কবি শ্রীমাধব - আমরা শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গ্রন্থ থেকে একটি পদে “শ্রীমাধব”, দুটি পদে “মাধব আচার্য”, একটি
পদে “মাধাই” এবং বাকি দুইশতাধিক পদের প্রায় সমান সমান সংখ্যায়, “মাধব” ও “দ্বিজ মাধব” ভণিতা
পেয়েছি। এই পদগুলি যে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গ্রন্থের পদ বলে, এগুলোর রচয়িতা
মাধব আচার্য্য, তাই মেনে আমরা
বলতে পারি যে এই “শ্রীমাধব” ভণিতাযুক্ত পদের রচয়িতা মাধব আচার্য্যই।

মাধব মিশ্র, বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর পিতা সনাতন মিশ্রের ছোট ভাই পরাশর মিশ্রের পুত্র মাধব মিশ্র। নিত্যানন্দ
দাসের প্রেমবিলাসে রয়েছে যে, পরাশর মিশ্র কালী ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর নাম হয়েছিল কালিদাস মিশ্র।
মাধব পণ্ডিত হয়ে উঠে, আচার্য্য উপাধিপ্রাপ্ত হন। তিনি
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্যালক। তিনি শ্রীমদ্ভাগবতের
দশম স্কন্ধের পদ্যানুবাদ করেন। গ্রন্থের নাম শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল।

নিত্যানন্দ দাস তাঁর প্রেম-বিলাস গ্রন্থে, কবি মাধবাচার্য্যের জীবন সম্বন্ধে লিখেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গ্রন্থের
রচনা
শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস গ্রহণের অনেক পরে হয়, শ্রীচৈতন্যের জীবদ্দশাতেই। তাহলে আমরা ধরে নিতে
পারি যে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের রচনা  হয়  ১৫৩৮ খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বে বা ষোড়শ শতকের তিরিশের দশকের প্রথম
দিকে।  

অন্য একটি শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ছিলেন ধরণীধরের পুত্র পরাশর মিশ্রের পুত্র মাধব। ইনিও আচার্য্য
উপাধি প্রাপ্ত হয়ে মাধবাচার্য্য নামে খ্যাত হন।



জগবন্ধু ভদ্রর ৬ জন মাধব -                                                             পাতার উপরে . . .   
১৯০২ সালে প্রকাশিত পদাবলী সংকলন গৌরপদ-তরঙ্গিণীর প্রথম সংকলনে,
জগবন্ধু ভদ্র ছয়জন মাধবের
উল্লেখ করেছেন, যাঁদের মধ্যে তিনজনেরই নাম মাধব মিশ্র! এই ছয়জন হলেন . . .
১। মাধব মিশ্র - ইনি গদধর পণ্ডিতের পিতা। তিনি চট্টগ্রামের বেলেটি গ্রাম থেকে এসে নবদ্বীপে বসবাস শুরু
করেন। এনার পদ-রচনা সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ নেই।
২। দুই ভাই জগন্নাথ ও মাধব - তাঁরা নবদ্বীপের বিখ্যাত জগাই-মাধাই, যাঁদের নিত্যানন্দ প্রভু উদ্ধার
করেছিলেন। এনারা পদকর্তা ছিলেন না বলেই আমরা জানি।
৩। মাধবাচার্য্য - ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্য এবং জামাতা। পিতা বিশ্বেশ্বর ও মাতা মহালক্ষ্মী। জন্মকালে
মাতার মৃত্যু ও তারপরে পিতা, সন্ন্যাসী হয়ে কাশীযাত্রা করলে, মাধবকে পরম যত্নে মানুষ করেন পিতা-
মাতার পরমবন্ধু দম্পতি, ভগীরথ ও জয়দুর্গা। মাধব নানা শাস্ত্রপাঠ করে মাধব আচার্য্য উপাধি লাভ করেন
এবং নিত্যানন্দ প্রভুর ভক্ত হয়ে তাঁরই আজ্ঞায় কন্যা গঙ্গা দেবী কে বিবাহ করেন। ইনি নিত্যানন্দ
দাস রচিত শ্রীপ্রেমবিলাস গ্রন্থের উনবিংশ বিলাসের ১৮৫-পৃষ্ঠায় উল্লেখিত, দ্বিতীয় মাধবাচার্য্য। এনার
রচনাবলি সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু ইনি নিত্যানন্দ দাসকে বাদ্য শিক্ষা দিয়েছিলেন বলে সেখানে
উল্লেখিত রয়েছে।
৪। মাধব ঘোষ - ইনি বাসুঘোষ ও গোবিন্দ ঘোষের আপন ভাই। এঁরা সবাই কবি ও গায়ক ছিলেন। বাসু ও
মাধব ছিলেন নিত্যানন্দ প্রভুর ভক্ত। তাঁরা চৈতন্য সমকালীন কবি। তাঁর পদে “মাধব ঘোষ” ভণিতা রয়েছে।
কিছু “মাধব” ভণিতার পদও তাঁর রচনা হতে পারে।
৫। মাধব মিশ্র - পিতার নাম পরাশর, পিতামহের নাম ধরণীধর ও পুত্রের নাম জয়রাম মিশ্র। তাঁর বাসস্থান
ছিল ত্রিবেণীর ধারে সপ্তগ্রামে। সেখান থেকে তাঁরা ময়মনসিংহ জেলায়, মেঘনার পারে নবীনপুর বা ন্যায়পুর
গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তিনি ১৫০১ শকে সারদাচরিত নামে একটি চণ্ডীগ্রন্থ রচনা করেন।
“ইন্দুবিন্দুবাণধাতা শক নিয়োজিত। দ্বিজ মাধবে গায় সারদাচরিত॥” ইনিও একটি কৃষ্ণমঙ্গল রচনা করেন।
৬। মাধব মিশ্র - ইনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বিতীয় স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর কাকা কালিদাস মিশ্রের পুত্র মাধব।
নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাসে রয়েছে যে এই কালিদাসের নামও পরাশর ছিল। . . .
জ্যেষ্ঠ সনাতন কনিষ্ঠ পরাশর কালিদাস। পরম পণ্ডিত সর্ব্ব গুণের আবাস॥”
শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের এই পংক্তির টীকায় দেওয়া আছে - পরাশর কালী ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর নাম কালিদাস হয়।
মাধব নানা শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করে মাধব আচার্য্য উপাধি লাভ করেন। ইনি কেবল শ্রীচাতন্যের শ্যালকই
নন, ইনি কিছুকাল নিমাইপণ্ডিতের (শ্রীচৈতন্যের পূর্বাশ্রমের ডাক নাম) টোলের ছাত্র ছিলেন! ইনি
শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের সুন্দর সরল অনুবাদ করে “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” নামে প্রকাশ করে
শ্রীচৈতন্যের পাদপদ্মে অর্পণ করেন। ইনি পরবর্তিতে কবিবল্লভ-আচার্য ও কলি-ব্যাস নামেও খ্যাত হন। ইনি
নিত্যানন্দ দাস রচিত শ্রীপ্রেমবিলাস গ্রন্থের উনবিংশ বিলাসের ১৮৩-পৃষ্ঠায় উল্লেখিত, প্রথম মাধবাচার্য্য।



