কবি সুনন্দা গুহ রায় - জন্মগ্রহণ করেন পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশের) ঢাকায়, মামার বাড়িতে।
পিতৃনিবাস রাজশাহী। অতীতে ওঁরা ছিলেন বর্ধিষ্ণু জমিদার পরিবার। কবির বাল্যকাল কেটেছে রাজশাহীর
ভবানীপুরে। তাই তিনি আজীবন ছিলেন তাঁরই কথায়, মনেপ্রাণে ‘বাঙাল’-ই। বাল্যকালেই দেশভাগের সময়
পূর্ববাংলা থেকে সপরিবারে ‘ছিন্নমূল’ হন। অভিজাত ভূস্বামী বংশের সুখ-সচ্ছলতা, স্বজন-পরিজন,
ভিটেমাটি, সর্বস্ব হারিয়ে বাবা-মা, ছোটোভাই ও বোনেদের সাথে পা বাড়াতে হয় এপার বাংলার অনিশ্চিত
ভবিষ্যতের পথে।

এর পরে কবির বাল্য ও কৈশোর কেটেছে অজয় নদের ধারে বধর্মানের পাণ্ডবেশ্বর গ্রামে। বাবা  
শচীন্দ্রকুমার চৌধুরী ছিলেন ছাত্রদরদি শিক্ষক, অত্যন্ত সৎ, সদাশয় ও বিদগ্ধ মানুষ। ইংরাজি ভাষা ও
সাহিত্যের কৃতবিদ্য ছাত্র হিসাবে এম.এ. পাশ করেন। কর্মজীবনে দেশভাগের আগে ও পরে, ওপার বাংলা ও
এপার বাংলার গ্রামাঞ্চলে ও আধা-মফস্বলের অনেক স্কুলেই তিনি শিক্ষকতা করেছেন। অবসর জীবন পর্যন্ত
এপার বাংলার সব স্কুলেই তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন একজন অনন্যসাধারণ শিক্ষাব্রতীর
কুশলী কর্মনিষ্ঠায়। ইংরাজিতে তাঁর ছিল প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য। কিন্তু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ জীবনযাপনের সারল্য ও
অসামান্য বিনম্রতা তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বকে আরও মহিমান্বিত করে। মা রেণুকা চৌধুরীও নিতান্ত  
আটপৌরে ‘গৃহবধূ’ জীবনে অভ্যস্ত হলেও অত্যন্ত বিদুষী, উদারচেতা ও বহুগুণসম্পন্না ছিলেন। বাংলা ও
ইংরাজি ভাষা, সাহিত্য ছাড়াও বিবিধ বিষয়েই একনিষ্ঠ পঠনপাঠনে তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডারও ছিল পরিপূর্ণ।
আই.এ. পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে তিনিও বিয়ের আগে শিক্ষকতা করতেন। এছাড়া গান, নাচ, কবিতা
লেখা, সাহিত্যচর্চা, খেলাধুলো, অভিনয়, সূচীকর্ম, রন্ধন – সবেতেই মা ছিলেন সমান পারদর্শিনী। কবির বাবা-
মা দুজনেই, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী মহলে, প্রতিবেশীদের কাছে সহজ-সরল,
সদাচারী, বিনয়ী স্বভাবের, পরহিতাকাঙ্ক্ষী, সহৃদয় মানুষ হিসাবে সুখ্যাত ছিলেন।

সুপণ্ডিত ও আদর্শ শিক্ষক বাবা এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী ও প্রতিভাময়ী মায়ের  সুযোগ্যা
কন্যা সুনন্দা ছেলেবেলা থেকেই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করেন। পাণ্ডবেশ্বরে যে কো-
এডুকেশন হাইস্কুলে তিনি ক্লাস সেভেন অবধি মেধাবী ছাত্রী হিসাবে পড়াশোনা করেন, সেই স্কুলের প্রধান
শিক্ষক ছিলেন বাবা। স্কুলের গ্রন্থাগারিক কবির প্রিয় ‘সুধীরকাকু’র স্নেহচ্ছায়ায় পাঠাগারের দুয়ার  সদা
উন্মুক্ত ছিল তাঁর কাছে। তাই বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ও দেশবিদেশের সাহিত্যের বঙ্গানুবাদের সাথে
বাল্যকাল থেকেই তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ও গভীর ভালোবাসা গড়ে ওঠে। ছড়া ও কবিতার সঙ্গেও তাঁর  
আশৈশব সখ্যতা। সাতাত্তর বছর পেরিয়ে জীবনাবসানের আগে অবধি কবি তাঁর নিরলস সাহিত্যসাধনা
থেকে কখনও বিরত হননি।

এদেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো বাংলার সমাজ-সাংস্কৃতিক বাতাবরণ আবহমানকাল ধরে যে পিতৃতান্ত্রিক
ভাবধারার অন্ধকারে নিমজ্জিত, একথা ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিকদের গবেষণায় জানা যায়। ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর, ডেভিড হেয়ার, বেথুন সাহেব, মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ আরও অনেক মুক্তচিন্তক সমাজ
সংস্কারকদের উদ্যোগে বাংলায় স্ত্রী-শিক্ষার প্রচলন ও বিস্তারের প্রায় ১০০ বছর পরেও সদ্য ‘স্বাধীনতা’প্রাপ্ত
ভারতের শহর, শহরতলি ও গ্রামে-গঞ্জে তখনও মেয়েদের পড়াশুনোর ব্যাপারে যথেষ্ট অনাগ্রহ ছিল। আমরা
জানি, রক্ষণশীল বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক ঘরেই মেয়েদের লেখাপড়া না শিখিয়ে  
তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চল ছিল। সেকালে নারীমুক্তি ও নারীশিক্ষার সুচেতনার আলো থেকে  
শতসহস্র যোজন দূরে থাকা বহু ‘শিক্ষিত’ মানুষও শিক্ষার অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করে  
অন্দরমহলের বন্ধ কারার অন্ধকারে রেখে দিতেন। এমন কি স্বয়ং
বিদ্যাসাগরের সহধর্মির্ণী দীনময়ী দেবীরও
যে সাক্ষরতা লাভ করে লেখাপড়া শেখার প্রবল ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে গেছিল, সেই মর্মন্তুদ করুণ কাহিনিও  
আমাদের অজানা নয়। মেয়েদের শিক্ষিত করে তুললে তাঁরা ‘গাহর্স্থ্য ধর্ম’ পালন না করে ‘অলক্ষ্মী’ হয়ে সমাজ-
সংসারের  ‘অনিষ্ট’ ও ‘অকল্যাণ’ ঘটাবেন, এমন মধ্যযুগীয় অন্ধ কুসংস্কারে তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’লাভের  
পরও গ্রাম-নগরের শ্রেণী-নির্বিশেষে অধিকাংশ বাঙালি মানস আচ্ছন্ন ছিল। তাই আরও অনেক বঙ্গ-তনয়ার
মতো শৈশবের দিনগুলিতে কবিরও প্রথাগত শিক্ষালাভ ও সাহিত্যচর্চার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না।

প্রাচীনপন্থী বাবা গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হলেও মেয়েদের বিদ্যালাভের বিষয়ে যারপরনাই উদাসীন
ছিলেন। তাই মায়ের আন্তরিক আগ্রহ, উৎসাহ ও সহযোগিতা থাকলেও বড়ো মেয়ে ভবানী (কবির ডাকনাম)
ও তাঁর প্রথম দুই বোন শিবানী ও ইন্দ্রাণীর খুব বেশিদিন প্রথাগত শিক্ষালাভের সুযোগ হয়নি। এছাড়াও  
এগারোজন ভাইবোনের বড়ো সংসারে সুনন্দাই ছিলেন জ্যেষ্ঠা কন্যা। তাই ভালো করে শাড়ি পরতে শেখার
আগেই ছোটো ভাইবোনদের দেখাশোনা করা এবং নিদারুণ অভাবের সংসারে গৃহস্থালির কাজে মায়ের
পরিশ্রম লাঘবের জন্য, মা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলে কিংবা ভাইবোনের জন্মের সময় মায়ের মুমূর্ষু  
অবস্থায় ঘরগেরস্থির বেশ কিছু গুরুদায়িত্ব মাঝেমধ্যেই তাঁর ও তাঁর মেজো ও সেজো বোনের ছোট্টো ছোট্টো
কাঁধেই এসে পড়ত। মেয়েদের পড়াশোনা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে সদা-সচেতন মায়ের একা হাতে সব
কাজ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও, মা তাঁর হৃদয়ের অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে অসহায়ভাবে মেয়েদের এই কষ্ট
দেখতে বাধ্য হয়েছেন। মাঠেঘাটে রোদে পুড়ে খেলাধুলো করার বয়সেই, কখনোসখনো হেঁশেলের উনুনের
আঁচে পুড়তে হয়েছে সুনন্দাদের। বারবার জননী-যন্ত্রণায় পীড়িতা মাকে সেবাশুশ্রূষা ও নবজাতক  
ভাইবোনদের দেখভাল করতে হত। হাতের কলম রেখে তুলে নিতে হত রান্নার খুন্তি বা ভাইবোনদের দুধের
বোতল। তবুও তিনি কখনোই অন্তঃপুরিকা ছিলেন না। সংসারের সব দায়দায়িত্ব সামলে স্কুলে যেতেন।  
লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তেন। চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স থেকেই কবিতা লিখতেন।

