কবি কমলাকান্ত দাস - এর প্রধান কীর্তি হলো ৪৩টি তরঙ্গে ১৩৫৮টি পদ সম্বলিত বৈষ্ণব-পাদবলীর
সংকলন “পদ-রত্নাকর” পুথির সম্পাদনা। এই গ্রন্থে তাঁর নিজের রচিত ১২-১৩টি পদও রয়েছে। তিনি
কমলাকান্ত দাস বা কমলাকান্ত বা কমল ভণিতায় লিখে গেছেন।

গ্রন্থ শেষে তাঁর নিজের পরিচয় এইভাবে দিয়েছেন---

প্রভু মোর কৃপা-সিন্ধু                পতিতের প্রাণ-বন্ধু
.                    কাকে দিলা গড়ুরের ভার।
পদ-রত্নাকর নাম                সংগ্রহ সুখের ধাম
.                     মূর্খ-মুখে করিলা প্রচার॥
নিজ পরিচয় দিতে                লজ্জা ভয় হয় চিতে
.                        অন্তরে উপজে অতি ঘৃণা।
তথাপি তেজিয়া লাজ                নৃত্য করি সভা মাঝ
.                প্রকাশিতে প্রভুর করুণা॥
রাঢ়-দেশে অনুপাম                সত্পল্লী লিউর গ্রাম
.                     সাধু-সন্ত-মহন্তের স্থিতি।
পূর্ব্ব পক্ষ-যোজনান্তে                কণ্টক-নগর-প্রান্তে
.                         পতিত-পাবনী ভাগীরথী॥
তথি জাতি শ্রিকরণ                সাধু-সেবা-পরায়ণ
.                        পিতা ব্রজকিশের আখ্যান।
কনিষ্ঠ রুক্মিণীকান্ত                সদ্ গুণ-আধার শান্ত
.                       বৈষেণবের দাস-অভিমান।

এর থেকে জানা যায় যে কবি কমলাকান্ত, রাঢ় দেশের (বঙ্গের যে অংশের উত্তরে গঙ্গা, দক্ষিণে উড়িষ্যা,  
পূর্ব্বে ভাগীরথী  এবং পশ্চিমে দারকেশ্বর।) সিউর গ্রামে করণবংশের সদস্য ছিলেন। এই সিউর গ্রামের দুই
(পক্ষ) যোজন ( ৯.৯ x ২ = ১৯.৮ বা প্রায় ২০ মাইল ) পূর্বদিকে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত কণ্টক নগর।
কবি কমলাকান্ত দাস তাঁর পদ-রত্নাকর গ্রন্থের সংকলন সম্বন্ধে লিখেছেন---

যুগযুজ্ঞ যুগল সমুদ্র শশিশাকে।
গুরুবার সপ্তবিংশ দিবস বৈশাখে॥
সহস্র অধিক সংখ্যা দুইশত সন।
তথি পরি ত্রয়োদশ অধিক গণন॥
বর্দ্ধমানে নির্জনে বসিয়া নিরন্তর।
প্রাণপণে পূর্ণ কৈল পদ-রত্নাকর॥
বহু পরিশ্রমে এই পদ-রত্নচয়।
মধুকর-বৃত্তে মুঞী করিল সঞ্চয়॥

উপরোক্ত পদের দ্বিতীয় পংক্তি থেকে জানা যায় গন্থের সংকলন বর্ষ ছিল ১২১৩ সন বা বঙ্গাব্দ বা ১৮০৬
খৃষ্টাব্দ। পরের বছরই, বর্দ্ধমান মহারাজের প্রধান কার্য্যকারক রাধানাথ বসুর অনুরোধে, পুথির একটি
অনুলিপি তৈরী করেন স্বয়ং কবি নিজে। এই পুথি সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায় তাঁর অপ্রকাশিত পদ-রত্নাবলী
গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন ---

"
এই পুথিখানির উপাদেয়তার একটি বিশেষ কারণ এই যে, ইহা সঙ্কলয়িতা কমলাকান্ত দাসের স্বহস্ত-লিখিত।
গ্রন্থ শেষে লিখিত আছে---