মাধব ভণিতা প্রসঙ্গে মৃণালকান্তি ঘোষ -                                              পাতার উপরে . . .   
গৌরপদতরঙ্গিণীর দ্বিতীয় সংকলনে ভণিতা প্রসঙ্গে, সম্পাদক মৃণালকান্তি ঘোষ লিখেছেন . . .
“গৌরপদতরঙ্গিণীতে মাধব ঘোষ -ভণিতার পাঁচটী, মাধবদাস ভণিতার দুইটী, মাধব -ভণিতাযুক্ত পাঁচটী এবং
দ্বিজ মাধব -ভণিতার একটী মাত্র পদ সংগৃহীত হইয়াছে। এই মাধ ঘোষ যে বাসু ও গোবিন্দ  ঘোষের
সহোদর, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তত্ত্বনিধি মহাশয়ের মতে কালিদাস-তনয় মাধবই, দ্বিজমাধব-ভণিতাযুক্ত
পদটীর রচয়িতা।
সতীশবাবু (পদকল্পতরুর সম্পাদক) বলেন, ‘পরাশরাত্মজ মাধব অপেক্ষা কালিদাসাত্মজ
মাধবের পদাবলী পদকল্পতরুতে সংগৃহীত হইবার বেশী সম্ভাবনা।’ আমরা ইহা বলিতে পারিনা। মাধব ও
মাধবদাস ভণিতাযুক্ত সাতটী পদ যে একজনার রচিত নহে. তাহা পাঠ করিলেই বেশ বুঝা যায়। তবে কোন্
পদটী কাহার রচিত, তাহা বলা সুকঠিন।”



নিত্যানন্দ দাসের প্রথম মাধবাচার্য্য -                                                 পাতার উপরে . . .   
নিত্যানন্দ দাস বিরচিত প্রেম-বিলাস কাব্যগ্রন্থের, উনবিংশ বিলাসে,  দুইজন,  মাধব আচার্য্যের বিবরণ
রয়েছে। ১৮৩-পৃষ্ঠায় কবি যে মাধবাচার্য্যের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন তিনিই শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের রচয়িতা। এই
“শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গান অতি চমত্কার” পদটি এই কবির কবিতার পাতায় তোলা হয়েছে।. . .

শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গান অতি চমত্কার। শুনিলে দ্রবয়ে চিত্ত আনন্দাশ্রু ধার॥
শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রীদশমস্কন্ধ। রচিলা মাধব আচার্য্য করি নানা ছন্দ॥
মাধব আচার্য্য গুণ বর্ণিয়া কিঞ্চিৎ। যাহার চরিত্র গুণ জগতে বিদিত॥
দুর্গাদাস মিশ্র সব গুণের আকর। বৈদিক ব্রাহ্মণ বাস নদীয়া নগর॥
তাহার পত্নীর হয় শ্রীবিজয়া নাম। প্রসবিলা দুই পুত্র অতি গুণধাম॥
জ্যেষ্ঠ সনাতন কনিষ্ঠ পরাশর কালিদাস।১ পরম পণ্ডিত সর্ব্ব গুণের আবাস॥
সনাতনের পত্নীর নাম হয় মহামায়া। একমাত্র কন্যা প্রসবিলা বিষ্ণুপ্রিয়া॥
একমাত্র কন্যা আর না হৈল সন্তান। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচন্দ্রে তারে কৈলা দান॥
কালিদাস মিশ্র-পত্নী বিধুমুখী নাম। প্রসবিল পুত্ররত্ন সর্ব্ব গুণধাম॥
একমাত্র পুত্র রাখিয়া কালিদাস। পৃথি ছাড়ি স্বর্গলোকে করিলেন বাস॥
বিধুমুখী মাধব নামে পুত্র কোলে করি। অল্প বয়সের কালে হইলেন রাঁড়ি॥
গর্ভাষ্টমে মাধবের যজ্ঞোপবীত হৈল। নানাবিধ শাস্ত্র তিঁহো পড়িতে লাগিল॥
নানাবিধ শাস্ত্র পড়ি হইলা পণ্ডিত। আচার্য্য উপাধিতে তিঁহো হইলা বিদিত॥
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অভিষেক সময়। মাধব আচার্য্য গেলা শ্রীনিবাসালয়॥
দেখিয়া গৌরাঙ্গ রূপ হইলা উন্মত্ত। সেই হৈতে হৈলা তিঁহো চৈতন্যের ভক্ত॥
যেই দিন শ্রীচৈতন্য নিজ হরিনামে। ইচ্চৈস্বরে উপদেশ কৈলা ভক্তগণে॥
সেই দিন সেই স্থানে ছিলেন মাধব। কর্ণে প্রবেশিল তার মহামন্ত্র রব॥
নাম শুনিয়া তার প্রেমোদয় হৈল। চৈতন্যচরণে দণ্ডবৎ প্রণমিল॥
শ্রীচৈতন্য প্রভু তারে অনুগ্রহ করি। চরণ তুলিয়া দিল মস্তকের উপরি॥
মাধব, নামের নীতি প্রভুরে পুছিলা। সংখ্যা করি লইতে নাম প্রভু আজ্ঞা কৈলা॥
সংখ্যা করি লক্ষ নাম লয় অনুরাগে। সেই হৈতে হৈল তার সংসার বিরাগে॥
শ্রীমহাপ্রভুর সন্ন্যাসের বহু দিন পরে। কৃষ্ণ-লালামৃত ভাষার বর্ণে হর্ষান্তরে॥
শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রীদশমস্কন্ধ। গীতি বর্ণনাতে তিঁহো করি নানা ছন্দ॥২
অন্য পুরাণ হৈতে কিছু করিয়া গ্রহণ। কৃষ্ণ মঙ্গলে তাহা কৈলা নিয়েজন॥
রাখিলা গ্রন্থের নাম শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল। শ্রীচৈতন্য পদে তাহা সমর্পণ কৈল॥
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য তারে কৈল অনুগ্রহ। সব ভক্ত তারে করিলেন স্নেহ॥
মহাপ্রভু অদ্বৈতেরে করিলা আদেশ। দীক্ষামন্ত্র মাধবেরে কর উপদেশ॥
শ্রীঅদ্বৈতপ্রভু মহাপ্রভু, আজ্ঞামতে। মাধবের কর্ণে মন্ত্র লাগিলা কহিতে॥
আগে হরিনাম কৈলা অর্থের সহিতে। রাধাকৃষ্ণ মন্ত্র পরে কহিলা কর্ণেতে॥
কামগায়ত্রী কামবীজ উপদেশ কৈলা। অর্থ জানাইয়া সব তত্ত্ব জানাইলা॥
সেই হৈতে মাধব হৈলা ভজনে নিপুণ। সংসারে থাকিতে তার নাহি আর মন॥
মাধবের মাতা তারে দেখিয়া উদাস। সংসার ছাড়িবে বলি মনে হৈল ত্রাস॥
মাধবের মাতা তারে বিয়ে করাইতে। শীঘ্র করি উদযোগ কৈলা ভয় পাইয়া চিতে॥
মাতার উদযোগ দেখি মাধব তখন। পলায়ন করি চলি গেল বৃন্দাবন॥
শ্রীরূপের পদে গিয়া আত্ম সমর্পিলা। ভজনের তত্ত্ব যত সকল জানিলা॥
সন্ন্যাস করিয়া তিঁহো রবি বৃন্দাবন। ব্রজের মধুর ভাবে করয়ে ভজন॥
মাধব আচার্য্য শ্রী মাধবী সখী হন। শ্রীরূপের কৃপায় তার হৈল উদ্দীপন


টীকা -
১। পরাশর কালী ভক্ত ছিলেন বলে তাঁর নাম কালিদাস হয়।
২। গীতে বর্ণিলা তিঁহো করি নানা ছন্দ




নিত্যানন্দ দাসের দ্বিতীয় মাধবাচার্য্য -                                                পাতার উপরে . . .   
নিত্যানন্দ দাস বিরচিত  প্রেম-বিলাস  কাব্যগ্রন্থের, উনবিংশ বিলাসে,  দ্বিতীয় মাধব আচার্য্যের বিবরণ
রয়েছে। ১৮৫-পৃষ্ঠায় কবি যে মাধবাচার্য্যের বিবরণ দিয়েছেন। ইনিও উচ্চশিক্ষিত এবং  আচার্য্য উপাধি
প্রাপ্ত। ইনি তাঁর গুরু শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর আজ্ঞায় তাঁর কন্যা শ্রীগঙ্গা দেবীকে বিবাহ করেন। কিন্তু কোথাও
উল্লেখ করা নেই যে ইনি শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রন্থের রচয়িতা। ইনি ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ এবং নিত্যানন্দ
দাস এঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রঙণ করেছিলেন। এই “বৃন্দাবন হৈতে আইলা জাহ্নবা ঈশ্বরী” পদটি এই কবির
কবিতার পাতায় তোলা হয়েছে।. . .