বাংলাদেশে  বুনিয়াদি  শিক্ষালাভের  পরে পাণ্ডবেশ্বর গ্রামে ‘জারাও ইনস্টিটিউশন’-এ তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি
হন। কিন্তু অত্যন্ত কৃতী ছাত্রী হয়েও সপ্তম শ্রেণীতে ওঠার পর তাঁর প্রথাগত পঠনপাঠনের পাট চুকল।  
মায়ের প্রেরণা ও ইচ্ছায় কলকাতায় মাতুলালয়ে পড়াশুনো করার জন্য চলে এলেও পারিবারিক চাপে মাত্র
ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেল এক কুলীন কায়স্থ বংশে।
আশাপূর্ণা দেবীর প্রবাদপ্রতিম উপন্যাস  
ট্রিলজির দ্বিতীয় ভাগ ‘সুবর্ণলতা’-র সত্যবতী-নন্দিনী সুবর্ণ’র সঙ্গে কবি সুনন্দা গুহ রায়ের বাস্তব জীবনের এ
এক আশ্চর্য সাদৃশ্য!

গল্পের ‘সুবর্ণ’র মতো সুনন্দার বিবাহোত্তর জীবনও সুখের ও স্বস্তির ছিল না। জীবনসাথী সমরেন্দ্রনাথ গুহ
রায় আর্থিকভাবে সংসারের দায়দায়িত্ব পালনে এবং স্নেহশীল বাবা হিসাবে ছেলেমেয়ের প্রতি তাঁর  
কর্তব্যকর্মে কোনওরকম অবহেলা না করলেও, স্ত্রীর প্রতি যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন। নবপরিণীতা সুনন্দার সব
স্বপ্ন অচিরেই ভেঙে গেল। উজাড় করা  ভালোবাসা  দিতে চেয়ে  পেলেন  উপেক্ষা, অনাদর, অবজ্ঞা ও
অমর্যাদা। গোঁড়া রক্ষণশীল শ্বশুরালয়ে বালিকা-বধূর প্রতি স্নেহ-সহানুভূতি তো ছিলই না, বরং
লাঞ্ছনা-গঞ্জনা,  অবহেলা-অত্যাচার করতেও তাঁরা কুণ্ঠিত হতেন না। ওঁদের এই নিষ্করুণ ব্যবহার, প্রথম
জীবনে সংসারের তীব্র অভাব-অনটন, যন্ত্রণাদীর্ণ মন নিয়েও অমানুষিক অক্লান্ত পরিশ্রম – কোনও বাধাই
কবির  সাহিত্যসাধনাকে প্রতিহত করতে পারেনি। অদম্য মনোবল ও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে জীবনভর লড়াই
করেছেন। দুঃখে-বেদনায় অস্থির হয়েছেন, কিন্তু জীবনযুদ্ধে কখনো হার মানেননি। রক্ষণশীল পরিবারের
মধ্যেও কন্যা সোমা ও পুত্র সন্দীপকে সুশিক্ষিত ও প্রগতিশীল করে মানুষ করেছেন। মায়ের প্রেরণায় তাঁরা
দু’জনেই জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। দুর্গাপুরে শিক্ষকতা করেন। পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ ঝুমা ও আদরের দুই নাতনি
বসুন্ধরা ও তনুশ্রীকে নিয়ে পরিপূর্ণ সংসারে কাজের পাশাপাশি তাঁর শিল্পী ও সাহিত্য-প্রতিভা শতদলে
বিকশিত হয়েছিল। গান, নাটক, কবিতা, গল্পে কবি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ,
‘আত্মা’র শান্তি।

কবির আরেক পরিচয়, তিনি একজন সুগায়িকা। শৈশবে মায়ের কাছেই গানের হাতেখড়ি। রেডিও ও  
গ্রামোফোনে গানের রেকর্ড শুনে শুনে নিজে নিজেই গান তুলতেন। বিয়ের পর কলকাতায় থাকাকালীন  
কসবার সংগীত শিক্ষালয় ‘ছন্দবাণী’ ও বালিগঞ্জের ‘গীতবিতান’-এ কিছুদিন রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নেন।
মধুরকন্ঠী এই শিল্পী রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদী, কীর্তন, ভজন, লোকসংগীত থেকে আধুনিক ও
ছায়াছবির গান – সবেতেই অনায়াস দক্ষতায় পারঙ্গম ছিলেন। স্থানীয় জলসা ও ঘরোয়া আসরে গান শুনিয়ে
বহু শ্রোতাকে মুগ্ধ করলেও কখনো প্রচারের আলোতে আসেননি।কলকাতার কসবার বাসায় এক সন্ধ্যায়  
প্রখ্যাত গায়ক পঙ্কজ মল্লিকের গান শোনার সুমধুর অভিজ্ঞতা ওঁর স্মৃতিপটে চিরভাস্বর ছিল। কলকাতার  
ল্যান্সডাউনে মেজোমামা পরিমল ধর-এর বাসভবনে আয়োজিত এক ‘মেহফিল্‌’-এ উস্তাদ বড়ে গুলাম  আলি
খাঁ সাহেব-এর সংগীতমুখর সন্ধ্যার উজ্জ্বল স্মৃতি তাঁর জীবনের আরেক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

কবির জীবনাবসানের মাত্র কয়েকমাস আগে তাঁর বোনঝি গণসংগীতশিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর
সংগীতপ্রেমী বন্ধু স্বপন বিশ্বাস-এর উদ্যোগে ‘রেডিও লিটারারি’
(Radio Literary) নামে একটি ‘ইন্টারনেট
রেডিও’তে কবির কণ্ঠে একটি আধুনিক গান সম্প্রচারিত হয় এবং শ্রোতাদের কাছে বহুল-প্রশংসিত হয়।

১৯৮০-র দশকে চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে দুর্গাপুরের লোকপ্রিয় ‘কল্লোল থিয়েটার গ্রুপ’-এ তাঁর অভিনয় জীবনের
শুরু। ‘কল্লোল’ নাট্যগোষ্ঠীর নির্দেশক ছিলেন
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র প্রমুখের স্নেহধন্য  
বিশিষ্ট পরিচালক অনিল বন্দ্যোপাধ্যায়। নাট্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ‘কল্লোল থিয়েটার গ্রুপ’   
পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রথম পুরস্কার লাভ করে। মনোজ মিত্রের ‘সাজানো বাগান’, ‘রাজদর্শন’ প্রভৃতি
মঞ্চসফল নাটকে সুনন্দা তাঁর উজ্জ্বল নাট্যপ্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ‘নবকল্লোল’ পত্রিকায় তাঁর অভিনয়  
প্রতিভা ভূয়সী প্রশংসিত হয়। ১৯৯৪ সালে কলকাতার গিরীশ মঞ্চে শ্যামাকান্ত দাসের লেখা ‘গুলশন’ নাটকে
অভিনয় করে মহানগরীর দর্শকদের মন জয় করেন। দুর্গাপুরে নাট্য প্রতিযোগিতায় ‘সাজানো বাগান’ নাটকে
অসাধারণ অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন। পঙ্কজ মুন্সীর মতো খ্যাতনামা  
নাট্যব্যক্তিত্বের প্রশংসাও লাভ করেছেন।

