শ্রীচৈতন্য পরবর্তী বাংলা -                                                              পাতার উপরে . . .  
তাঁর প্রবর্তিত সাম্যবাদ ভিত্তিক বৈষ্ণব ধর্মকে নীলাচলের পরবর্তী রাজা গোবিন্দ  বিদ্যাধর চেয়েছিলেন
উত্কল থেকে উচ্ছেদ করতে। সেইজন্য তিনি যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তার ফলে, শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুর
পরবর্তী ৫০ বছর গৌড় এবং উত্কলে কীর্তন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। উত্কলে অতিবড়ী সম্প্রদায় প্রভাব বিস্তার
করে আর গৌড়ে শাক্তরা পুণরায় উজ্জীবিত হন। ইংরেজ আমলের প্রথমার্ধ পর্যন্ত শাক্তদের প্রভাব ছিল
পুরো মাত্রায়।
শ্রীচৈতন্যের রচনা মিলনসাগরে কেন ?   
শ্রীচৈতন্যের জীবিতাবস্থায় তাঁকে আঁকা ছবির তথ্য    
শ্রীচৈতন্যের রচিত বাংলা পদ    
শ্রীচৈতন্যের রচিত জগন্নাথদশক    
শ্রীচৈতন্যদেবের নাম    
শ্রীচৈতন্য কেমন ছিলেন দেখতে ?   
শ্রীচৈতন্যের জন্ম, শৈশব ও কৈশোর    
শ্রীচৈতন্যের বিবাহ    
নবদ্বীপের সফল নাগরিক আন্দোলন    
শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস    
গৌড়েশ্বর হুসেন শাহ ও শ্রীচৈতন্য      
হিন্দু ধর্মের ত্রাতা শ্রীচৈতন্য    
শ্রীচৈতন্য ও রূপ-সনাতন     
বৃন্দাবনের ষট্ গোস্বামী      
শ্রীচৈতন্য ও যবন হরিদাস    
শ্রীচৈতন্য ও ছোট হরিদাস    
শ্রীচৈতন্য নারায়ণী ও বৃন্দাবন দাস     
শ্রীচৈতন্যের জগন্নাথে বিলীন না অন্তরধান না গুমখুন?
শ্রীচৈতন্য পরবর্তী বাংলা     
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"    
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
শ্রীচৈতন্যের রচনা মিলনসাগরে কেন ? -                                               পাতার উপরে . . .  
শ্রীচৈতন্য তাঁর ভক্তগণের চোখে শ্রীকৃষ্ণের অবতার। বৈষ্ণব পদাবলীর মূল রসের দিক দিয়ে তিনি রাধা-
কৃষ্ণের মিলিত অবতার। কিন্তু ইতিহাসকারদের চোখেও সম্ভবত তার স্থান, খুব বড়। তাঁকে তাঁদের  
অনেকেই একাধারে সমাজ সংস্কারক, হিন্দু ধর্মকে জাতপাতের নাগপাশ থেকে মুক্তির পথীকৃত এবং বাংলার
প্রথম নবজাগরণের
(First Renaissance of Bengal ) স্থপতি বলে মনে করেন। তাঁকে কেবল ধর্মনেতার আসনে
বসালে ভুল হবে। তিনি পাঁচশো বছর পূর্বের ভারতবর্ষের একজন তীক্ষ্ণ-বুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তাঁকে একজন প্রত্নতাত্বিক হিসেবেও আমাদের কুর্নিশ জানাতে হয় যখন  
জানতে পারি যে তিনি নীলাচলে বালি খুঁড়ে তোটা গোপীনাথের মূর্তি আবিষ্কার করেছিলেন। শ্রীচৈতন্যের
অন্তর্ধান রহস্যের লেখক যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালীবুড়ো তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন যে, তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের পরে
কৃষ্ণদাসকে নিয়ে ভারত পরিক্রমার সময়ে কৃষ্ণবেন্বা নদীতীরে, সন্ধান পেয়ে সংগ্রহ করেন শ্রীকৃষ্ণকর্ণামৃত
এবং ব্রহ্মসংহিতা নামক দুটি গ্রন্থ যা তাঁকে একজন গবেষকরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। আমরা,
মিলনসাগরে, তাঁর অসীম প্রভাবশালী, আলো-ছায়াময় জীবনের কিছুটা তুলে ধরতে পারলে নিজেদের ধন্য
মনে করবো।

সর্বোপরি, তিনি ছিলেন একজন কবি! সংস্কৃত ভাষায় তাঁর রচিত আটটি গীত বা পদ বা শ্লোক তাঁর
ভক্তবর্গের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁর বাণী হিসেবে, শিক্ষাষ্টকম্ নামে গীত হয়ে থাকে। যার একটি
বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, পদসংখ্যা ৩০৫৫ ও ৩০৫৬ এর মাঝে প্রক্ষিপ্ত পদ
হিসেবে। এ ছাড়াও আরও চারটি শ্লোক তাঁর রচিত বলে প্রচলিত, পঞ্চদশ শতকে প্রকাশিত হয়েছে, রূপ
গোস্বামীর “পদ্যাবলী” গ্রন্থে।  অনেকে  বলেন  শিক্ষাষ্টকমের  আটটির মধ্যে পাঁচটি মাত্র শ্রীচৈতন্যের নিজের
রচনা। আমরা প্রতিটি শ্লোকের সঙ্গে তাঁর রচয়িতার নাম এখানে তুলে দিয়েছি। এর সঙ্গে পরে যোগ দিয়েছি
তাঁর রচিত বলে প্রচলিত বাংলাভাষায় রচিত একটি পদ এবং তাঁর পুরীতে রচিত "জগন্নাথদশক"।

তাই মিলনসাগরে শ্রীচৈতন্যকে কবিদের সভায় আসন দিতে পেরে আমরা ধন্য!
শ্রীচৈতন্যদেবের নাম -                                                                    পাতার উপরে . . .  
শ্রীচৈতন্যের পিতৃদত্ত নাম বিশ্বম্ভর। তাঁর অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে তাঁর মায়ের দেওয়া ডাক নাম নিমাই,
গায়ের রঙ ফরসা ছিল বলে গোরা, গোরা রায় বা গৌরাঙ্গ। সন্ন্যাস গ্রহণের পর রাখা নাম কৃষ্ণচৈতন্য এবং
তাঁর ভক্তদের কাছে তিনি মহাপ্রভু বা চৈতন্যদেব বা চৈতন্য মহাপ্রভু।
শ্রীচৈতন্য কেমন ছিলেন দেখতে ? -                                                    পাতার উপরে . . .  
নিতাই, গোরা, গৌরাঙ্গ, বিশ্বম্ভর ও শেষমেশ শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য কেমন ছিলেন দেখতে? এই প্রশ্নটি মনে আসা
স্বাভাবিক কারণ তাঁর ডাক নামের মধ্যেই তাঁর গায়ের রঙ লুকিয়ে রয়েছে!

সন্ন্যাস গ্রহণ করার পূর্বে নবদ্বীপে সংকীর্তনের সময়ে অসংখ্য মানুষের সমাবেশে, যেখানে এমন গাদাগাদি
হয়েছিল যে সরষে ফেললেও তা মাটিতে পড়বে না, সেখানেও তাঁকে সবাই দেখতে পেয়েছিলেন কারণ তিনি
এত লম্বা ছিলেন। . . .
চতুর্দ্দিগে আপন-বিগ্রহ ভক্তগণ।
বাহির হইলা প্রভু শ্রীশচীনন্দন॥
প্রভু মাত্র বাহির হইলা নৃত্যরসে।
‘হরি’ বলি সর্ব্বলোক মহানন্দে ভাসে॥
*        *        *        *        *
ললাটে চন্দন শোভে ফাগুবিন্দু-সনে।
বাহু তুলি ‘হরিহরি’ বোলে শ্রীবদনে॥
আজানুলম্বিত মালা সর্ব্ব-অঙ্গে দোলে।
সর্ব্ব-অঙ্গ তিতে পদ্মনয়নের জলে॥
দুই মহা-ভুজ যেন কনকের স্তম্ভ।
পুলকের শোভা যেন কনক-কদম্ব॥
সুরঙ্গ অধর অতি সুন্দর দশন।
শ্রুতিমূলে শোভা করে ভ্রুঅঙ্গ-পত্তন॥
গজেন্দ্র জিনিঞা স্কন্ধ, হৃদয় সুপীন।
তহীঁ শোভে শুক্ল-যজ্ঞসূত্র অতি ক্ষীণ॥
চরণারবিন্দ---রমা-তুলসীর স্থান।
পরম-নির্ম্মল-সূক্ষ্ম-বাস পরিধান॥
উন্নত নাসিকা, সিংহ-গ্রীব মনোহর।
সভা’ হৈতে সুপীত সুদীর্ঘ কলেবর॥
যে-সে-খানে থাকিয়া সকল লোকে বোলে।
“অই ঠাকুরের কেশ শোভে নানা ফুলে॥”
এতেক লোকের সে হইল সমুচ্চয়।
সরিষাও পড়িলেও তল নাহি হয়॥
তথাপিহ হেন কৃপা হইল তখন।
সভেই দেখেন সুখে প্রভুর বদন॥
প্রভুর শ্রীমুখ দেখি সব নারীগণ।
হুলাহুলি দিয়া ‘হরি’ বোলে অনুক্ষণ॥
---বৃন্দাদন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্যলীলা, ২৩শ অধ্যায়॥

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতে সন্ন্যাস গ্রহণ করার পরে শ্রীচৈতন্যের বর্ণনা আমরা পাই এভাবে। একবার
তিনি গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের রাজধানীর কাছে, রামকেলি গ্রামে গিয়ে  কয়েকদিন থেকে ভক্তদের দর্শন
দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রূপ-সনাতনের সঙ্গে দেখা করেন, অতি  গোপনীয়তার সঙ্গে। বিশাল জনসমাবেশ
হয়েছিল তাঁকে দেখতে। কোটালের মুখ দিয়ে “যবনরাজ” হুসেন শাহের প্রশ্নের উত্তরে আমরা শ্রীচৈতন্যের
একটি সুন্দর বর্ণনা পাই। . . .
কোটাল গিয়া কহিলেক রাজা-স্থানে।
এক ন্যাসী আসিয়াছে রামকেলিগ্রামে॥
নিরবধি করয়ে হিন্দুর সঙ্কীর্ত্তন।
না জানি তাঁহার স্থানে মিলে কতজন॥”
রাজা বোলে “কহ কহ সন্ন্যাসী কেমন।
কি খায়, কি নাম, কৈছে দেহের গঠন॥”
কোটোয়াল বোলে “শুন-শুনহ গোসাঞি!
এমত অদ্ভুত কভু দেখি শুনি নাঞি॥
সন্ন্যাসীর শরীরের সৌন্দর্য্য দেখিতে।
কামদেব সম হেন না পারি বলিতে॥
জিনিঞা কনক কান্তি, প্রকাণ্ড শরীর।
আজানুলম্বিত ভুজ, নাভি সুগভীর॥
সিংহ গ্রীব, গজ-স্কন্ধ কমল-নয়ান।
কোটি চন্দ্র সে মুখের না করি সমান॥
সুরঙ্গ অধর, মুক্তা জিনিঞা দশন।
কাম-শরাসন যেন ভ্রূভঙ্গ-পত্তন॥
সুন্দর সুপীন বক্ষ লেপিত-চন্দন।
মহা কটিতটে শোভে অরুণ-বসন॥
অরুণ কমল যেন চরণযুগল।
দশ নখ যেন দশ দর্পণ নির্ম্মল॥
কোনো বা রাজ্যের কোনো রাজার নন্দন।
জ্ঞান পাই ন্যাসী হই করয়ে ভ্রমণ॥
নবনীত হৈতেও কোমল সর্ব অঙ্গ।
তাহাতে অদ্ভুত শুন আছাড়ের রঙ্গ॥
একদণ্ডে পড়েন আছাড় শতশত।
পাষাণ ভাঙ্গয়ে তভু অঙ্গ নহে ক্ষত॥
নিরন্তর সন্ন্যাসীর ঊর্দ্ধ রোমাবলী।
পনসের প্রায় অঙ্গে পুলকমণ্ডলী॥
ক্ষণেক্ষণে সন্ন্যাসীর হেন কম্প হয়।
সহস্রজনেও ধরিবারে শক্ত নয়॥
দুইলোচনের জল অদ্ভুত দেখিতে।
কত নদী বহে হেন না পারি বলিতে॥
কখনো বা সন্ন্যাসীর হেন হাস্য হয়।
অট্টঅট্ট হাস্যে প্রহরেক ক্ষমা নয়॥
কখনো মূর্চ্ছিত হয় শুনিয়া কীর্ত্তন।
সভে ভয় পায়, কিছু না থাকে চেতন॥
বাহু তুলি নিরন্তর বোলে হরিনাম।
ভোজন শয়ন আর নাহি কিছু কাম॥
চতুর্দ্দিগ হৈতে লোক আইসে দেখিতে।
কাহারো না লয় চিত্ত ঘরেতে যাইতে॥
কত দেখিয়াছি আমি-সব যোগী জ্ঞানী।
এমত অদ্ভুত কভু নাহি দেখি শুনি॥
কহিলাঙ এই মহারাজ! তোমা’স্থানে।
দেশ ধন্য কৈল এ পুরুষ-আগমনে॥
না খায় না লয় কারো, না করে সম্ভাষ।
সবে নিরবধি এক কীর্ত্তনবিলাস॥
”---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়॥

কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতে লিখেছেন যে শ্রীচৈতন্যের শরীর ছিল “প্রকাণ্ড” এবং তিনি তাঁর
নিজের হাতের মাপের চারগুণ লম্বা ছিলেন। আমরা জানি যে সাধারণত মানুষ তাঁর নিজের হাতের সাড়ে
তিন গুণ লম্বা হয়। . . .
কলিযুগে যুগধর্ম্ম নামের প্রচার ;
তথি লাগি পীতবর্ণ চৈতন্যাবতার।
তপ্তহেম সমকান্তি, প্রকাণ্ড শরীর,
নব মেঘ জিনি কণ্ঠ ধ্বনি যে গভীর।
দৈর্ঘ্য বিস্তারে, যেই আপনার হাত,
চারি হস্ত হয় মহাপুরুষ বিখ্যাত।
ন্যগ্রোধ পরিমণ্ডল হয় তাঁর নাম ;
ন্যগ্রোধ পরিমণ্ডল তনু চৈতন্য গুণধাম।
আজানুলম্বিত ভুজ, কমল লোচন,
তিলফুল জিনি নাসা সুধাংশুবদন।
শান্ত, দান্ত, কৃষ্ণভক্তি নিষ্ঠা পরায়ণ,
সুশীল ভক্তবত্সল সর্ব্বভূতে সম।
চন্দন অঙ্গবালা, চন্দন ভূষণ
নৃত্যকালে পরি, করেন্ কৃষ্ণসঙ্কীর্ত্তন।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, তয় পরিচ্ছেদ॥

যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালীবুড়োর লেখা থেকে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি।
চৈতন্যদেব পুরীতে আসার পরে এমন একটা ঘটনা ঘটল যার জন্য চৈতন্যদেবের নাম নীলাচল সহ সারা
উত্কলে ছড়িয়ে পড়ল। ঘটনাটি হলো, একদিন চৈতন্যদেব ভাবাবেশে জগন্নাথদেবকে দর্শন করার  জন্য
অগ্রসর হচ্ছিলেন মূল মণ্ডপের দিকে অর্থাৎ সিংহাসনের দিকে। তখন বিশালাকার বলিষ্ঠ শরীর অনন্ত
গচ্ছিকার তাঁকে সিংহাসনের দিকে অগ্রসর হতে নিষেধ করলেন। চৈতন্য ভাবাবেগে অনন্তকে হাত দিয়ে
সরিয়ে সোজা চলতে লাগলেন। তাতেই অনন্ত ছিটকে পড়ল পূজাপীঠ অনসরপিণ্ডি-তে।” এই খবর  
তড়িত্গতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো এবং রাজ প্রতাপরুদ্রও নড়ে চড়ে বসলেন এই ভেবে যে এই মহাশক্তিধর
বীর কি সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে বাইরের কোনো শত্রু? এ থেকে আমরা তাঁর শারীরিক শক্তির একটি আন্দাজ
পেতে পারি
। ---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য, পৃষ্ঠা ২২৪॥