বৃন্দাবন হৈতে আইলা জাহ্নবা ঈশ্বরী। রহিলেন কত দিন আসি শ্রীখেতরী॥
তার সনে থাকে সদা মাধব আচার্য্য। গান বাদ্যে তিঁহ হরে সবাকার ধৈর্য্য॥১
মাধব আচার্য্য হয় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ। নিত্যানন্দ প্রিয়ভক্ত পরম কুলীন॥
নিত্যানন্দ শিষ্য, নিতাই বিনা নাহি জানে। সদাই করয়ে তিঁহো নিতাই-পদ ধ্যানে॥
নিত্যানন্দ প্রভুর কন্যা হয় গঙ্গা নাম। মাধব আচার্য্যে প্রভু কৈলা কন্যা দান॥
বিবাহ করিলা মাধব গুরুর আজ্ঞাতে। গরু আজ্ঞা বলবতী কহয়ে শাস্ত্রেতে॥
ঈশ্বরের মহিমা কিছু বোঝা নাহি যায়। অঘট্য ঘটন হয় ঈশ্বর-ইচ্ছায়॥
রাঢ়ীতে বারেন্দ্রে বিয়ে না ভাবিহ আন। রাঢ়ী ও বারেন্দ্র হয় একের সন্তান॥
রাঢ়ী ও বারেন্দ্রে বিয়ে হৈয়েছে অনেক। দেশঙেদে নামভেদ এই পরতেক॥
আদিশূরের যজ্ঞে আইলা পাঁচজন দ্বিজ। তাহার সন্ততি রাঢ়ী বারেন্দ্র সমাজ॥
মাধব আচার্য্য গঙ্গাকে বিয়ে করি। গুরুর আজ্ঞায় তিঁহ হইলেন রাঢ়ী॥২
মাধব আচার্য্যকে শান্তনু বলি কয়। দ্রবময়ী গঙ্গা এই গঙ্গাদেবী হয়॥
মাধব আচার্য্য-স্থানে বাদ্য শিক্ষা কৈল। কৃপা করি তিঁহো মোরে বাদ্যশিক্ষা দিল॥
তার পাদপদ্মে মোর কোটি নমস্কার। কত কৃপা কৈল মোরে নাহি তার পার


টীকা -
১। গানে বাদ্যে তিঁহ হয় সবাকার বর্ষ্য।
২।    মাধদ আচার্য্য বিয়ে করিয়ে গঙ্গায়।
.        রাঢ়ী হইলেন তিনি গুরুর আজ্ঞায়




দীনেশচন্দ্র সেনের মাধবাচার্য্য -                                                       পাতার উপরে . . .   
১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, “বঙ্গভাষা ও সাহিংত্য” গ্রন্থের ৭ম অধ্যায়ের পরিশিষ্টে, ২২০-পৃষ্ঠায় দীনেশচন্দ্র
সেনের বিবরণে,
নিত্যানন্দ দাসের বিবরণের কিছু অমিল রয়েছে, যেমন পিতামহের নাম।
তিনি লিখেছেন . . .
. . . ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগের অপর একজন বেশ প্রতিভাবান কবি ভাগবতের অনুবাদ করেন। ইঁহার
নাম মাধবাচার্য্য, ইনি কান্যকুব্জ হইতে সমাগত ভট্টনারায়ণ বংশীয় ও তাঁহার অষ্টাদশ পর্য্যায়ে জন্মগ্রহণ
করেন। মাধবাচার্য্যে বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণে মেঘনা নদীর তীরস্থ নবীনপুর (ন্যানপুর) গ্রাম, এই স্থান
এখন গোঁসাইপুর বলিয়া পরিচিত। মাধবাচার্য্যের পিতামহের নাম ধরণীধর বিশারদ, পিতার নাম পরাশর ও
একমাত্র পুত্রের নাম জয়রামচন্দ্র গোস্বামী। মাধবাচার্য্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলে লিখিত আছে মাধবাচার্য্যের পিতা
মাতা বৃদ্ধাবস্থায় গঙ্গাতীরে নবদ্বীপে বাস করেন ; . . .।
. . .  শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলে শ্রীমদ্বাগবতের দশম স্কন্দের সারভাগ সুন্দরভাবে সঙ্কলিত হইয়াছে ; গৌরভূষণ শ্রীযুক্ত
অচ্যূতচন্দ্র চৌধুরী মহাশয় বলেন, শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের পূর্ব্বে নানা স্থানে গুণরাজ খাঁ (মালাধর বসু) প্রণীত
কৃষ্ণবিজয় গীত হইত, মাধবের কৃষ্ণমঙ্গল অচিরেই সেই স্থান অধিকার করিয়া লইয়াছিল।
. . . কৃষ্ণমঙ্গল, চণ্ডীকাব্য ও দক্ষিণরায়ের উপাখ্যান ব্যতীত মাধবাচার্য্য সংস্কৃতে প্রেমরত্নাকর নামক গ্রন্থ
প্রণয়ন করেন
।”



মাধবাচার্য্যকে নিয়ে দ্বন্দ্ব -                                                             পাতার উপরে . . .   
ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪), ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে, নটবর চক্রবর্ত্তী
দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের ভূমিকায়। তাঁরা, আনুমানিক চারশো বছর পূর্ব্বে, মাধবাচার্য
বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের, ১৬৩২ শক বা ১১১৮ বঙ্গাব্দে (১৭১১ খৃষ্টাব্দে)  অনুলিখিত
একটি পুথি থেকে প্রকাশনার কাজ করেন।

এই গ্রন্থের ভূমিকায় তাঁরা জানিয়েছেন যে তাঁরা মাধবাচার্য্য সম্বন্ধে কেবল এই তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন
যে তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁর নাম ছিল মাধবাচার্য। তাঁরা আরএ জানিয়েছেন . . .