কবির আরেকটি চমৎকার শিল্পকৃতির দিক হল, তিনি নানা রঙের ফুল-লতাপাতা সাজিয়ে জাপানি শৈলীর
নয়নশোভন ও মনোমুগ্ধকর অনিন্দ্যসুন্দর ‘ইকেবানা’ বানাতে পারতেন। কৈশোর-যৌবনকাল পেরিয়ে
প্রৌঢ়ত্বের গোধূলিবেলায় ও বার্ধক্যের সায়াহ্নে এসেও তাঁর সৃজনশীল ও সাহিত্যানুরাগী মন নব নব সৃষ্টির
আনন্দে মেতে উঠেছিল বারবার। জরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও কখনও হতাশ ও বিষাদক্লিষ্ট হননি।

সংসারের দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততার মাঝে ক্ষণিক অবসরে ছিল কবির নিভৃত কাব্যচর্চা। দুঃখে-সুখে,
আনন্দে-বেদনায় কবিতাই ছিল তাঁর আশ্রয়। ছোটোবেলা থেকেই রবীন্দ্র-ভক্ত। কবিগুরুই তাঁর ‘নিভৃত  
প্রাণের দেবতা’।  
মাইকেল মধুসূদনের জীবন ও কাব্য কবিকে আবেগাপ্লুত করত। অন্নদাশংকর রায়,
সুনির্মল বসু, সুকুমার রায় ও একালের ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ছিলেন তাঁর প্রিয় ছড়াকার। নারীমুক্তির
আলোর দিশারী দুই যুগপ্রবর্তক
রামমোহনবিদ্যাসাগর কবির আদর্শ মনীষী। জীবনে তিনি অনেক
গুণীজনেরও সান্নিধ্য লাভ করেছেন। প্রখ্যাত কবি অনুজপ্রতিম
কমলেশ সেনের তিনি ছিলেন পরমপ্রিয়,
পরমশ্রদ্ধেয় ‘বউদি’।

কবির জীবদ্দশায় স্থানীয় পত্রপত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতেও তাঁর
কবিতা ছাপা হয়েছে। মণিমুক্তোর মতো অমূল্য সেইসব ছড়ানো ছিটোনো ছড়ার মালা গেঁথে কবির প্রথম
ছড়ার বই ২০০৬ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘কলকাতা বইমেলা’য় প্রকাশিত হয়। বইমেলার ‘মঁমার্ত’ মুক্তমঞ্চে
বইটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন একালের স্বনামধন্য সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। ছোটোদের প্রকাশনী
সংস্থা ‘কুট্টুস’ থেকে প্রকাশিত ‘সোনাঝরা শৈশব’ নামে এই ঝকঝকে সুন্দর বইটিতে কবির ডায়েরিতে লেখা
অসংখ্য ছড়ার মধ্যে থেকে স্ব-নির্বাচিত আঠারোটি ছড়া দুই মলাটের মধ্যে সংকলিত হয়েছে। ছড়াগুলির
মধ্যে দিয়ে শিশুদের সাথে কবির নিবিড় একাত্মতার ভাবটি চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। বইটির প্রচ্ছদ,
অলংকরণ ও অঙ্গসজ্জা করেছিলেন কবির বোনপো এই জীবনচরিতের লেখক। অঙ্গসজ্জা পরিকল্পনা ছিল
সোনালী মান্নার।

শিশুদের সাথে কবির ছিল চিরকালের ভালোবাসা। দুর্গাপুরের এবিভি কলোনিতে থাকার সময় ওখানকার
ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে ‘বনফুল’ নামে একটি সাংস্কৃতিক দল গড়ার সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
সে-সময় প্রতি বছর নিয়মিতভাবে সেখানকার আঞ্চলিক সভাগৃহগুলোতে শিশুদের এই ‘বনফুল’ দলটি নাচে-
গানে-আবৃত্তিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করত।

১৯৪৭-এর দেশভাগে নিজের ছেলেবেলা বড়ো তাড়াতাড়িই তাঁকে ছেড়ে যায়। কঠিন বাস্তবের সাথে লড়াইয়ে
অকালে হারিয়ে যায় সোনালি শৈশবের দিনগুলি। নিজের সেই দুঃখ ভোলার জন্যই হয়তো স্নেহের স্বজন
সিমি, সোনাই, রিমি, রাই, বুতানের মতো আরও অনেক ছোটোদের জন্য ছড়া লিখে যান। শেষ বয়সেও ভগ্ন-
স্বাস্থ্য ও বাত-ব্যাধিকে উপেক্ষা করে আদরের দুই নাতনি তনুশ্রী ও বসুন্ধরার সাথে গানে-গল্পে-খেলার ছলে
কবির চিরসবুজ, চিরনবীন মন ফিরে ফিরে যেত ওপার বাংলায় ‘ছায়ার ঘোমটা মুখে টানা’ ভবানীপুর গ্রামে
ফেলে আসা ‘সোনাঝরা শৈশব’-এ। আঁখিপাতা বুজলে চোখের সামনে জলছবির মতো ভেসে উঠত গ্রামের
শান্ত নদী, খাল, বিল, পুকুর, গাছগাছালি, ফুল-ফল, পাখপাখালিতে ভরা সুন্দর শৈশব। ছোটোদের মধ্যেই
কবি খুঁজে পেতে চাইতেন তাঁর হারানো শৈশবকে। তাইতো লেখেন –

‘চাই না মোতির মালা,
সোনাদানা ওই সব।
বারে বারে দাও ফিরে
সোনাঝরা শৈশব।’

২০১৫ সালের ১০ এপ্রিল। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় কবির জীবনসঙ্গী সমরেন্দ্রনাথ
গুহ রায়-এর জীবনাবসান
হয়। কবির বৈবাহিক জীবন সুখের ছিল না, কারণ তাঁর জীবনসাথীকে কখনোই প্রাণের সাথী, মনের সাথী,
সৃজনের সাথী রূপে পাননি। তাঁর জীবনের ‘তার ছিঁড়ে গেছে’ বারবার, ‘সুর হারায়ে গেছে পলে পলে’।
আজীবন ‘ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে’ তিনি ছিলেন বঞ্চিতা, রিক্তা, একাকিনী।
রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রা’
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার ভাষায়,

‘জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে
.      তুমি বিচিত্ররূপিণী।
অন্তরমাঝে শুধু তুমি একা একাকী
.      তুমি অন্তরব্যাপিনী।...
ধীর গম্ভীর গভীর মৌনমহিমা,
স্বচ্ছ অতল স্নিগ্ধ নয়ননীলিমা
স্থির হাসিখানি উষালোকসম অসীমা,
.      অয়ি প্রশান্তহাসিনী।
অন্তরমাঝে তুমি শুধু একা একাকী
.      তুমি অন্তরবাসিনী।’

মনের তারে তারে কোনও মিল না থাকা সত্ত্বেও, সুদীর্ঘ ষাট বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসানে জীবনসাথীর
চিরবিদায়ে কী যেন এক অনির্বচনীয় বেদনার অনুভূতিতে, এক অনুচ্চকিত বিষাদময়তায় তিনি দীর্ণ  
হয়েছিলেন! তাঁর আবেগপ্রবণ, সংবেদনশীল হৃদয়তন্ত্রীতে জীবন-নিশীথের করুণ মালকোষ রাগে কী বেজে
উঠেছিল কোমল গান্ধার ও কোমল নিষাদের অস্ফুট মরমি মূর্ছনা?

২০১৬-র ৪ জুন, কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জীবনাবসানের মাত্র মাস তিনেক আগে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬-
তে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘আবাদভূমি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর জীবনে ছাপার  
আখরে দু’টি শেষ কবিতা ‘পরান কাঁদে ভাই’ ও ‘নস্ট্যালজিয়া’।

আমার প্রিয় বড়োমাসি, কবি সুনন্দা গুহ রায়ের অমর, অমলিন স্মৃতির প্রতি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য
ও প্রণাম জানাই।
– রাজেশ দত্ত, চন্দননগর, ২০ মার্চ, ২০১৮


আমরা কৃতজ্ঞ
কবি রাজেশ দত্তর কাছে যিনি কবির এই ছবি, কবিতা ও কবি-পরিচিতি আমাদের  
পাঠিয়েছেন। সবটাই তিনি নিজে বাংলায় টাইপ করে পাঠিয়েছেন। মিলনসাগরে কবি রাজেশ দত্তর কবিতার
পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .

মিলনসাগরে  কবি সুনন্দা গুহ রায়ের কবিতা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার
সার্থকতা।



উত্স - এই কবির কবিতা ও পরিচিতি, কবি রাজেশ দত্তর নিজের হাতে বাংলায় টাইপ করে পাঠানো।   


কবি সুনন্দা গুহ রায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ০৯.১০.২০১৮।
...