এই বর্ণনার পরে নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শ্রীচৈতন্যর চিত্র এযাবৎ যেভাবে আঁকা হয়ে আসছে
তার সঙ্গে এই বর্ণনার মিল নেই। তাঁর যত ছবি দেখেছি, সবেতেই তাঁকে নারীসুলভ কমনীয় করে আঁকা হয়
যাতে, সম্ভবত তাঁর, শ্রীকৃষ্ণের সখীভাব স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে। কিন্তু এই বর্ণনা স্পষ্টতই একজন কর্কশ-কঠোর
নয়, কোমল কিন্তু সুঠাম দীর্ঘদেহী, সুপুরষ ব্যক্তির যার মধ্যে নারীসুলভ কোনো লক্ষ্মণ নেই।
শ্রীচৈতন্যের জন্ম, শৈশব ও কৈশোর -                                                 পাতার উপরে . . .  
জগন্নাথ ও শচী দেবীর প্রথম সন্তান পুত্র বিশ্বরূপ, সন্ন্যাস গ্রহণ করে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। তারপর আরও
কয়েকটি সন্তান জন্মের পরেই বা ছোটবেলাতেই মারা যায়। চৈতন্যদেব, শচীদেবীর শেষ সন্তান বলে তিনি
নাম রাখেন “নিমাই”। সেকালের সংস্কার মতে, এই সন্তান যাতে মারা না যায়, তাই যমের অরুচিকর তিক্ত
“নিম”-এর থেকে নাম রাখা হোতো “নিমাই”। তাঁর পিতৃদত্ত নাম “বিশ্বম্ভর”।

প্রথম পুত্র শিক্ষালাভের পরে গৃহত্যাগ করেছিলেন বলে, পিতা জগন্নাথ, বিশ্বম্ভরকে বিদ্যা অর্জনের  দিকে
ঠেলে দেননি পাছে এই ছেলেও শিক্ষালাভের পরে সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগ করে! কিন্তু নিমাইয়ের পৈতে বা
উপনয়নের পরে নিমাই নিজেই পড়তে আগ্রহী হলে পিতা তাঁকে গঙ্গাদাস পণ্ডিতের টোলে পাঠান।

বিশ্বম্ভর কৈশোরেই ব্যাকরণের দুর্বোধ্য সূত্র-টীকা আয়ত্ত করেন। ক্রমে তাঁর পাণ্ডিত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি নিজের টোল খুলে বসেন, পণ্ডিত মুকুন্দের চণ্ডীমণ্ডপে।
শ্রীচৈতন্যের বিবাহ -                                                                    পাতার উপরে . . .  
বল্লভ আচার্য ছিলেন রুদ্রসম্প্রদায় বৈষ্ণব আচার্য। তাঁরা ছিলেন গুজরাট অঞ্চলের বসবাসকারী। পিতা লক্ষ্মণ
ভট্ট দেশ ত্যাগ করে উত্তর ভারতের বারাণসীতে বসবাস শুরু করেন। বল্লভাচার্য প্রচারকার্যে  ভারত
পরিক্রমা করেছিলেন এবং সেকালের হিন্দু সংস্কৃতির পীঠস্থান নবদ্বীপে এসে বসবাস শুরু করেন। নবদ্বীপ-
শান্তিপুর অঞ্চলে যে বৈষ্ণব সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল তাঁর পেছনে বল্লভ আচার্যের অবদান ছিল বলে  
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বল্লভ আচার্যের কন্যা লক্ষ্মীদেবী।

নিমাইয়ের বয়স তখন ষোলো কি সতেরো। লক্ষ্মীদেবী রোজ গঙ্গাস্নানে যেতেন। একদিন পথে তাঁকে দেখে
নিমাই চিত্তচাঞ্চল্য অনুভব করেন এবং এই প্রণয়ঘটিত ঘটনাবলির পরে মাত্র পাঁচটি হরীতকী দিয়ে
লক্ষ্মীদেবীকে বিবাহ করে গৃহে নিয়ে আসেন। প্রথমে নিমাইয়ের মাতা শচীদেবীর এই প্রস্তাবে সায় ছিল না।
তিনি এই সম্বন্ধ নাকচ করে, ঘটককে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।  পরে  পুত্রের  ইচ্ছায়  এ বিয়েতে সম্মতি
দিয়েছিলেন।

টোলের পণ্ডিত বিশ্বম্ভর এরপর গেলেন পূর্ববঙ্গে, তাঁর পিতৃভূমি শ্রীহট্ট পরিক্রমায়। সেখানেও  তাঁর  
পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বম্ভরের এই শ্রীহট্ট ভ্রমণের কালেই লক্ষ্মীদেবীর অকাল মৃত্যু ঘটে। ঠিক
কিভাবে লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যু হয়েছিল তা শ্রীচৈতন্যের জীবনীকারগণ স্পষ্ট করে বলে যাননি।
বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত থেকে আমরা পাই ---
এথা নবদ্বীপে লক্ষ্মী প্রভুর বিরহে।
অন্তরে দুঃখিতা দেবী কারে নাহি কহে॥
নিরবধি করে দেবী আইর সেবন।
প্রভু গিয়াছেন হৈতে নাহিক ভোজন॥
নামেরে সে অন্ন-মাত্র পরিগ্রহ করে।
ঈশ্বরবিচ্ছেদে বড় দুঃখিতা অন্তরে॥
একেশ্বর সর্ব্বরাত্রি করেন ক্রন্দন।
চিত্তে স্বাস্থ্য লক্ষ্মী না পায়েন কোন-ক্ষণ॥
ঈশ্বরবিচ্ছেদ লক্ষ্মী না পারি সহিতে।
ইচ্ছা করিলেন প্রভুর সমীপে যাইতে॥
নিজ প্রতিকৃতি-দেহ থুই পৃথিবীতে।
চলিলেন প্রভুপাশে অতি-অলক্ষিতে॥
প্রভুপাদপদ্ম লক্ষ্মী করিয়া হৃদয়।
ধ্যানে গঙ্গাতীরে দেবী করিলা বিজয়
॥ ---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, দশম অধ্যায়॥

লক্ষ্মীদেবী কি গঙ্গাতীরে বা গঙ্গায় দেহত্যাগ করেছিলেন? পূর্ববঙ্গের শ্রীহট্ট থেকে বাড়ী ফিরে লক্ষ্মীদেবীকে না
দেখে এবং মাতা শচীদেবীর “দুঃখিত-বদন” দেখে, বিশ্বম্ভর জানতে চাইলেন, কি হয়েছে। উত্তরে মা কাঁদতেই
থাকেন। কোনো উত্তর দিতে পারেন না। তখন সবাই বিশ্বম্ভরকে বলে . . .
তবে সভে কহিলেন “শুনহ পণ্ডিত!
তোমার ব্রাহ্মণী গঙ্গা পাইলা নিশ্চিত॥
”  ---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, দশম অধ্যায়॥
এখানে কথাটা গঙ্গাপ্রাপ্তি অর্থেই পাচ্ছি অর্থাৎ মৃত্যু। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত থেকে আমরা
পাই ---

এই মতে বঙ্গে লোকের কৈল মহা হিত।
নাম দিয়া বৈষ্ণব কৈল, পড়াঞা পণ্ডিত॥
এই মত বঙ্গে প্রভু করে নানা লীলা।
এথা নবদ্বীপে লক্ষ্মী বিরহে দুঃখী হৈলা॥
প্রভুর বিরহ-সর্প লক্ষ্মীরে দংশিল।
বিরহ সর্প বিষে তাঁর পরলোক হৈল॥
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ষোড়শ পরিচ্ছেদ॥

পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজের এই বিরহ-সর্পই অন্যান্য জীবনীকারদের হাতে সর্পদংশনে পর্যবশিত হয়েছে।
লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কেউই খোলসা করে বলে যাননি। তারা কি তাঁর পারিবারিক জীবনের এই
অধ্যায়টিকে সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন? সামান্য কিছুদিনের বিরহেই স্ত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন,
এটাও অনেকের কাছে আশ্চর্যের বিষয়। তিনি জলে ডুবে মারা গিয়েছেন না সর্প-দংশনে মারা  গিয়েছিলেন
না কি বিষপান করেছিলেন, তা ধোঁয়াশার মধ্যেই রয়ে গেছে। তাছাড়া এটা কি শুধু বিরহের কারণে না কি
পুত্রের অবর্তমানে শাশুড়ী-বৌয়ের সংঘাত এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মীদেবীকে এই পথ
বেছে নিতে হয়! বিয়ের প্রস্তাব আসার সময় কিন্তু শচীদেবীর এই বিয়েতে এতটুকু ইচ্ছে ছিল না। তিনি
বনমালী নামের ঘটককে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কন্যার পিতা বল্লভাচার্য ছিলেন গুজরাট প্রদেশের মানুষ।
ভিন্ন সামাজিক আচার ব্যবস্থার মানুষ।

বৃন্দাবন দাস তাঁর চৈতন্যভাগবতে ঘটক বনমালীকে ফিরিয়ে দেবার বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন . . .

ঈশ্বর ইচ্ছায় বিপ্র---বনমালী নাম।
সেইদিন গেলা তিঁহো শচীদেবী-স্থান॥
নমস্করি আইরে বসিলা বিপ্রবর।
আসন দিলে আই করিয়া আদর॥
আইরে বোলেন তবে বনমালী-আচার্য্য।
পুত্র বিবাহে কোনো না চিন্তহ কার্য্য॥
বল্লভ-আচার্য্য কুলে শীলে সদাচারে।
নির্দ্দোষে বৈসেন নবদ্বীপের ভিতরে॥
তার কন্যা লক্ষ্মী প্রায় রূপে শীলে মানে।
সে সম্বন্ধ কর যদি ইচ্ছা হয় মনে॥
আই বোলে পিতৃহীন বালক আমার।
জীউক পঢ়ুক আগে, তবে কার্য্য আর॥
আইর কথায় বিপ্র রস না পাইয়া।
চলিলেন বিপ্র কিছু দুঃখিত হইয়া॥
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, আদিখণ্ড, ৭ম অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৭৪।

প্রথমা স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর প্রভাব নিমাই বা বিশ্বম্ভরের জীবনে প্রগাঢ়। এক গোঁড়া স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের পুত্র
নিমাই লক্ষ্মীদেবীর প্রভাবে বৈষ্ণব ধর্মের দিকে আকৃষ্ট হন এবং তাঁর অকাল মৃত্যুই তাঁকে সন্ন্যাসের দিকে
ঠেলে দেয়।

লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যুর পর বিশ্বম্ভর তাঁর টোল চালিয়ে গেলেও মন তাঁর উদাসী হয়ে থাকতো। শচীদেবী তাই
পুত্রকে আবার বিয়ে দেবার কথা ভাবলেন। এবার খুব ধূমধামের সঙ্গে পুত্রের বিয়ে দিলেন রাজপণ্ডিত
সনাতনের কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে।
নবদ্বীপের কাজীর বিরদ্ধে হুঙ্কার এবং একটি সফল নাগরিক আন্দোলন -      পাতার উপরে . . .  
বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বিবাহের পরে ১৫০৮ খৃষ্টাব্দে তিনি গয়া গেলেন পিতৃশ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের জন্য। সেখানে
অঞ্জলি দেওয়ার সময় আত্মহারা হয় গেলেন। ঈশ্বরীপুরীর কাছে গোপাল মন্ত্র নিলেন।

গয়া থেকে ফিরে সবাই দেখলো যে কৃষ্ণপ্রেমে নিমাইয়ের হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠেছে। তাঁর চরিত্রের পরিবর্তন
লক্ষ্য করলেন সবাই। তাঁর হাস্য-কৌতুক, বিদ্যার দম্ভ, সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল। তাঁর অন্তরে  দেখা
দিল সংসার বৈরাগ্য। ছাত্র পড়াতে আর মন নেই বলে তাঁর টোল বন্ধ হয়ে গেল। তিনি কৃষ্ণ নাম-কীর্তনে
মেতে উঠলেন। তিনি নিত্যানন্দ, অদ্বৈত্যাচার্য প্রমুখ বৈষ্ণবগণ, যাঁরা শাক্ত ও নৈয়ায়িকদের ভয়ে ভয়ে
ছিলেন, তাঁদের উদ্বুদ্ধ করলেন।

বৈষ্ণব বিরোধী হিন্দুদের এবং যবন ( অহিন্দু, এক্ষেত্রে মুসলমান ) নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে
চাঁদকাজী, নগরে কীর্তন বন্ধের আদেশ দিলেন . . .

এইমত পাষণ্ডীরা বল্গয়ে সদায়।
প্রতিদিন নগরিয়াগণ ‘কৃষ্ণ’ গায়॥
একদিন দৈবে কাজি সেই পথে যায়।
মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ শুনিবারে পায়॥
হরিনাম-কোলাহল চতুর্দ্দিগে মাত্র।
শুনিয়া স্মঙরে কাজি আপনার শাস্ত্র॥
কাজি বোলে “ধর ধর আজি করোঁ কার্য্য।
আজি বা কি করে তোর নিমাঞি আচার্য্য॥”
এথেব্যথে পলাইল নগরিয়াগণ।
মহাত্রাসে কেশ কেহো না করে বন্ধন॥
যাহারে পাইল কাজি, মারিল তাহারে।
ভাঙ্গিল মৃদঙ্গ, অনাচার কৈল দ্বারে॥
কাজি বোলে হিন্দুয়ানি হইল নদীয়া।
করিমু ইহার শাস্তি নাগালি পাইয়া॥
ক্ষমা করি যাঙ আজি, দৈবে হৈল রাতি।
আরদিন লাগি পাইলেই লৈব জাতি॥
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্যখণ্ড, ২৩শ অধ্যায়॥

কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতে লিখেছেন . . .
শুনিয়া যে ক্রুদ্ধ হইল সকল যবন ;
কাজী পাশে আসি সবে কৈল নিবেদন।
ক্রোধে সন্ধ্যাকালে কাজী একঘরে আইলা ;
মৃদঙ্গ ভাঙ্গিয়া লোকে কহিতে লাগিলা :---
‘এতকাল প্রকটে কেহ না কৈল হিন্দুয়ানী ;
এবে উদ্যম চালাও কার বল জানি ?
কেহ কীর্ত্তন না করিহ সকল নগরে ;
আজি মুই ক্ষমা করি যাইতেছি ঘরে।
আর যদি কীর্ত্তন করিতে লাগ পাইমু ;
সর্ব্বস্ব দণ্ডিয়া তার জাতি যে লইমু’।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ॥

কাজীর আদেশ শুনে যখন সবাই ভয়েভীত, তখন বিশ্বম্ভরের মুখে ভয়ের বদলে শোনা গেল হুংকার! . . .
তা’ সবার অন্তরে ভয় প্রভু মনে জানি
কহিতে লাগিলা লোকে শীঘ্র ডাকি আনি :---
‘নগরে নগরে আজি করিব কীর্ত্তন ;
সন্ধ্যাকালে কর সবে নগর মণ্ডন।
সন্ধ্যাতে দেউটি সবে জ্বাল ঘরে ঘরে।
দেখি কোন্ কাজি আসি মোরে মানা করে’?
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, সপ্তদশ॥

চাঁদকাজীর এই কীর্তন বন্ধের আদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বম্ভর শুরু করেন একটি সফল, প্রচণ্ড, অহিংস, নাগরিক
আন্দোলন! তিনি তিনটি দলে তাঁর ভক্ত-সমর্থকদের ভাগ করে দিলেন। প্রথম দলটি চললো  হরিদাসের
নেতৃত্বে, দ্বিতীয় দল চললো অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বে এবং তৃতীয় দল চলল নিত্যানন্দ এবং তাঁর নেতৃত্বে।
সকল জাতপাতের সাধারণ মানুষকে নিয়ে, হরি নাম করতে করতে, কাজীর বাড়ী পর্যন্ত চলে এই অভিযান।
বিশাল জন সমর্থন দেখে কাজী ভয় পেয়ে গেলেন। বিশ্বম্ভরের সঙ্গে মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক পাতিয়ে ফেললেন
এবং নতিস্বীকার করলেন! অথবা বিশ্বম্ভরের নানা প্রশ্ন ও শাস্ত্রবচন শুনে, সত্যিই অনুশোচনাগ্রস্থ হয়ে
বিশ্বম্ভরের দাবী মেনে নিলেন এবং কৃপাপ্রার্থী হলেন। . . .