কতিপয় ভ্রান্ত ব্যক্তির অনভিজ্ঞতায় দূষিত, প্রক্ষিপ্তাংশপরিপূর্ণ প্রেমবিলাস নামক গ্রন্থে কৃষ্ণমঙ্গল রচয়িতার
যে প্রকার পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে, তাহার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতা না পারায়, আমরা এস্থলে তাহা উদ্ধৃত
করিতে পারলাম না। বিশেষতঃ কৃষ্ণমঙ্গল রচয়িতাকে লইয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন্ কোন্ স্থলে
কিরূপ গোলযোগ চলিয়া আসিতেছে, তাহা সুপ্রসিদ্ধ মাসিক পত্র ‘সাহিত্যে’ (১০ম বর্ষ, ১১শ সংখ্যা), ‘বৈষ্ণব
সমাজে দলাদলি’ এবং ‘প্রেমবিলাসগ্রন্থ’ শীর্ষক প্রবন্ধ দুইটি দেখিলেই বুঝিতে পারা যাইবে। সাধারণের
কৌতুহল নিবৃত্তির জন্য আমরা ‘বৈষ্ণব সমাজে দলাদলি’ প্রবন্ধ হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিলাম।
“এই সকল মাধবের মধ্যে প্রেমরত্ন (রত্নাকর?) রচয়িতা ও বিষ্ণুপ্রিয়ার ভ্রাতা মাধবাচার্য্য সমধিক প্রসিদ্ধ।
চৈতন্যদেবের শ্বশুর সনাতন মিশ্র মিথিলা হইতে নবদ্বীপে উপনিবিষ্ট হন। এই বিখ্যাত বংশে
পণ্ডিত-শিরোমণি জগদীশ তর্কালঙ্কারের জন্ম হয়। এই বংশে মাধব এবং প্রেমরত্নাকর ও কৃষ্ণমঙ্গলের
রচয়িতা মাধরের সহ ‘ত্যাগী’ মাধবের কোন সংস্রব নাই। মাধবাচার্য্য পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে গমন করিয়া
চৈতন্যের কৃপালাভ করেন। সেখানেই তাঁহার একখানি বৈষ্ণবস্মৃতি রচনা করিবার অভিলাষ হয়। প্রশ্ন হইতে
পারে, হরিভক্তিবিলাস থাকিতে প্রেমরত্নাকর নামক স্মৃতি রচনা করিবার উদ্দেশ্য কি ? হরিভক্তিবিলাস
প্রকাণ্ড গ্রন্থ, মাধ সংক্ষেপে একখানি স্মৃতির রচনা করেন। এই মাধবাচার্য্যই কৃষ্ণমঙ্গলের রচয়িতা। এ কথা
আমরা কেন বিষ্ণুপ্রিয়ার ভ্রাতা ও মাধবের বংশধর গোস্বামিগণও স্বীকার করেন। কৃষ্ণমঙ্গলের রচয়িতা
মাধবের বংশীয় গোস্বামিগণ অদ্যাপি ময়মনসিংহ জেলায় বাস করিতেছেন। ময়মনসিংহ, ঢাকা, মালদহ
প্রভৃতি জেলায় তাঁহাদের বহুসংখ্যক শিষ্য আছে। শুনিয়াছি, ইঁহারা বৃন্দাবনধামে চূড়াধারী নামক ব্রজবাসীর
কুঞ্জ ক্রয় করিয়া, তথায় আপনাদের কুঞ্জ স্থাপন করেন। কোনও কারণে ময়মনসিংহ জেলার কোন অধিকারি-
বংশের সহিত তাঁহাদের বিবাদ হয়। অধিকারিগণ মধ্যে কেহ কেহ প্রচার করিয়া দেন যে, ময়মনসিংহ
যশোদলের গোস্বামিগণ চূড়াধারী মাধবের বংশসম্ভূত। তাঁহার বৈষ্ণব-সমাজের পরিত্যজ্য। মাধবাচার্য্য
কৃষ্ণমঙ্গল রচনা করেন নাই। বিষ্ণুপ্রিয়ার ভ্রাতা মাধবাচার্য্যই কৃষ্ণমঙ্গল রচয়িতা।”
এদিকে বিষ্ণুপ্রিয়ার ভ্রাতা মাধবের বংশধরেরা বলিতেছেন, আমাদের বংশের কেহ কৃষ্ণমঙ্গল রচনা করেন
নাই। পাঠক মহোদয়গণ বিবাদের প্রকৃতি পর্য্যালোচনা করিয়া সিদ্ধান্ত করুন। ইত্যাদি
।”



চূড়াধারী মাধব প্রসঙ্গে মৃণালকান্তি ঘোষ -                                            পাতার উপরে . . .   
পদকল্পতরুর সম্পাদক
সতীশচন্দ্র রায়ের কালিদাসাত্মজ মাধবাচার্য্যকে পদকর্তা স্থির করাকে কেন্দ্র করে
লেখার সম্বন্ধে গৌরপদতরঙ্গিণীর দ্বিতীয় সংস্করণের সম্পাদক মৃণালকান্তি ঘোষ লিখেছেন . . .
সতীশবাবু লিখিয়াছেন, ‘জগবন্ধুবাবু তত্ত্বনিধি মহাশয়ের মতে মত দিয়া কালিদাসাত্মজ মাধবাচার্য্যকেই
পদকর্ত্তা বলিয়া স্থির করিয়াছেন। কিন্তু পরাশরাত্মজ মাধবও বৈষ্ণ এবং গ্রন্থ-রচয়িতা ছিলেন। এ অবস্থায়
তিনি যে কোন পদ রচনা করেন নাই, কিংবা তাঁহার কোন পদ পদকল্পতরুতে সংগৃহীত হয় নাই,---ইহা
কিরূপে বলা যাইতে পারে?’

সতীশচন্দ্রবাবু সম্ভবতঃ এখানে একটী ভুল করিয়াছেন। পরাশরাত্মজ মাধব যে বৈষ্ণব ছিলেন, ইহা তিনি
কোথায় পাইলেন? ‘চূড়াধারী’ বলিয়া এক মাধবের অখ্যাতি ছিল। অনেকের বিশ্বাস, তিনিই ‘পরাশরাত্মজ
মাধব’। অচ্যুতবাবু বলেন, ‘ইনি বৈষ্ণব-ধর্মে দীক্ষিত না হিলেও, সম্ভবতঃ শেষকালে বৈষ্ণবলীলা-প্রলুব্ধ হইয়া
থাকিবেন। এই জন্যই কথিত আছে যে, ইনি নিত্যানন্দ-গণদিগের ন্যায় মাথায় চূড়াধারণ করিতেন বলিয়া
‘চূড়াধারী’ বলিয়া কীর্ত্তিত।’ কিন্তু নিত্যানন্দ দাস তাঁহার রচিত প্রেমবিলাস গ্রন্থে প্রভৃতি দোষী বিষয়র শ্রীধাম
নবদ্বীপের একখানি ব্যাবস্থাপত্র উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়াছেন যে, ‘চূড়াধারী মাধব’ প্রভৃতি তাঁহাদের গণসহ
দোষী ও ত্যাগী। তিনি পাদটীকায় লিখিয়াছেন যে, মাধব নামে একটী ব্রাহ্মণ মস্তকে চূড়াধারণ করিয়া মন্দ
মন্দ হাসিতে হাসিতে বলিত, ‘আমি নারায়ণ কৃষ্ণ, জীবের উদ্ধারের জন্য বৃন্দাবন হইতে সমাগত হইয়াছি।
’ এই রূপ কথিত আছে, মহাপ্রভু ইহাকে গণসহ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। মহাপ্রভু ১৮৫৫ শকে অপ্রকট হয়েন।
কিন্তু পরাশরাত্মজ মাধব ‘সারদাচরিত’ নামক চণ্ডী ১৫০১ শকে রচনা করেন। সুতরাং সারদাচরিত-রচক
মাধব ও চূড়াধারী মাধব এক ব্যক্তি হইতে পারেন না
।”



প্রেমবিলাসের রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের পরিচয় -                                পাতার উপরে . . .   
আমরা মনে করি প্রেমবিলাসের রচয়িতা
নিত্যানন্দ দাস তাঁর গ্রন্থে একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে স্পষ্ট কথা
লিখে গিয়েছেন। তাঁর নিজের লেখাতেই রয়েছে যে এই গ্রন্থ তাঁর বৃদ্ধ বয়সের রচনা। তাঁর আত্ম-পরিচয়ে
আছে যে তাঁর মাতা সৌদামিনী এবং পিতা আত্মারাম দাস ছিলেন। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল বলরাম দাস।
বালক অবস্থাতেই তাঁরা দুজনেই মারা যান। এরপর তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর প্রথমা স্ত্রী, জাহ্নবা দেবীকে স্বপ্নে
দেখেন এবং সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারে খড়দহে গিয়ে জাহ্নবাদেবীর কাছে আশ্রয় পান। নিঃসন্তান জাহ্নবা  
দেবীই তাঁর নতুন নাম রাখেন নিত্যানন্দ দাস এবং তাঁকে দীক্ষাদান করেন। তাঁর আদেশেই তিনি প্রেমবিলাস
গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থ শেষ করার কালে বোধ হয় জাহ্নবা দেবী জীবিত ছিলেন না বলে গ্রন্থটিকে, নিত্যানন্দ
প্রভুর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বসুধা দেবীর পুত্র বীরচন্দ্রের পদে অর্পণ করেন।

নিত্যানন্দ দাসের এই পরিচয় জানার পর, শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গ্রন্থের প্রকাশক, বঙ্গবাসী কার্যালয়ের নটবর চক্রবর্ত্তী
মহাশয়ের “
কতিপয় ভ্রান্ত ব্যক্তির অনভিজ্ঞতায় দূষিত, প্রক্ষিপ্তাংশপরিপূর্ণ প্রেমবিলাস নামক গ্রন্থে . . .” এই
উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওদিকে “সাহিত্য” পত্রিকার ‘বৈষ্ণব সমাজে দলাদলি’ প্রবন্ধে
উল্লেখিত বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর ভাই মাধবের বংশধরগণের, তাঁদের পূর্বপুরুষ দ্বারা শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের রচনার
কথা অশ্বীকার করার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না!



শ্রীপদমেরুগ্রন্থের সংকলক দ্বিজমাধব -                                                পাতার উপরে . . .   
১৩৬৪টি পদ বিশিষ্ট পদাবলী সংকলন শ্রীপদমেরুগ্রন্থ বিশ্বভারতী বাংলা-পুথিশালার “রতন লাইব্রেরি
সংগ্রহের” অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৯ সালে প্রয়াত পণ্ডিত শিবরতন মিত্র মহাশয়ের সিউড়ীস্থিত মূল্যবান পাঠাগারের
পুথিগুলি বিশ্বভারতী ক্রয় করেন ; তাই নিয়ে “রতন লাইব্রেরি সংগ্রহ”।

বিশ্বভারতী-প্রকাশিত তথা ডঃ পঞ্চানন মণ্ডল সংকলিত “পুঁথি-পরিচয়” দ্বিতীয় খণ্ড-র (১৯৫৮), গ্রন্থপরিচয়
অংশে ডঃ পঞ্চানন মণ্ডল অনুমান করেছেন, দ্বিজ মাধব নামে কোনো ব্যক্তি পদমেরুগ্রন্থের সংকলক হতে
পারেন। তাঁর প্রধান যুক্তি পুথির অন্তিম উক্তিটি :---
“ইতি গৌরাঙ্গ হে কৃপাঙ্কুরু মাধব দীনবরে॥”
সমগ্র পুথিটির বিশ্বাস-প্রেক্ষিতে এ-সম্পর্কে নানা কৌতূহল-ই কেবল জাগে, সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো দুষ্কর।



শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল ও শ্রীপদমেরুগ্রন্থের দ্বিজ মাধব কি একই ব্যক্তি ?                  পাতার উপরে . . .   
১৯৮২ সালে প্রকাশিত, শ্রীপদমেরুগ্রন্থের ভূমিকার, ৬-পৃষ্ঠায় গ্রন্থের সম্পাদক, বিশ্বভারতীর বিদ্যাভবনের
বাংলা বিভাগের পক্ষে ভুদেব চৌধুরী, এই বিষয়ে লিখেছেন . . .

. . . এই ১১টি স্বতন্ত্র কবিতাংশের চারটির শেষে দ্বিজ মাধব অথবা কেবল মাধব ভণিতা রয়েছে ; তার
একটির পূর্ণ রূপ হল :---“ চিন্তিয়া চৈতন্যচান্দের চরণকমল।/ দ্বিজমাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥” ডঃ মণ্ডল
উপরিউক্ত আলোচনায় জানিয়েছেন, ‘বঙ্গবাসী’-সংস্করণ দ্বিজ মাধবের ‘শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলে’র মুদ্রিত গ্রন্থে বলরামের
রাসলীলার বিবরণ রয়েছে, যদিও ‘পদমেরু’-ধৃত অংশটি তার প্রতিলিপি নয়। স্বভাবতই প্রশ্ম ওঠে, বলরাম-
রাসের ঐ সংযোজিত উপাখ্যানটি কি যথার্থই শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল-খ্যাত কবি দ্বিজ মাধবের রচনায় কোনো পাঠান্তর-
সূত্রে সংগৃহীত, অথবা পূর্বৈতিহ্যের অনুসরণের ‘পদমেরুগ্রন্থ’-সংকলিতা (অন্য) কোনো দ্বিজ মাধবের মৌলিক
রচনা ? দুই দ্বিজ মাধবকে অভিন্ন ভাববার উপায় নেই। শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের আলোচ্য কবি ষোড়শ
শতকের শেষ অথবা সপ্তদশ শতকের সূচনায় তাঁর কাব্য রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয় ;
পদমেরুগ্রন্থের বর্তমান পুথিটির লিপিকাল উনিশ শতকের মাঝামাঝির খুব ওপরে তুলে নেবার মত প্রামাণিক
সমর্থন আপাতত অন্ত হাতে নেই। মূল সংকলনটি নিশ্চয়ই আরো পূর্ববর্তী কালের রচনা, কিন্তু সে ঐ
ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের ঘটা বলেই দাবি করতে পারার মত তথ্য অন্তত এখনো হাতে আসে নি
।”

শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল ও শ্রীপদমেরুগ্রন্থের দ্বিজ মাধবের উপরোক্ত ভণিতার পূর্ণরূপ আমরা মিলিয়ে পেয়েছি।
“শ্রীপদমেরুগ্রন্থের ৪৭০-পৃষ্ঠার “এই সব রূপে সারিসারি গোপনারী”-পদটির শেষ দুটি পংক্তি হলো . . .

চিন্তিয়া চৈতন্যচান্দের চরণকমল।
দ্বিজমাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

অন্য দিকে, দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্য রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের “উদ্ধব শ্রীকৃষ্ণে সংবাদ” পদটির শেষ দুটি
পংক্তি প্রায় এক . . .

চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্রে-চরণকমল।
দ্বিজ মাধব কহে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল॥

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগেই যে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের রচয়িতা “দ্বিজ মাধব” আর শ্রীপদমেরুগ্রন্থের ওই পদটির
রচয়িতা এবং ডঃ পঞ্চানন মণ্ডলের মতানুযায়ী, সংকলক, “দ্বিজ মাধব” কি একই ব্যক্তি ? পাঠকের সুবিধার
জন্য এই দুটি পদই আমরা এই পাতায় তুলে দিয়েছি “দ্বিজ মাধব” ভণিতার পাতায়।

মাধবাচার্য নিশ্চিতভাবে চৈতন্য সমসাময়িক কবি অর্থাৎ
বৈষ্ণবদাস পূর্ববর্তী কবি। শ্রীপদমেরুগ্রন্থ সংকলনে
রয়েছে রাধামোহন,
বৈষ্ণবদাস, উদ্ধব দাসের মত নিশ্চিভাবে জানা, চৈতন্য পরবর্তী কবিদের পদ। চৈতন্য-
সমকালীন কোনো কবির পক্ষে পরবর্তী যুগের কবিদের পদ সংগ্রহ করা তো সম্ভব নয়! পদগুলি  
শ্রীপদমেরুগ্রন্থে, পরবর্তী সংযোজন হিসেবে সংকলিতও করা হয় নি। পদগুলি গ্রন্থকারের পরিকল্পনা মতো
সারা গ্রন্থ জুড়ে সংযোজন করা হয়েছে। কাজেই পদমেরু গ্রন্থের সংকলক নিশ্চিতভাবে বৈষ্ণবদাস-পরবর্তী
কালের। অর্থাৎ ১৭৫০ খৃষ্টাব্দের পরবর্তী কালের।

