কবি রমেশচনদ্র সেন - আমরা কৃতজ্ঞ দিল্লীর জাকিরহুসেন কলেজের অধ্যাপক ডঃ শর্মিষ্ঠা সেনের
কাছে, যিনি আমাদের কবির এই সংক্ষিপ্ত জীবনীটি লিখে পাঠিয়েছেন . . .

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

মেশচন্দ্র সেন  এর জন্ম কলকাতায় ১৮৯৪ সালের ২৪শে আগস্ট। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা  
বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া পরগনার পিঞ্জরী গ্রামে। পিতা ক্ষীরোদচন্দ্র সেন  
পেশায় ছিলেন কবিরাজ। তিনি কলকাতায় ২০১ মুক্তারাম বাবু স্টীটের ভাড়া বাড়ীতে থাকতেন। জ্যেষ্ঠপুত্র
রমেশচন্দ্রের জন্ম এবং সমস্ত জীবন কাটে কলকাতাতেই। ১৯৬১ সালের ৪ঠা নভেম্বর রমেশচন্দ্রকে  
সপরিবারে সেই বাড়ী ছেড়ে চলে আসতে হয় বরানগরের ২৪, ডাক্তার নীলমণি সরকার স্ট্রীটে।  ১৯৬২  
সালের ১লা জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পণ্ডিত সীতানাথ সংখ্যাতীর্থের চতুষ্পাঠীতে রমেশচন্দ্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯১১ সালে সংস্কৃত  
ব্যাকরণের দ্বিতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৩ সালে, টোলে পাঠরত অবস্থাতেই, প্রাইভেটে ম্যাট্রিকুলেশন
পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এর পর ১৯১৭ সালে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইংরেজীতে
অনার্স নিয়ে বি.এ. পাশ করেন। বাংলা সাহিত্যের পত্রে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।  পিতার  
আকস্মিক মৃত্যুতে ইংরেজীতে এম.এ. পড়া তাঁর মাঝপথেই থামিয়ে দিতে হয়। গ্রহণ করেন পৈতৃক  
কবিরাজী পেশা কে। হাল ধরেন পরিবারের প্রধানরূপে।

১৯১৮ সালে  মাদ্রাজ  শহরে  অনুষ্ঠিত  নিখিল  ভারত আয়ুর্বেদ সম্মেলনে তিনি বাংলার একজন প্রতিনিধি
ছিলেন। সেই সম্মেলন-কালে তাঁর দেওয়া সংস্কৃতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র সংক্রান্ত তথ্য সমৃদ্ধ ভাষণ যথেষ্ট চাঞ্চল্যের
সৃষ্টি করে। সেই সম্মেলনেই তাঁকে "বিদ্যানিধি" উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কিছুকালের জন্য তিনি  
"বৈদ্যশাস্ত্রপীঠে" অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন কিন্তু পরিচালক-মণ্ডলীর সাথে মতানৈক্য হওয়াতে তিনি তাঁর
স্বাধীন কবিরাজী পেশায় ফিরে আসেন। তিনি পিতার মতই চিকিত্সক হিসেবে এক দুর্লভ খ্যাতির অধিকারী
হয়ে উঠেছিলেন।

চিকিত্সা-শাস্ত্রের চেযে রমেশচন্দ্রের সাহিত্যচর্চায় বেশী আগ্রহ ছিল। সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্থপতি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি শুধু অমূল্য সাহিত্যই সৃষ্টি করেন নি, তিনি
তৈরী করে গেছেন বহু বাঙালী সাহিত্যিককেও। ১৯১১ সালে তাঁর পিতার কয়েকজন ছাত্রের সহযোগিতায়
প্রতিষ্ঠা করেন "সাহিত্য সেবক সমিতি"। এই সমিতি হয়ে ওঠে লেখক তৈরীর কারখানা!
বিভূতিভূষণ  
বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কামিনী রায়  প্রমুখ  
তখনকার যুগের খ্যাতনামা লেখক-কবি-সাহিত্যিকরা সেখানে তাঁদের রচনা পড়তেন। অনেকে আরম্ভও  
করেছিলেন এই সভায় - অর্থাৎ হাত পাকিয়েছিলেন এখানেই।

১৯৪৫ থেকে ১৯৬২ তে তাঁর মৃত্যু কাল অবধি তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন। লিখেছেন নানা  তত্কালীন  
প্রসিদ্ধ পত্র-পত্রিকায় যেমন বসুমতী, ভারতবর্ষ, যুগান্তর, দেশ, প্রভাতী, সর্বহারা, নবশক্তি। তিনি বারোটি
উপন্যাস লিখেছেন যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তাঁর একটি উপন্যাস "সেলিরানা" শারদীয় "মধ্যবিত্ত" পত্রিকায়
প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস শতাব্ দী (১৯৪৫)। অন্য উপন্যাসের মধ্যে আছে চক্রবাক (১৯৪৫),  
কুরুপালা (১৯৪৬), কাজল (১৯৪৯), গৌরীগ্রাম (১৯৫৩), মালঙ্গীর কথা (১৯৫৪), পূব থেকে পশ্চিমে (১৯৫৬),  
সাগ্নিক (১৯৫৯), নিঃসঙ্গ বিহঙ্গ (১৯৫৯), অপরাজেয় (১৯৬০), পূর্বরাগ (১৯৬১), দীপক, সেলিরানা। আছে "সাদা
ঘোড়া", "ডোমের চিতা"-র মত বহু গল্প। তাঁর লেখা সাতটি গল্প গ্রন্থ। দেশ পত্রিকায় ১৯৩৬ সালের জুন মাস
থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্যাটায়ার ধর্মী রম্যরচনা "টিকি বনাম প্রেম"। ১৯৯৪ সালের  
২৮শে আগস্ট স্টেটসম্যান পত্রিকা তাঁকে
"Bengal's Maxim Gorky" আখ্যা দেয়।

এমন মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই পরাধীনতার গ্লানি থেকে দেশকে মুক্ত করতে চাইতেন। তিনি দীর্ঘকাল  
জাতীয় কংগ্রেসের উত্তর কলকাতার জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন। তিনি সে যুগের বিপ্লবী আন্দোলনের
সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এরই ফলে তাঁর মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের বাড়ীতে বেশ কয়েকবার ইংরেজ পুলিশ হানা
দেয়।
শ্রী অরবিন্দ ঘোষের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। ১৯৪৫ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস "শতাব্দী", তিনি
শ্রী অরবিন্দ ঘোষকে উত্সর্গ করেছিলেন।  

সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মধ্যেও তাঁর মনের কোমল দিক আমরা দেখতে পাই যখন তিনি বাংলার পূর্বাঞ্চল  
থেকে কোনো পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে আসা এক বালককে, কলকাতার ফুটপাথ থেকে তুলে নিয়ে গৃহে
আশ্রয় দেন। সেই ছেলেটিও তাঁদের পরিবারের একজন এবং রমেশচন্দ্রের কবিরাজী পেশার অন্যতম  
সহকারী হয়ে ওঠেন এবং রমেশচন্দ্রের সন্তানদের কাছে পিতৃব্য-সম ভালবাসার অধিকারী হন।

Behind every man there is a woman কথাটা রমেশচন্দ্রের ক্ষেত্রে একশো ভাগ সত্যি। সেই নারী তাঁর  
প্রেরণাময়ী স্ত্রী বনলতা দেবী। ১৯১৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি বিবাহসূত্রে পরিণীতা হয়ে এসেছিলেন।
শশুরবাড়ীতে এসে সবার মনে তিনি জননীর স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের পাঁচ পুত্র এবং নয় কন্যার
পরিবারের সমস্ত দায় তিনি একা হাতে সামলেছেন। এই মহিয়সী নারীর সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা  
রমেশচন্দ্রকে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবতার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সামান্য সময়ের জন্যও সংকুচিত
হতে দেয় নি।

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

রমেশচন্দ্র সেনের জীবনের একটি দুর্ভগ্যজনক ঘটনা . . .

দীপায়ণ থেকে প্রকাশিত রমেশচন্দ্র সেনের নির্বাচিত রচনা সংগ্রহের ১ম খণ্ডের ভূমিকা থেকে একটি ঘটনা
জানা যায়। রমেশচন্দ্র ছোটোবেলায় অসুখে ভুগে তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। তিনি মাত্র একটি
চোখ দিয়ে দেখতে পেতেন বলে তাঁর হাতের লেখা ছিল বড়ো বড়ো। ফলে তাঁর লেখা পাণ্ডুলিপির আয়তনও
বেশ বড় হতো। তাঁর "শতাব্দী” উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছিল। এই পাণ্ডুলিপিটি
নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন 'গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স' এর কর্ণধার হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের কাছে,
প্রকাশনার জন্য। তাঁরা ছিলেন “ভারতবর্ষ' পত্রিকার মালিক। রমেশচন্দ্র সেন পান্ডুলিপিটি টেবিলে রাখার
সঙ্গে সঙ্গে হরিদাসবাবু ঠাট্টা করে বলে উঠেছিলেন --- "টেবিলে রাখবেন না, টেবিল ভেঙে যাবে"।
আত্মাভিমানী রমেশচন্দ্র সেন এই উক্তি শোনা মাত্রই পান্ডুলিপি ফেরৎ নিয়ে চলে এসেছিলেন। গ্রন্থটি ১৯৪৫
সালে, পূরবী পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ---৫.৭.২০২০

আমরা কৃতজ্ঞ দিল্লীর জাকিরহুসেন কলেজের অধ্যাপক ডঃ শর্মিষ্ঠা সেনের কাছে, যিনি আমাদের কবির এই
সংক্ষিপ্ত জীবনীটি লিখে পাঠিয়েছেন।
তিনি রমেশচন্দ্র সেনের কন্যা শ্রীমতী ইলা সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী তমাল
সেনের স্ত্রী। তিনি মিলনসাগরের অন্যতম উপদেষ্টা ও মার্গদর্শক। মিলনসাগরে কবি শর্মিষ্ঠা সেনের কবিতার
পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .      

আমরা
মিলনসাগরে  কবি রমেশচন্দ্র সেনের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা। এই পাতা তাঁর প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধার্ঘ্য।



কবি রমেশচন্দ্র সেনের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


উত্স -
  • মানবেন্দু রায় :  নির্বাচিত রচনা সংগ্রহ - রমেশচন্দ্র সেন
  • পুনরুত্থান :  রমেশচন্দ্র সেন জন্মশতবার্ষিকী সমিতি, ১৯৯৫  
  • রমেশচন্দ্র সেনের পরিবারের সাথে সাক্ষাত্কার
  • কবির "যমুনা" কবিতাটি পেয়েছি শোধগঙ্গা ওয়েবসাইটে ২০০৮ সালে প্রকাশিত ডঃ তপনকুমার রায়ের
    “রমেশচন্দ্র সেন : জীবন ও সাহিত্য” নামক গবেষণা-পত্রের “পরিশিষ্ট” থেকে।


কবির তিনটি কবিতা নিয়ে এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ২৬.৪.২০২০
কবির জীবনীতে একটি সংযোজন - ৫.৭.২০২০।

...