মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি -                   পাতার উপরে . . .  
১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন
কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . .
“. . .
রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা
তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয়
মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার
অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের
প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই
প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত
করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার
পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন,
মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ
করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ
বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন।
মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা
গাহিয়াছেন।


আমরা
মিলনসাগরে  কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের বৈষ্ণব পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।


কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ২২.৪.২০২০

...
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
কবির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন হেতু আমরা এই পাতায় তাঁর পদবীর বানান “সান্ন্যাল” রাখছি। ঠিক তিনি
যে বানানটি ব্যবহার করতেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ “চণ্ডীদাস চরিত” এর বিজ্ঞাপন (ভূমিকা) এর শেষে তিনি তাঁর ঠিকানা ঘোড়ামারা,
রাজশাহী লিখেছিলেন। এই ঠিকানাই তাঁর সম্পাদিত “উত্সাহ” পত্রিকাটি এবং “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”
সংকলন (৩ খণ্ডে) দেওয়া রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের জীবনী আমরা কোনও চরিতাভিধান গ্রন্থে খুঁজে পাই নি। কবির একটি
ছবি ও তাঁর জীবনী যদি কেউ আমাদের লিখে পাঠান তাহলে আমরা প্রেরকের প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করবো
এই পাতায়

ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের রচনাসম্ভার     
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”-র ৩য় খণ্ডের "ভূমিকা"   
“মুসলমান বৈষ্ণব কবি” ৩য় খণ্ডের "জীবনী আলোচনা" থেকে   
ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল কি ‘সাহিত্য সংহিতা’ সম্পাদনা করেছিলেন?   
কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের কবিতা    
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
মুসলমান কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের উদ্ধৃতি    
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
.
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জলধর সেন
সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্তিক, ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬),  তাঁর “বৈষ্ণব-কবিগণের
পদাবলী” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
মুসলমান কবিগণ এক-সময়ে কবিতাকারে রাধাকৃষ্ণের প্রেম-বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন,---এখন  এই   
ভেদবুদ্ধির দিনে এ কথা নিতান্ত বিচিত্র বলিয়াই বোধ হইবে। কিন্তু বিচিত্র বোধ হইলেও, তাহা একান্ত সত্য
কথা,---তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। মুসলমান কবিগণ সত্যসত্যই রাধাকৃষ্ণের  প্রেমসুধা-পানে
বিভোর হইয়াছিলেন। সেই সুধাপানে কেহ-কেহ অমরতাও লাভ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের  লীলারস
প্রকটনে অনেকে এমনই তন্ময়চিত্ত হইয়াছিলেন যে, ভণিতাটুকু উঠাইয়া দিলে---কবিতাটি হিন্দুর, কি  
মুসলমানের রচনা, তাহা চিনিয়া লওয়া অসম্ভব বিবেচিত হইবে। জাতিধর্ম্মের ব্যবধানে থাকিয়া একজন  
কবির এরূপ প্রসংশা-লাভ করা সামান্য গৌরবের কথা নহে। সৈয়দ মর্ত্তুজা, নাছির মহাম্মদ, মীর্জ্জা ফয়জুল্লা
প্রভৃতি কবিগণের পদাবলী কবিত্বে ও মাধুর্য্যে যে-কোন হিন্দু বৈষ্ণব-কবির পদাবলীর সহিত তুলনীয়
।”
.
.
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“. . .
বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই
।”
.
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের উদ্ধৃতি -                          পাতার উপরে . . .  
ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল তাঁর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি, ৩য় খণ্ড”-এর “জীবনী আলোচনা”-তে লিখেছেন . . .
“ . . .
 ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবির’ বর্ত্তমান খণ্ডে সৈয়দ আলাওল, মীর্জা ফয়জুল্লা, মীর্জা কাঙ্গালী, সৈয়দ  
আইনদ্দিন, নাছির মহম্মদ, সৈয়দ নাছিরদ্দিন, সেরচান্দ বা সেরবাজ, এবাদোল্লা, আবাল ফকির, মোছন আলী,
মহম্মদ হানিফ এবং আলিমদ্দিন,---এই দ্বাদশ জন কবির পদাবলী প্রকাশিত হইল। ইহাঁদের মধ্যে মহাকবি
আলাওলের বৃত্তান্ত পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হইল। অবশিষ্ট কবিগণের সম্বন্ধে আমাদের গবেষণার হুল কিছুমাত্র
প্রবেশ করিতে পারে নাই। প্রাচীন কবিগণ সাহিত্য-সংসারে একান্ত কুহেলিকাচ্ছন্ন। তাঁহাদের  জীবনী  
জানিবার অভিলাষ করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোড়া প্রায় সমানই বটে
!”
কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল - পিতা  
বরদাগোবিন্দ  সান্ন্যাল।  কবি  রাজশাহী  
জেলার ঘোড়ামারার বাসিন্দা ছিলেন। ১৩১১
বঙ্গাব্দে  (১৯০৪ খৃষ্টাব্দ)  রচিত  'চণ্ডীদাস  
চরিত' গ্রন্থটি তিনি তাঁর পিতা বরদাগোবিন্দ
সান্ন্যালকে   উত্সর্গ   করেছিলেন।  কবি  
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের জীবন সম্বন্ধে আমাদের
কাছে আর বিশেষ কোনও তথ্য নেই। তাঁর
বৈষ্ণব পদাবলী ও সাহিত্যের অন্যান্য দিকে
অকল্পনীয়   অবদানের   জন্যই   আমরা  
মিলনসাগরে তাঁর এই কবিতার পাতাটি  
তৈরী করেছি, যাতে স্মৃতি-বিমুখ বাঙালী  
জাতি যাতে তাঁর আবদান ভুলে যেতে না  
পারে।
.
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের রচনাসম্ভার -                                                       পাতার উপরে . . .  
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের রচনাসম্ভারে রয়েছে তাঁর ১৯০৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ “চণ্ডীদাস চরিত”, শিশুদের  
কৌতুকপূর্ণ হাস্যোদ্দীপক শিক্ষাপদ গল্পের পুস্তক “আজগুবি গল্প” (১৯০৪)।  

তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “মুসলমান বৈষ্ণব কবি” সংকলন ৩ খণ্ডে। এই সংকলনের ৩য় খণ্ডটি
১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।  “মুসলমান বৈষ্ণব কবি” সংকলনের আরও কোনও খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল
কি না আমাদের জানা নেই।  আরও রয়েছে তাঁর সম্পাদিত ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হরিচরণ দাস বিরচিত
“শ্রীশ্রীঅদ্বৈতমঙ্গল”।

ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের সম্পাদিত পত্রিকার মধ্যে রয়েছে, তাঁর বাসস্থান ঘোড়ামারা, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত,
“উত্সাহ” পত্রিকা। ১৮৯৭ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত “উত্সাহ” পত্রিকার সংখ্যাগুলি  আমাদের দেখার সৌভাগ্য
হয়েছে। পত্রিকার ঐ ৫টি বছরের প্রকাশনা
জার্মানীর ক্রসএশিয়া ওয়েব আর্কাইভে  রক্ষিত আছে।  
ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে যে এই পত্রিকাটির সম্পাদনা করেছেন সুরেন্দ্রচন্দ্র সাহা এবং ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল।
কেবল ১৯০৫ সালের পত্রিকাটির প্রথম পাতাটি সুরক্ষিত রয়েছে, যেখানে সম্পাদকের নাম “ব্রজসুন্দর  
সান্ন্যাল” পড়া যাচ্ছে। এছাড়া অন্য সব সংকলনে সম্পাদকের নাম উল্লিখিত পাতাগুলি নেই। কালের নিয়মে
নষ্ট হয়ে গিয়েচে। তাই আমরা  বলতে পারছি না যে, কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল “উত্সাহ” পত্রিকাটি ক’বছরের
জন্য বা কোন কোন বছর  সম্পাদনা করেছিলেন।

আমাদের জানা, কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অল্প হলেও, তাঁর বৈষ্ণব পদাবলী ও  
কবিওয়ালা সংক্রান্ত বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বহু পত্র-পত্রিকায়। আমরা যে যে প্রবন্ধের সন্ধান পেয়েছি,
তার একটি তালিকা নিচে তুলে দেওয়া হলো . . .