মহারাজ অধিরাজ অবনীর ইন্দ্র।
বর্দ্ধমান-ভূমির ভুপতি তেজচন্দ্র॥
কন্দর্প জিনিয়া রূপ গুণের সাগর।
বুদ্ধে বৃহষ্পতি কৃপাপূর্ণ কলেবর॥
তাঁর কার্য্যকারকগণের অবতংশ।
কায়স্থকুলেতে রাধানাথ বসু-বংশ॥

.*        *        *        *        *

তাঁর অনুরোধে অনবধি পরিশ্রমে।
লিখিল পুস্তক-রাজ পরম যতনে॥
নবদ্বার পুরীর দ্বারের বামভাগে।
পক্ষ বসিয়াছে সমুদ্রের যাম্য-দিকে॥
সমুদ্রের পূর্ব্বতীরে চন্দ্রের উদয়।
শাক-সংখ্যা সঙ্কেতে কহিল সুনিশ্চয়॥
বার শত চৌদ্দ সন মার্গশীর্ষ মাসে।
বারে বৃহষ্পতি ষষ্ঠবিংশতি দিবসে॥
বর্দ্ধমানে বিরলে বসিয়া নিরন্তর।
সম্পূর্ণ করিল গ্রন্থ পদ-রত্নাকর॥

পুথি খানি আদ্যোপান্ত একই হাতের লেখা ; তদ্ভিন্ন ১২১৩ সালে সঙ্কলিত পুথিখানির ১২১৪ সালেই বর্দ্ধমান-
রাজের প্রধান কার্য্যকারক রাধানাথ বসুর অনুরোধে একখানা প্রতিলিপি প্রস্তুত হইল এবং প্রতিলিপি-কারক
সঙ্কলিতার ন্যায় বর্দ্ধমানে বসিয়া গ্রন্থ লেখন সম্পূর্ণ করিয়া, গ্রন্থ-শেষে কবিতায় সেই বিবরণ লিপি-বদ্ধ করিয়া
রাখিলেন,---ইহা দ্বারা সঙ্কলয়িতা ও প্রতিলিপিকারক যে একই ব্যক্তি, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না।
পদরত্নাকর গ্রন্থে ১। কমলাকান্ত ২। জানকীবল্লভ ৩। ধনঞ্জয় ৪। সর্ব্বানন্দ --- এই চারিজন অজ্ঞাতপূর্ব্ব
পদকর্ত্তার কতকগুলি পদ সহ বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ পদকর্ত্তাদিগের বহু অপ্রকাশিত পদ
সন্নিবেশিত হইয়াছে। সঙ্কলয়িতা কমলাকান্তের রচনাদর্শনে---তাঁহাকে সুপণ্ডিত ব্যক্তি বলিয়াই বিবেচনা হয়।
পদ-রত্নাকর পুথির গৃহিত পাঠ অধিকাংশ স্থলেই সমীচীন এবং পুথিখানিতে লিপিকরের ভ্রম প্রমাদও
অপেক্ষাকৃত অনেক কম দেখা যায়।


১৮০৯ সালে অম্বিকা-কালনার অধিবাসী, বিখ্যাত শাক্তপদাবলী ও শ্যামাসঙ্গীতের রচয়িতা সাধক কমলাকান্ত
ভট্টাচার্য্য বর্ধমান মহারাজের সভাকবি হয়ে আসেন। তাঁর ২৪টি বৈষ্ণব পদাবলি, শ্রীকান্ত মল্লিক কর্তৃক
১২৯২ বঙ্গাব্দে (১৮৮৫ সাল) প্রকাশিত কমলাকান্ত-পদাবলি গ্রন্থে পাওয়া গেছে। ইনিও “কমলাকান্ত” ভণিতায়
রচনা করেছেন। কবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য্যর পদাবলীর পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .

আমরা
মিলনসাগরে  কবি কমলাকান্ত দাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি কমলাকান্ত দাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।      
কবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য্যর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।   


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৮.৪.২০১৭                                                           
...
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .