মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি -                   পাতার উপরে . . .  
১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন
কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . .
“. . .
রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা
তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয়
মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার
অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের
প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই
প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত
করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার
পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন,
মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ
করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ
বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন।
মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা
গাহিয়াছেন।


আমরা
মিলনসাগরে  কবি আলিরাজার বৈষ্ণব পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে  
এই  প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি আলিরাজার মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২৯.১২.২০১৮
এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৪.৫.২০১৯

...
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
কবি আলি রাজা - জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালি থানার অন্তর্গত ওশখাইন গ্রামে, অষ্টাদশ
শতকের শেষভাগে। তিনি “কানুফকির” নামেও প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ ও পদে  
কেয়ামদ্দিন-এর নাম উঠে এসেছে তাঁর গুরু হিসেবে।

সাহা কেয়ামদ্দিন গুরু বংশীনাদে বশ।
আলিরাজা কহে বাঁশী অমূল্য পরশ॥

আলিরাজার দুই পুত্র ও শিষ্য সর্ফতোল্লা ও এর্শাদুল্লা। তাঁরাও বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করেছিলেন।
লি রাজার গান সম্বন্ধে আবদুল কাদিরের উদ্ধৃতি    
আলি রাজার রচনাসম্ভার নিয়ে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যের উদ্ধৃতি   
আলিরাজার নবীর বন্দনার পদ    
আলিরাজার শ্যামা সঙ্গীত    
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্যালের উদ্ধৃতি    
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
এই পাতার কবিতার ভণিতা -
আলিরাজা
.
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জলধর সেন
সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্তিক, ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬),  তাঁর “বৈষ্ণব-কবিগণের
পদাবলী” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
মুসলমান কবিগণ এক-সময়ে কবিতাকারে রাধাকৃষ্ণের প্রেম-বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন,---এখন  এই   
ভেদবুদ্ধির দিনে এ কথা নিতান্ত বিচিত্র বলিয়াই বোধ হইবে। কিন্তু বিচিত্র বোধ হইলেও, তাহা একান্ত সত্য
কথা,---তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। মুসলমান কবিগণ সত্যসত্যই রাধাকৃষ্ণের  প্রেমসুধা-পানে
বিভোর হইয়াছিলেন। সেই সুধাপানে কেহ-কেহ অমরতাও লাভ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের  লীলারস
প্রকটনে অনেকে এমনই তন্ময়চিত্ত হইয়াছিলেন যে, ভণিতাটুকু উঠাইয়া দিলে---কবিতাটি হিন্দুর, কি  
মুসলমানের রচনা, তাহা চিনিয়া লওয়া অসম্ভব বিবেচিত হইবে। জাতিধর্ম্মের ব্যবধানে থাকিয়া একজন  
কবির এরূপ প্রসংশা-লাভ করা সামান্য গৌরবের কথা নহে। সৈয়দ মর্ত্তুজা, নাছির মহাম্মদ, মীর্জ্জা ফয়জুল্লা
প্রভৃতি কবিগণের পদাবলী কবিত্বে ও মাধুর্য্যে যে-কোন হিন্দু বৈষ্ণব-কবির পদাবলীর সহিত তুলনীয়
।”
.
.
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“. . .
বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই
।”
.
আলী রাজার গান সম্বন্ধে আবদুল কাদিরের উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .   
১৯৪৫ সালে প্রকাশিত আবদুল কাদির, রেজাউল করীম সম্পাদিত বাঙ্গালী মুসলমান কবিদের রচিত
কবিতাবলীর সংকলন “কাব্য-মালঞ্চ”, ২৬-পৃষ্ঠায়, আবদুল কাদিদের বাঙ্গালা কাব্যের ইতিহাস প্রবন্ধে তিনি
কবি আলি রাজা সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