তবে মহাপ্রভু তার দ্বারেতে বসিলা ;
ভব্য লোক পাঠাইয়া কাজী বোলাইলা।
দূর হৈতে আইলা কাজী মাথা নোঙাইয়া ;
কাজীরে বসাইলা প্রভু সম্মান করিয়া।
প্রভু বলেন ‘আমি তোমার আইলাম অভ্যাগত ;
আমা দেখি লুকাইলা ; এ ধর্ম্ম কেমত’?
কাজী কহে ‘তুমি আইস ক্রুদ্ধ হইয়া ;
তোমা শান্ত করিবারে রহিনু লুকাইয়া।
এবে তুমি শান্ত হৈলা, আসি মিলিলাঙ ;
ভাগ্য মোর তোমা হেন অতিথি পাইলাঙ।
গ্রাম সম্বন্ধে চক্রবর্ত্তী হয় আমার চাচা ;
দেহ সম্বন্ধ হৈতে গ্রাম সম্বন্ধ সাচা।
নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী হয় মোর নানা ;
সে সম্বন্ধে হও তুমি আমার ভাগিনা।
ভাগিনার ক্রোধ মামা অবশ্য সহয় ;
মাতুলের অপরাধ ভাগিনা না লয়’।
এই মতে দুঁহার কথা হয় ঠারে ঠোরে ;
ভিতরের তত্ত্ব কেহ বুঝিতে না পারে।

*        *        *        *        *
প্রভু কহে ‘এক দান মাগিয়ে তোমায় ;
সংকীর্ত্তন বাদ যেন নহে নদীয়ায়’।  
কাজী কহে ‘মোর বংশে যত উপজিবে ;
তাহাকে তালাক দিব কীর্ত্তন না বাধিবে।’
শুনি প্রভু হরি বলি উঠিলা আপনি ;
উঠিল বৈষ্ণব সব করি হরিধ্বনি।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ॥

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের এই ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতের বর্ণনার
অনেক তফাত রয়েছে। চৈতন্যভাগবতে (মধ্য খণ্ড, ২৩শ অধ্যায়) এই আন্দোলনকে মোটেই অহিংস দেখানো
হয়নি। সেখানে
চাঁদকাজীর বাড়ী ও বাগান লণ্ডভণ্ড করে দেওয়া হয় এবং কাজী তাঁর লোকজন নিয়ে ভয়ে  
পালিয়ে যান। এরপর নিমাই, বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দিতে বলেন। বিশ্বম্ভরের এই ক্রোধ দেখে শেষে  
ভক্তরাই গলবস্ত্র হয়ে তাঁকে শান্ত হতে অনুরোধ করলে তিনি ফিরে যান। দুটির মধ্যে কোনো বর্ণনাতেই নেই
কোনো হতাহতের বা লুণ্ঠনের বা নারীর শ্লীলতাহানীর ঘটনার উল্লেখ। অর্থাৎ একটি অহিংস এবং অপরটি
নির্ভেজাল অহিংস না হলেও খুনাখুনি পর্যন্ত গড়ায়নি।

কোটিকোটি হরিধ্বনি মহাকোলাহল।
স্বর্গ-মর্ত্ত্য-পাতালাদি পূরিল সকল॥
শুনিয়া কম্পিত কাজি গণ-সহে ধায়।
সর্প-ভয়ে যেন ভেক ইন্দুর পলায়॥
*        *        *        *        *  
আসিয়া প্রভুর দ্বারে প্রভু বিশ্বম্ভর।
ক্রোধাবেশে হুঙ্কার করয়ে বহুতর॥
ক্রোধে বোলে প্রভু “আরে কাজি বেটা কোথা।
ঝাট আন ধরিয়া কাটিয়া ফেলোঁ মাথা॥
নির্যবন করোঁ আজি সকল ভুবন।
পূর্ব্বে যেন বধ কৈলুঁ সে কালযবন॥
প্রাণ লঞা কোথা কাজি গেল দিয়া দ্বার।
ঘর ভাঙ্গ ভাঙ্গ” প্রভু বোলে বারেবার
॥ ---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্য খণ্ড, ২৩শ অধ্যায়॥

. . . এর পর ঘর-দোর গাছ-পালা লণ্ডভণ্ডের বর্ণনার পর ভক্তগণের গলবস্ত্র হয়ে ক্রোধ সম্বরণের অনুরোধ . . .

. . .অগ্নি দেহ ঘরে তোরা না করিহ ভয়।
আজি সব যবনের করিমু প্রলয়॥”
দেখিয়া প্রভুর ক্রোধ সর্ব্বভক্তগণ।
গলায় বান্ধিয়া বস্ত্র পড়িলা তখন॥
ঊর্দ্ধবাহু করিয়া সকল ভক্তগণ।
প্রভুর চরণানবিন্দে করে নিবেদন॥
“তোমার প্রধান অংশ প্রভু সঙ্কর্ষণ।
তাঁহার অকালে ক্রোধ না হয় কখন॥
যে-কালে হইব সর্ব্বসৃষ্টির সংহার।
সঙ্কর্ষণ ক্রোধে হন রুদ্র-অবতার॥
যে রুদ্র সকল সৃষ্টি ক্ষণেকে সংহরে।
শেষে তিঁহো আসি মিলে তোমার শরীরে॥
*        *        *        *        *
ব্রহ্মাদিও তোমার ক্রোধের নহে পাত্র।
সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় তোমার লীলা-মাত্র॥
করিলা ত কাজির অনেক অপমান।
আর যদি ঘটে তবে সংহারিহ প্রাণ
॥” ---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্য খণ্ড, ২৩শ অধ্যায়॥

এখানে ক্রোধের মধ্যে দিয়ে একদিকে শ্রীচৈতন্যকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতাররূপে তুলে ধরার একটি চেষ্টা।
অপরদিকে ভক্তগণ ক্রোধ সম্বরণ করতে বলার মধ্যে সঙ্কর্ষণের বা হলধর বা প্রভু নিত্যানন্দের কথা তুলে
বলছেন যে অকালে তাঁর এমন ক্রোধ হয় না। জগাই-মাধাই কাণ্ডের সময়ও নিমাই প্রচণ্ড ক্রোধিত হয়ে
সংহার করার কথা বলে ছিলেন এবং নিত্যানন্দ প্রভুর মাথা ফাটলেও তিনি জগাই-মাধাইকে ক্ষমা করার
কথা বলে বাঁচিয়েছিলেন। এখানে নিত্যানন্দ হলধর অর্থাৎ বলরামের অবতার।

প্রশ্ন ওঠে কোন বর্ণনাটি সত্য, চৈতন্যচরিতামৃতের না চৈতন্যভাগবতের?

অনেকেই বৃন্দাবন দাসের কথাই ঠিক বলে মনে করেন কারণ তিনি তাঁর গুরু প্রভু নিত্যানন্দের থেকেই সব
বিবরণ শুনে লিখেছিলেন। অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য! আমার মনে হয় যে প্রভু নিত্যানন্দের ব্যক্তিত্বকে
আরও উজ্জ্বল বা আরও বড় করে দেখানোর জন্যও এমনভাবে লিখে থাকতে পারেন বৃন্দাবন দাস। বৃন্দাবন
দাস প্রভু নিত্যানন্দের মন্ত্র শিষ্য ছিলেন। তাঁর আজ্ঞাতেই তিনি চৈতন্যভাগবত রচনা করেন। এখানে বৃন্দাবন
দাসের রচনা যেন কিছুটা  অতিরঞ্জিত। কৃষ্ণদাস কবিরাজের পরিণত-বৃদ্ধবয়সের লেখা অনেক সংযত।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যজীবনী, বৃন্দাবন দাসের থেকে প্রায় ২০বছর পরে লিখলেও তিনি ২০-২২বছরের
বয়োজ্যেষ্ঠ। নবদ্বীপের এই নাগরিক আন্দোলনের সময় তিনি কিশোর বয়সের আর বৃন্দাবন দাসের তখন
জন্মই হয় নি। তাই  কৃষ্ণদাস কবিরাজও লোকমুখে সেই ঘটনার তাজা বিবরণ শুনেছিলেন তা একেবারে
উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও তিনি তাঁর গ্রন্থে একাধিকবার
বৃন্দাবন দাসের লেখাকে অনুসরণ  করছেন
বলে লিখেছেন। তবুও মনে হয় পরস্পর বিরোধী তথ্যের, যায়গায় তাঁর নিজের জানা তথ্যের উপর ভিত্তি
করে চৈতন্যচরিতামৃত রচনা করেছিলেন।

চাঁদ কাজী ছিলেন বাংলার নবাবের দৌহিত্র। নদীয়ার বামনপুকুরে চাঁজকাজীর সমাধি রয়েছে। সেখানকার
মানুষজনের মতে, চাঁদকাজীর আসল নাম ছিল মৌলানা সিরাজউদ্দীন। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের  শাসক
এবং গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের শিক্ষক (
অভিষেক নস্কর, বঙ্গদর্শন)। অর্থাৎ নবাবের আত্মীয় অথবা অতি
কাছের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাঁর বাড়ী-ঘর ভাঙচুর করলে, ফল কত খারাপ হতে পারে, সে কথা নিমাইপণ্ডিতের
মত বিচক্ষণ নেতা নিশ্চয়ই চিন্তা করেছিলেন। কোনো বিবেচক নেতার কি তেমন কোনো হঠকারী কাজে
উত্সাহ দেওয়া উচিত হোতো? নবদ্বীপের মানুষের উপর বাংলার বাদশাহের কাছ থেকে, এই ঘটনার বদলা
হিসেবে অবধারিত দমন-পীড়ন ঘটনাবলীর উল্লেখ আমরা পাই না। তাই এরকম ঘটনার সত্যতা নিয়ে  
সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

তাই মনে হয় কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের ঘটনাই সত্যের কাছাকাছি। সেখানে দেখতে পাই যে
কাজীর সঙ্গে নিমাই পণ্ডিতের সামনাসামনি কথা হচ্ছে এবং কাজী, গ্রাম সূত্রে নিমাই-এর সঙ্গে মামা-ভাগ্নের
আত্মীয়তার কথা বলছেন। তিনি নাকি শ্রীচৈতন্যের ভক্তও হয়ে যান। নদীয়ার বামনপুকুরে, কাজীর সমাধির
উপর, মহাপ্রভু নাকি একটি চাপাফুলের গাছ পুতেছিলেন (কথিত)। সেই গাছটি এখনও জীবিত আছে।    

নবদ্বীপের কাজী ও বিশ্বম্ভরের ঘটনাটি যে কোনো আধুনিক যুগের নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা
যায়, চোখ বুজে! প্রশাসন দ্বারা নাগরিকের উপর কোনো বিষয়ে উত্পীড়ন-নিপীড়ন, কোন জননেতার দ্বারা,
নাগরিকদের সংগঠিত করে স্লোগান দিতে দিতে, এ ক্ষেত্রে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতে করতে, প্রশাসকের
কর্মক্ষেত্রের দিকে এদিয়ে গিয়ে অবরোধ তৈরী করা, প্রশাসনকে বাধ্য করা সামনাসামনি বসে কথা বলার
এবং শেষে প্রশাসককে বুঝিয়ে রাজি করানো, তাঁদের দাবী সম্পূর্ণভাবে মেনে নিতে! যে যুগে লড়াই-যুদ্ধ-
বিগ্রহই ছিল যে কোনো বিরোধের মিমাংসার একমাত্র উপায়, সেখানে বিশ্বম্ভর, পরে শ্রীচৈতন্য চমত্কারভাবে
সংগঠিত করছেন একটি অহিংস নাগরিক আন্দোলন! কে বলে ইনি শুধু ধর্মনেতা!?
শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস -                                                                       পাতার উপরে . . .  
নবদ্বীপের কাজীর কাছ থেকে কীর্তন করার অধিকার বুঝে নেবার পর তাঁর ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলো।
কিন্তু তবুও সাধারণ গৃহস্থরা তাঁর মত একজন গৃহী মানুষের কাছ থেকে তাঁর ভক্তিমার্গকে সমুপূর্ণভাবে
মেনে নিতে পারছিলেন না বা গ্রহণ করতে পারছিলেন না। তাঁকে বহু নিন্দা-কটাক্ষ বরদাস্ত করতে হচ্ছিল।
এমন সময় তিনি ভাবলেন সন্ন্যাস নেবার কথা। তাঁর মনে হলো যে সন্ন্যাস গ্রহণ করলে সাধারণ মানুষ তাঁর
কথা মন দিয়ে শুনবেন এবং গ্রহণ করবেন।
“এই সব মোর নিন্দা অপরাধ হৈতে ;
আমি লওয়াইলেও ভক্তি না পারে লইতে।
নিস্তারিতে আইলাঙ আমি হৈল বিপরীত ;
এ সব দুর্জ্জনের কৈছে হইবেক হিত ?
আমাকে প্রণতি করে, হয়ে পাপ ক্ষয় ;
তবে সে ইহারে ভক্তি লয়াইলে লয়।
মোরে নিন্দা করে, যে না করে নমস্কার ;
এ সব জীবের অবশ্য করিব উদ্ধার।
অতএব অবশ্য আমি সন্ন্যাস করিব ;
সন্ন্যাসী দেখিয়া মোরে প্রণত হইব।
প্রণতিতে হবে ইহার অপরাধ ক্ষয় ;
নির্ম্মল হৃদয়ে ভক্তি করিব উদয়।
এসব পাষণ্ডী তবে হইবে নিস্তার ;
আর কোন উপায় নাহি, এই যুক্তি সার।”
--কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদ॥

এই সময়ে নবদ্বীপে কেশবভারতী এসেছিলেন। তিনি সেখান থেকে কাটোয়া বা কণ্টকনগরে চলে যাবার পূর্বে,
বিশ্বম্ভর তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেন। ২৬শে মাঘ ৯১৬ বঙ্গাব্দে (ফেব্রুয়ারী ১৫১০ সালের
২য় সপ্তাহে) বিশ্বম্ভর, সংসার ত্যাগ করে নিত্যানন্দ, চন্দ্রশেখর ও মুকুন্দ আচার্য কে সঙ্গে নিয়ে কাটোয়ায়
উপস্থিত হন। সেখানে কেশবভারতীর কাছেই সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ২৯শে মাঘ ৯১৬ বঙ্গাব্দে। তাঁর নতুন নাম
হলো কৃষ্ণচৈতন্য। শুরু হলো তাঁর সন্ন্যাস জীবন।

সন্ন্যাস গ্রহণ করে, এক দিন কাটোয়ায়, তিন-চার দিন রাঢ়দেশে কাটিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হয়ে নিত্যানন্দকে
পাঠান মা শচীদেবীর কাছে আর নিজে থাকেন শান্তিপুরে, অদ্বৈত আচার্যের বাড়ীতে। এরপর  তিনি  
নিত্যানন্দ, দামোদর পণ্ডিত, জগদানন্দ ও মুকুন্দের সঙ্গে নীলাচলে (পুরী) যাত্রা করেন।

এরপর তিনি বার হন দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত পরিক্রমায়। এই সময়ে মারাঠী সাধক সন্ত তুকারাম, তাঁকে
গুরু বলে স্বীকার করেন। প্রায় দুইবছর পরিক্রমা করার পর তিনি পুনরায় নীলাচলে ফিরে আসেন এবং
নীলাচলের রাজা প্রতাপ রুদ্রের গুরু কাশী মিশ্রের আশ্রমে বসবাস শুরু করেন। তিনি জীবনের শেষ ২৪ বছর
সেখানেই কাটিয়েছিলেন।
গৌড়েশ্বর হুসেন শাহ ও শ্রীচৈতন্য -                                                   পাতার উপরে . . .  
গৌড়ের স্বাধীন শাসক তখন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৪ - ১৫১৯ শাসনকাল)। দিল্লীর বাদশা সিকান্দার
লোদী (১৪৮৯ - ১৫১৭) ও হুসেন শাহের পুত্র ডানিয়ালের সঙ্গে বাড় নামক স্থানে (বর্তমানে পাটনা শহরের
দক্ষিণে) যুদ্ধ ও সন্ধি-চুক্তি হয়। এর ফলে সিকান্দার লোদী হুসেন শাহকে গৌড়ের স্বাধীন রাজা বলে স্বীকার
করে নেন এবং ঐ স্থানের পূর্বদিকের ভূমি হুসেন শাহের অধীনে চলে আসে।

তাঁর পুরো নাম ছিল “সুলতান হুসেন শাহ বিন সৈয়দ আশরাফ-উল-হুসৈনী”, অর্থাৎ সৈয়দ আশরাফ-উল-
হুসৈনী-এর পুত্র সুলতান হুসেন শাহ। পিতা ছিলেন মক্কার একজন শরিফ যিনি তুর্কমেনিস্তানের তিমিত্জ-এ
বসবাস করতেন। হুসেন শাহ কিভাবে ভারতবর্ষে তথা বাংলায় এসে পৌঁছলেন তার কোনো বৃত্তান্ত নেই।
ইতিহাস বলে যে, প্রথমে তিনি গৌড়ের শাসক সুলতান শামসুদ্দিন মুজফ্ফর শাহের অধীনে উজীর ছিলেন।
পরে মুজফ্ফর শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন।

ঐতিহাসিকগণ তাঁকে অপেক্ষাকৃত কম ধর্মীয়-অসহিষ্ণু শাসক বলেছেন। তাঁর আমলে অপেক্ষাকৃত কম হিন্দু
মন্দির ভাঙ্গা হয় বলেও ঐতিহাসিকগণ স্বীকার করেন। তা সত্বেও তাঁর কামতা-কামরূপ (উত্তরবঙ্গ ও  
আসাম) ও নীলাচল (পুরী-উড়িষ্যা) অভিযানের সময়ে তাঁর সৈন্যদল দ্বারা প্রচুর মন্দির ভাঙচূর এবং
অত্যাচারের কথা উল্লেখ করা রয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থে। নীলাচলের রাজা প্রতাপরুদ্র দক্ষিণে বিজয়নগরের রাজা
কৃষ্ণ দেব রায়ের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন বলে তাঁরা পুরী পর্য্যন্ত দখল করে নিয়েছিলেন এবং পুরীর জগন্নাথ
মন্দির ধ্বংসের জন্য তৈরী হচ্ছিলেন। খবর পেয়ে, রাজা প্রতাপরুদ্র ফিরে আসায় সে যাত্রায় পুরীর মন্দির
রক্ষা পায়।

তাঁর এত ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের পরেও তিনি রামকেলি গ্রামে ১৫১৩ খৃষ্টাব্দে শ্রীচৈতন্যের ভক্ত সমাবেশ ও
তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে হুকুম দিয়েছিলেন যে, শ্রীচৈতন্যকে যেন সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয় এবং কেউ
যেন তাঁর কোনো ক্ষতি না করে।

রাজা বোলে এই মুঞি বলিলুঁ সভারে।
কেহো পাছে উপদ্রব করয়ে তাঁহারে॥
যেখানে তাঁহার ইচ্ছা, থাকুন সেখানে।
আপনার শাস্ত্রমত করুণ বিধানে॥
সর্ব্বলোক লই সুখে করুণ কীর্ত্তন।
কি বিরলে থাকুন, যে লয় তাঁর মন॥
কাজী বা কোটাল বা তাঁহাকে কোনো জনে।
কিছু বলিলেই তার লইমু জীবনে॥
এই আজ্ঞা দিয়া রাজা গেলা অভ্যন্তর।
হেন রঙ্গ করায়েন শ্রীগৌরসুন্দর॥
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৪২৫।

দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর
“Chaitanya and his age” গ্রন্থে জানিয়েছেন এর ঠিক উলটো কথা। তাঁর মতে সুলতান
হুসেন শাহ, বৈষ্ণব আন্দোলন যাতে দানা বাঁধতে না পারে, তার সব রকম ব্যবস্থাই নিয়েছিলেন। পূর্বে
ফতেশাহের আমলে ব্রাহ্মণদের উপবীত ধারণ করা নিষিদ্ধ হয়েছিল। হুসেন শাহ নিষিদ্ধ করলেন বৈষ্ণবদের
তুলসীর মালা ধারণ করা। আদেশ দিয়েছিলেন তুলসীর গাছ দেখলেই উপড়ে ফেলতে। নিষিদ্ধ করেছিলেন
সংকীর্তনও।

আসলে সমস্ত কালেই, এমন কি সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া সিংহলীদের দ্বারা, যাঁরা  অহিংস  
বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, উত্তর-শ্রীলঙ্কায় তামিলদের উপর, শেষ বিজয় অভিযানেও একই হিংস্রতা ও অত্যাচার দেখা
গেছে। সে অভিযান এতটাই অমানবিক ছিল যে তা আজ আন্তরজাতিক যুদ্ধাপরাধের মধ্যে গণ্য করা হয়।
“রাষ্ট্রসংঘ”, “ভিয়েনা চুক্তি” সহ আরও বহু বহু মানবাধিকার চুক্তি-রীতি-নীতি ও সংঘটন থাকা  সত্বেও এ
যুগেও যখন এমন অনাচার-অত্যাচার প্রত্যক্ষ করতে হয়, তখন মধ্যযুগের কথা সহজেই অনুমেয়। খুন-লুঠ-
ধর্ষণ ছিল যে কোনো জয়ের স্বাভাবিক হকের প্রাপ্তি বা পুরস্কার! কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক মনে করা হোতো
যখন ধর্মীয় স্থান ভাঙা বা ধ্বংস করা হোতো।

অন্যদিকে, হুসেন শাহের এক রাজ কর্মচারী,
যশোরাজ খানের একটি পদে তাঁর গুনগান করা আছে।
শ্রীযুত হুসন                   জগতভূষণ
.        সোহ এ রস জান।
পঞ্চগৌড়েশ্বর                ভোগ পুরন্দর
.        ভণে জসরাজ খান॥
--- পিতাম্বর দাস, রসমঞ্জরী, ৪র্থ অধ্যায়, পৃষ্ঠা-২৭১।

হুসেন শাহের আমলেই লেখা হয়
বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্য। সেখানে বিজয় গুপ্তও, হুসেন শাহের  
প্রশংসা করেছেন।
ঋতু শুন্য বেদ শশী পরিমিত শক।
সুলতান হোসেন শাহ নৃপতি তিলক॥
সংগ্রামে অর্জুন রাজা প্রভাতের রবি।
নিজ বাহুবলে রাজা শাসিল পৃথিবী॥
রাজার পালনে প্রজা সুখ ভুজে নিত।
মুল্লুক ফতেহাবাদ বাঙ্গজোড়া তকসিম॥
---বিজয় গুপ্ত, মনসামঙ্গল কাব্য, মনসার জন্ম পালা, ৪র্থ সর্গ॥
(মিলনসাগরে
বিজয়গুপ্তের সম্পূর্ণ মনসামঙ্গল কাব্য পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . . ।)

সুকুমার সেন এই তত্ত্ব নাকচ করেছিলেন এই বলে যে মনসামঙ্গলের সময়কাল ১৪৮৪ খৃষ্টাব্দ, আলাউদ্দিন
হুসেন শাহের শাসনকালের সঙ্গে মিলছে না। মনসামঙ্গল রচনার ১০ বছর পর আলাউদ্দিন হুসেন শাহের
রাজত্বকাল শুরু হয়। সুকুমার সেনের মতে বিজয়গুপ্তের উল্লেখিত রাজা ছিলেন জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ
জিনি হুসেন শাহ নামেই আধিক পরিচিত ছিলেন। একথাও মনে রাখতে হবে যে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ কিন্তু
গৌড়ের সিংহাসনে বসবার অনেক আগে থেকেই উজীর ইত্যাদির মত উচ্চপদে পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্য তেমন কোনো সময়ে রচিত হয়ে থাকতেও পারে!
হিন্দু ধর্মের ত্রাতা শ্রীচৈতন্য -                                                           পাতার উপরে . . .  
আফগান-তুর্কীদের শাসনে হিন্দুদের তখন করুণ অবস্থা। এর থেকে মুক্তির জন্য শ্রীচৈতন্য, উপায় বার করার
চেষ্টা করছিলেন, মূলতঃ দুটো পর্যায়ে। প্রথমত হিন্দুদের জাত-পাত-ছোঁওয়া-ছুঁই এইসব জঘন্ন কুপ্রথা থেকে
মুক্ত ক’রে, সবাই যাতে একইভাবে ঈশ্বরকে ডাকতে পারেন, সমাজে সেই সাম্যতার প্রবর্তন করা। দ্বিতীয়ত,
হিন্দুদের একত্রিত করে তাঁদের উপর মুসলমান শাসকদের, অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে, হিন্দুধর্মের তুলনায়
অনেক আধুনিক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তকরণের ঢেউ কে প্রশমিত করা।

অনেকেই মনে করেন যে বাংলায় তথা ভারতবর্ষের অন্য প্রান্তে, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের চাপে যে সমাজ ব্যবস্থা
কায়েম করা হয়েছিল, যদি শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব না ঘটতো, তাহলে “হিন্দু বাঙালী” শব্দটি এবং সম্ভবত
"হিন্দু" শব্দটিও আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকতো! এই কথাটি কতটা সত্য তা ইন্দোনেশিয়া ও
মালেশিয়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দুটি দেশেই সনাতন বা হিন্দু ধর্মের প্রভাব পুরোমাত্রায় ছিল, ঠিক
ভারতবর্ষের মতোই। কিন্তু সে দুটি দেশই আজ ঘোষিত ইসলামিক দেশ। অর্থাৎ অন্য ধর্মের অস্তিত্ব প্রায়
নেই। অথচ ভারতবর্ষ তথা বাংলায় এখনও হিন্দু ধর্ম রয়েছে। এর কারণ আমরা মনে করি এই যে
ভারতবর্ষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব হয়েছিল আর ওই দুটি দেশে শ্রীচৈতন্যের মতো কোনো ব্যক্তিত্বের
আবির্ভাব হয় নি! এবং এটা তিনি করতে সমর্থ হয়েছিলেন কোনও অস্ত্র না তুলে, কোনও যুদ্ধ না করেই!

জয়দেব মুখোপাধ্যায় তাঁর “কাঁহা গেলে তোমা পাই” (২০১০) গ্রন্থের ১৩৪-পৃষ্ঠায় খুব সুন্দর করে লিখেছেন . . .
“ঐতিহাসিক মাত্রেই জানেন সামাজিক অবহেলা আর পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এই শ্রেণীর (নিম্নশ্রেণীর) মানুষরা
কিছুটা সাম্যবাদী সদ্যাগত ইসলাম ধর্মের প্রতি যখন আকৃষ্ট হয়ে পড়ছিল ক্রমে ক্রমে, ঠিক সেই সময়ে কৃষ্ণ
নামের জোয়ার বইয়ে অবজ্ঞাত নিষ্পেষিত তথাকথিক এই নীচু শ্রেণীকেই সর্বাগ্রে তাঁর সমদর্শী উদার বক্ষপটে
জড়িয়ে ধরেছিলেন গৌরহরি। অপরিণামদর্শী সমাজনেতাদের সামাজিক শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই
তিনি এমনটি করে সনাতন ধর্মকে নিশ্চিত অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।”

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে, নীলাচলে গোদাবরী নদী তীরে, রায় রামানন্দের সঙ্গে দেখা ও
“সাধ্যসাধন তত্ত্ব” নিয়ে কথোপকথনে আমরা পাচ্ছি যে তিনি নীচু জাতের মানুষকে অক্লেশে
আলিঙ্গন করছেন এবং তা থেকে ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে! . . .

তথাপি পুছিল ‘তুমি রায় রামানন্দ’ ?
তিঁহ কহে ‘সেই মুঞি দাস শূদ্র মন্দ’।
তবে তাঁরে কৈল প্রভু দৃঢ় আলিঙ্গন ;
প্রেমাবেশে প্রভু ভৃত্য দোঁহে অচেতন।
*        *        *        *        *
দেখিয়া ব্রাহ্মণগণের হৈল চমত্কার!
বৈদিক ব্রাহ্মণ সব করেন বিচার :---
এই সন্ন্যাসীর তেজ দেখি ব্রহ্মসম ;
শূদ্রে আলিঙ্গিয়া কেন করেন ক্রন্দন ?
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ৮ম পরিচ্ছেদ॥

এর পরেই রায় রামানন্দের সঙ্গে “কৃষ্ণ ভক্তিতত্ত্ব” নিয়ে কথোপকথনে, শ্রীচৈতন্যকে আমরা বলতে শুনি যে,
তিনি নীচু জাতের রায় রামানন্দকে বলছেন যে, বাসুদেব সার্বভৌম জানিয়েছেন যে তুমি আমাকে কৃষ্ণ
ভক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে বলতে পারবে। রায় রামানন্দ ইতস্তত করতে শ্রীচৈতন্য বলছেন যে শুধু ব্রাহ্মণ বা সন্ন্যাসী
কেন গুরু হবে? যে শূদ্র কৃষ্ণতত্ত্ব জানে সে কেন গুরু হতে পারবে না? অর্থাৎ তুমি নীচু জাতের হয়েও জ্ঞানী,
তাই এখন আমার গুরু হয়ে আমাকে এই জ্ঞান প্রদান কর। ৫০০বছর পূর্বের ভারতে এমন প্রশ্ন যিনি করছেন,
তাঁর সাম্যবাদে বিশ্বাস, আস্থা ও তা জাত-পাতে নিমজ্জ এক কলুষিত সমাজে তা প্রবর্তন করার যে সাহস ও
পরিকল্পনা তা এযুগের সাম্যবাদী বিপ্লবীদের থেকে কোনো অংশে কম ছিল কি?  . . .
প্রভু কহে “মায়াবাদী আমি ত সন্ন্যাসী ;
ভক্তিতত্ত্ব নাহি জানি মায়াবাদে ভাসি।
সার্ব্বভৌম সঙ্গে মোর মন নির্ম্মল হইল ;
‘কৃষ্ণ ভক্তিতত্ত্ব কহ’ তাঁহারে পুছিল।
তিহোঁ কহে ‘আমি নাহি জানি কৃষ্ণ কথা ;
সবে রামানন্দ জানে তিঁহো নাহি এথা’।
তোমার ঠাঁই আইলাম মহিমা শুনিয়া ;
তুমি মোরে স্তুতিকর সন্ন্যাসী জানিয়া।
কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শুদ্র কেনে নয় ;
যেই কৃষ্ণ তত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়।
সন্ন্যাসী বলিয়া মোরে না কর বঞ্চন ;
কৃষ্ণ রাধা তত্ত্ব কহি পূর্ণ কর মন”।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ৮ম পরিচ্ছেদ॥


নিত্যানন্দ দাসের “প্রেম বিলাস”-এর উনবিংশ বিলাসের একটি অংশে, শ্রীচৈতন্যের সাম্যবাদের বাণীকে খুব
সুন্দর করে তুলে ধর হয়েছে। সেখানে একটিই মাপকাঠি দেওয়া হয়েছে---ঈশ্বরে ভক্তি। সেখানে জাতপাতের
কোনো রকমের আভিযাত্যের কোনো স্থান নেই  . . .

