে চন্দ্রবিন্দু রয়েছে বলে অর্থ এই দাঁড়ায় যে কবি বলছেন যে
তিনি
শ্রীরাধামোহনের পদামৃতসমুদ্র গ্রন্থের সব পদ নিয়েছেন। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ বা ১৯২৭ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত
সটীক (২য়) সংস্করণে ওই “তাঁহার” শব্দে চন্দ্রবিন্দুটি মুদ্রিত না হয়ে, তা “তাহার” হয়ে গিয়েছে। সেই ক্ষেত্রে
অর্থ দাঁড়ায় নানা পর্যটনে সংগ্রহ করা পদের সব পদ নিয়েছেন।

“তাঁহার” শব্দ কে মেনে নিলে অর্থ দাঁড়ায় যে
বৈষ্ণবদাস স্বীকার করছেন যে তিনি তাঁর গুরু রাধামোহন
ঠাকুরের গ্রন্থ “পদামৃতসমুদ্র” থেকে গান গেয়ে গেয়ে, প্রলুব্ধ হয়ে, নিজের একটি ওই করম গ্রন্থ রচনা করার
ইচ্ছা জন্মায়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পদ সংগ্রহ করেন এবং তার সাথে “তাঁহার”  অর্থাৎ
রাধামোহন ঠাকুরের গ্রন্থের সমস্ত পদ একত্র নিয়ে গীত-কল্প-তরু নাম দিয়ে গ্রন্থ রচনা করলেন। এতেই স্পষ্ট
হয় যে তিনি কোনো রকমের চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেন নি। বলিয়া গুরুর দ্রব্য লওয়া কি চুরি বলা যায়! যা
করেছেন তা সত্যের থেকে বিচ্যুত না হয়, সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে গৌরবান্বিতই হয়েছেন। গুরুর রেখে
যাওয়া সাহিত্যকীর্তির তিনি আরও বহুগুণ বর্ধনের কাজ করেছেন যা দিয়ে গুরুর নামযশ তো কমেই নি,
বরঞ্চ আরও বেড়েছে। তাই
বৈষ্ণবদাসের উদ্দেশ্য মোটেই অসৎ ছিল না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে পদকল্পতরুতে বৈষ্ণদাস, রাধামোহনের পদামৃত সমুদ্র থেকে সব পদ তাঁর গ্রন্থে
সন্নিবেশ করেন নি। এমন অনেক পদ পদামৃত সমুদ্রে রয়েছে, যা পদকল্পতরুতে নেই। আবার পদকল্পতরুতে
রাধামোহনের এমন পদও যুক্ত করেছিলেন যা স্বয়ং রাধামোহনও তাঁর পদামৃত সমুদ্রে সংকলিত করেন নি।
বৈষ্ণবদাসকে আমরা এমন একজন সংকলক ও সম্পাদক হিসেবে দেখতে পাই, যাঁর সঙ্গে তুলনা  করার
মতো, আধুনিক যুগেরও খুব বেশী সম্পাদকদের নাম করা যাবে না।
পদকল্পতরু গ্রন্থে প্রাপ্ত বৈষ্ণব, বৈষ্ণবদাস ও বৈষ্ণবচরণ ভণিতা -                পাতার উপরে . . .  
পদকল্পতরুতে “
বৈষ্ণবদাস” ভণিতার ২৩টি, “বৈষ্ণব” ভণিতার ২টি এবং “বৈষ্ণবচরণ” ভণিতার ১টি মাত্র পদ
রয়েছে। দুটি “বৈষ্ণব” ভণিতার পদ হলো “রূপ-গুণবতী রস-মঞ্জরী লবঙ্গ পাশ” (৩০৮২ পদসংখ্যা)  ও  
“নিন্দের আলসে শুতিবে দুজন” (৩০৮৩ পদসংখ্যা)। যার মধ্যে  “নিন্দের আলসে শুতিবে দুজন”  পদটি
জগবন্ধু ভদ্রর গৌরপদ-তরঙ্গিণী সংকলনে “বৈষ্ণবদাস” ভণিতাতেই পাওয়া গিয়েছে। রচনাশৈলীর  সাদৃশ্য
দেখে বাকি পদটিও  বৈষ্ণব দাসের বলেই মনে হয়।

“বৈষ্ণবচরণ” ভণিতার পদটি হলো “শ্রীগুণমঞ্জরী-পদ মোর প্রাণ-সম্পদ”। যেভাবে বৈষ্ণবচরণ শব্দটি ওই পদে
ব্যবহার করা হয়েছে তাতে মনে হয় এটিও বৈষ্ণবদাসেরই পদ। তবুও আমরা এই পদটিকে একটি স্বতন্ত্র
পদকর্তার পদ হিসেবে “বৈষ্ণবচরণ” ভণিতার কবির পাতায় তুলেছি।

সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের, ভূমিকার, পদকর্তাদের পরিচয়ে লিখেছেন . . .
বৈষ্ণবচরণ ভণিতার একটিমাত্র (৩০৭৭ সংখ্যক) পদ পদকল্পতরুতে পাওয়া গিয়েছে। ‘বৈষ্ণবচরণ’ পদকর্ত্তা
ও পদকল্পতরুর সঙ্কলয়িতা বৈষ্ণবদাসেরই পূর্ণ নাম কিংবা স্বতন্ত্র কোন পদকর্ত্তা, নিশ্চিত বলা যায় না। তবে
এই পদের অব্যবহিত পরেই বৈষ্ণবদাসের আটটি এক জাতীয় প্রার্থনার পদ সন্নিবেশিত হওয়ায় আমাদের
মনে হয় যে, এই ‘বৈষ্ণবচরণ’ বৈষ্ণবদাস ব্যতীত অন্য কেহ নহে। আলোচ্য ৩০৭৭ সংখ্যক পদের আদি এ
অন্ত্য কলিদ্বয় এইরূপ, যথা---

শ্রীগুণমঞ্জরী-পদ                                মোর প্রাণ-সম্পদ
.                    শ্রীমণিমঞ্জরী তার সঙ্গে।
হেন দশা মোর হব                        সে পদ দেখিতে পাব
.                    সখী মোর প্রেমের তরঙ্গে॥

.        *                *                *                *

কত বা কৌতুক কাজ                        হইবে সে কুঞ্জ মাঝ
.                    তাহা মুঞি শুনিব শ্রবণে।
পূরিবে মনের আশা                        পালটিবে মোর দশা
.                     নিবেদয়ে বৈষ্ণবচরণে॥

ভণিতার ‘নিবেদয়ে  বৈষ্ণবচরণে’ বাক্যের ‘বৈষ্ণবচরণে’ শব্দটীর পদচ্ছেদ করিলে এরূপ অর্থও করা  যায়
যে, পদকর্ত্তা বৈষ্ণব অর্থাৎ ‘বৈষ্ণবদাস’ ইহা শ্রীগুণমঞ্জরীর কিংবা বৈষ্ণব মহান্তদিগের ‘চরণে’ নিবেদন  
করিতেছেন। এরূপ অর্থান্তরও যে, বৈষ্ণবদাসের অভিপ্রেত নহে---এরূপ বলা যায় না। কেন না, তিনি ৩০৮২
ও ৩০৮৩ সংখ্যক পদের ভণিতায় নিজেকে শুধু বৈষ্ণব নামে পরিচিতি করিয়াছেন, যথা---
হেন অনুক্রমে                            করিবে সেবনে
.                কেবল বৈষ্ণব আশে।---( ৩০৮২ সং পদ )
কেবল বৈষ্ণবের আশা            পালটিবে মোর দশা
.                সে সব করিব দরশনে॥---( ৩০৮৩ সং পদ
)”    