অষ্টাদশ শতাব্দীক শেষভাগে চট্টগ্রামের অন্তর্গত ওশখাইন গ্রামে দার্শনিক কবি আলী রাজা জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁহার রচিত পদে আধ্যাত্মিকতার আভাষ সুস্পষ্ট---
সততে বঁধুর লাগি জ্বলে অবলার চিত।
.                হায়, এ কি প্রেম-রীত॥
দূর-দেশী সঞে প্রেম বাড়াইনু অতি।
সেই হৈতে হৈল মোর অনলে বসতি॥
প্রেমের ঔষধ খাই’ হৈলুম উদাস।
জগ-লোকে কলঙ্কিনী বলে বার মাস॥
শ্বাশুড়ী ননদী বৈরী. স্বামী হৈল ভিন্।
আর জ্বালা কালার, সহিমু কত দিন॥
গুরু-পদে আলি রাজা গাহিল কানাড়া।
চিত্ত হৈতে প্রেমানল না হউক ছাড়া॥
এই আধ্যাত্মিকতা এক অস্পষ্ট গুহ্যতত্ত্বের রূপে প্রকাশ পাইয়াছে তাঁহার সুবিখ্যাত “জ্ঞানসাগর” কাব্যে।
তিনি তাহাতে স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন---
সর্ব্বভূত নিরঞ্জন নহে কদাচন।
সর্ব্বভূত হ’তে ভিন্ন নহে নিরঞ্জন॥
আলিরাজার উপর সহজিয়া নিগূঢ় রস-সাধনার প্রভাব যথেষ্ট। তিনি এক স্থানে বলিয়াছেন---
সুখ-দুঃখ ভালো-মন্দ নানা ভঙ্গী করি’।
আপে রঙ্গ চাহে আল্লা লীলা-রূপ ধরি’॥
আপনার মায়ামূলে আপে হই’ বশ।
নানা রূপ ধরি’ প্রভু করে নানা রস॥
আল্লাহ্-রসুলের প্রসঙ্গ “জ্ঞান-সাগরে” আছে বটে ; কিন্তু আসলে যোগ-সাধনার মাহাত্ম্য প্রচারই তাঁহার উদ্দেশ্য
। তিনি লিখিয়াছেন---
কোরাণেতে কহিয়াছে জগত-ঈশ্বরে।
যোগ-পন্থে নরনারী সবে চলিবারে॥
নরনারী সব যদি ফকিরী না করে।
পুণ্যবলে স্বর্গে গেলে না দেখিবে মোরে॥
তাঁহার মতে পুণ্যকর্ম্মের বলে মানবের মোক্ষলাভ ঘটিলেও ঈশ্বরপ্রাপ্তি ঘটে না। প্রেমের পথেই হয় সিদ্ধিপ
বরলাভ---
সিদ্ধিপন্থ গোপন রাখিছে করতার।
সম্মুখে অসার পন্থ হয়েছে প্রচার॥ . . .
আলি-রাজা ভণে ভাষা জ্ঞানের সাগর।
প্রেম-পাঠ বিনু নাহি সিদ্ধি মুক্তি-বর॥
প্রেমের উত্পত্তি ও মুক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে তিনি বলিয়াছেন---
(১)        রূপ বিনু প্রেম নাহি, ভাব বিনা ভক্তি।
.        ভাব বিনু লক্ষ্য নাই, সিদ্ধি বিনা মুক্তি॥
(২)        মদনে পিরীতি জন্মে, প্রেমেতে সন্তাপ।
.        বিরহেতে দুঃখ জন্মে, দুঃখে সিদ্ধি-লাভ॥
বলা অনাবশ্যক যে, এ-সমস্ত উক্তি আমাদিগকে বৈষ্ণবের রস-তত্ত্বই স্মরণ করাইয়া দেয়। তবে সহজিয়ার
জটিল তাত্ত্বিকতার গহনে ডুব দিলেও তাঁহার জ্ঞানদৃষ্টি পরিচ্ছন্ন অথচ ভাবদীপ্ত।

আলী রাজার ধারণা যে, একালের অনেক কবি ও তাপস সেকালের বহু পয়গম্বর হইতেও শ্রেষ্ঠ। কারণ,
‘আগম-নিগম-তত্ত্ব জানে ঋষিগণে’।
শাস্ত্র সব ত্যাগ করি’ ভাবে ডুম্ব দিয়া।
প্রভু-প্রেমে প্রেম করি’ রহিবে জড়িয়া॥
তাঁহার এই মধ্যযুগীয় মনোভাব গোঁড়া ধর্ম্মাচারীদের সমর্থনীয় হইতেই পারে না। তাঁহার মতে, প্রকৃত সাধক
ভিন্ন পয়গম্বরের প্রদর্শিত পথে কেহ অগ্রসর হইতে পারে না, এবং গুরুর অন্ধানুসরণ মুক্তিলাভের অমোঘ
উপায়। বলা বাহুল্য যে, একালেও বহু পীর-পন্থীর মনে এই বিশ্বাস অটুট। আলী রাজার কাব্যে গুরুবাদের
সমর্থন করিয়া এক তত্ত্বসংকুল পরিবেশের সৃষ্টি হইয়াছে। তাঁহার কাব্যের স্থানে স্থানে সন্ধ্যাভাষার ব্যবহার
লক্ষ্যনীয়। এই দিক দিয়া তিনি শেখ ফয়জুল্লাহ্ ও সৈয়দ সুলতানের সগোত্র
। . . .”
.
আলিরাজার নবীর বন্দনার পদ -                                                      পাতার উপরে . . .   
১৯৪৫ সালে প্রকাশিত আবদুল কাদির, রেজাউল করীম সম্পাদিত বাঙ্গালী মুসলমান কবিদের রচিত
কবিতাবলীর সংকলন “কাব্য-মালঞ্চ”, ৩৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। কবির জ্ঞনসাগর গ্রন্থ থেকে।

॥ জ্ঞানসাগর॥

নবী বলে শুন আলী অপরূপ বাণী।
প্রভুর আগম-তত্ত্ব সুরস কাহিনী॥
যেই সবে ভাব তত্ত্বে করিবে খেয়াল।
সব হ’তে শুদ্ধ কাম, প্রভু জানে ভাল॥

অপরূপ সে কখন শুন আলী তুমি।
প্রভুর গোপন রত্ন তত্ত্ব সে কাহিনী॥
এই সব বৃথা নহে শুন শুদ্ধ সার।
মোর পাছে পয়গম্বর না জন্মিব আর॥
মোর পরে হইবেক কবি ঋষিগণ।
প্রভুর গোপন রত্নে বান্ধিবেক মন॥
শাস্ত্র সব ত্যাগ করি ভাবে ডুম্ব দিয়া।
প্রভু-প্রেমে প্রেম করি’ রহিবে জড়িয়া॥
মোর পাছে হ’বে শুদ্ধ ফকির প্রধান।
গুরুর পাইবে দেখা প্রভু নিজ স্থান॥
তার সঙ্গে দেখা করে আপে নিরঞ্জন।
জ্যোতেঃ জ্যোতিঃ মেশামিশি হৈবে ত্রিভুবন॥
তাহার সমান মিত্র ভবে না জন্মিবে।
প্রভুর গোপন রত্ন যোগী সে পাইবে॥
যত কবি ঋষিকুলে, আপে নিরঞ্জনে।
সর্ব্ব হ'তে বড় কৈল এ তিন ভুবনে॥
আগম নিগম তত্ত্ব জানে ঋষিগণে।
শক্তি কেহ নাহি ধরে তাহার সদনে॥
যোগী সবে বড় কৈল জগৎ মাঝারে।
তার সম মিত্র প্রভু না জানে কাহারে॥ --- জ্ঞানসাগর॥
.
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্যালের উদ্ধৃতি -                          পাতার উপরে . . .  
ব্রজসুন্দর সান্যাল তাঁর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি, ৩য় খণ্ড”-এর “জীবনী আলোচনা”-তে লিখেছেন . . .
“ . . .
 ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবির’ বর্ত্তমান খণ্ডে সৈয়দ আলাওল, মীর্জা ফয়জুল্লা, মীর্জা কাঙ্গালী, সৈয়দ  
আইনদ্দিন, নাছির মহম্মদ, সৈয়দ নাছিরদ্দিন, সেরচান্দ বা সেরবাজ, এবাদোল্লা, আবাল ফকির, মোছন আলী,
মহম্মদ হানিফ এবং আলিমদ্দিন,---এই দ্বাদশ জন কবির পদাবলী প্রকাশিত হইল। ইহাঁদের মধ্যে মহাকবি
আলাওলের বৃত্তান্ত পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হইল। অবশিষ্ট কবিগণের সম্বন্ধে আমাদের গবেষণার হুল কিছুমাত্র
প্রবেশ করিতে পারে নাই। প্রাচীন কবিগণ সাহিত্য-সংসারে একান্ত কুহেলিকাচ্ছন্ন। তাঁহাদের  জীবনী  
জানিবার অভিলাষ করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোড়া প্রায় সমানই বটে
!”
.
আলি রাজার রচনাসম্ভার নিয়ে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যের উদ্ধৃতি -             পাতার উপরে . . .   
তাঁর রচনায় আমরা পাই ইসলামী, বৈষ্ণব এবং শাক্ত ভাবধারার প্রবাহ। তাঁর রচনা নিয়ে, ১৯৪৫ সালে
প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” নামক বৈষ্ণব পদাবলী
সংকলনে তিনি লিখেছেন . . .