বিষ্ণুভক্তিপরায়ণ যেই জন হয়।
তাহার অন্তরে পৈতা জানিহ নিশ্চয়॥
কৃষ্ণভক্ত হয় সেই ব্রাহ্মণের বড়।
কৃষ্ণভক্তি-হীন বিপ্র শূদ্রাধম দৃঢ়॥
তথাহি।
চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠো বিষ্ণুভক্তি পরায়ণঃ।
বিষ্ণুভক্তি বিহীনশ্চ দ্হিদোপহি শ্বপচাধমঃ
॥ নিত্যানন্দ দাস, প্রেম বিলাস, ১৯শ বিলাস, ১৮৭-পৃষ্ঠা॥

মালীবুড়োর শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য গ্রন্থে এরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় . . .
“এ কেমন সন্ন্যাসী, যাঁর কাছে স্পৃশ্য বা অস্পৃশ্য বলে কোন জাত নেই। সে যুগের সমাজ ব্যবস্থার উপরে
দাঁড়িয়ে এত বড় কথা বলা কিছুতেই সহ্য করতে পারলেন না বর্ণহিন্দুরা। তাঁরা দেখলেন --- যাদের তাঁরা
সমাজে নিপীড়ন এ নিষ্পেষণ করে নিজেদের উচ্চ-বর্ণত্ব জাহির করতেন, শ্রীচৈতন্য তাদেরই টেনে নিচ্ছেন
আপন কোলে পরম করুণাভরে। শুচি-অশুচির বালাই নেই। তিনি যেন বর্ণ হিন্দুদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে
বলছেন :
মুচি হয়ে শুচী হয় যদি কৃষ্ণ ভজে।
শুচী হয়ে মুচি হয় যদি কৃষ্ণ ত্যজে॥
এত বড় গা-জ্বালা-কথা শুনে বর্ণ হিন্দুরা ক্ষোভে, রাগে যেন ফেটে পড়লেন। এই বিশ্বজনীন উদার ধর্মমতের
অভ্যুদয়, সংস্কারান্ধ, স্বার্থসন্ধ ধর্মধ্বজীরা পারলো না কিছুতেই সহ্য করতে। তারাও অন্তরে অন্তরে
ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে লাগলো।” ---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য, পৃষ্ঠা-৮১-৮২॥

শ্রীচৈতন্য যখন বৃন্দাবন যাত্রা করেন তখন বৃন্দাবনের ভগ্ন দশা। প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানগুলি ধ্বংসাবশেষে
পরিণত হয়েছে। পরে তাঁর সেনাপতিদ্বয়
রূপ গোস্বামী ও সনাতন ঐতিহ্যমণ্ডিত রাধাকুণ্ড ইত্যাদির সংস্কার
করেন। শ্রীচৈতন্যের বৃন্দাবন দর্শনের সময়ে তাঁকে একজন “কৃষ্ণের অবতার” বলে সম্বোধন করলে
তিনি তাকে সে রকম কথা বলতে বারণ করেছেন। লোকে তাঁকে বলেছেন যে তাঁকে দেখলেই স্ত্রী, বাল, বৃদ্ধ,
চণ্ডাল, যবন সব কৃষ্ণ নাম নিয়ে বিভোর হয়, অর্থাৎ তাঁর প্রভাব সকলের উপরেই প্রগাঢ় ছিল। . . .  
বৃন্দাবনে হৈলে তুমি কৃষ্ণ অবতার ;
তোমা দেখি সর্ব্বলোক হইল নিস্তার।
প্রভু কহ বিষ্ণু! বিষ্ণু! ইহা না কহিও ;
জীবাধমে কৃষ্ণ জ্ঞান কভু না করিও।
*        *        *        *        *
স্ত্রী বাল বৃদ্ধ কিবা চণ্ডাল যবন ;
যেই তোমার একবার পায় দরশন ;
কৃষ্ণ নাম লয়ে নাচে হইয়ে উন্মত্ত ;
আচার্য্য হইল সেই তারিল জগত।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১৮শ পরিচ্ছেদ॥

তাঁর শিষ্যদের কেমন হওয়া উচিত তাঁর একটি বর্ণনা আমরা পাই এভাবে। কৃষ্ণদাস কবিরাজের
চৈতন্যচরিতামৃতে, সনাতন গোস্বামীকে উপদেশ দেবার সময়ে বৈষ্ণবের লক্ষণ এভাবে বর্ণনা করা রয়েছে . . .
সর্ব্ব মহাগুণগণ বৈষ্ণব শরীরে ;
কৃষ্ণভক্তে কৃষ্ণের গুণ সকল সঞ্চারে।
এই সব গুণ হয় বৈষ্ণব লক্ষণ ;
সব কহা না যায় করি দিগ দরশন।
কৃপালু, অকৃত দ্রোহ, সত্য সার, সম ;
নির্দ্দোষ, বদান্য, মৃদু, শুচি, অকিঞ্চন।
সর্ব্বোপকারক, শান্ত, কৃষ্ণৈক শরণ ;
অকাম, নিরীহ, স্থির, বিজিত ষড়্গুণ।
মিতভুক, অপ্রমত্ত, মানদ, অমানী ;
গম্ভীর, করুণ, মৈত্র, কবি, দক্ষ, মৌনী।
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ২২শ পরিচ্ছেদ॥
শ্রীচৈতন্য ও রুপ-সনাতন -                                                              পাতার উপরে . . .  
হুসেন শাহের মন্ত্রী ও পারিষদগণের মধ্যে অনেক উচ্চশিক্ষিত হিন্দুও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সনাতন
গোস্বামী ও তাঁর ভাই
রূপ গোস্বামী (তাঁদের এই নাম শ্রীচৈতন্যের দেওয়া)। তাঁদের বিচার বুদ্ধি ও বৈষয়িক
কাজে-কর্মে পারদর্শিতার পরিচয় পেয়ে হোসেন শাহ,
রুপ গোস্বামীকে তাঁর একান্ত বা আপ্ত বা খাস্ সহায়ক
বা “দবীর-ই-খাস” পদে এবং তাঁর দাদা সনাতন গোস্বামীকে অন্তরঙ্গ বা কাছের মন্ত্রী বা “সঘীর মালিক” বা
“সাকর মল্লিক” পদে নিযুক্ত করেন। হুসেন শাহের বিভিন্ন অভিযানে, এমন কি উড়িষ্যা অভিযানেও, তাঁরা
হুসেন শাহের মুখ্য মন্ত্রণাদাতা হিসেবে ভুমিকা পালন করেন। কিন্তু প্রতি জয়ের পরে তাঁদের সৈন্যদলের করা
অত্যাচার ও মন্দির ভাঙা বা অপবিত্র বা নাপাক্ করা দেখে, তাঁদের অনুশোচনা হয় এবং তাঁরা
শ্রীচৈতন্যদেবের আশ্রয় অবলম্বন করে থাকার ইচ্ছা শ্রীচৈতন্যকে জানান।

রুপ ও সনাতনকে, হুসেন শাহের দরবার থেকে বার করে আনলে হুসেন শাহ যে বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে
পড়বেন, সেই কথা মাথায় রেখে শ্রীচৈতন্য এগোলেন! ১৫১৩ খৃষ্টাব্দে, বিশাল ভক্তের দল নিয়ে, নীলাচল থেকে
বৃন্দাবন যাবার পথে গৌড়ের কাছেই রামকেলি গ্রামে তিনি রূপ ও সনাতনের সঙ্গে দেখা করলেন, অতি
গোপনে। তাঁদের তিনি বৃন্দাবনে গিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠার ও প্রচারে কাজে আত্মনিয়োগ করতে বলে তাঁদের নতুন
নামকরণ করলেন সনাতন ও রূপ। তাঁদের পূর্বাশ্রমের নাম জানা নেই। সনাতনের নাম সম্ভবত অমর ছিল।
শুনি মহাপ্রভু কহে ‘শুন দবীর খাস!
তুমি দুই ভাই মোর পুরাতন দাস।
আজি হৈতে দোঁহার নাম রূপ-সনাতন ;
দৈন্য ছাড় তোমার দৈন্যে ফাটে মোর মন।
*         *        *        *        *        *
গৌড় নিকটে আসিতে নাহি প্রয়োজন ;
তোমা দোঁহা দেখিতে মোর ইঁহা আগমন।
এই মোর মনের কথা কেহ নাহি জানে ;
সবে বলে ‘কেনে আইলা রামকেলি গ্রামে’ ?
---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১ম পরিচ্ছেদ॥

রূপ-সনাতন দুই ভাই আলাদা আলাদা ভাবে, তাঁদের মনিব হুসেন শাহের চোখে ধুলো দিয়ে, শেষ পর্যন্ত
বৃন্দাবনে গিয়ে হাজির হন এবং এঁরা দুইজন, তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট এবং
রঘুনাথ দাস প্রমুখদের সঙ্গে মিলে এই ছয়জন গোস্বামীই ষট্-গোস্বামী নামে পরিচিতি লাভ করেন।
বৃন্দাবনের ষট্ গোস্বামী -                                                               পাতার উপরে . . .  
রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী, তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট  এবং রঘুনাথ
দাস  বৃন্দাবনের  এই ছয়জন গোস্বামীই, ষট্-গোস্বামী নামে পরিচিত। এঁরাই গৌড়ীয় বৈষ্ণবরসতত্ত্ব ও মঞ্জরী-
ভাবের উপাসনা-রীতির প্রবর্তক।
শ্রীচৈতন্য ও ছোট হরিদাস -                                                            পাতার উপরে . . .  
কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত “চৈতন্যচরিতামৃতের” অন্ত্যলীলার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ - “ছোট হরিদাস দণ্ডরূপ শিক্ষা”
বৃত্তান্তে রয়েছে যে, নীলাচলে একদিন ভগবানাচার্য্য, প্রভুকে ( শ্রীচৈতন্যদেবকে ) ঘরে ভাত খাওয়ানোর জন্য
ছোট হরিদাস নামের কীর্তনিয়াকে সুগন্ধী চাল আনার জন্য শিখী মাহিতীর ভগ্নী মাধবী দেবীর কাছে পাঠান।
মাধবী দেবী ছিলেন, নীলাচল বা পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের হিসাব-রক্ষক অথবা লিপিকর  শিখী  
মাহিতীর ভগিনী। তাঁর রচিত ৯টি, মাধবী ও মাধবী দাস ভণিতাযুক্ত পদ রয়েছে। খেতে বসে,  চৈতন্যদেব
এই চাল সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে হরিদাস একজন মহিলার কাছ থেকে চাল চেয়ে এনেছেন।
এই কারণে চৈতন্যদেব তিনি ছোট হরিদাসকে বর্জন করেন। অনেক অনুরোধ উপরোধেও যখন তিনি
হরিদাসকে ক্ষমা করলেন না, তখন আর থাকতে না পেরে ছোট হরিদাস ত্রিবেণীতে গিয়ে জলে ডুবে  
আত্মহত্যা করেন।

এই ঘটনাটি খুবই আশ্চর্যজনক এই জন্য যে, যে শ্রীচৈতন্যদেব প্রেম-ভক্তি আন্দোলনের পুরোধা হয়ে ক্ষমা-
সুন্দর এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যে শ্রীচৈতন্যদেব কীর্তনের রসে দিবারাত্রি আকণ্ঠ ডুবে  
থাকতেন, তিনিই এক বৈষ্ণব কীর্ত্তনিয়াকে এক মহিলার সঙ্গে কথা বলার লঘু অপরাধে এত গুরু দণ্ডে দণ্ডিত
করলেন যে সেই হতভাগ্যকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হলো! এটা সাধারণ বুদ্ধিতে অনুধাবন করা শক্ত।
শ্রীচৈতন্য, নারায়ণী ও বৃন্দাবন দাস -                                                  পাতার উপরে . . .  
চৈতন্যদেবের অপ্রকট হবার কিছুকাল পরে প্রভু নিত্যানন্দের আদেশে
বৃন্দাবন দাস, শ্রীচৈতন্যের জীবনী লেখা
শুরু করেন যা প্রথমে চৈতন্যমঙ্গল ও পরে চৈতন্যভাগবত নামে খ্যাতি লাভ করে। এই কবি-পদকর্তাকে
মহাভারতের রচয়িতা ব্যাসদেবের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সে কি কেবল তাঁর জ্ঞান ও মেধার জন্যই, নাকি
তাঁর জন্মের-ইতিহাসেও সমতা রয়েছে?
বৃন্দাবন দাসের নিজের লেখা চৈতন্যভাগবতে, নিজের পরিচয়ে
কেবল তাঁর মাতা নারায়ণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। পিতার কোনো উল্লেখ তিনি নিজে করে যান নি। . . .
শ্রীচৈতন্যরসে সভে পরম উদ্দাম।
সভার চৈতন্য নিত্যানন্দ---ধনপ্রাণ॥
কিছুমাত্র আমি লিখিলাঙ জানি যাঁরে।
সকল বিদিত হৈব বেদব্যাস-দ্বারে॥
সর্বশেষ ভৃত্য তান---বৃন্দাবন দাস।
অবশেষ পাত্র-নারায়ণী-গর্ব্ভজাত॥ (অবশেষ নারায়ণী গর্ভে পরকাশ॥ ---টীকায় দেওয়া ভিন্ন রূপ। )
অদ্যাপিহ বৈষ্ণবমণ্ডলে যাঁর ধ্বনি।
চৈতন্যের অবশেষপাত্র নারায়ণী॥
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নিত্যানন্দচান্দ জান।
বৃন্দাবনদাস তছু পদযুগে গান॥
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, অন্ত্যখণ্ড, ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৪৭৫।

বিশ্বম্ভরের প্রথমা স্ত্রী লক্ষ্মীদেবী মারা যাবার পর ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। নিমাইয়ের
তখনও দ্বিতীয় বিবাহ হয়নি এবং তখনও তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন নি। নারায়ণী, বিধবা অবস্থায় সন্তান
বৃন্দাবন দাসের জন্ম দেন।

জগবন্ধু ভদ্র তাঁর গৌরপদ-তরঙ্গিণী গ্রন্থে অসমর্থিত সূত্র থেকে লিখেছেন যে প্রভু নিত্যানন্দ নাকি নারায়ণীর
বিধবা অবস্থাতেই তাঁকে পুত্রবতী হবার আশীর্বাদ করেন। সেটা কি ভাবে সম্ভব হবে এই প্রশ্নের  উত্তরে
তিনি বলেন যে শ্রীচৈতন্যের প্রসাদে সে সম্ভব হবে এবং তিনি পুণ্যবতীই থাকবেন। এই নিয়ে সেকাল থেকেই
একটি বিতর্কের সূত্রপাত হয় যা আজও চলে আসছে। (
জগবন্ধু ভদ্র, গৌরপদ-তরঙ্গিণী, ১৩৪১বঙ্গাব্দের  
সংস্করণ (১৯৩৪), পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়,
বৃন্দাবনদাস, পৃষ্টা-২১৪)।

এই নারায়ণী ছিলেন শ্রীবাসের ভ্রাতুষ্পুত্রী। তাঁকে নিয়ে একটি গল্প রয়েছে। সে সময় সুলতানের চর  
বৈষ্ণবদের ধরতে আসার খবর হয়েছিল। সেই ভয়ে সবাই টথস্থ ছিলেন। শ্রীবাসের গৃহে, বিশ্বম্ভর তাঁর নিজ
মহিমা ও বিভূতি প্রকাশ করে উড়িয়ে দিলেন রাজভীতি। বললেন “মোর শক্তি দেখ্ এবে নয়ন ভরিয়া”।
বললেন আমি রাজার সমক্ষে হাতী ঘোড়া মৃগ পাখী প্রভৃতি প্রাণীদে এবং রাজার সঙ্গে যত পরিষদ, তাঁদের
‘শ্রীকৃষ্ণ’ ব’লে কাঁদিয়ে ছাড়বো। যদি বিশ্বাস না হয় তবে এই দেখ ব’লে তিনি মাত্র চার বছর  বয়সের
নারায়ণী কে সামনে দেখতে পেয়ে, তাঁকে তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রভাবে, কৃষ্ণ কৃষ্ণ ব’লে কাঁদিয়ে দিলেন।...