অন্যদিকে “বৈষ্ণব” ভণিতা যে বৈষ্ণব দাসেরই ভণিতার ভিন্নরূপ, তা নিয়ে একটি নতুন তথ্য সামনে এসেছে
--- পদকল্পতরুর “জয় জয় অদ্বৈত আচার্য্য দয়াময়” (পদসংখ্যা ১১১৫) পদটি, ভণিতাহীন অজ্ঞাত পদকর্তার
পদ হিসেবে থাকলেও জগবন্ধু ভদ্রর গৌরপদ-তরঙ্গিণী সংকলনে তা “বৈষ্ণব” ভণিতার “জয় জয় অদ্বৈত
আচার্য্য মহাশয়” পদ হিসেবে দেওয়া রয়েছে। তাই বৈষ্ণব ভণিতা যে বৈষ্ণবদাসেরই ভণিতার অন্য রূপ
এতে আর সন্দেহ থাকে না। এটা সম্ভবত পদকল্পতরুর লিপিকারদের প্রমাদের কারণে ঘটে থাকতে পারে
বলে আমরা মনে করছি। দুটি পদই আমরা পর পর সাজিয়ে তুলেছি পাঠকের সুবিধের জন্য।  এই  
ভণিতাহীন পদটিকে ধরলে পদকল্পতরুতে
বৈষ্ণবদাসের ২৭টি পদ রয়েছে বলে বলা যায়।
কবি হিসেবে বৈষ্ণবদাসের সাহিত্য সৃষ্টির নবমূল্যায়ণ প্রয়োজন -                পাতার উপরে . . .  
পদকল্পতরুতে প্রাপ্ত পদেই
বৈষ্ণবদাসের পদকর্তা হিসেবে পরিচয়। মোট ২৭টির মধ্যে অর্ধেক পদই রচনা
করতে হয়েছিল পদকল্পতরু গ্রন্থের পরিকল্পনা ও রচনার সময়ে। ১৩ - ১৫টি পদই শ্রীচৈতন্য বা কোন  না
কোন বৈষ্ণব মহাজনের প্রতি বন্দনা এবং প্রার্থনার পদ। যাকে একরকমভাবে অর্ডারি বা ফরমায়শি  
কবিতাও বলা চলে। কোন ব্যক্তি বা বিষয়ের উপরে পূর্বতন পদকর্তাদের পদ না পেয়ে বৈষ্ণবদাসকে স্বয়ং
সেই সব পদ রচনা করে গ্রন্থ পূরণ করতে হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, ফরমায়েসী কবিতা রচনা করা একরকম
দায়ে পড়ে পদ রচনা করা। তাতে স্বাভাবিক কবিত্বের বিকাশ হতে পারে না। তবুও  আমরা  
পদকল্পতরুতেও, তাঁর কয়েকটি পদে তাঁর সাহিত্য রসের ঝলক দেখতে পাই।

জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ ১৯৩৪ সালে সম্পাদিত “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”-২য় সংস্করণের  
পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়ে, বৈষ্ণবদাসের রচিত পদসংখ্যা সম্বন্ধে মৃণালকান্তি ঘোষ লিখেছেন . . .

পদকল্পতরুতে বৈষ্ণবদাসের সবে ২৬টী পদ উদ্ধৃত হইয়াছে। ইহা ভিন্ন তিনি আর কোন পদ রচনা  
করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না
।”

এ থেকে জানা যায় যে, ১৯৩৬ সাল নাগাদ বৈষ্ণব পদাবলীর বিশেষজ্ঞগণ মনে করতেন যে পদকল্পতরুর  
২৬টি পদ ছাড়া বৈষ্ণবদাস আর পদ রচনাই করেন নি!