“নব্যভারত” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩১০ সংখ্যায় চণ্ডীদাস (১), চৈত্র ১৩১০ সংখ্যায় চণ্ডীদাস (২), জ্যৈষ্ঠ ১৩১১
সংখ্যায় চণ্ডীদাস (৩), ভাদ্র ১৩১১ সংখ্যায় চণ্ডীদাস (৪) এবং আশ্বিন ১৩১১ সংখ্যায় চণ্ডীদাস (৫) প্রবন্ধাবলী
প্রকাশিত করেন।
“নব্যভারত” পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩১৪ (মে ১৯১০) সংখ্যায় “কবিওয়ালা সাতুরায়” প্রবন্ধ।
“নব্যভারত” পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৪ (মে ১৯১৭) সংখ্যায় প্রকাশিত “জনসাধারণ শিক্ষা” প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধটি
বরানগর নিবাসী রায় যতীন্দ্রনাথ চৌধুরী দ্বারা ৩০টাকা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল।
নৃসিংহচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সুবলচন্দ্র মিত্র সম্পাদিত “সাহিত্য সংহিতা” পত্রিকার আষাঢ় ১৩১২ (জুন ১৯০৫)
সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় তাঁর “কবির ইতিহাস” প্রবন্ধাবলী। ভাদ্র ১৩১২ (অগাস্ট ১৯০৫),
অগ্রহায়ণ ১৩১২ (নভেম্বর ১৯০৫), শ্রাবণ ১৩১৩ (জুলাই ১৯০৬) সহ মোট পাঁচটি খণ্ডে প্রবন্ধটি প্রকাশিত
হয়েছিল।
.
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”-র ৩য় খণ্ডের ভূমিকা -              পাতার উপরে . . .  
বাংলায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবারিত প্রেমের, সাম্যবাদী গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব
পড়েছিল, তা বাংলার পদাবলী সাহিত্যে ভাস্বর হয়ে ফুটে উঠেছিল। একসময় এই দেশে মুসলমান ধর্মাবলম্বী
মানুষরাও যে এই প্রেমের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন তার সাক্ষর পাওয়া যায় বৈষ্ণব পদালীতে।  
মুসলমান পদকর্তারাও রচনা করে গিয়েছেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমের গাথা। এখন পর্যন্ত শতাধিক তেমন মুসলমান
বৈষ্ণব পদকর্তার পদ আবিস্কৃত হয়েছে। এতে উল্লেখনীয় হলো এই যে সেই পদের থেকে ভণিতাখানি তুলে
নিলে বো
ঝার উপায় থাকে না যে রচয়িতা হিন্দু না মুসলমান। সেই সব লুপ্তপ্রায় সাহিত্য উদ্ধার করে  
আধুনিক বাঙালীর সামনে উপস্থাপনার মূলে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল।
তিনি “মুসলমান বৈষ্ণব কবি” তিন খণ্ডে প্রকাশিত করেছিলেন তা আমরা জানি। তাঁর ৩য় খণ্ডের বিজ্ঞাপনে
একটি ৪র্থ খণ্ডের প্রকাশনার পরিকল্পনার কথা লেখা আছে। কিন্তু সেই ৪র্থ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল কি না তা
আমাদের জানা নেই। দুঃখের বিষয় এই যে আমরা ১ম এবং ২য় খণ্ডও যোগাড় করে উঠতে পারি নি।

পুথি বিশারদ
মৌলবী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সাহায্যে, ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ব্রজসুন্দর
সান্ন্যালের সম্পাদিত ও সংকলিত  “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”-র ৩য় খণ্ডের ভূমিকা বা বিজ্ঞাপনে তিনি
মৌলবী
আবদুল করীম সাহিত্যবিশারদের
প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, গ্রন্থ সম্বন্ধে লিখেছিলেন . . .

মুসলমান বৈষ্ণন কবি’ তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হইল। ইহাতে আলাওলের ৫টী, মীর্জা ফয়জুল্লার ৫টী, সৈয়দ
আইনদ্দিনের ৮টী, সৈয়দ নাসিরদ্দিনের ৪টী, নাছির মহম্মদের ৯টী, সের চান্দের ১টী, এবাদোল্লার ১টী, আবাল
ফকীরের ১টী, মোছন আলীর ১টী, মহম্মদ হানিফের ১টী এবং আলিমদ্দিনের ১টী,--- এই মোট বারো জন
কাবির ৩৭টী পদ সন্নিবেশিত হইল। এতন্মধ্যে যে গুলি বৈষ্ণব পদ নহে, সে গুলি পরিশিষ্টে দেওয়া হইয়াছে।
কেবল আলাওলের একটী পদ পরে সংগৃহীত হওয়ায় পরিশিষ্টে প্রকাশিত হইল। শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র
সেন সহাশয়ের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে’ আলাওলের একটা পদ উদ্ধৃত হইয়াছে ; সে পদটী শ্রীযুক্ত আবদুল
করিম মহাশয় দীনেশ বাবুকে দিয়াছিলেন, কিন্তু দীনেশ বাবুর পুস্তকে তাহার উল্লেখ নাই ; উক্ত পদটীও
ইহাতে প্রকাশিত হইল।

আমরা প্রথম খণ্ডে যে ২৫ জন মুসলসান বৈষ্ণব কবির নামোল্লেখ করিয়াছিলাম, তন্মধ্যে ১৪ জন কবির
পদাবলী তিন খণ্ডে প্রকাশিত হইল। অবশিষ্ট কয়জনের পদাবলী শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে। এই ১৪ জন কবির
যদি আর কোনো নুতন, পদ সংগ্রহ করিতে পারি, তবে তাহাও চতুর্থ খণ্ডের পরিশিষ্টে প্রকাশিত হইবে।

মুসলমান বৈষ্ণব কবির পদাবলী প্রকাশের আমার একমাত্র সাহায্যকারী বন্ধুবর শ্রীযুক্ত মৌলবী আবদুল  
করিম মহাশয় আমার জন্য যেরূপ যত্ন ও পরিশ্রম করিতেছেন, তাহাতে তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না
করিলে নিতান্ত কৃতঘ্নের ন্যায় কার্য্য হইবে। তিনি এবারো দয়া করিয়া কবিদিগের জীবনী লিখিয়া ও অনেক
গুলি পদ সংগ্রহ করিয়া দিয়াছেন। ভগবান তাঁহার মঙ্গল করুণ।

ঘোড়ামারা, রাজসাহী।                                                                 শ্রীব্রজসুন্দর সান্ন্যাল।
১লা আশ্বিন ১৩১১।
.
ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”-র জীবনী আলোচনা থেকে -      পাতার উপরে . . .  
১৯০৪ সালে প্রকাশিত ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের সম্পাদিত ও সংকলিত “মুসলমান বৈষ্ণব কবি”-র ৩য় খণ্ডের
“জীবনী আলোচনা” থেকে মুসলমান বৈষব পদকর্তাদের সম্বন্ধে তাঁর উদ্ধৃতির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি
যা প্রণিধানযোগ্য . . .

মুললমান বৈষ্ণৰ কবির বর্তমান খণ্ডে সৈয়দ আলাওল, মীর্জা ফয়জুল্লা, মীর্জা কাঙ্গালী, সৈয়দ আইনদ্দিন,
নাছির মহম্মদ, সৈয়দ নাছিরদ্দিন, সেরচান্দ বা সেরবাজ, এবাদোল্লা, আবাল ফকির, মোছন আলী, মহম্মদ
হানিফ, এবং আলিমদ্দিন,---এই দ্বাদশ জন কবির পদাবলী প্রকাশিত হইল। ইহাঁদের মধ্যে মহাকবি
আলাওলের বৃত্তান্ত পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হইল। অবশিষ্ট কবিগণের সম্বন্ধে আমাদের গবেষণার হুল কিছুমাত্র
প্রবেশ করিতে পারে নাই। প্রাচীন কবিগণ সাহিত্য-সংসারে একান্ত কুহেলিকাচ্ছন্ন। তাঁহাদের
জীবনী জানিবার অভিলাষ করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোড়া প্রায় সমানই বটে! . . .

. . . পাঠকগণ দেখিবেন, বৈষ্ণব কবিতা ব্যতীত কোন কোন কবি অপরবিধ পারমার্থিক গীতও রচনা করিয়া
গিয়াছেন, তচ্ছ্রেণীর কোন কোন গীত হইতে তাঁহাদের কেহ কেহ ‘ফকিরী’ পথবর্ত্তী ছিলেন বলিয়াও অনুমান
করা যায়। হয়ত 'প্রকৃতঃ তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াম্‌ !