মোর শক্তি দেখ্ এবে নয়ন ভরিয়া।
এত বলি মত্ত-হস্তী আনিব ধরিয়া॥
হস্তী, ঘোড়া, মৃগ, পাখী একত্র করিয়া।
সেইখানে কান্দাইমু ‘শ্রীকৃষ্ণ’ বলিয়া॥
রাজার যতেক গণ --- রাজার সহিতে।
সভা’ কান্দাইমু ‘কৃষ্ণ’ বলি ভাল-মতে॥
ইহাতে বা অপ্রত্যয় তুমি বাস’ মনে।
সাক্ষাতেই করোঁ দেখ আপন-নয়নে॥
সম্মুখে দেখয়ে এক বালিকা আপনি।
শ্রীবাসের ভাতৃসুতা---নাম ‘নারায়ণী’॥
অদ্যপিহ বৈষ্ণব-মণ্ডলে যাঁর ধ্বনি।
‘চৈতন্যের অবশেষ-পাত্র নারায়ণী’॥
সর্ব্ব-ভূত-অন্তর্যামী---প্রভু গৌরচান্দ।
আজ্ঞা কৈলা “নারায়ণি! কৃষ্ণ বলি কান্দ॥”
চারি-বত্সরের সেই উন্মত্ত-চরিত।
‘হা কৃষ্ণ!’ বলিয়া কান্দে, নাহিক সম্বিত॥
অঙ্গ বাহি পড়ে ধারা পৃথিবীর তলে।
পরিপূর্ণ হৈল স্থল নয়নের জলে॥
হাসিয়াহাসিয়া বোলে প্রভু বিশ্বম্ভর।
“এখন তোমার সব ঘুচিল কি ডর?”
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্যখণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃষ্ঠা-১৭০।

এই ঘটনার বিবরণ চৈতন্যভাগবতের আরেক যায়গায় এভাবে দেওয়া রয়েছে। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে
বিশ্বম্ভরের চর্বিত তাম্বুল অর্থাৎ পান, সব ভক্তের মধ্যেই বন্টন করা হয়েছিল। শেষ টুকু বালিকা নারায়ণীর
ভাগে পড়ে। সে তা খেয়ে ধন্য হয় এবং তারপরে বিশ্বম্ভরের আদেশে কৃষ্ণ নাম বলে কাঁদতে শুরু করে।
এখানে কোথাও বলা নেই যে এই বালিকা তখন বিধবা ছিল কি না!

দেখায় আপনে শিখায় সভাকারে।
“এ সকল কথা ভাই! শুনে পাছে আরে॥
জন্ম জন্ম তোমরা পাইবে মোর সঙ্গ।
তোমা’ সভার ভৃত্যেও দেখিব মোর রঙ্গ॥”
আপন গলার মালা দিলা সভাকারে।
চর্ব্বিত-তাম্বুল আজ্ঞা হইল সভারে॥
মহানন্দে খায় সভে হরষিত হৈয়া।
কোটি-চান্দ-শারদ-মুখের দ্রব্য পায়্যা॥
ভোজনের অবশেষে যতেক আছিল।
নারায়ণী পুণ্যবতী তাহা সে পাইল॥
শ্রীবাসের ভাতৃসুতা---বালিকা অজ্ঞান।
তাহারে ভোজনশেষ প্রভু করে দান॥
পরম আনন্দে খায় প্রভুর প্রসাদ।
সকল বৈষ্ণব তাঁরে করে আশীর্ব্বদ॥
“ধন্যধন্য এই সে সেবিলা নারায়ণ।
বালিকাস্বভাবে ধন্য ইহার জীবন॥”
খাইলে প্রভুর আজ্ঞা হয়ে “নারায়ণি!
কৃষ্ণের পরমানন্দে কান্দ দেখি শুনি॥”
হেন প্রভু চৈতন্যের আজ্ঞার প্রভাব।
‘কৃষ্ণ’ বলি কান্দে অতি বালিকাস্বভাব॥
অদ্যপিহ বৈষ্ণব মণ্ডলে যার ধ্বনি।
‘গৌরাঙ্গের অবশেষপাত্র নারায়ণী’॥
যারে যেন আজ্ঞা করে ঠাকুর চৈতন্য।
সে আসিয়া অবিলম্বে হয় উপসন্ন॥
এ সব বচনে যার নাহিক প্রতীত।
সত্য অধঃপাত তার জানিহ নিশ্চিত॥
---বৃন্দাবন দাস, চৈতন্যভাগবত, মধ্যখণ্ড, ১০ম অধ্যায়, পৃষ্ঠা-২৩৯।

উপরোক্ত পদের শেষ দুটি পংক্তি সম্বন্ধে অনেকেই বিরূপ মত পোষণ করেন।
নিজে কবি বৃন্দাবন দাস তাঁর নিজের জন্ম বিবরণ বর্ণনা করে ধৈর্য হারিয়ে এর পরেই অবিশ্বাসীদের গালি
দিয়েছেন --- যা বৈষ্ণব-বিনয় ও  নমনীয়তার  ঘোর বিরোধী
”। ---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য,
পৃষ্ঠা-২০১। এতে আরও মনে হতে শুরু করে যে তাঁর জন্ম রহস্যাবৃত!

১৫২২ শকাব্দ অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, নিত্যানন্দ দাস রচিত শ্রীপ্রেমবিলাস গ্রন্থে বৃন্দাবন দাসের জন্মবৃত্তান্ত
এভাবে দেওয়া রয়েছে, যেখানে স্পষ্ট করে বৃন্দাবনদাসের পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ---

শ্রীবাসের জ্যেষ্ঠ ভাই ছিল নলিন পণ্ডিত।
নারায়ণী তাঁর কন্যা জগতে বিদিত॥
নারায়ণী যবে এক বত্সরের হৈল।
মাতা পিতা তাঁর পরলোকে চলি গেল॥
শ্রীবাসের পত্নী তারে করয়ে পালন।
নারায়ণী হৈল প্রভুর উচ্ছিষ্ট-ভাজন॥
শ্রীগৌরাঙ্গে আজ্ঞা-কৃপায় নারায়ণী।
হা কৃষ্ণ বলিয়া কান্দে পড়য়ে ধরণী॥
চারি বত্সরের শিশু বালিকা অজ্ঞান।
প্রভু তাঁরে ভুক্ত শেষ করিলেন দান॥
বৃন্দাবনে কৃষ্ণোচ্ছিষ্ট যে কৈলা ভোজন।
সেই কিলিম্বিকা এবে নারায়ণী হন॥
সন্ন্যাস করি মহাপ্রভু নীলাচলে রৈল।
শ্রীবাস শ্রীরাম কুমারহট্টে চলি গেল॥
কুমারহট্টবাসী বিপ্র বৈকুণ্ঠদাস যেঁহো।
তাঁর সহিত নারায়ণীর হইল বিবাহ॥
তাঁর গর্ব্ভে জন্মিলা বৃন্দাবন দাস।
তিঁহো হন শ্রীল বেদব্যাসের প্রকাশ॥
বৃন্দাবন দাস যবে আছিলেন গর্ব্ভে।
তাঁর পিতা বৈকুণ্ঠদাস চলি গেল স্বর্গে॥
ভ্রাতৃ-কন্যা গর্ব্ভবতী পতিহীনা দেখি।
আনিয়া শ্রীবাস নিজ গৃহে দিল রাখি॥
পঞ্চবত্সরের শিশু বৃন্দাবন দাস।
মাতামহ মামগাছি করিলা নিবাস॥
বাসুদেব দত্ত প্রভুর কৃপার ভাজন।
মাতাসহ বৃন্দাবনের করে ভরণ পোষণ॥
বাসুদেব দত্তের ঠাকুর বাড়ীতে বাস কৈল।
নানাশাস্ত্র বৃন্দাবন পড়িতে লাগিল॥
নানাশাস্ত্র পড়ি হৈল পরম পণ্ডিত।
চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ যাহার রচিত॥
ভাগবতের অনুরূপ চৈতন্য মঙ্গল।
দেখিয়া বৃন্দাবনবাসী ভকত সকল॥
চৈতন্য ভাগবত নাম দিল তাঁর।
যাহা পাঠ করি ভক্তের আনন্দ অপার॥
---নিত্যানন্দ দাস, প্রেমবিলাস, ত্রয়োবিংশ বিলাস, পৃ-২২২॥

এখানে আমরা
বৃন্দাবন দাসের পিতার নাম পাচ্ছি। জানা যাচ্ছে যে, নারায়ণী, মাত্র চার বছর বয়সে, কাকা
শ্রীবাসের গৃহে, শ্রীগৌরাঙ্গের উচ্ছিষ্ট ভাজন হয়ে, কৃষ্ণ নাম নিয়ে কেঁদেছিলেন। এই ঘটনাটিপ্রায় সব গ্রন্থেই
রয়েছে। এও জানা যাচ্ছে যে গর্ভবতী অবস্থাতেই নারায়ণীর স্বামী অর্থাৎ বৃন্দাবন দাসের  পিতা,  
বৈকুণ্ঠদাসের মৃত্যু হয়। এই বর্ণনায় আরও মনে হচ্ছে যে নারায়ণীর বিয়ে হয়েছিল, উচ্ছিষ্ট-ভাজন  হবার
পরে এবং বিশ্বম্ভরের নীলাচলে যাবার পরে। নারায়ণীর প্রতি কবি নিত্যানন্দ আরও বলেছেন যে শ্রীকৃষ্ণের
ব্রজলীলায় যিনি কৃষ্ণোচ্ছিষ্টভোজী কিলিম্বা নাম্নী অম্বিকাভগ্নী ছিলেন, তিনিই শ্রীগৌরাঙ্গের নবদ্বীপলীলায়  
নারায়ণী। শ্রীচৈতন্যের “উচ্ছিষ্টের” প্রভাব ধরলে তো নারায়ণীর মাত্র পাঁচ-ছ বছরে মা হবার কথা। তা  
নিশ্চয়ই অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য। সুদূর বেথলেহেমে, ভগবান-পুত্র যীশুকেও প্রাপ্ত (শিশুর জন্ম দিতে সমর্থ)
বয়স্কা মাতা মেরীর গর্ভে জন্ম নিতে হয়েছিল!

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মহলে শ্রীচৈতন্য ও নারায়ণীকে নিয়ে যে একটি রহস্যময় গল্পের বীজ বপন  হয়েছিল,
আমি (মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর) তো তার কোনো প্রমাণ বা সামান্য ইঙ্গিতও দেখতে পাচ্ছি না। তবে
কোনো কোনো গ্রন্থে রয়েছে যে নারায়নীর অষ্টাদশ মাসের গর্ভ হয়েছিল (
জগবন্ধু ভদ্র, গৌরপদ-তরঙ্গিণী,
১৩৪১বঙ্গাব্দের (১৯৩৪) সংস্করণ, পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়,
বৃন্দাবনদাস, পৃষ্ঠা-২১৪)। প্রথমত তা  অস্মভব,
তবুও ভক্তদের খাতিরে তা যদি হয়েও থাকে, তবুও শ্রীচৈতন্য কে এর মধ্যে জড়ানোর অবকাশ  আমি
দেখতে পাচ্ছি না।
বৃন্দাবন দাস যে এ নিয়ে তাঁর জীবনে অনেক গঞ্জনা সহ্য করেছেন তা তাঁর  
চৈতন্যভাগবতের, মধ্যখণ্ডের ১০ম অধ্যায়ের, ২৩৯-পৃষ্ঠাতে, তাঁর উপরোক্ত, ধৈর্য্য হারিয়ে  অবিশ্বাসীদের
প্রতি লেখা “
এ সব বচনে যার নাহিক প্রতীত। সত্য অধঃপাত তার জানিহ নিশ্চিত॥” দুটি কলিতে ফুটে ওঠা
আক্রোষ থেকেই বোঝা যায়।

এমন কি হতে পারে যে, এই অসহনীয় অবস্থা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে, বৃন্দাবনদাস চেষ্টা করেছিলেন তাঁর
সাথে শ্রীচৈতন্যের নাম জড়িয়ে নেবার, আসল পিতার নামের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকে? আশ্চর্যজনকভাবে,
তাঁর নিজের লেখা চৈতন্যভাগবতের কোত্থাও তিনি তাঁর নিজের পিতার নাম উল্লেখ করেননি। অথচ  
নিত্যানন্দ দাসের রচিত “প্রেমবিলাস” গ্রন্থে তিনি পরিষ্কারভাবে বৃন্দাবনদাসের পিতার নাম উল্লেখ করেছেন।
এমন কথা কি
বৃন্দাবন দাসের মনে কাজ করেছিল যে তাঁর অজ্ঞাত পিতার আসল পুত্রের চেয়ে ভগবান
পিতার মানস পুত্রের পরিচয় অনেক ভাল! যেসব গ্রন্থ আমরা যোগাড় করতে পেরেছি, তার মধ্য  থেকে
তেমন সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যাচ্ছে না যার সঙ্গে শ্রীচৈতন্যের নাম জড়ানো যায়।

মনে হয় শ্রীচৈতন্যকে ভগবান বা অবতার বানানোর চেষ্টায় তাঁর জীবনীকারগণ তাঁর অলৌকিক  শক্তি
দেখাতে গিয়ে, বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন যা থেকে চৈতন্যভাগবতও বাদ যায় না। কিন্তু তা বুমেরাং হয়ে
চৈতন্যের চরিত্রকেই সন্দেহের কুহেলীবেষ্টিত করতে সাহায্য করেছে। শ্রীচৈতন্যের মত মানুষের প্রতি এটা
করে আর যাই হোক ন্যায় করা হয়নি।    