সৌভাগ্যবশত বিশ্বভারতীর গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত, দ্বিজমাধবের সংকলিত, বৈষ্ণবদাস পরবর্তী কালের,
“শ্রীপদমেরুগ্রন্থ” থেকে আমরা বৈষ্ণবদাসের ২২টি,
জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত “গৌরপদ-তরঙ্গিণী” থেকে ২টি,  
চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ও রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু” থেকে ১টি,
মোট ২৫টি সুন্দর পদ পেয়েছি। এগুলি পদকল্পতরুর বাইরে বিভিন্ন সংকলক দ্বারা সংকলিত হয়েছে। এই
পদগুলি তিনি তাঁর আবেগের জন্য রচনা করেছিলেন, সম্ভবত তাঁর কীর্তনের গীত হিসেবে। এগুলির মধ্যে
তাঁর কবিত্বের প্রকাশ অনেক বেশী দেখা যায়।

পদকল্পতরুর বাইরে পাওয়া বৈষ্ণবদাস রচিত এই পদগুলিতে তাঁর আয়ত্বে থাকা বাংলাভাষার সুবিশাল
শব্দভাণ্ডার, তাঁর কবিত্ব ও সাহিত্যরস এবং পাণ্ডিত্যের যথাযত পরিচয় পাওয়া যায়। আশাকরি  সমকাল
ও আগামী দিনের, বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের বিশেষজ্ঞগণ, বৈষ্ণবদাসের সাহিত্যেরসের পূনর্মূল্যায়ণ করবেন।

দুঃখের বিষয় এই যে
বৈষ্ণবদাস আমাদের দিয়ে গিয়েছেন বৈষ্ণব পদাবলীর সর্ববৃহৎ সংকলন। ১৭৪জন  
পদকর্তার, ৩১০১টি (বৈষ্ণবদাসের গণনায়) পদ সম্বলিত সংকলন পদকল্পতরু। আর আমাদের, তাঁর রচিত
মাত্র ৫২টি পদ (অন্য নতুন পদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত) নিয়েই আজ সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে!

একারণেই আমরা তাঁর কবিতার পাতায় পদকল্পতরুর পদ ও অন্যান্য সংকলন থেকে পাওয়া পদের ভিন্ন
সূচীর ব্যবস্থা করেছি পাঠকের সুবিধের জন্য।
বৈষ্ণবদাসের মহানুভবতা -                                                              পাতার উপরে . . .  
এটা বোঝা যায় যে
বৈষ্ণবদাস তাঁর পদকল্পতর গ্রন্থে, প্রয়োজনের উর্দ্ধে, তাঁর নিজের পদ সন্নিবেশ করেন নি।
এটা তাঁর সততার পরিচয় বটে। তাঁর পূর্বের ও সমসাময়িক সংকলকদের সংকলনে স্বরচিত  পদের  
আধিক্য চোখে পড়ে। এ বিষয়ে
সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের, ভূমিকার,  
পদকল্পতরুর বিশেষত্ব-তে লিখেছেন . . .

. . . এ যাবৎ প্রাচীন বৈষ্ণব-পদাবলীর যতগুলি সংগ্রহ-গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে, উহার মধ্যে পদকল্পতরুই  
সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ বটে। ইহার সঙ্কলয়িতা বৈষ্ণব দাস নিজে একজন রসজ্ঞ পদ-কর্ত্তা ও কীর্ত্তন-পারদর্শী  
ছিলেন; তথাপি তিনি তাঁহার বিরাট্ সংগ্রহে নিজের রচিত মাত্র ২৬টী পদ (ভণিতাহিন পদসংখ্যা ১১১৫  
ধরলে ২৭টি পদ হয়) উদ্ধৃত এবং গ্রন্থের কলেবর অন্য প্রসিদ্ধ পদ-কর্ত্তাদিগের পদ দ্বারা পূর্ণ করিয়া নিতান্ত  
সদ্বিবেচনা ও সুরুচিরই পরিচয় দিয়াছেন। এই বিরাট সংগ্রহে কত বিভিন্ন পদকর্ত্তার কত বিভিন্ন বিষয়ের
পদাবলী সন্নিবেশিত হইয়াছে, উহা পদ-কর্ত্তৃ-সূচী ও বিষয়-সূচী দেখিলেই বুঝা যাইবে, আমরা সে  সম্বন্ধে
এখানে কিছু লেখা অনাবশ্যক বিবেচনা করি। এখানে শুধু ইহা বলিলেই সঙ্গত হইবে যে, এই  গ্রন্থের  
বহুসংখ্যক বিষয়গুলিকে বৈষ্ণবদাস যে ভাবে সুবিন্যস্ত এবং বিষয়-অনুযায়ী পদ বাছিয়া বাছিয়া যথাযোগ্য
ভাবে সন্নিবেশিত করিয়াছেন, উহা দ্বারা তাঁহার অসাধারণ রসজ্ঞতারই পরিচয় পাওয়া যাইতেছে
।”
পদকর্তা ও কীর্তনিয়া বৈষ্ণবদাস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি -                     পাতার উপরে . . .  
জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ ১৯৩৪ সালে সম্পাদিত “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”-২য় সংস্করণের
পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়ে,
বৈষ্ণবদাসের সাহিত্যরস সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্রর এই উদ্ধৃতি এভাবে দেওয়া রয়েছে . . .