ইঁহার রচিত নিম্নলিখিত কয়েকখানি গ্রন্থের সংবাদ জানা যাইতেছে---
(১) ‘ধ্যানমালা’ - সঙ্গীত গ্রন্থ, ইহাতে বিভিন্ন রাগরাগিণী ও তালের উত্পত্তি বর্ণিত হইয়াছে এবং দৃষ্টান্তস্থলে
বিভিন্ন কবির এবং স্থলভেদে স্ররচিত এক একটি গীত উদ্ধৃত হইয়াছে ; (২) ‘সিরাজ কুলুপ’ --- দরবেশী গ্রন্থ ;
(৩) ‘জ্ঞানসাগর’ --- দরবেশী গ্রন্থ ; (৪) ‘যোগ কালন্দর’ --- তান্ত্রিক মতের গ্রন্থ এবং (৫) ‘ষটচক্রভেদ’। কবি-
রচিত ৪৬টি রাধাকৃষ্ণ-লীলাপদ ব্রজসুন্দর সান্যালৃসম্পাদিত মুসলমান বৈষ্ণব কবি, দ্বিতীয় খণ্ডে
মুদ্রিত হইয়াছে @। এতদ্ব্যতীত আরও কয়েকটি পদ ‘আলো’, ‘সাহিত্য’ ও ‘সাহিত্য সংহিতা’ পত্রিকায় এবং
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ-সম্পাদিত ‘প্রাচীন পুঁখির বিবরণে’ স্থান পাইয়াছে
।”

@ - দুর্ভাগ্যবশত আমরা এই গ্রন্থটি যোগার করে উঠতে পারি নি। আমাদের কাছে ওই গ্রন্থের কেবল ৩য়
খণ্ডটি আছে। অন্যান্য গ্রন্থ ও প্রবন্ধাদি থেকে আমরা ১৭টি পদ যোগার করে তুলতে সক্ষম হয়েছি।
.
॥ গীত - মালশী॥

করুণাদধি(১) নানান বরণী শ্যামা কালী॥ ধ্রু।
তুমি নারায়ণ হরি,               তুমি হর ব্রহ্মা গৌরী,
দেবের দেবতা তুয়া মূল।
অষ্ট লোকে পরিহার,               রাতুল চরণে যার,
শরণ মাগে দেবকুল॥
তুমি গুরু মাতা পিতা,            ত্রিলোক পরমদাতা,
তারিণী করুণাসিন্ধু সার।
জগত রুদ্রাণী তনু,              শিব লীলা রাধা কানু,
সত্ত্বঃ রজঃ তমঃ শক্তি যাক॥
হীন আলি রাজা বোলে,            শ্যামকালী পদতলে,
শক্তি লীলা শঙ্কর-ঘরিণী।
সূরবংশী হর গৌরী,             চন্দ্র অংশী রাধা হরি,
তত্ত্বরূপী নবীন যৌবনী॥

১ - করুণাদধি - কুণোদধি, করুণা-সাগর।
আলিরাজার শ্যামা সঙ্গীত -                                                              পাতার উপরে . . .   
এই পদ দুটি নৃসিংহচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “সাহিত্য সংহিতা” পত্রিকার আষাঢ় ও শ্রীবণ,
১৩০৮ সংখ্যায় (জুন ও জুলাই ১৯০১), আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের “অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী”
প্রবন্ধে, ধারাবাহিকভাবে, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ গীত - শুদ্ধ মালশী॥

কালিকার মহালীলা ভয়ে কাঁপে
দেবগণ শৈল সিন্ধু শিলা॥ ধ্রু।
অষ্ট অলঙ্কার চণ্ডী করি পরিধান।
মহানন্দে লৈল গৌরী যুদ্ধের সাজান॥
সিংহ আরোহণ কালী হস্তেত কৃপাণ।
সুরবর্ণ ত্রিনয়নী সমরে পয়ান॥
যুদ্ধে প্রবেশিল দেবী মন্দ মন্দ হাসি।
রক্তপানে মত্ত অসুর কাটে রাশি রাশি॥
মুক্তকেশে ভবানী দাণ্ডাই শিব বক্ষে।
নাচে পাগলরূপে, অসুর নাশে লক্ষে লক্ষে॥
শিশু আলি রাজা ভণে শ্যামকালিকাদাস।
জগমোহনী লাল-চরণী ত্রিলোক-বিনাশ॥