অষ্টাদশ শতকের কবি উদ্ধব দাসের একটি পদেও বৃন্দাবন দাসের জন্ম নিয়ে বর্ণনা রয়েছে। যা প্রমাণ করে
যে বৃন্দাবনদাসের শ্রীচৈতন্যের মানসপুত্র হয়ে জন্মাবার রহস্যাবৃত গল্পটি প্রায় দুশো বছর পরেও বৈষ্ণব
সমাজে প্রচলিত ছিল।
প্রভুর চর্ব্বিত পাণ                স্নেহবশে কৈলা দান
.                নারায়ণী ঠাকুরাণী হাতে।
শৈশব-বিধবা ধনী                সাধ্বী সতী-শিরোমণি
.                সেবন করিল সে চর্ব্বিতে॥
প্রভু শক্তি সঞ্চারিলা              বালিকা গর্ভিণী হৈলা
.                লোক মাঝে কলঙ্ক নহিল।
দশমাস পূর্ণ যবে                  মাতৃগর্ভ হৈতে তবে
.                সুন্দর তনয় এক হৈল॥
সেই বৃন্দাবনদাস                   ত্রিভুবনে সুপ্রকাশ
.                চৈতন্যলীলায় ব্যাস যেই।
উদ্ধবদাসেরে দয়া                 করি দিবে পদছায়া
.                প্রভুর মানস পুত্র সেই॥
শ্রীচৈতন্যের জগন্নাথে বিলীন না অন্তরধান না গুমখুন করে হত্যা? -             পাতার উপরে . . .  
শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুও প্রচণ্ড রহস্যজনক ভাবে হয়েছে বলে মনে করা হয়। এ বিষয়ে প্রায় সারা জীবন ধরে
অনুসন্ধান ও গবেষণা করে, যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালীবুড়ো, তাঁর গ্রন্থ “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য”-এ যা
লিখেছেন তা থেকে অংশবিশেষ এখানে তুলে দিচ্ছি . . .
চৈতন্যদেবের অন্তর্ধান সম্পর্কে আমি যে সব কাহিনী প্রাচীন বাংলা ও ওড়িয়া পুঁথি থেকে সংগ্রহ করেছি তা
এক রকম নয়। মোটামুটি তার মধ্যে ৯টি ঘটনা প্রধান। সংক্ষেপে ঘটনাগুলি হলো :
    ১। লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ --- জগন্নাথের দারুময় দেহে লীন। স্থান - জগন্নাথ মন্দির।
    ২। কবিরাজ কৃষ্ণদাসের ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র সূত্র থেকে অনেকে অনুমান করেন - ভাবোন্মাদ অবস্থায়
    সমুদ্রে পতনের ফলে মৃত্যু।
    ৩। জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ - রথযাত্রায় নৃত্যের সময় পায়ে ইটালের আঘাত লাগে।  ষষ্ঠীর  দিনে  
    বেদনা হয়। মৃত্যু তোটা গোপীনাথের মন্দিরে।
    ৪। শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারীর আবিষ্কৃত বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবতে’র পরিশিষ্টাংশে - জগন্নাথ মন্দির থেকে
    ন্যাসীর বেশে মদনগোপাল মন্দিরের দিকে চলে গিয়েছিলেন। আর ফিরেন নাই।
    ৫। ওড়িয়া কবি অচ্যুতানন্দ ও দিবাকর দাসের মতে - জগন্নাথে লীন। স্থান - জগন্নাথ মন্দিরেই।
    ৬। বৈষ্ণব দাসের (ওড়িয়া কবি) ‘শ্রীচৈতন্য গৌরাঙ্গ চকড়া’র মতে - হরিনাম সহকারে সমাধি দেওয়া
    হয়েছিল। মৃতদেহ পড়েছিল গরুড়স্তম্ভের পিছনে। সেখান থেকে আনা হয়েছিল তোটাগোপীনাথের মন্দিরে।
    ৭। ঈশ্বর দাস তাঁর ‘চৈতন্য ভাগবতে’ লিখেছেন - চৈতন্য জগন্নাথ দেহে চন্দন লেপন করতে করতে ৩রা
    বৈশাখ জগন্নাথ দেহে লীন হন। পরে জগন্নাথের নির্দেশে শব শূন্যে বহন করে ভাসিয়ে দেওয়া হয় পুরী
    থেকে ৪০ মাইল দূরে প্রাচী নদীতে।
    ৮। গোবিন্দদাস বাবাজীর শ্রীচৈন্য চকড়ার, বর্ণনানুযায়ী - গুণ্ডিচা বাটীতে আষাঢ় মাসে সপ্তমী তিথিতে
    সন্ধ্যারতি দর্শনের সময় সহসা গরুড় স্তম্ভের পিছন থেকে তীব্র জ্যোতি বিকীর্ণ হয়ে লীন হন জগন্নাথ
    আর তাঁকে পাওয়া যায় নি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বহির্বাস ও মালা পাওয়া গেল। সেই
    বস্তুগুলিকেই তোটা গোপীনাথ মন্দিরের চত্তরে সমাধি দেওয়া হয়
    ৯। মহামুনি ভাগুরি কথিত প্রভাস খণ্ডে - নিত্যানন্দের কোলে নিমবৃক্ষ তলে তিনি দেহত্যাগ করেন। পরে
    নিত্যানন্দই তাঁকে দাহ করেন।
এই ৯টি কাহিনী থেকে এই কথা বলা যায় শ্রীচৈতন্যদেবের দেবদেহ সত্যসত্যই কোন দারুময় বিগ্রহে
লীন হয়ে যায়নি। হয়ত তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। কোন দুর্ঘটনায়ও হতে পারে। তা সে হত্যাই
হোক (বা গুমখুন) বা ইটালের আঘাতেই হোক।

জয়ানন্দ (৩) আর গোবিন্দ দাস বাবাজীর (৮) কাহিনী দুটিকে এক করলে একটা বিশ্বাসযোগ্য সমাধান করা
যায়। প্রভুর পায়ে ইটাল বেজেছিল, তার ফলে ভীষণ ব্যাথা হয়েছিল, সে কথা তিনি কাউকে বলেন নি। ষষ্ঠী
বা সপ্তমীর দিন সন্ধ্যার সময় আরতি দর্শন করতে গিয়ে উদ্দণ্ড কীর্তনে যখন মত্ত তখন সেই বেদনা সহ্য
করতে না পেরে গোবিন্দ ও স্বরূপকে ধরে বসে পড়েন পাদুকা কুণ্ডের কাছে। তারপর তাঁকে আনা হয় তাঁর
প্রিয় পার্ষদ গদাধরের কাছে। তখন তিনি অচৈতন্য। সম্ভবত সেই রবিবার দিনেই তিনি দেহত্যাগ করেন।
এবং তোটা গোপীনাথ মন্দিরের চত্তরেই তাঁর মরদেহকে সমাধিস্থ করা হয়। যে ছোট্ট সমাধি মন্দিরটি আছে
সেইটাই মহাপ্রভুর সমাধি। এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়ার একমাত্র উপায় সমাধি উত্খনন। কিন্তু কোন দিন তা
হবে না। ভক্তবৃন্দদের থেকে প্রচণ্ড আপত্তি আসবে।
” ---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য, পৃষ্ঠা-২৯৫-
২৯৬॥

“. . .
ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায় যদি বিচার করতেই হয়, তাহলে বলতে হয় যেভাবে নীলাচলের রাজা
প্রতাপরুদ্রদেবের পুত্র কালুআদেবকে গোবিন্দ বিদ্যাধর সুকৌশলে ও সুগোপনে হত্যা করেছিল, সেভাবেই
শ্রীচৈতন্যদেবকে হত্যা করা হয়েছিল। এবং মৃতদেহ তোটা গোপীনাথেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য, পৃষ্ঠা-২৯৮॥ (এই গোবিন্দ বিদ্যাধর ছিলেন উত্কলের রাজা
প্রতাপরুদ্রের  উচ্চাকাখাঙ্খী সেনাপতি, মতান্তরে মন্ত্রী এবং শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হওয়ার পরে
রাজা প্রতাপরুদ্র নীলাচল ত্যাগ করলে তিনি কয়েক বছরের ব্যবধানে একে একে প্রতাপরুদ্রের দুই পুত্রকে
হত্যা করান এবং ১৫৪২ খৃষ্টাব্দে  নিজে  উত্কল  সিংহাসনে  আরোহন  করে “ভোই” অর্থাৎ “লেখক
কুলসম্ভুত” রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।)

“. . .
এতদিন পাণ্ডাদের মধ্যে যে গুজব চলে আসছে, তারাই নাকি চৈতন্যকে গুমখুন করেছিলেন। কিন্তু আজ
পর্যন্ত তার লিখিত কোন প্রমাণ মিলছে না। কিন্তু এই গুজবের মধ্যে সত্য নিহিত আছে ইতিহাস পর্যালোচনা
করলে তা সত্য বলে মনে হয়। এ বিষয়ে প্রভুজী (গ্রন্থের ১৭৮ পৃষ্ঠা, “প্রভুজীর সন্ধানে” অধ্যায়ে উল্লেখিত
নীলাচলের এক জ্ঞানী পুরুষ।) আমাকে যে ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছেন, তা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য। অর্থাৎ
পাণ্ডাদের দ্বারাই উত্কলের রাজা নির্ধারিত হতেন অনেক সময় অর্থাৎ ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে।
---মালীবুড়ো, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য, পৃষ্ঠা-২৯৭॥”  

জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের “কাঁহা গেলে তোমা পাই”, (পৃষ্ঠা ১২২) এবং মালীবুড়োর “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য”
(পৃষ্ঠা-৯৫) গ্রন্থদ্বয়ে উল্লেখিত আছে যে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রজ্ঞাপ্রবীণা অধ্যাপিকা শান্তা মায়ি সাক্ষী-সাবুদ
তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়ে বলেছেন যে পুরীতে মহাপ্রভুর মৃত্যু হয়নি। সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে তোটা
গোপীনাথের মন্দিরে ছদ্মবেশ ধারণ করে পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে শেষে উলা নামক গ্রামে
উপস্থিত হন মহাদেব বারুইয়ের পানের বরোজে। অপুত্রক মহাদেব নিজের সন্তানরূপে তাঁকে গ্রহণ করেন।
(অন্য একটি ওয়েবসাইট-সূত্রে জানতে পারছি যে মহাদেব বারুই তাঁর বরোজে এক শিশুকে উদ্ধার করে
লালন-পালন করে বড় করেছিলেন, (
debavasya.wordpress.com ) তিনি ছদ্মবেশেই এক সময়ে বেজড়া গ্রামে
এসে নতুন নাম নেন “আউলিয়া চাঁদ”, জিনি কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক এবং প্রথমে তিনি ২২জন কে
শিষ্যত্বে বরণ করেন, যার মধ্যে অনেকেই সমাজের নিম্নশ্রেণীর। আরবী ভাষায় “আউলিয়া” অর্থ “আদি”
অথবা “সিদ্ধপুরুষ”। তিনি নদীয়া জেলার অধুনা নগর কল্যাণীর কাছে অবস্থিত ঘোষপাড়ার এক
সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি রামশরণ পালকে, মতান্তরে তাঁর স্ত্রী সরস্বতী দেবীকে, একটি জীবনান্তক ব্যাধি থেকে সারিয়ে  
তুলেছিলেন। স্বামী ও পুত্রের মৃত্যুর পরে সরস্বতী দেবী জীবিত ছিলেন এবং কর্তাভজা সম্প্রদায়কে নেতৃত্বদান
করেন এবং “সতী-মা” নামে খ্যাত হন। আজও নদীয়া জেলার কল্যাণীর ঘোষপাড়ায়, দোলপূর্ণিমার দিনে
“সতী-মায়ের মেলা” অনুষ্ঠিত হ’য়ে আসেছে যা দুই বাংলার কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই প্রিয়।  

আউলিয়া চাঁদের প্রচারের বাণী শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনিও জাত-বিচার অন্ন-বিচার করতেন না।
তাঁর দৈহিক বর্ণনাও নাকি মিলে যায় শ্রীচৈতন্যের সাথে। তাঁর রেখে যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে তালপত্রে লেখা
পাওয়া যায় “নাহং বিপ্রো ন চ নরপতির্নাপি বৈশ্যো ন শূদ্রো”। এই শ্লোকটি স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের রচিত
বলে চলে আসছে। কিন্তু
রূপ গোস্বামীর শ্রীপদ্যাবলীতে এই শ্লোকটির রচয়িতার নামের যায়গায় রয়েছে
“কস্যচিৎ” অর্থাৎ “এই শ্লোক কোন ব্যক্তির রচিত”। এর পরে রয়েছে আরো দুটি কলি . . .
গত ঈশান গতা মাতা গত স্বরূপ-রায়।
একেলা মুই পুড়িয়া কান্দি জগন্নাথের পায়॥

এখানে ঈশান হলেন শ্রীচৈতন্যদেবের গৃহভৃত্য, মাতা শচীদেবী এবং স্বরূপ হলেন
স্বরূপ দামোদর, যিনি
নীলাচলে মহাপ্রভুর সেবাব্রত গ্রহণ করেছিলেন।

কর্তাভজা সম্প্রদায়ের ভক্তেরা বিশ্বাস করেন আউলচাঁদই ছিলেন শ্রীচৈতন্য। তাঁর জন্মের তিথিও একই দিনে
অর্থাৎ দোল পূর্ণিমার দিনে পালন করা হয়। কিন্তু অসুবিধেটা হলো এই যে প্রথমত, একটি মতে,
আউলিয়াচাঁদের পিতা তাঁকে শিশু অবস্থায় পেয়েছিলেন তাঁর পানের বরজে। শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধানের কালে
তাঁর বয়স ছিল ৪৮বছর, তাই দুটো তথ্যের মধ্যে মিল নেই। দ্বিতীয়ত শ্রীচৈন্যের জন্ম ১৪৮৬ খৃষ্টাব্দে
আর এই আউলিয়া চাঁদের তিরোধান হয় ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে। দুজন একই লোক হলে, তাঁর জীবনকালের দৈর্ঘ্য
হয়ে দাঁড়ায় ২৮৪ বছর! সেটা বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সীমা লঙ্ঘন করে।

যতদিন না আরও বৈজ্ঞনিক প্রমাণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন শ্রীচৈতন্যের শেষলীলা আমাদের কাছে
অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। কিন্তু যে মানুষটার কাছে আমরা পাঁচশো বছর ধরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই ঋণী,
তাঁর মৃত্যুর সত্য উদ্ধাটন করে, তাঁকে ন্যায় পাইয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্য নয় কি?
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও যবন হরিদাস -                                                  পাতার উপরে . . .  
নিমাই পণ্ডিত বা বিশ্বম্ভর, যিনি তখনও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হন নি, তাঁর গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের প্রথম
দিনেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রভু নিত্যানন্দ, একজন হিন্দু এবং যবন হরিদাস, একজন মুসলমানকে।  

যবন হরিদাস মুসলমান মাতা পিতার ঘরে জন্মেছিলেন, মতান্তরে তিনি শৈশবে অনাথ হয়ে পড়লে মুসলমান
পিতা-মাতা তাঁকে মানুষ করেন। তিনি বৈষ্ণব হয়ে যান এবং নিমাইপণ্ডিতের খুব কাছের ভক্ত-পরিকর হয়ে
যান। ইসলাম ধর্মের বাইরে চলে আসার জন্য, কাজীর বিচারে তাঁকে বাইশ বাজারে বেত্রাঘাতে মৃত্যদণ্ড
দিলেও তিনি প্রাণে বেঁচে থাকেন। রূপ ও সনাতন গোস্বামীদের মতো যবন হরিদাসেরও আগের নাম জানা
যায় না।

১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, বিষ্ণুপ্রিয়া সমিতি দ্বারা “গৌড়তত্বরত্নাকর” উপাধিতে
ভূষিত, শ্রী গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরীর “বাংলা চরিত গ্রন্থে শ্রীচৈতন্য” গ্রন্থের ষষ্ঠ বক্তৃতায়, শ্রীচৈতন্য কেন
নিত্যানন্দ ও যবন হরিদাসকে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে
লিখেছেন
“ . . . প্রথম দিনের দুই প্রচারকের মধ্যে একজন হিন্দু আর একজন মুসলমান --- অথচ দুইজনেই বৈষ্ণব।
মুসলমান যে শুধু বৈষ্ণব হইতে পারে তাহা নয় ; মুসলমান বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করিতে নিমাই
পণ্ডিতের আদেশে প্রথম দিনই নবদ্বীপের রাজপথে বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দুর্গের বুকে
বসি. নিমাইয়ের পক্ষে সেদিন কত বড় দুঃসাহসের কার্য্য ছিল! নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ সমাজে সেদিন এক
ভূমিকম্প অনুভীত হইবার কথা।”

যবন হরিদাস মুসলমান ছিলেন কি না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোথাও লেখা তিনি নীচবংশীয় হিন্দু,
মুসলমান পিতা দ্বারা পালিত, আবার কোথাও লেখা তিনি ব্রাহ্মণবংশীয়।

১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন  
“শ্রীগৌরপদতরঙ্গিণী”-র ২য় সংকলনের ভূমিকা থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি . . .
“. . . এই সকল দেখিয়া ( জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল ও নিত্যানন্দ দাসের প্রেম বিলাসের বৃত্তান্ত ) মনে হয়,
হরিদাস যবন-কুল-সম্ভূত ছিলেন। কিন্তু সম্ভবতঃ একজন যবনকে মহাপ্রভু ও তাঁহার গণ এত সম্মান
দেখাইয়াছিলেন, --- ইহা সাধারণের মনঃপূত না হওয়ায়, তাঁহাকে প্রথম নীচবংশীয় হিন্দু, এবং শেষে
ব্রাহ্মণবংশীয় বলিয়া প্রচার করা হইয়াছে। আধুনিক সাহিত্যিকদিগের মধ্যে এখনও কেহ কেহ হরিদাসকে
যবন-সন্তান বলিয়া বিশ্বাস করেন। সতীশবাবু (শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সম্পাদক) তাঁহাকে যবন-কুল-জাত বলিয়া
উল্লেখ করিয়াছেন।”

এই মতের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, সমাজ সংস্কারক হিসেবে এসে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের
বিরুদ্ধে যথাশক্তি প্রয়োগ করে দলে দলে হিন্দুর ধর্মান্তকরণ রোখার প্রয়াস করেছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই
যে তাতে তিনি অনেকাংশেই সফল হয়েছিলেন। এর বিনিময়ে তাঁকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় উচ্চবর্গীয়
হিন্দুদের হাতেই। তাঁর অপ্রকট হবার পরের যুগের বৈষ্ণব সমাজের শীর্ষস্থানীয়রাই মনে হয় তাঁর এত
খোলামনের সংস্কারকে মেনে নিতে পারেন নি। যবন হরিদাস, মুসলমান থেকে ক্রমে হিন্দু নীচজাতি
হয়ে, ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ সন্তানে বিবর্তিত হয়ে গিয়েছেন!
শ্রীচৈতন্যের রচিত বাংলা পদ -                                                       পাতার উপরে . . .  
সাধারণত আমারা শ্রীচৈতন্যর শিক্ষাষ্টকম্ এর সংস্কৃত শ্লোক্ বা গীতের সঙ্গে পরিচিত। তাঁর কোন বাংলা
পদের প্রথম উল্লেখ আমরা পাই নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত “সঙ্গীত-মুক্তাবলী” গীত
সংকলন গ্রন্থে। সেখানে একটিই পদের উল্লেখ রয়েছে তাও লোকমুখে প্রচলিত, অজ্ঞাত পদকর্তার পদ, যা
শ্রীচৈতন্যের রচিত পদ বলে অনেকে মনে করতেন।

পরবর্তীকালে, পদটির উল্লেখ পাই ১৯২৭ সালে নবদ্বীপ ধাম থেকে প্রকাশিত, শ্রীপাদ হরিদাস গোস্বামী  
সম্পাদিত, মাসিক শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া-গৌরাঙ্গ পত্রিকার ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যার ১৩-পৃষ্ঠায় ‘সংগৃহীত’, “শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর
রচিত বাঙ্গালা পদ” ছোট প্রবন্ধে। এই বিষয়ে সেখানে লেখা হয়েছে . . .

শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভু রচিত গ্রন্থ ও শ্লোকাবলীর কথা ও বিবরণ নানা গ্রন্থে পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁহার রচিত
বাঙ্গালা পদের কথা এপর্য্যন্ত শুনা যায় নাই। তিনি বাঙ্গালি ছিলেন, বাঙ্গালা পদ যে তিনি যে একেবারেই
লিখেন নাই, তাহা বলিতে পারি না। তাঁহার পার্ষদগণ বহু বাঙ্গালা পদ লিখিয়াছেন, তিনি যে একটিও লিখেন
নাই, একথা বিশ্বাস হয় না। তবে কোনটি তাঁহার রচিত তাহা এখন নির্ণয় করা বড় কঠিন কাজ। ঢাকার
নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় প্রকাশিত সঙ্গীত-মুক্তাবলী গ্রন্থে নিম্নলিখিত অতি সুন্দর পদ-রত্নটি শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর
রচিত বলিয়া লিখিত আছে। গৌরভক্তগণের বিচারার্থ এই অমূল্য পদ-রত্নটি নিম্নে উদ্ধৃত হইল---

কানু পরশমণি আমার ( ঐ )।
কর্ণের ভূষণ আমার সে নাম শ্রবণ।
নয়নের ভূষণ আমার সে রূপ দরশন॥
বদনের ভূষণ আমার তাঁর গুণ গান।
হস্তের ভূষণ আমার সে পদ সেবন॥
( আমার ) ভূষণ কি বাকি আছে?
আমি শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র-হার পরিয়াছি গলে
॥”

আমরা উপরে উল্লিখিত নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত “সঙ্গীত-মুক্তাবলী” গ্রন্থের হরিনাম-
সঙ্গীত ও সঙ্কীর্ত্তন অধ্যায়ের ৭৪৬-পৃষ্ঠায়, গানটিকে এইরূপে পেয়েছি . . .

কানু পরশ-মণি আমার।
কর্ণের ভূষণ আমার সে নাম শ্রবণ।
নয়নের ভূষণ আমার সেরূপ দরশন॥
বদনের ভূষণ আমার তার গুণ গান।
হস্তের ভূষণ আমার সে পদ সেবন॥
ভূষণ কি আর বাকি আছে।
আমি শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্রহার পরিয়াছি গলে॥ @
.                                অজ্ঞাত।

@ - পাদটীকায় লেখা - এই গানটী চৈতন্য স্বয়ং রচনা করিয়াছিলেন কেহ কেহ এরূপ বলিয়া থাকেন।
*
শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে যেমন বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলী মূল স্রোত হয়ে দেখা দিয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর পর
মঙ্গলকাব্য এবং শাক্তগীতির পুনরুত্থান আমরা দেখতে পাই।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৈষ্ণব পদাবলী ও তাঁর জীবন ও কর্মযজ্ঞ আগামী প্রজন্মের
কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৩.৬.২০১৭
এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ৭.৮.২০১৭
এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২৫.১.২০১৮
শ্রীচৈতন্যের বাংলা পদ সহ এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ৬,১১.২০১৮
শ্রীচৈতন্যের জগন্নাথঅষ্টক সহ এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২৮.১.২০১৯
শ্রীচৈতন্যের রচিত জগন্নাথদশক -                                                   পাতার উপরে . . .  
শিবচন্দ্র শীল, ১৯২৫ সালে (১৩৩১ বঙ্গাব্দ), বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ২৮শ বার্ষিক, ১০ম মাসিক অধিবেশনে
তাঁর বক্তৃতায় বলেন যে তিনি মনে করতেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, পুরী বা নীলাচলে অবস্থানকালে    
“জগন্নাথদশক”-এর রচনা ক’রে জগন্নাথ দেবের স্তব করেছিলেন।

১৮৬৭ সালে (১২৭৪ বঙ্গাব্দে), ৯৬নং আহীরিটোলা ঠিকানা থেকে শ্রীনৃত্যলাল শীল দ্বারা প্রকাশিত হয়  
“নিত্যকর্ম্ম” পুস্তকের ৫-৬ পৃষ্ঠায়, “শ্রীচৈতন্যচন্দ্রমুখপদ্মবিনির্গত শ্রীজগন্নাথাষ্টকং”। অর্থাৎ সেখানে তাঁরা মাত্র
আটটি শ্লোক উদ্ধার করে দিতে পেরেছিলেন তাও অত্যন্ত অশুদ্ধ রূপে।  

এর পর "সুবর্ণবণিকসমাচার"-এর ১৯২২ সালের মার্চ মাসের (১৩২৮ বঙ্গাব্দের চৈত্র) সংখ্যায় নরেন্দ্রনাথ
লাহার “কবি বিশ্বম্ভর পানি ও জগন্নাথমঙ্গল” প্রবন্ধে তিনি জানিয়েছিলেন যে “জগন্নাথমঙ্গল” গ্রন্থের
১৮৯৮সালের  (১৩০১বঙ্গাব্দ) সংস্করণের শেষে জগন্নাথাষ্টকং পুনর্মুদ্রিত হয়ছিল।

উপরোক্ত শিবচন্দ্র শীল মহাশয়, তাঁর গৃহে প্রাপ্ত পুথি থেকে “জগন্নাথদশক” (দশটি শ্লোক সম্বলিত), উপরোক্ত
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের অধিবেশনে পাঠ করেছিলেন। তাঁর সেই বক্তৃতাটি সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার ১৩৩১
এর ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আমরা সেখান থেকে জগন্নাথদশকটি এখানে মিলনসাগরে তুলে দিয়েছি।
*
কবি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু - মধ্যযুগীয় বাংলা
সাহিত্যের বিশারদ, বিদগ্ধ সমালোচক এবং ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ আহমদ শরীফ
(১৩.০২.১৯২১ - ২৪.০২.১৯৯৯) বলেছিলেন,
বাংলাদেশে দুইবার একদেহে অসামান্য রূপগুণের
সমাবেশ হয়েছিল। একবার চৈতন্য দেহে অন্যবার
রবীন্দ্র শরীরে।


শ্রীচৈতন্য জন্মগ্রহণ করেন নদীয়া জেলার নবদ্বীপে।
পিতা জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচী দেবী। শ্রীচৈতন্যের
পূর্বাশ্রম বা পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর। পিতা
জগন্নাথ মিশ্রের আদি বাড়ী ছিল শ্রীহট্ট। পঞ্চদশ
শতাব্দীর  গোড়ার দিকে আসামে যখন হিন্দু রাজা
নীলাম্বরের রাজ্য মুসলমান দ্বারা অধিকৃত হয় তখন
বহু ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য চলে আসেন নবদ্বীপে।
চৈতন্যদেবের পিতা জগন্নাথ, জগন্নাথের শ্বশুর
নীলাম্বর চক্রবর্তী সহ বহু মানুষ, হয় ধর্মসংকটে
নতুবা বিদ্যালাভের আশায় সেকালের বিদ্যার
পীঠস্থান নবদ্বীপে এসে বসবাস শুরু করেন।
*
শ্রীচৈতন্যের জীবিতাবস্থায় তাঁকে আঁকা ছবির তথ্য -                             পাতার উপরে . . .  
১৯১১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, দীনেশচন্দ্র সেনের
History of Bengali Language and Literature গ্রন্থ থেকে আমরা
জানতে পারি যে, ছবিতে (ছবিটি আংশিক তোলা হয়েছিল বোধহয়) দেখা যাচ্ছে সপার্ষদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু
ভগবদ্গীতা পাঠ শুনছেন। ছবিটি আঁকা হয় পুরী বা নীলাচলের রাজা প্রতাপরুদ্র দেবের আদেশে, ১৫১২ -
১৫৩৩ খৃষ্টাব্দের সময়কালে। ছবিটি শ্রীনিবাসাচার্য্য নদীয়ায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হওয়ার
পরে।
শ্রীনিবাসাচার্য্যের বংশধরদের মাধ্যমে ছবিটি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী খ্যাত মহারাজ নন্দকুমারের বা
নান্ কুমারের পরিবারের হাতে আসে এবং শেষপর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলার কুঞ্জঘাটায় রক্ষিত রয়েছে। এই
ছবিতে মধ্যমণি হিসেবে দেখা যাচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে। তাঁর ডানদিকে রয়েছেন প্রভু নিত্যানন্দ। এছাড়া
রয়েছেন ভাগবতাচার্য্য এবং এই ছবির আদেশকর্তা
রাজা প্রতাপরুদ্র দেব কে দেখা যাচ্ছে সাষ্টাঙ্গে প্রণামরত।
রাজার সামনে একটি ময়ূর দেখা যাচ্ছে, যা সম্ভবত মহারাজের উচ্চ মর্যাদাক্রম দর্শাতে আঁকা হয়েছে।
কোথাও এই ছবির শিল্পীর নামের উল্লেখ নেই।

এর সঙ্গে আমরা আরও কয়েকটি তথ্য যোগ করে দিতে পারি, পাঠকদের জন্য।
১। এই ছবিতে শ্রীচৈতন্যের পার্ষদদের মধ্যে কারা কারা আছেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মতান্তরে,   
মধ্যমণি হিসেবে রয়েছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। সঙ্গে রয়েছেন প্রভু নিত্যানন্দ, গীতাপাঠরত গদাধর পণ্ডিত,  
অদ্বৈতাচার্য্য সম্ভবত পক্ককেশে, শ্রীবাস,
রূপ এবং সনাতন গোস্বামী, দণ্ডায়মান যবন হরিদাস যাঁকে আমরা
দেখতে পারছিনা ছবিটি এখানে আংশিক রয়েছে বলে এবং সাষ্টাঙ্গে প্রণামরত স্বয়ং
রাজা প্রতাপরুদ্র দেব

২। যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালিবুড়ো, তাঁর ১৯৫৮ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” গ্রন্থের,
৩০৬-৩০৭ পৃষ্ঠায়  প্রতাপরুদ্র দেব ও শ্রীচৈতন্যদেবের ছবি (আলেখ্য),  নিয়ে লিখেছেন . . .
সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনোদ তাঁর “শ্রীক্ষেত্র” পুস্তকে লিখেছেন : কথিত হয় যে, শ্রীনরেন্দ্র সরোবরের তীরে   
সপার্ষদ শ্রীচৈতন্যদেবের সম্মুখে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যখ্যারত শ্রীগদাধর পণ্ডিত গোস্বামিপ্রভু ও সপার্ষদ শ্রীগৌরহরির
শ্রীপাদপদ্মমূলে সাষ্টাঙ্গ প্রণত শ্রীপ্রতাপরুদ্রের একটি আলেখ্য তাঁহার আদেশেই প্রকাশিত হইয়াছিল।  কেহ
কেহ বলেন, ঐ আলেখ্যেরই একটি প্রতিলিপি মুর্শিদাবাদ কুঞ্জাঘাটার রাজবাড়ীতে রক্ষিত আছে
।”  

৩। নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ১৯১১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, The archeological Survey of Mayurbhanja গ্রন্থের
Pratappur অধ্যায়ের ৩৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“Prataprudra had ordered a likeness of Chaitanya to be painted in water-colours, in which the
king himself is represented as lying prostrate before his great religious master. The painting,
which is a rare specimen of art, is still preserved at Kunjaghata Rajabati, Murshidabad.”


৪। শ্রীনিবাসাচার্য্যের পুরী যাত্রার পথেই শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হবার খবর পান। তাঁদের দেখা হয়নি। তাই  
ছবিটি তিনি শ্রীচৈতন্যের অপ্রকট হবার পরেই নিয়ে এসেছিলেন।
শ্রীনিবাসাচার্য্যের বংশধর ছিলেন   
রাধামোহন ঠাকুর যিনি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর দরবারে “স্বকীয়াবাদ” বনাম “পরকীয়াবাদের”  তর্কযুদ্ধে   
জয়প্রাপ্ত হয়ে “পরকীয়াবাদ”-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি “পদামৃতসমুদ্র” নামক ৭৪৬টি পদবিশিষ্ট  
একটি বিশাল পদাবলী-সংকলন রচনা করেছিলেন। এই
রাধামোহন ঠাকুরই ছিলেন মহারাজ নন্দকুমারের
দীক্ষাগুরু। তাই তাঁর হাত দিয়েই
মহারাজ   নন্দকুমারের কাছে এই ছবিটি এসেছিল এটা বলা চলে।  
নন্দকুমারের কন্যা সুমণির সঙ্গে বিয়ে হয় কুঞ্জঘাটার জমিদার পুত্র জগত চাঁদের। সেই সূত্রে উপরোক্ত ছবিটি
কুঞ্জঘাটার জমিদার বংশের হাতে আসে বলে কথিত আছে।

৫। দীনেশচন্দ্র সেনের বই থেকে জানতে পারি যে ছবিটি, ১৫১২-১৫৩৩ খৃষ্টাব্দের সময়কালে,  রাজা  
প্রতাপরুদ্র দেবের রাজত্বকালে, তাঁরই আদেশে আঁকা হয়েছিল। শ্রীচৈতন্যের যুগকে আমরা বলছি বাংলার  
প্রথম  নবজাগরণের যুগ। ঠিক তেমনই সেই সেময়েই ইউরোপে চলছিল সেখানকার নবজাগরণের যুগ বা  
“রেনেসাঁ”। ইউরোপে, শিল্পী-স্থপতি-বৈজ্ঞানিক লিওনার্ডো-ডা-ভিঞ্চী, ১৫০৩ খৃষ্টাব্দে আঁকেন পৃথিবীর সবচেয়ে  
বিখ্যাত ছবি “মোনালিসা”। তাই শ্রীচৈতন্যের এই ছবি এবং মোনালিসা প্রায় সমসায়িক বললে অত্যুক্তি করা
হবে না। বলাবাহুল্য এই ঐতিহাসিক ছবিটির মূল্য অসীম।