জগবন্ধুবাবু লিখিয়াছেন, ‘ইঁহার রচিত কোন কোন পদ এতই সুন্দর যে, উহা করিতে করিতে মনে হয়, যেন
নরোত্তমের রচনা পাঠ করিতেছি। ইঁহার কোন কোন পদ পাঠ করিলে, অতি পাষ্ণন্ডেরও নয়নযুগল
অশ্রুভারাবনত হয়, এবং ইঁহার কোন কোন পদ পাঠ করিলে জানা যায় যে, বৈষ্ণব-সাহিত্যে ও বৈষ্ণব-
ইতিহাসে ইঁহার অসাধারণ ব্যুত্পত্তি ছিল। ইনি একজন প্রসিদ্ধ কীর্ত্তনিয়াও ছিলেন। ইনি যে সুরে গান
করিতেন, তাহাকে অদ্যপিও ‘টেঞার ছপ’ কহে
।”

সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের, ভূমিকার, পদকর্তাদের পরিচয়ে, বৈষ্ণবদাস প্রসঙ্গে
লিখেছেন . . .
বৈষ্ণবদাসের ‘জয় জয় শ্রীগুরু, প্রেম-কলপতরু’ ইত্যাদি ১সংখ্যক পদ (পদকল্পতরুর প্রথম পদ) ও
উহার মত আরও দুই চারিটী পদ তাঁহার পাণ্ডিত্য, ভক্তি ও কবিত্বে যথেষ্ট পরিচায়ক হইলেও তিনি শ্রেষ্ঠ
পদসংগ্রহকার বলিয়াই সুবিখ্যাত
।”

আমরা
মিলনসাগরে  কবি বৈষ্ণবদাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।


কবি বৈষ্ণব-এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।  
কবি বৈষ্ণবচরণের মূলপাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
কবি বৈষ্ণবদাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।     


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২০.২.২০১৭
পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২১.৩.২০১৭
পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৬.১১.২০১৭
...
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে
আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান
তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ
প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো।
আমাদের ঠিকানা -
srimilansengupta@yahoo.co.in
গুরু রাধামোহন ও বন্ধু উদ্ধব দাস     
বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরু ও বিশ্বের বড় বড় সংকলন    
পদকল্পতরু ও গীতকল্পতর    
পদামৃতসমুদ্র ও পদকল্পতরু    
বৈষ্ণব, বৈষ্ণবদাস ও বৈষ্ণবচরণ ভণিতা   
কবি হিসেবে বৈষ্ণবদাসের সাহিত্য সৃষ্টির নবমূল্যায়ণ প্রয়োজন   
বৈষ্ণবদাসের মহানুভবতা   
গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে বৈষ্ণবদাস    
পদকর্তা ও কীর্তনিয়া বৈষ্ণবদাস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
বৈষ্ণবদাস
বৈষ্ণদাসের ভণিতা
সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
.
.
.
.
.
.
.
.
ধর্মীয় গোঁড়ামীর ঊর্ধ্বে বৈষ্ণবদাস -                                                   পাতার উপরে . . .  
সম্ভবত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রচলিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ভাবধারায় দীক্ষিত বলে,  
বৈষ্ণবদাস তাঁর
পদকল্পতরু গ্রন্থে, নদীয়া-বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলে সর্বপ্রথম ধর্মের গোঁড়ামীর ঊর্দ্ধে উঠে, কোনো ধর্মীয় গ্রন্থে
কোনো বিধর্মী কবির সমভাবাপন্ন কাব্যকে সংকলিত করেছেন। তিনি তিনজন মুসলমান কবির বৈষ্ণব
পদাবলী গ্রহণ করে সংকলন করেছেন অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে। আগরওয়ালির ১টি পদ, মুর্শিদাবাদের
সৈয়দ মর্তুজার ১টি পদ এবং সালবেগের ৩টি পদ।

অষ্টাদশ শতকে, বৈষ্ণব দাসের সমকালীন, গৌরসুন্দর দাসের "সংকীর্ত্তনানন্দ" সংকলনে কোনো মুসলমান
কবির পদ রয়েছে কি না আমরা জানি না কারণ এই গ্রন্থটি আমরা হাতে পাইনি। বৈষ্ণবদাসের কিছুকাল
পরে, অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে প্রকাশিত দীনবন্ধু দাসের "সংকীর্তনামৃত" গ্রন্থেও কোনো মুসলমান কবির পদ
সংগৃহীত করা হয় নি। অষ্টাদশ শতকের শেষ অথবা উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সংকলিত দ্বিজমাধবের
"পদমেরুগ্রন্থে" অবশ্য সৈয়দ মর্তুজার একটি পদ রয়েছে। চট্টগ্রামে অষ্টাদশ শতকের শুরুতে, ১৭১৮ খৃষ্টাব্দে
সংকলিত কোন এক অজ্ঞাত সংকলকের “রাগমালা” নামক একটি পুথি সহ বহু পুথি আবিষ্কার করেন
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সেই পুথিতে মুসলমান বৈষ্ণব পদকর্তাদের পদ সংকলিত হয়েছিল।

উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকে যত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে মুসলমান
পদকর্তার পদ থাকলেও, সেই সব গ্রন্থের কোনো সম্পাদক এই রকম ভাবে বিষয়টিকে বিশেষভাবে উল্লেখ
করেননি। তার প্রধান কারণ ছিল যে সেই সময়কার ভারতবর্ষের মানুষ অনেক উদারমনষ্ক ছিলেন। তাঁদের
কাছে মুসলমান পদকর্তার পদ প্রকাশিত হচ্ছে বলে হৈ-চৈ করার মতো কিছু বোধ হয় ছিল না! তাই
আলাদাভাবে কিছু লেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি।

বাংলাদেশে ধর্মীয় মতবাদের বিরূদ্ধে লেখার জন্য পটাপট ব্লগারদের নিকেশ করা, ইসলামিক স্টেটের মতো
মধ্যযুগীয় বর্বরতার একটি মতবাদের সূপ্ত এবং প্রকাশ্য সমর্থন, এসব তো ছিলোই! এ সব কে টেক্কা দিতেই
যেন, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো, বিংশ শতকের শেষ থেকে একবিংশ শতকের ২য় দশকে ভারতবর্ষে
এসে দাঁড়িয়ে, এক অন্ধকারময় মধ্যযুগীয় হিন্দুত্বের পুনরুত্থান। তাই আমরা এই উদার মনোভাবের হারিয়ে
যাওয়া দিনের কথা নিয়ে লিখতে বাধ্য হলাম। বোধহয় আমারা এখন ধর্মের অন্ধকূপের মণ্ডুকে পরিণত হয়ে
গিয়েছি। পাঠক আমাদের এর জন্য মার্জনা করবেন।  
.