এই সকল পদাবলী লেখকদের মধ্যে অত্যল্প মাত্র কবিরই সামান্য পরিচয় প্রদত্ত হইল। অবশিষ্ট কবিগণ প্রায়
অজ্ঞাতকুলশীলই রহিলেন। তবে তাঁহার সকলে খাঁটি চট্টগ্রামী কবি কিনা, ঠিক বলা না গেলেও তাঁহারা যে
অন্ততঃ পূর্ব্ববঙ্গবাসী ছিলেন এবং বৈষ্ণবকবিতা প্রচারের প্রাদুর্ভাব সময়েই আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তাহাতে
সন্দেহ করিবার কিছুই নাই
।”
.
ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল কি ‘সাহিত্য সংহিতা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন? -     পাতার উপরে . . .  
ভারত সরকারের “
শোধগঙ্গা ওয়েবসাইট”-এ, একটি “কবিওয়ালা ও কবিসঙ্গীত” গবেষণার প্রবন্ধের প্রথম  
অধ্যায়ে ১৯ সংখ্যক পৃষ্ঠায় গবেষক লিখেছেন যে “
ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল মহাশয় ‘সাহিত্য সংহিতা’ সম্পাদনা  
করার সূত্রে উনিশ শতকের অসংখ্য কবিওয়ালার জীবনী ও গান সংগ্রহ করেছেন এবং তাঁর পত্রিকায়  
কবিগান বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন
”।

এখানে আমাদের বক্তব্য এই যে, “
কবিগান বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা” ব্রজসুন্দর মহাশয় ঠিকই করেছিলেন,  
তবে ‘সাহিত্য সংহিতা’ পত্রিকা সম্পাদনা করার সূত্রে নয়। কারণ তাঁর এই বিষয়ের সংশ্লীষ্ট “কবির  
ইতিহাস” প্রবন্ধাবলী “সাহিত্য সংহিতা” পত্রিকায় ১৯০৫-০৬ সালে প্রকাশনার সময় তিনি সেই পত্রিকার
সম্পাদক ছিলেন না। ১৯০০ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত এবং তারপরে ১৯১৬ ও ১৯২০ র সংখ্যাগুলি দেখার  
সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। এই সময়কালে ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল ‘সাহিত্য সংহিতা’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন
না। অন্য কোনও সময় ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল “সাহিত্য সংহিতা” পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন কি না তা  
আমাদের জানা নেই। কেউ সঠিক তথ্য জানালে আমরা এই পাতায় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করবো।
.
কবি ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের কবিতা -                                                   পাতার উপরে . . .  
তিনি নিজে বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করেন নি। করে থাকলেও তা আমাদের জানা নেই।

বাংলা তথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ব্রজসুন্দর সান্ন্যালের মতো মানুষের কথা বাঙালীর  স্মৃতিতে   
জাগিয়ে রাখার জন্য আমরা তাঁর রচিত কবিতার খোঁজ করে সফল হয়েছি। নিশ্চিতভাবে তাঁর  অন্তত  
একটি কবিতা আমরা পেয়েছি নরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্ত্তৃক প্রকাশিত “জন্মভূমি” পত্রিকার বৈশাখ ১৩১০ সংখ্যায়  
(এপ্রিল ১৯০৩)। এছাড়া ১৯০১-০২ সালের মধ্যে প্রকাশিত, তাঁর নিজের সম্পাদিত “উত্সাহ” পত্রিকা থেকে
আরও তিনটে কবিতা আমরা পেয়েছি যা আমরা নিশ্চিতভাবে তাঁর কবিতা বলতে পারছি না। কিন্তু  
প্রকাশনার নানান খুঁটিনাটি বিষয় বিশ্লেষণ করে আমাদের মনে হয়েছে যে এই কবিতা তিনটি তাঁরই রচিত।
এর অন্যথা হলে, প্রমাণ সহ আমাদের জানালে, আমরা সংশোধন করে দেবো এবং পাতায় সংশোধনী  
প্রেরকের প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করবো।