এছাড়া দ্বিজমাধব ভণিতার “সর্ব্ব শুভোদয় হইল পরম শোভন” পদটি আমরা পদমেরুগ্রন্থ ও  শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল,
দুটি গ্রন্থেই পেয়েছি। তবুও আমরা মনে করছি যে এই দুই দ্বিজ মাধব, দুজন ভিন্ন ব্যক্তি। শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের
দ্বিজ মাধব বা মাধব আচার্য্য
চৈতন্য সমকালীন কবি এবং শ্রীপদমেরুগ্রন্থের দ্বিজ মাধব কেবল চৈতন্য
পরবর্তীই নয়, শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সংকলক
বৈষ্ণবদাস পরবর্তী যুগের কবি।



মাধবাচার্য্যের রচনাসম্ভার ও ভণিতা ও তিনটি কৃষ্ণমঙ্গল -                       পাতার উপরে . . .   
মাধবাচার্য্যের রচনা সম্ভারে রয়েছে “শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল” কাব্য, “চণ্ডীকাব্য”, সুন্দরবনের ব্যাঘ্রারোহী দেবতা
“দক্ষিণরায়ের উপাখ্যান”, সংস্কৃত ভাষায় লিখিত “প্রেমরত্নাকর” গ্রন্থ প্রভৃতি। শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলে, দুটি পদে
“মাধবাচার্য্য”, একটি পদে “শ্রীমাধব”, একটি পদে “মাধাই” এবং বাকি পদগুলি প্রায় সমান সমান সংখ্যায়,
“মাধব” ও “দ্বিজ মাধব” ভণিতা রয়েছে। এই পদগুলি এই মাধবাচার্য্যের পাতায় রাখার পাশাপাশি, মাধব,
দ্বিজ মাধব, মাধাই, শ্রীমাধ ইত্যাদি ভণিতার পাতাতেও রাখা হয়েছে, যাতে একই ভণিতাযুক্ত পদাবলী সব
একখানেই পাওয়া যায়। আমরা মাধবাচার্যের পাতায় তাঁর শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলের দুইশতাধিক পদের মধ্য থেকে,
আপাতত ২৪টি পদ তুলে দিচ্ছি।  

জগবন্ধু ভদ্র তাঁর গৌরপদতরঙ্গিণী সংকলনে লিখেছেন যে বাঙ্গালাভাষায় তিনখানি কৃষ্ণমঙ্গল গ্রন্থের পরিচয়
পাওয়া যায়।
১। পরাশরাত্মজ মাধব প্রণীত,
২। কালিদাস-তনয় মাধব প্রণীত, ও
৩। দ্বিজ সন্তোষ রচিত।
নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাসের টীকায় রয়েছে যে, এই কালিদাসের নামও নাকি ছিল পরাশর! কালীভক্ত
ছিলেন বলে নাম হয় কালিদাস!



বিভিন্ন রূপে "মাধব" ভণিতা ও তার অপভ্রংশ -                                  পাতার উপরে . . .   
আমরা মিনলসাগরে যে বিভিন্ন রূপে “মাধব” ও তার অপভ্রংশ রূপের ভণিতাযুক্ত পদ সংগ্রহ
করতে পেয়েছি তা হলো "মাধব", "মাধব দাস", "দ্বিজ মাধব", "মাধব আচার্য্য", "শ্রীমাধব", "মাধাই", "মাধো",
"মাধব ঘোষ", "মাধবেন্দ্র পুরী", "মাধবী" এবং "মাধবী দাসী"।

মিলনসাগরে প্রকাশিত "মাধব" সম্বলিত বিভিন্ন ভণিতায় ক্লিক করলেই সেই পাতায় চলে যেতে পারবেন।
মাধব   
মাধব দাস    
দ্বিজ মাধব   
দ্বিজ মাধব দাস   
মাধব আচার্য্য   
শ্রীমাধব   
মাধাই    
মাধব ঘোষ   
মাধবেন্দ্র পুরী    
মাধবী    
মাধবী দাসী      
মাধো   ...   

আমরা
মিলনসাগরে  কবি শ্রীমাধবের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই  
প্রচেষ্টার সার্থকতা।




কবি শ্রীমাধবের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।      


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৩.৮.২০১৭
...                                                                                    
*
শ্রীমাধব
জন্ম পঞ্চদশ শতকের শেষ অথবা ষোড়শ শতকের শুরু।
চৈতন্য সমসাময়িক বা পরবর্তী কবি।
কবির একটি ছবি ও তাঁর জীবন সম্বন্ধে
আরও তথ্য যদি কেউ আমাদের পাঠান
তাহলে আমরা, আমাদের কৃতজ্ঞতাস্পরূপ
প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো।
আমাদের ঠিকানা -
srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার কবিতার ভণিতা -
শ্রীমাধব
জগবন্ধু ভদ্রর ৬ জন মাধব    
মাধব ভণিতা প্রসঙ্গে মৃণালকান্তি ঘোষ    
নিত্যানন্দ দাসের প্রথম মাধবাচার্য্য    
নিত্যানন্দ দাসের দ্বিতীয় মাধবাচার্য্য    
দীনেশচন্দ্র সেনের মাধবাচার্য্য    
মাধবাচার্য্যকে নিয়ে দ্বন্দ্ব    
চূড়াধারী মাধব প্রসঙ্গে মৃণালকান্তি ঘোষ    
প্রেমবিলাসের রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের পরিচয়    
শ্রীপদমেরুগ্রন্থের সংকলক দ্বিজমাধব
শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল ও শ্রীপদমেরুগ্রন্থের দ্বিজ মাধব কি একই ব্যক্তি ?  
মাধবাচার্য্যের রচনাসম্ভার ও ভণিতা  
বিভিন্ন "মাধব" সম্বলিত ভণিতা ও তার অপভ্রংশ    
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা   
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"    
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .