আমরা  মিলনসাগরে  কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রয়াসের সার্থকতা।


উত্স -   
  • ঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, "ঈশ্বর গুপ্তের জীবন চরিত ও কবিত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ", ১৮৮৫
  • দুর্গাদাস লাহিড়ী, "বাঙ্গালীর গান", ১৯০৫।
  • কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন, "কবিবর স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের গ্রন্থাবলী", ১৯১০।
  • সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত "ঈশ্বর গুপ্তের গ্রন্থাবলী", ১৯১৯।
  • শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার, "জীবনী কোষ", ১৯৩৬।
  • দীনেশচন্দ্র সেন, "বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" ৬ষ্ঠ সংস্করণ।
  • সুকুমার সেন, “বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস”, ১৯৪০।
  • বিনয় ঘোষ,বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৫৮
  • সঞ্জীবকুমার বসু, "ঈশ্বর গুপ্ত ও বঙ্গ সাহিত্য", ১৯৫৯।
  • বিনয় ঘোষ, “সাময়িক পত্রে বাংলার সমাজচিত্র” ৪র্থ খণ্ড, ১৯৬০।
  • শিশিরকুমার দাশ, "সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী", ২০০৩।
  • শর্মিষ্ঠা সেন, "বাংলা সাহিত্যে বিধবা চিত্রণ", ২০০৭।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ১ম খণ্ড", ৫ম সংস্করণ, ২০১০।
  • সৌরভকুমার ভূঞ্যা, বিধবার 'ঈশ্বর' (বিদ্যাসাগরকে নিয়ে), Dailyhunt ওয়েব পত্রিকা
  • Explained:  Where  Vidyasagar  stands  in the history of Indian social reform, Indian Express,  
    15.5.2019.   



কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


৩টি কবিতা নিয়ে এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১০.১.২০০৯।                                          ^^ উপরে ফেরত   
পাতায় কবির ছবির সংযোজন - ২০১৪।
৫১টি নতুন কবিতা ও গান এবং কবির নতুন একটি ছবি এবং পরিচিতি নিয়ে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ৮.২.২০২১।

...
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত  -       জন্মগ্রহণ করেন
বর্তমান  পশ্চিমবঙ্গের,  অধুনা  উত্তর ২৪ পরগনা
জেলার কাঁচড়াপাড়ার শিয়ালডাঙ্গা নীলকুঠি গ্রামে।
তাঁকে  “কবীশ্বর  ঈশ্বরচন্দ্র”  বলেও  ডাকা হতো।
পিতা হরিনারায়ণ গুপ্ত অবং মাতা শ্রীমতী দেবী।
কবি ছিলেন চার ভাই ও এক বোনের  মধ্যে মেজ
ভাই। পিতা হরিনারায়ণ ছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালী
বৈদ্য পরিবারের।  তিনি  চিকিত্সা ব্যবসা ছেড়ে
নিজের গ্রামের কাছে সেয়ালদহের কুঠিতে ৮ টাকা
মাইনেতে কাজ  করতেন।  পৈতৃক  ধানী  জমি ও
সম্পত্তিতে  তাঁদের  স্বচ্ছন্দেই  চলে  যেত কোনো
অভাব অনটন ছাড়াই।

দশ বছর বয়সে কবির মা মারা গেলে পিতা আবার বিয়ে করেন এবং তাঁকে কলকাতায় তাঁর মামাবাড়ীতে
এনে রাখা হয়।  তাঁর মামাবাড়ী  ছিল  কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। মাতামহ রামমোহন গুপ্ত কাজ করতেন
কানপুরে। শৈশবে তিনি দুরন্ত ছিলেন এবং লেখা পড়ায় মন দিতেন না। নিয়মিত পাঠশালায় যেতেন না।
কখনো কেবল ঘুরে বেড়াতেন বা খেলে বেড়াতেন।  পড়াশুনায় অমনোযোগী  থাকলেও  মুখে  মুখে  সংগীত  
রচনার  করতে পারতেন।
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বিবাহিত জীবন    
বাংলা সাহিত্যের যুগসন্ধিক্ষণের কবি, কবিতা আবৃত্তির প্রবর্তক  
সাংবাদিক ও পত্রিকার প্রকাশক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত    
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কয়েটি অমর উক্তি    
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা ও ঠাট্টা ইয়ার্কি    
বাঙালীর নববর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রবর্তক কবি ঈশ্বর গুপ্ত    
প্রাচীন কবিদের কাব্য ও জীবনীর প্রথম সংগ্রাহক ও প্রকাশক   
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মনুষ্যত্ববোধ    
কবি ঈশ্বর গুপ্তর সিপাহী বিদ্রোহের বিরুদ্ধতা    
কবি ঈশ্বর গুপ্তের রক্ষণশীলতা    
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি  
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে দুর্গাদাস লাহিড়ির উদ্ধৃতি    
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি    
কবি ঈশ্বর গুপ্তর রচনা সম্ভার    
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বিবাহিত জীবন -                                             পাতার উপরে . . .    
কবি ঈশ্বর গুপ্তের বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় দুর্গামণি দেবীর সঙ্গে।
পিতার ইচ্ছায় এই বিয়েতে কবির বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কারণ দুর্গামণি দেবী সুন্দরী ছিলেন না। বিবাহের
পরে তিনি নাকি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কোন কথাই বলেন নি। কিন্তু তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন নি এবং সারা
জীবন স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে সরেও আসেন নি। তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়
তাঁর ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, “ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনচরিত ও কবিত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ”-এর ১৮-পৃষ্ঠায় কবির
দাম্পত্ত জীবন নিয়ে লিখেছেন . . .

ঈশ্বরচন্দ্রের যৎকালে ১৫ বর্ষ বয়স, তৎকালে গুপ্তীপাড়ার গৌরহরি মল্লিকের কন্যা দুর্গামণি দেবীর সহিত
তাঁহার বিবাহ হয়।

দুর্গামণির কপালে সুখ হইল না। ঈশ্বরচন্দ্র দেখিলেন, আবার মেকি! দুর্গামণি দেখিতে কুৎসিতা! হাবা!
বোবার মত ! এ ত স্ত্রী নহে, প্রতিভাশালী কবির অর্ধাঙ্গ নহে---  কবির সহধর্মিণী নহে। ঈশ্বরচন্দ্র বিবাহের
পর হইতে আর তাহার সঙ্গে কথা কহিলেন না।

ইহার ভিতর একটু
Romanceও আছে। শুনা যায় ঈশ্বরচন্দ্র, কাঁচড়াপাড়ার এক জন ধনবানের পরমা সুন্দরী
কন্যাকে বিধাহ করিতে আভিসারী হয়েন। কিন্তু তাঁহার পিতা সে বিষয়ে মনোযোগী না হইয়া, গুপ্তপাড়ার
উক্ত হৌরহরি মল্লিকের উক্ত কন্যার সহিত বিবাহ দেন। গৌরহরি বৈদ্যদিগের মধ্যে এক জন প্রধান কুলীন
ছিলেন, সেই কুল-গৌরবের কারণ এবং অর্থ দান করিতে হুইল না বলিয়া, সেই পাত্রীর সহিতই ঈশ্বরচন্দ্রের
পিতা পুত্রের বিবাহ দেন। ঈশ্বরচন্দ্র পিতার আজ্ঞায় নিতান্ত অনিচ্ছায় বিবাহ করেন। কিন্ত বিবাহের পরই
তিনি বলিয়াছিলেন যে, আমি আর সংসারধর্ম্ম করিব না। কিছু কাল পরে ঈশ্বরচন্দ্রের আত্মীয়-মিত্রগণ
তাঁহাকে আর একটি বিবাহ করিতে অনুরোধ করিলে, তিনি বলেন যে, দুই সতীনের ঝগড়ার মধ্যে পড়িয়া
মারা যাওয়া অপেক্ষা বিবাহ না করাই ভাল
।”
.
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর কয়েটি অমর উদ্ধৃতি -                                             পাতার উপরে . . .    
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে এমন কয়েকটি বাক্যবিন্যাস করে গিয়েছেন যা বাংলা ভাষা ও
বাঙালীর জীবনে প্রায় প্রবাদ-বাক্যের আকার ধারণ করেছে। সেই সব প্রবাদ বাক্যের মধ্যে রয়েছে . . .
রাতে মশা দিনে মাছি
এই নিয়ে কলকাতায় আছি।
যা সাধারণভাবে এই আকারে ও রূপে লোকমুখে চলে আসছে। আসলে ছড়াটির সঠিক রূপ হলো . . ,
রেতে মশা দিনে মাছি,
এই তাড়্ য়ে কল্ কেতায় আছি।

কবির ১০ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যাবার পরে তাঁর শৈশব কাটে কলকাতায় তাঁর মামাবাড়ীতে। শৈশবে
তিনি দুরন্ত ছিলেন এবং লেখা পড়ায় মন দিতেন না। নিয়মিত পাঠশালায় যেতেন না।  কখনো কেবল ঘুরে
বেড়াতেন বা খেলে বেড়াতেন।  পড়াশুনায়  অমনোযোগী  থাকলে ও  মুখে  মুখে  সংগীত  রচনার  করতে
পারতেন। তারও পূর্বে কখনও কলকাতায় তাঁর মামাবাড়ীতে থাকার সময়ে, তাঁর মাত্র ৩ বছর বয়সে, মশা
মাছির উপদ্রবে পড়ে তিনি রচনা করেন বাংলার সেই বিখ্যাত ছড়াটি।

মাত্র তিন বছর বয়সে এই কবিতা রচনার কথা অনেকেই বিশ্বাস করবেন না জেনে
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ১৮৮৫
সালে  প্রকাশিত,  “ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনচরিত ও কবিত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ”-এর  ১১-পৃষ্ঠায়  এই  দুটি  লাইন
লেখার ঠিক পরেই লিখেছিলেন . . .
I lisped in numbers, for the numbers came !      
তাই নাকি? অনেকে কথাটা না বিশ্বাস করিতে পারেন --- আমরা বিশ্বাস করিব কি না জানিনা। তবে যখন
জন  ষ্টুয়ার্ট  মিলের  তিন  বত্সর  বয়সে গ্রীক শেখার কথাটা সাহিত্যজগতে চলিয়া গিয়াছে, তখন এ কথাটা
চলুক
।”

এছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি উক্তি যা তাঁর বিভিন্ন কবিতা কলি থেকে নেওয়া। যেমন . . .

এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা  
এই কলিটি কবির “পৌষ-পার্বন” কবিতার ২য় কলি।

ধর্মতলা ধর্মহীন গো-হত্যার ধাম
এই কলিটি কবির “বাবাজান বুড়াশিবের স্তোত্র” কবিতার ৭ম স্তবকের ১ম কলি।

শয্যায় ভার্য্যার প্রায়, ছারপোকা উঠে গায়
এই কলিটি কবির “বর্ষা” কবিতার ৮৪ তম কলি।

[ এখানে উল্লিখিত সব ক’টি কবিতাই মিলনসাগরে দেওয়া রয়েছে। ]
.
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা ও ঠাট্টা ইয়ার্কি -                             পাতার উপরে . . .    
ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা রচনায় তিনি বিখ্যাত ছিলেন। সে যুগের কোনো লোকই গুপ্ত কবির বিদ্রুপ থেকে রেহাই
পাননি।  তাঁর  লেখার  অনেকটা  জুড়ে  আছে  নিপাট  ঠাট্টা-ইয়ার্কি।  ঈশ্বর গুপ্তের রচনায় ঠাট্টা-ইয়ার্কির  
আধিপত্য নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র  মনে করতেন  যে এর  জন্য দায়ি  ছিল  তাঁর  সুশিক্ষার  অভাব। এই  বিষয়ে
উপরোক্ত গ্রন্থে
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৩-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .  

ঈশ্বরচন্দ্র যে ভ্রমে পতিত হইয়াছিলেন, আজ কাল অনেক ছেলেকে সেই ভ্রমে পতিত হইতে দেখি লিখিবার
একটু শক্তি থাকিলেই, অমনি পড়া শুনা ছাড়িয়া দিয়া কেবল রচনায় মন। রাতারাতি যশস্বী হইবার বাসনা।
এই সকল ছেলেদের দুই দিক নষ্ট হয়---রচনাশক্তি যে টুকু থাকে, শিক্ষার অভাবে তাহা সামান্য ফলপ্রদ হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র বাল্যে পড়া শুনায়, অমনোযোগী ইউন,  শেষে তিনি  কিছু  শিখিয়াছিলেন। তাঁহার গদ্য  রচনায়
তাহার বিলক্ষণ প্রমাণ আছে।  কিন্তু  তিনি  বাল্যকালে  যে সম্পূর্ণ শিক্ষালাভ করেন নাই, ইহা বড় দুঃখেরই
বিষয়। তিনি সুশিক্ষিত হইলে, তাঁহার যে প্রতিভা ছিল, তাহার বিহিত প্রয়োগ হইলে, তাঁহার কবিত্ব, কার্য্য
এবং সমাজের  উপর  আধিপত্য  অনেক  বেশী  হইত। আমার বিশ্বাস যে তিনি যদি তাঁহার সমসাময়িক
লেখক কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়  বা  পরবর্তী  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ন্যায় সুশিক্ষিত হইতেন, তাহা হইলে
তাঁহার সময়েই বাঙ্গালা সাহিত্য অনেক দূর অগ্রসর হইত।  বাঙ্গালার  উন্নতি  আরও  ত্রিশ  বত্সর অগ্রসর
হইত। তাঁহা'র রচনায় দুইটি অভাব দেখিয়া বড় দুঃখ হয় --- মার্জ্জিত রুচির অভাব, এবং উচ্চ লক্ষ্যের
অভাব। অনেকটাই ইয়ারকি। আধুনিক সামাজিক. বানরদিগের ইয়ারকির মত ইয়ারকি নয় প্রকিভাশালী
মহাম্মার ইয়ারকি। তবু ইয়ারকি বটে
।”

অন্যত্র ১৪-১৫ পৃষ্ঠায়
বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন . . .
“. . .  
তাই এখনকার ছেলেদের সতর্ক করিতেছি --- ভাল শিক্ষা লাভ না করিয়া কালির আঁচড় পাড়িও না।
মহাত্মাদিগের  জীবনচরিতের  সমালোচনায়  অনেক  গুরুতর  নীতি আমরা শিখিয়া থাকি।  ঈশ্বরচন্দ্রের  
জীবনের সমালোচনায় আমরা এই মহতী নীতি শিখি --- সুশিক্ষা ভিন্ন প্রতিভা কখন পূর্ণ ফলপ্রদা হয় না
।”
.
বাংলা সাহিত্যের যুগসন্ধিক্ষণের কবি ও কবিতা আবৃত্তির প্রবর্তক -           পাতার উপরে . . .    
বাংলা সাহিত্যে তিনি যুগসন্ধির কবি বলে সুপরিচিত। তিনিই কবিয়াল-রচনারীতির শেষ কবি এবং দেব-
দেবী সম্বন্ধিত ধর্মীয় বিষয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে কবিতা
রচনার প্রবর্তক। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ও আসরে জনসাধারণের মধ্যে কবিতাপাঠের প্রবর্তনও তিনিই করেন।
যাকে আমরা এখন বলি কবিতা আবৃত্তি বা বাচিক শিল্প। এর পূর্বে যে কোনও ছন্দোবদ্ধ লেখাকে সুরে
গাইবার প্রথারই প্রচলন ছিল। সুরের মাধ্যমে কাব্যের উচ্চারণের বাইরে কেবল আবৃত্তি বা কবিতা পাঠের
চেষ্টা ও আয়োজন ছিল না বললেই চলে।

তিনি পড়াশুনায় অমনোযোগী হলেও মুখে মুখে গান রচনার করতে পারতেন। তিনি গ্রামের কবি ও ওস্তাদের
দলে গানও বেঁধে দিতেন। সাধারণ মানুষের ভাষায় কাব্য রচনা করে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। উপরোক্ত
প্রবন্ধে, ঈশ্বর গুপ্তের যুগসন্ধির কবি হওয়া নিয়ে
বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন . . .

সে কাল আর এ কালের সন্ধিস্থানে ঈশ্বর গুপ্তের প্রাদুর্ভাব। এ কালের মত তিনি নানা সভার সভ্য, নানা স্কুল
কমিটির মেম্বর ইত্যাদি ছিলন --- আবার ও দিগে কবির দলে, হাফ আখড়াইয়ের দলে গান বাঁধিতেন। নগর
এবং উপনগরের সখের কবি এবং হাফ আখড়াই দল সমূহের  সংগীতসংগ্রামের  সময় তিনি কোন না কোন
পক্ষে নিযুক্ত হইয়া সংগীত রচনা করিয়া দিতেন।  অনেক  স্থলেই  তাঁহার  রচিত  গীত ঠিক উত্তর হওয়ায়
তাঁহারই জয় হইত। সখেরদল সমূহ সর্বাগ্রে তাহাকেই হস্তগত করিতে  চেষ্টা  করিত,  তাঁহাকে পাইলে আর
অন্য কবির আশ্রয় লইত না
।”
.
বাঙালীর নববর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রবর্তক কবি ঈশ্বর গুপ্ত -                      পাতার উপরে . . .    
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত  ১২৫৭  বঙ্গাব্দের  পয়লা বৈশাখ (১৪ই এপ্রিল ১৮৫০)  থেকে  বছরের  প্রথম  দিনটিকে
স্মরণীয় করে রাখার জন্য, তাঁর  ছাপাখানায়,  একটি সভার  সূচনা  করেন।  সেখানে  বিদ্যান  ও  সম্ভ্রান্ত
মানুষদের নিমন্ত্রণ করে এনে সভায় প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠ করে শোনাতেন।  সেই সভার  সভাপতিত্বে
মহর্ষী
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
নামও পাওয়া যায়।  তাঁর অনুগামী শিষ্যদেরও সেই সভায় পাঠ করতে বলতেন এবং
তাঁদের মধ্যে উত্কৃষ্ট রচনাকারদের নগদে পুরষ্কৃত করা হতো। সভার শেষে সেই শ্রোতামণ্ডলীর চার-পাঁচশো
অতিথীবর্গের জন্য মহাভোজের আয়োজনও করতেন।  উপরোক্ত  প্রবন্ধে, ঈশ্বর গুপ্তের নববর্ষের অনুষ্ঠান
নিয়ে
বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন . . .

সন ১২৫৭ সাল হইতে ঈশ্বরচন্দ্র একটা নূতন অনুষ্ঠান করেন। নববর্ষে অর্থাৎ প্রতিবর্ষের ১লা বৈশাখে তিনি
স্বীয়, যন্ত্রালয়ে একটী মহতী সভা সমাহূত করিতে আরম্ভ করেন। সেই সভায় নগর, উপনগর, এবং মফস্বলের
প্রায় সমস্ত সম্ভ্রান্ত লোক  এবং  সে  সময়ের  সমস্ত  বিদ্বান  ও  ব্রাহ্মণ  পণ্ডিতগণ  আমন্ত্রিত হইয়া উপস্থিত
হইতেন। কলিকাতার  ঠাকুরবংশ,  মল্লিকবংশ,  দত্তবংশ,  শোভাবাজারের  দেববংশ, প্রভৃতি সমস্ত সম্ভ্রান্ত
বংশের লোকেরা সেই সভায় উপস্থিত হইতেন।  বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর  প্রভৃতির  ন্যায় মান্যগণ্য ব্যক্তিগণ
সভাপতির আসন গ্রহণ করিতেন।  ঈশ্বরচন্দ্র  সেই  সভায় মনোরম প্রবন্ধ এবং কবিতা পাঠ করিয়া সভাস্থ
সকলকে তুষ্ট করিতেন। পরে ঈশ্বরচন্দ্রের ছাত্রগণের  মধ্যে যাঁহাদিগের  রচনা  উৎকৃষ্ট  হইত, তাঁহারা তাহা
পাঠ করিতেন। যে সকল ছাত্রের রচনা উৎকৃষ্ট হইত,  তাঁহারা  নগদ  অর্থ পুরস্কার স্বরূপ পাইতেন। নগর ও
মফস্বলের অনেক  সম্ভ্রান্তলোক  ছাত্রদিগকে  সেই  পুরস্কার  দান, করিতেন।  সভাভঙ্গের পর ঈশ্বরচন্দ্র সেই
আমন্ত্রিত প্রায় চার পাঁচ শত লোককে মহাভোজ দিতেন
।”
.
সাংবাদিক ও পত্রিকার প্রকাশক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত -                                  পাতার উপরে . . .    
তিনি  সাংবাদিকতায়  অসাধারণ  কৃতিত  প্রদর্শন  করেছিলেন।  কলকাতায়  তাঁর  মাতামহদের  সঙ্গে
পাঠুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের পরিচয় ছিল।  সেই  সূত্রে  পাথুরিয়াঘাটার  গোপীমোহন ঠাকুরের তৃতীয়
পুত্র নন্দকুমার ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়।

কবি ঈশ্বর গুপ্ত  ১৮৩১ সালে  ২৮ জানুয়ারি  যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের  সহযোগিতায়  “সংবাদ প্রভাকর”
সাপ্তাহিক  পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরে  ১৮৩৯ সালে ১৪ই জুন পত্রিকাটি বাংলা দৈনিকরুপে প্রকাশিত
হতে শুরু করে। দৈনিক প্রভাকর পত্রিকায় তিনি মনের সাধে কবিতা লিখে উঠতে পারতেন না। তাই তিনি
১৮৫৩ সালের ১লা বৈশাখ থেকে, প্রতি মাসের  পয়লা  তারিখে  তিনি  মাসিক প্রভাকর  প্রকাশ করা শুরু
করেন। মাসিক কবিতা ও গদ্য দুইই থাকতো। মাসিক প্রভাকর প্রকাশের কয়েক বছর পরেই তিনি দৈনিক
প্রভাকর পত্রিকা বন্ধ করে দেন। সংবাদ প্রভাকরের সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন . . .

এই প্রভাকর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের অদ্বিতীয় কীর্ত্তি। মধ্যে একবার প্রভাকর মেধে ঢাকা পড়িয়াছিলেন বটে, কিন্ত
আবার পুনরুদিত হইয়া অদ্যপি কর বিতরণ করিতেছেন। বাঙ্গালা সাহিত্য এই প্রভাকরের নিকট বিশেষ
ঋনী। মহাজন মরিয়া গেলে খাদক আর বড় তার নাম করে না। ঈশ্বর গুপ্ত গিয়াছেন, আমরা আর সে ঋণের
কথা বড় একটা মুখে আনি ন।  কিন্তু এক  দিন  প্রভাকর বাঙ্গালা সাহিত্যের হর্তা কর্তা  বিধাতা  ছিলেন।
প্রভাকর বাঙ্গালা রচনার  রীতিও  অনেক  পরিবর্তন করিয়া যান। ভারতচন্দ্রী ধরণটা তাঁহার অনেক ছিল
ৰটে---অনেকস্থলে তিনি ভারতচন্দ্রের অনুগামী মাত্র, কিন্তু আর একটা ধরণ ছিল, যা কখন বাঙ্গালা ভাষায়
ছিল না, যাহা পাইয়া আজ বাঙ্গালার ভাষা তেজস্বিনী হুইয়াছে। নিত্য নৈমিত্তিকের ব্যাপার, রাজকীয় ঘটনা,
সামাজিক ঘটনা, এ সকল যে রসময়ী রচনার বিষয় হইতে পারে, ইহা প্রভাকরই প্রথম দেখায়। আজ শিখের
যুদ্ধ, কাল পৌষপার্ব্বণ, আজ মিশনরি, কাল উমেদারি, এ সকল যে সাহিত্যের অধীন, সাহিত্যের সামগ্রী, তাহা
প্রভকরই দেখাইয়াছিলেন। আর ঈশ্বরগুপ্তের নিজের কীর্ত্তি ছাড়া প্রভাকরের শিক্ষানবিশ দিগের একটা কীর্ত্তি
আছে। দেশের অনেক গুলি লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখক প্রভাকরের শিক্ষানবিশ ছিলেন। বাবু রঙ্গালাল বন্দোপাধ্যায়
এক জন। বাবু দীনবন্ধু মিত্র আর এক জন।  শুনিয়াছি,  বাবু মনোমোহন বসু  আর  এক জন। ইহার জন্যও
বাঙ্গালার সাহিত্য, প্রভাকরের নিকট ঋণী। আমি নিজে প্রভাকরের নিকটে বিশেষ ঋণী। আমার প্রথম রচনা
গুলি প্রভাকরে প্রকাশিত হয়। সেসময়ে ঈশ্বরচন্ত্র গুপ্ত আমাকে বিশেষ উৎসাহ দান করেন
।”

“সংবাদ প্রভাকর”-এর পূর্বে আর মাত্র ৬টি বাংলা সংবাদ পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। (১) ১৮১৫ সালে প্রকাশিত
গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালা গেজেট”। (২) ১৮১৭ সালে প্রকাশিত শ্রীরামপুরের  মিশনারিদের
“সমাচার দর্পণ”। (৩) ১৮২০ সালে প্রকাশিত
রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে “সংবাদ কৌমুদী”। (৪) ১৮২১
সালের “সমাচার চন্দ্রিকা”। (৫) সংবাদ “তিমিরনাশক”। (৬) বাবু নীলরত্ন হালদার সম্পাদিত “বঙ্গদূত”।

“সংবাদ প্রভাকর” ছাড়া কবি, "পাষণ্ডপীড়ন”, “সংবাদ রত্নাবলী”, “সংবাদসাধুরঞ্জন” এবং আরও তিনটি
পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন। গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য্যের “রসরাজ” পত্রিকার সঙ্গে তাঁর কবিতার লড়াই
চালাবার জন্যই তিনি 'পাষণ্ডপীড়ন" পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। ব্য
ক্তিগত জীবনে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ
সদ্ভাব ছিল, শত্রুতা ছিল না।

“সংবাদ  প্রভাকর”-এর  জন্য  কেবল  তাঁর  নিজের  প্রতিষ্ঠাই  এনে  দেয়  নি,  তাঁর শিষ্য  বা  অনুসারী বা  
শিক্ষানবিশদেরও তুলে এনেছিল।  পরবর্তী  যুগের  বহু  প্রথিতযশা  সাহিত্যিক  সংবাদ প্রভাকরে  লিখে
উঠেছেন।  তাঁদের  মধ্যে ছিলেন
রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, মনোমোহন বসু প্রমুখরা। বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়
নিজে জানিয়েছেন যে তাঁর প্রথমদিকের রচনাগুলি “সংবাদ প্রভাকর” এই প্রকাশিত হয়েছিল।
তিনি লিখেছেন . . .

আমি নিজে প্রভাকরের নিকটে বিশেষ ঋণী। আমার প্রথম রচনা গুলি প্রভাকরে প্রকাশিত হয়। সে সময়ে
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত আমাকে বিশেষ উত্সাহ দান করেন
।”
.
ঈশ্বর গুপ্ত প্রাচীন কবিদের কাব্য ও জীবনীর প্রথম সংগ্রাহক ও প্রকাশক -  পাতার উপরে . . .    
রামপ্রসাদ সেন, রামনিধি গুপ্ত, রামমোহন বসু, নিত্যানন্দ দাস বৈরাগী, হরুঠাকুর, নৃসিংহ, লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস
প্রভৃতি বিভিন্ন কবির ও পাঁচালিকারের রচনা সংগ্রহ এবং প্রকাশ তাঁর অন্যতম সাহিত্যকীর্তি।

১৯১৯ সালে প্রকাশিত সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দ্বারা বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে প্রকাশিত “ঈশ্বরগুপ্তের
গ্রন্থাবলীর (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ একত্রে)”
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কবি ঈশ্বর গুপ্তের “জীবন চরিত ও
কবিত্ব” প্রবন্ধে, ১২-পৃষ্ঠায় রয়েছে . . .

প্রাচীন কবিদিগের অপ্রকাশিত লুপ্তপ্রায় কবিতাবলী, গীত, পদাবলী এবং তৎসহ তাঁহাদিগের জীবনী প্রকাশ
করিতে অভিলাষী হইয়া ঈশবরচন্দ্র ক্রমাগত দশবর্ষ কাল নানা স্থান পর্য্যটন এবং যথেষ্ট শ্রম করিয়া, শেষ
সে বিষয়ে সফলতা লাভ করেন। বাঙ্গালীজাতির মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্রই এ বিষয়ে প্রথম উদ্যোগী। সর্ব্বাদৌ ১২৬০
সালের ১লা পৌষের মাসিক প্রভাকরে ঈশ্বরচন্দ্র বহুকষ্টে সংগৃহীত রামপ্রসাদ সেনের জীবনী ও ততপ্রণীত
“কালীকীর্ত্তন"  ও  “কৃষ্ণকীর্ত্তন”  প্রভৃতি  বিষয়ক  অনেকগুলি  লুপ্তপ্রায়  গীত  এবং পদীবলী প্রকাশ করেন।
ততপরে পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসের প্রভাকরে রামনিধি সেন @ (নিধু বাবু),  হরুঠাকুর,  রাম বসু,  নিতাইদাস
বৈরাগী,  লক্ষ্মীকান্ত বিশ্বাস,  রাসু ও নৃসিংহ এবং আরও কয়েক জন খ্যাতনামা কবির জীবন চরিত, গীত
এবং পদাবলী প্রকাশ করেন।  সেগুলি স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে প্রকাশ করিবার বিশেষ ইচ্ছা ছিল, কিন্তু প্রকাশ
করিয়া যাইতে পারেন নাই।

মৃত কবি ভারতচন্দ্র রায়ের জীবনী এবং তৎপ্রণীত অনেক লুপ্তপ্রায়  কবিতা এবং  পদাবলী বহুপরিশ্রমে
সংগ্রহ করিয়া, সন ১২৬২ সালের ১লা জ্যৈষ্ঠের প্রভাকরে প্রকাশ করেন। সেই সনের আষাঢ় মাসে তাহা
স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। ইহাই ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম পুস্তক প্রকাশ
।”

@ -
নিধুবাবুর পুরো নাম রামনিধি গুপ্ত, সেন নয়। সম্ভবত মুদ্রণ প্রমাদ।
.
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি -                 পাতার উপরে . . .    
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণের নবম অধ্যায়ের পরিশিষ্টে
ঈশ্রচন্দ্র গুপ্ত সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

কবিওয়ালাগণের মধ্যে আমরা ঈশ্বরচন্দ্র গৃপ্তের (১৮১১খৃঃ--১৮৫৮খৃঃ) নাম উল্লেখ করি নাই। তাঁহার লেখা
সম্পূর্ণরূপে ইংরেজীর প্রভাব বার্জ্জিত নহে---এজন্য আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসই তাঁহার গ্রন্থাদি আলোচনার
উচিত স্থল হইবে। বিম্‌স সাহেব ঈশ্বরচন্দ্রকে “হিন্দুস্থানী রেবিলেস”  আখ্যা  করিয়াছেন ; ইনি অনেকগুলি
সখীসংবাদ গান রচনা করিয়াছেন, কিন্তু বোধ হয়  সখীসংবাদ  গান  অপেক্ষা  ব্যঙ্গ কবিতা রচনাতে কবি
সুপণ্ডিত ছিলেন। তাঁহার ব্যঙ্গগুলি কোন শ্রেণীবিশেষ কি ব্যক্তিবিশেষে সীমাবদ্ধ ছিল না,--- পৃথিবীর যাবতীয়
দ্রব্যের উপর সেই ব্যঙ্গের তীব্ররশ্মি নিপতিত হইয়াছে, ---লক্ষ্মী-ঠাকুরাণীকে লইয়া ব্যঙ্গ, আইনের সুত্র লইয়া
ব্যঙ্গ, ইংরেজের বিবি লইয়া ব্যঙ্গ, গোস্বামীগণ লইয়া ব্যঙ্গ।  তাঁহার  এই  প্রখর ব্যঙ্গরাশি ও সখীসম্বাদগীতি
কালে সাহিত্যের অধঃস্তরে পড়িয়া বিস্মৃত হইবে --- কিন্তু  তাঁহার  অধ্যবসায়ের  চিরস্মরণীয় কীর্তি প্রাচীন
কবিগণের জীবন-সংগ্রহ বিলুপ্ত হইবার নহে
।”
.
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে দুর্গাদাস লাহিড়ির উদ্ধৃতি -                                 পাতার উপরে . . .    
১৯০৫ সালে প্রকাশিত ২২৭জন গীতিকারের ৫৬৬৩টি গানের সংকলন বাঙ্গালীর গান-এ সম্পাদক ও সংগ্রাহক
দুর্গাদাস লাহিড়ী কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কবি --- খাঁটি বাঙালী কবি। ইঁহার ন্যায় স্বভাবকবি, অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়।
কবিতায় শ্লেষ ও ব্যাঙ্গ প্রকাশে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন।

চব্বিশ পরগনার অন্তর্গত কাঁচড়াপাড়া গ্রামে ১২১৮ সালের পঁচিশ ফাল্গুন ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। ইহার
পিতার  নাম  হরিনারায়ণ  গুপ্ত।  ইনি  আশৈশব  কলিকাতা  জোড়াসাঁকোয়  মাতুলালয়ে  প্রতিপালিত
হইয়াছিলেন। বাল্যকালে ঈশ্বরচন্দ্রের লেখাপড়ায় তাদৃশ যত্ন ছিল না। তবে সপ্তম বৎসর বয়ঃক্রমকালে তিনি
মুখে মুখে কবিতা রচনা করিতে পারিতেন।  যৌবনের  প্রারাম্ভেই  তিনি  সখের ও পেশাদারি কবির দলে ও
হাফ-আখড়াইয়ের দলে গান  বাঁধিয়া  দিতে  আরম্ভ  করেন।  ভবানীপুরের  সখের  দলে এবং রসময় বসু,
হরিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, উদয়চাঁদ দাস প্রভৃতি তাৎকালিক প্রসিদ্ধ কবিওয়ালাদিগের কবির দলে তিনি গান
রচনা করিয়া দিতেন।  ১২৩৯ সালের ষোলোই মাঘ তাঁহার “সংবাদ-প্রভাকর” পত্রের  প্রথম প্রকাশ  আরম্ত
হয়।  উত্ত  সংবাদপত্র ব্যতীত,  “সংবাদ রত্নমালা”,  “পাষণ্ড-পীড়ন”,  “সাধুরঞ্জন”  নামক  অপর  তিনখানি
সংবাদপত্রও কিছুদিন তিনি সম্পাদন করিয়াছিলেন। “পাষ-পীড়ন” আর “রসরাজ”-এ এক সময় কবিতা যুদ্ধে
কলিকাতাকে মাতাইয়া তুলিয়া ছিল।  তবে  “প্রভাকর”  সম্পাদনা  করিয়াই  তিনি যশস্বী  হন। সে সময়
বঙ্গদেশের অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত ও কৃতবিদ্য ব্যক্তি “প্রভাকর”-এর গ্রাহক ছিলেন। “প্রভাকর”-এ অনেক প্রাচীন
কবিগণের  লুপ্তপ্রায়  কবিতা,  গীত  ও  পদাবলি বহু কষ্টে সংগ্রহ করিয়া তিনি প্রকাশ করিয়াছিলেন। ইহা
ব্যতীত পদ্যে ও গদ্যে রাজনীতি এবং সমাজনীতিও এই “প্রভাকর”-এ আলোচিত হইত। “প্রবোধ-প্রভাকর” ও
“হিত-প্রভাকর”  নামক  দুইখানি  কবিতা-পুস্তকে  শ্লেষ ও ব্যঙ্গময়ী কবিতা রচনায় তাহার অদ্বিতীয় ক্ষমতা
প্রদর্শিত হয়।  “বোধেন্দু বিকাশ”, “কলি নাটক”, “শকুন্তলা” প্রভৃতি কয়েকখানি নাটকও  তিনি রচনা করেন।

এক সময়ে ঈশ্বর গুপ্তের  মিথ্যা-মৃত্যু-সংবাদ  প্রচারিত  হয়।  তিনি  সেই অমূলক সংবাদ উপলক্ষ করিয়া
“প্রভাকর”-এ একটি কবিতা লিখিয়াছিলেন --- “কে বলে ঈশ্বরগৃপ্ত ব্যক্ত চরাচর।  যাঁহার  প্রভায়  প্রভা পায়
প্রভাকর॥”

কবি ও হাফ-আখড়াইয়ের দলের গান ব্যতীত তিনি অন্যান্য অনেক গানও রচনা করিয়াছিলেন। তাহার মধ্যে
কয়েকটি আগমনি ও  প্রণয়-সংগীত  মাত্র  আমরা  সংগ্রহ  করিতে সমর্থ হইয়াছি। তাহার রচিত গানগুলি
অসাধারণ কবিত্বপূর্ণ।  ১২৬৫  সালের  দশই  মাঘ  রাত্রি  প্রায়  একটার  সময় ৪৮ বৎসর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র
মানবলীলা সংবরণ করেন। এক সময়ে, ঈশ্বরচন্দ্রের, যশ ও প্রতিপ্রত্তি এতই বাড়িয়া উঠিয়াছিল যে, সাধারণে
তাঁহাকে “কবীশ্বর ঈশ্বরচন্দ্র” বলিয়া সম্মান করিত
।”
.
কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্বন্ধে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .    
সুকুমার সেন তাঁর, ১৯৪০ সালে প্রকাশিত, “বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস” গ্রন্থের দ্বিষষ্টিতম (৬২) পরিচ্ছেদ -
“নূতন-পুরানো যুগসন্ধি”-তে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

সংবাদপ্রভাকরের সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) মুখ্যভাবে কবি ছিলেন। তাঁহার আদর্শ ছিলেন
ভারতচন্দ্র।  এই  হিসাবে  ঈশ্বর গুপ্ত  প্রাচীনপন্থী।  তাঁহার  নৃতনত্ব  হইতেছে কাব্যের আশয় নির্বাচনে।
ব্যঙ্গরচনা তো ছিলই, কেন না ইহাতে তাঁহার কবিপ্রকৃতির প্রধানভাবে প্রকাশ পাইয়াছে। তাহা ছাড়া নীতি
দেশপ্রিয়তা সমাজসেবা  ঈশ্বরভক্তি  ইত্যাদি  বিষয়ে  কাব্য  লিখিয়া  এবং ইংরেজী কবিতার অনুবাদ বা
ভাবালম্বন করিয়া নূতন পন্থার সম্ভাবনা জাগাইলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের প্রধানতম কৃতিত্বের পরিচয় তাঁহার লেখায়
পাইনা পাই তাঁহার সাহিত্যিক শিষ্যদিগের নির্ব্বাচনে ও অনুশীলনে।  আধুনিক  বাঙ্গালা সাহিত্যের যাঁহারা
আদি পথিকৃৎ তাঁহাদের অধিকাংশই ছিলেন ঈশ্বরগুপ্তের সাহিত্য শিষ্য অথবা ভাবশিষ্য। ইঁহাদের অন্যতম
রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় মহাশয় আধুনিক বাঙ্গালা সাহিত্য ধারার প্রথম কবি।

পূর্ববর্তী কবিদিগের পরিচয়সংগ্রহ ও  নষ্ট  রচনা  উদ্ধার প্রচেষ্টায় ঈশ্বরচন্দ্রের পূর্বগামী কেহই ছিলেন না। এ
হিসাবে বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রথম ইতিহাস-সংগ্রাহকের সম্মান তাহারই প্রাপ্য। ১৭৫৫ শকাব্দে ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে
ঈশ্বরচন্দ্র রামপ্রসাদের কালীকীর্তন প্রকাশ করেন। ইহার ভূমিকার কিছু অংশ সংস্কৃতে বেশীর ভাগ বাঙ্গালা
পদ্যে রচিত। ইহা হইতে বোঝা যাইবে, পদ্য রচনার
 instinct তখনও কত প্রবল ছিল। . . .

. . . বোধেন্দুবিকাশ নাট্যাকারে গ্রথিত। কবির হয়ত আশা ছিল যে কোনো দিন ইহা অভিনীত হইতে পারে,
সেইজন্য ইহাতে অনেকগুলি গান ও মৌলিক কবিতা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে।  এই  গান ও কৰিতাগুলির হালকা
ভাষা ও ছন্দ উপভোগ্য। গ্রন্থটি ঈশ্বর গুপ্তের লেখার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। . . .

. . .  ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত  কবি  হইলেও  কার্য্যতঃ  ছিলেন  সংবাদপত্রসেবী  বা
journalist, সুতরাং  যেখানে
তিনি নীতিশিক্ষা দিতে চেষ্টা করেন নাই সেখানে তাঁহার কবিতা
journalism রীতিকে ছাড়াইয়া উঠিতে পারে
নাই। কবি হিসাবে ঈশ্বরগুপ্তের দাবী বেশী নয়, কিন্তু ছড়া-রচয়িতা হিসাবে তাঁহার আদর বহুকাল থাকিবে
।”
.
কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর মনুষ্যত্ববোধ -                                                   পাতার উপরে . . .    
কবি ঈশ্বর গুপ্ত ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখলেও ধর্ম-অধর্মের সংঙ্গা, আদর্শবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ ছিল পুরো মাত্রায়।
সংবাদ প্রভাকরের ১২৫৫ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখের সংখ্যায় তিনি লিখেছিলেন . . .  

যে মনুষ্যের অর্থ দ্বারা ক্ষুধাতুরের ক্ষুধা এবং তৃষ্ণাতুরের তৃষা নিবারণ না হইল, সে মনৃষ্য মনুষ্যই নহে ;
স্বজাতীয় ধর্মরক্ষার এবং বিদ্যার আলোচনার জন্য যে মনুষ্য যত্নশীল না হইল, সে মনুষ্য মনুষ্যই নহে ; যে
স্বদেশের স্বাধীনতা স্থাপনের প্রতি অনুরাগী ও উৎসাহী না হইল, সে মনুষ্য মনুষ্যই নহে।” . . . মনুষ্য
তাঁহাকেও বলি, যিনি প্রেমরূপে হেমদ্বারা মনের শরীর শোভিত করেন ; মনুষ্য তাঁহাকেই বলি, দয়া যাঁর
মনের অলৎকার হইয়াছে ; মন্যুষ্য তাঁহাকেই বলি, যিনি স্বদেশীয় লোকের কল্যাণার্থ অত্যন্ত অনুরাগী
; অপিচ মনুষ্য তাহাকেই বলি, যিনি স্বজাতীয় ধর্ম ও শাস্ত্রের উন্নতির জন্য প্রযত্ন করেন এবং স্বদেশের
স্বাধীনতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখেন
।”

পত্রিকার ওই সংখ্যাটি আমরা হাতে পাইনি কিন্তু এই উদ্ধৃতিটি আমরা পেয়েছি সঞ্জীবকুমার বসুর ১৯৫৯
সালে প্রকাশিত, “ঈশ্বর গুপ্ত ও বাংলা সাহিত্য” গ্রন্থ থেকে।
.
কবি ঈশ্বর গুপ্তের রচনা সম্ভার -                                                       পাতার উপরে . . .    
“বোধেন্দুবিকাস” নাটকে  ভাষ্য  ও  ছন্দে  তাঁর  দক্ষতার  প্রমাণ  রয়েছে।  

তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে “কালীকীর্তন” (১৮৩৩), “কবিবর ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের জীবনবৃত্তান্ত” (১৮৫৫),
“বোধেন্দুবিকাস” (১৮৬৩), “ভ্রমণকারী বন্ধুর পত্র” (১৮৬৩), “কলি নাটক”, “শকুন্তলা” প্রভৃতি। ১৮৩২ সালে
কবির ভাই রামচন্দ্র গুপ্ত “সার সংগ্রহ” নামে কবিতাবলীর গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় তাঁর
কবিতাসংগ্রহ প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে। কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্ন তাঁর গ্রন্থাবলী প্রকাশ করেন ১৮৯৯ সালে।

এখানে কবি ঈশ্বর গুপ্তর যে সকল কবিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তাঁর সবগুলিই আমরা এখানে তুলে
দিয়েছি যাতে পাঠক সেই কবিতাটি এখানেই পড়তে পারেন।
.
কবি ঈশ্বর গুপ্তের সিপাহী বিদ্রোহের বিরুদ্ধতা ও রক্ষণশীলতা -                পাতার উপরে . . .    
তাঁর লেখায় স্পষ্ট উঠে আসে তাঁর সিপাহী বিদ্রোহের প্রতি বিরূপ মনোভাব।  একাধিক কবিতায় তাঁকে,
ব্রিটিশদের দ্বারা, ভারতীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহার থেকে মুক্তি পেতে, রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রতি প্রার্থনা জানাতে
দেখা গেলেও এবং ব্রিটিশদের প্রতি ব্যঙ্গাত্মত রচনা লিখলেও,
 সে  অর্থে  প্রতিবাদী  লেখার  পর্যায়  কম
রয়েছে। তাঁর “যুদ্ধ বিষয়ক” কবিতার মধ্যে তা খুব স্পষ্ট। এমন কি রাণী ভিক্টোরিয়ার হাতে তিনি সিপাহী
বিদ্রোহের
 নায়ক  তাতিয়া টোপেকে,  যাঁর  ফাঁসী  হয়  এবং  নানা সাহেবকে,  যিনি  ভারতের  ইতিহাসে  
নেতাজীর  পূর্বের এমন আরেক ব্যক্তিত্ব যিনিও নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন, এঁদের দুজনকে তুলে এনে ধরিয়ে
দেবার কথাও বলেছেন, তাঁর কবিতায়। যেমন, “দুর্ভিক্ষ ২য় গীত” কবিতাটি শুরু হচ্ছে এইভাবে . . .

ওগো মা, বিক্টোরিয়া, কর্ গো মানা,
.          কর্ গো মানা।
যত তোর, রাঙা ছেলে, আর যেন মা !
.  চোক রাঙেনা, চোক রাঙে না॥
.     প্রজা লোকের জাতি ধর্ম্মে,
.     কেহ যেন জোর করে না।
*        *        *        *
*        *        *        *

কবিতাটি শেষ হচ্ছে এইভাবে . . .

.   এই ভারত কিসে রক্ষা হবে,
.    ভেবো না মা, সে ভাবনা।
সেই “তাতিয়া তোপির” মাথা কেটে,
.   আমরা ধোরে দেব “নানা”॥

তাঁর যুদ্ধ “বিষয়ক কবিতার” মধ্যে “নানা সাহেব” কবিতাটিতে তিনি সরাসরি লিখেছেন যে নানা সাহেব . . .
“অধর্মের অন্ধকারে হইয়াছে কানা”

দেখা যাচ্ছে যে এই দু’জন, অর্থাৎ তাতিয়া টোপে এবং নানা সাহেব, যাঁরা সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব
দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি ঈশ্বর গুপ্তর লেখনী যেন বড়ই কঠোর।

এর মূল কারণ সম্ভবত সেকালের বাংলায়, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে একের পর এক সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা
ব্যবস্থার পত্তন ও প্রসারের মত ইতিবাচক কর্মকাণ্ড হয়ে চলেছিল, যা ভারতের অন্যত্র তখনও সেভাবে হয়ে
ওঠে নি। সিপাহী বিদ্রোহের জন্যই বিদ্যাসাগরের অনেক পরিকল্পনা, বিশেষ করে কুলীনদের মধ্যে বহু বিবাহ
প্রথা রোধ করার আইন (১৮৫৭) সহ,  হয়  পিছিয়ে  দিতে  হয়েছিল  নয়  আর  হয়ে ওঠে নি। কারণ তখন
চলছিল ব্রিটিশদেরই এ দেশে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

শিক্ষিত বাঙালীর মনে সম্ভবত একটা ভয় কাজ করছিল যে সিপাহী আন্দোলনে ব্রিটিশদের হার হলে ভারত
আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।  এই ভয় একেবারেই অমূলক ছিল না। ১৮৫৮ সালে, সিপাহী
বিদ্রোহের পরে, ভারতে রাজত্ব করার সমস্ত ক্ষমতা  ব্রিটিশ সরকার, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে
নিজের হাতে নিয়ে নেন এবং তাঁরা ভারতীয়দের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা
সিদ্ধান্ত নেন।

ঈশ্বর গুপ্ত, তাঁর “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকায়, সত্য খবর পরিবেশন করে আসছিলেন এ কথা সত্য বটে,
অর্থাৎ যুদ্ধে হার-জিতের সত্য বিবরণ দেওয়া ইত্যাদি, কিন্তু তাঁর যুদ্ধ-বিষয়ক কবিতায়, সম্ভবত এই সব
উপরোক্ত কারণেই বারবার আমরা সিপাহী বিদ্রোহ বিরোধী ও ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে লেখা দেখতে পাই।

সঞ্জীবকুমার বসুর ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত,  “ঈশ্বর গুপ্ত ও বাংলা সাহিত্য” গ্রন্থের  “ঈশ্বর গুপ্ত ও সিপাহী
বিদ্রোহ” অধ্যায়ে আমরা এই প্রতিবেদনের ঠিক বিপরীত সুর পাই। স্পষ্টই তিনি ঈশ্বর গুপ্তর যুদ্ধ বিষয়ক
অন্যান্য কবিতাগুলি এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি গ্রন্থের ১১৬-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .

সিপাহী বিদ্রোহের পর "তিনি যুদ্ধবিষয়ক ঘটনাগুলিকে ছন্দে গ্রথিত করে আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন,
যেমন শিখ যুদ্ধকে বর্ণনা করে তিনি বলেছেন :
“লিখিতে উদার দুঃখ, লেখনীর মুখে।
সেলের মরণগুলি, শেল ফুটে বুকে॥
এতি কম্প ছেড়ে কেম্প, অস্ত্রধরি বলে।
মরিলে শীকের যুদ্ধে, সময়ের স্থলে॥
হায় হায় এই দুঃখ কিসে হবে দূর।
বৃটিশের রক্ত খায়, শৃগাল কুক্কুর॥
সিপাহী বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে যে সব ছোট বড় বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল, সেগুলি কখনো বৃটিশের জয়, কখনো
বা দেশীয় সৈন্যদের জয়, এরকম ভাবে বহুবার জয়-পরাজয়ের পালা ঘটেছে উভয় পক্ষের। কবি এই সুযোগে
বৃটিশের পরাজয়ের কলঙ্কের উপর আরো বেশী কালি লেপনের জন্য নির্ভয়ে কলম চালিয়েছেন। ইংরেজ
রাজত্বে বাস করে ইংরেজের পরাজয়ের কথা এমন কি “বৃটিশের রক্ত খায় শৃগাল কুক্কুর”--- এমন দুঃসাহসিক
কথা বলা বা লেখায় যে কতটা নির্ভীকতা কতটা তেজস্বিতা ও মনোবলের প্রয়োজন তাই লক্ষণীয়। এমন
নির্ভীকতা শুধু সে যুগে তো নয়ই, এমন কি এ-যুগেও তার দৃষ্টান্ত বিরল দৃষ্ট। যুদ্ধ সম্বন্ধে কবির যে সকল
কবিতা আছে, তা সত্য ঘটনার অনুরূপ বলেই মনে হয়, কারণ যখন বৃটিশের জয় হয়েছে তখন তাঁদের
জয়ের কথা লিখেছেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে, সত্য ঘটনাগুলিকে তিনি প্রকৃত সাংবাদিক দৃষ্টিতে দেশের
সামনে পরিবেশন করেছেন “সংবাদ প্রভাকরে'র মাধ্যমে। বহু যুদ্ধের কথা তিনি লিখেছেন সমসাময়িক
ঘটনাগুলকে কেন্দ্র করে-যার ফলে সে যুগের সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের অনেক মূল্যবান উপাদানের
সৃষ্ট হয়েছে তাঁর রচনায়, সেগুলির মধ্যে শিখ যুদ্ধ, কানপুরের যুদ্ধ, দিল্লীর যুদ্ধ, এলাহাবাদের যুদ্ধ, কাবুলের
যুদ্ধ, আগ্রার যুদ্ধ, ব্রহ্মদেশের সংগ্রাম ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য
।”

উপরোক্ত কবিতাটির শিরোনাম “শীক সংগ্রাম” (মিলনসাগরে দেওয়া রয়েছে)। যদি পুরো কবিতাটি আমরা
পড়ি তাহলে দেখা যাবে যে কবি ব্রিটিশদের পক্ষে থেকেই পুরো কবিতাটি রচনা করেছেন। “বৃটিশের রক্ত
খায় শৃগাল কুক্কুর” লেখাটি ব্রিটিশদের প্রতি সহানুভূতি, দুঃখ ও হাহাকারের ভাব থেকে লেখা হয়েছে, তাঁদের
প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব থেকে নয়।

ঈশ্বর গুপ্তর লেখায় ব্রিটিশ বিরোধী (মূলত ব্যঙ্গাত্মক)
 বা  স্বদেশ  ভাবনার  লেখা থাকলেও তাঁর পরবর্তী
লেখক প্রজন্মের লেখাতেই আমরা স্বদেশভাবের বিষ্ফোরণ দেখতে পাই। সেই পরবর্তীরা তাঁর উত্সাহে বা
কিছুটা প্রশ্রয়ে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়,
দীনবন্ধু মিত্র, মনোমোহন বসু, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখরা। এর জন্য বাঙালী জাতি তাঁর কাছে চিরঋণী থাকবে।

কবি ঈশ্বর গুপ্ত ও সিপাহী  বিদ্রোহ  বিষয়টি,  পরবর্তী  কালের  অনেক  গবেষকরাও  খানিকটা  এড়িয়েই
গিয়েছেন। কারণ তাতে উঠে আসে যে ১৮৫৭ এর সিপাহী বিদ্রোহ, ব্রিটিশের ছত্রছায়ায় থাকা সেই সময়ের
শিক্ষিত বাঙালী সমাজে তেমনভাবে সমর্থন লাভ করেনি। ঈশ্বর গুপ্তের লেখা, সেই সময়কার বুদ্ধিজীবী
সমাজের বেশ খানিকটা প্রতিনিধিত্ব তো করেই।
.
কবি ঈশ্বর গুপ্তের রক্ষণশীলতা -                                                     পাতার উপরে . . .    
কবি ঈশ্বর গুপ্ত, প্রথমদিকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজভুক্ত ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার
প্রমুখদের উদ্যোগে তখন যে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাংলা উত্তাল হয়েছিল, সেই বিধবা বিবাহ বা নারীশিক্ষার
তিনি ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি। তাঁর “বিধবা বিবাহ”, “বিধবা বিবাহ আইন” প্রভৃতি কবিতা পড়লেই তা বোঝা
যায়। এই বিষয়ে লেখার সময়ে
বিদ্যাসাগরও তাঁর লেখনীর খোঁচা থেকে বাদ যান নি।

শর্মিষ্ঠা সেন তাঁর ২০০৭ সালে প্রকাশিত, “বাংলা সাহিত্যে বিধবা চিত্রণ” গ্রন্থের ১ম অধ্যায় “ইতিহাসের
প্রেক্ষাপট : সল্ তে পাকানোর পর্ব”-এর ৫৯-পৃষ্ঠায়, ঈশ্বর গুপ্তকে উল্লেখ করেছেন এইভাবে যে তিনি তাঁর
কবিতার মধ্য দিয়ে সেই সময়কার বৃহত্তর গোঁড়া ও রক্ষণশীল সমাজের কথাই বলছিলেন . . .

Legislative papers ACT XV 1856 Vol I & II থেকে জানা যায় এই আইনের পক্ষে আবেদনপত্রের
সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ছিল বিপক্ষের আবেদনপত্র। ঈশ্বর গুপ্ত আইন পাশ হবার পরেই ছড়ায় যে
ব্যাঙ্গবাণ হানলেন, বলা যায়, বরং সেই ব্যঙ্গই অন্ততঃ পাঁচ কোটি মানুষের বক্তব্য ছিল :

হিন্দু বিধবার বিয়া আছে অপ্রচার।
বহুকাল হ'তে যার নাহি ব্যবহার॥
সে বিষয়ে ক্ষতাক্ষত না করি বিশেষ।
করিলেন একেবারে নিয়ম নির্দ্দেশ॥
শত শত প্রজা তায় ব্যখা পায় প্রাণে।
তাদের আর্দ্দাশ নাহি শুনিলেন কানে॥
--- না হইতে শাস্ত্রমতে বিচারের শেষ।
বল করি করিলেন আইন আদেশ॥
... করিছে আমার ধর্ম্ম আমাতে নির্ভর।
রাজা হয়ে পরধর্ম্মে কেন দেন কর॥

বিদেশি শাসকের বিধবাবিবাহকল্পে সাহায্য করা বা হাত দেওয়া মোটেই পছন্দ হয়নি “শত শত প্রজার।
রামায়ণের কাল থেকে যে নারীর যে রূপটি পুরুষসমাজের পূজ্যা, সে সতী-সীতা কিংবা জননীসীতা ; হিন্দু
বিধবার সঙ্গে যে ব্যবহারই সে করুক, সে হল আদর্শগতভাবে তার ‘জননী’, যার 'অ-সতীত্ব' সে সহ্য করতে
পারেনি কখনোই-অথচ, এই আইন সেই নারীর পুনর্বিবাহ বিষয়ে কথা বলছে। তাই, আহত কবি পিতৃতন্ত্রের
প্রতিনিধি হয়ে প্রশ্ন করছেন---

বিধবার বিয়ে দিতে যাহারা উদ্যত।
তার মাঝে বড় বড় লোক আছে যত॥
যারে ইচ্ছা তারে হয় ডাকিয়া আনিয়া।
ঘরেতে বিঝবা কত পরিচয় নিয়া॥
গোপনেতে এই কথা বলিবেন তারে।
জননীর বিয়ে দিতে পারে কি না পারে
॥”

[ শর্মিষ্ঠা সেন, ঈশ্বর গুপ্তর “বিধবা-বিবাহ আইন” কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন ]

অনেকে মনে করেন যে তিনি তাঁর “বিধবা-বিবাহ” কবিতায় কিছুটা নরম হয়ে, বিধবা বিবাহের পক্ষে মত
দিয়েছেন - যদি সেই বিধবা “অক্ষতযোনি”-র হন। ঈশ্বর গুপ্ত সরাসরি
বিদ্যাসাগরের নাম না নিয়ে তাঁকে
খোঁচা দিয়েছেন তাঁর “বিধবা-বিবাহ” কবিতায় এইভাবে . . .
পরাশর” প্রমাণেতে বিধি বলে কেউ।
কেহ বলে এ যে দেখি সাগরের ঢেউ॥
কোথা বা করিছে লোক শুধু হেউ হেউ।
কোথা বা বাঘের পিছে লাগিয়াছে ফেউ॥
অনেকেই এইমত লতেছে বিধান।
“অক্ষতযোনির" বটে বিধাহ-ধিধান


এতকিছুর পরে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ঈশ্বর গুপ্ত বিধবা-বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন। এত তির্যক-ব্যঙ্গ-
কৌতুক, এমন কি স্বয়ং
বিদ্যাসাগরকে খোঁচা মেরে লেখা সত্ত্বেও, ঈশ্বর গুপ্ত সম্ভবত একটি দোলাচলের মধ্য
দিয়ে চলেছিলেন --- তিনি বিধবাবিবাহ সমর্থন করবেন কি না! তাঁর সেই দোলাচলের সমাপ্তি ঘটেছিল একটি
চরম দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার পরে। তারপরেই তিনি তাঁর পত্রিকা “সংবাদ প্রভাকর”-এর ২৮শে
বৈশাখ ১২৬২ এর সংখ্যার (১০ই মে ১৮৫৫) সম্পাদকীয়তে বিধবা বিবাহের পক্ষে স্পষ্ট অভিমত প্রকাশ
করেন। সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ছিল --- তাঁর “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার ছাপাখানার বাইরেই একদিন
তাঁরা একটি সদ্যপ্রসূত কন্যাসন্তান দেখতে পান। জন্মের পরপরই তাকে সেখানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই
ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পরেই তিনি তাঁর পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখেন . . .

"
২৮ বৈশাখ ১২৬১। ১০ মে ১৮৫৫
বর্তমান সময়ে যখন হিন্দু বিধবাদিগের বিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব বাহুল্যরূপে আন্দোলন হইতেছে তখন কোন
বিধবার গর্ভস্রাব, অথবা তদগর্ভজাত কোন সন্তান-সন্ততি সঙ্গোপনে রাজপথে নিক্ষিপ্ত হইলে বিবেচকদিগের
অন্তঃকরণে অসীম দুঃখের সঞ্চার হয় এবং এ ঘটনা বিধবাবিবাহের কর্ত্তব্যতা বিষয়ে সম্পূর্ণ
পোষকতা করে, অতএব আমরা গত সোমবার রজনীযোগে আমাদিগের যন্ত্রালয়ের সম্মুখে রাজপথের উপর
যাহা দর্শন করিয়াছি তাঁহার সংক্ষেপ বিবরণ নিম্নভাগে লিখিলাম।

আমরা সন্ধ্যার পরে শ্রবণ করিলাম যে একটি সদ্যঃপ্রসূত কন্যা রাজপথে, নিক্ষিপ্ত হইয়াছে এবং সে ক্রন্দন
করিতেছে, আমরা শ্রুতমাত্র তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, ঐ কন্যা এক ধূলার উপরে শয়ন করিয়া আছে
তাহার নাভিচ্ছেদও হয় নাই শরীরে রক্তচিহ্ন রহিয়াছে, একজন দয়াবান যবন তাহাকে দুগ্ধপান করাইতেছে,
আমরা তৎক্ষণাৎ পুলিশ প্রহরীকে নিকটস্থ সারজন সাহেবের নিকট পাঠাইলাম, কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টার
পরে সে সাহেব ও জমাদার প্রভৃতিকে সঙ্গে লইয়া প্রত্যাগত হুইল, সাহেব কন্যাকে দেখিয়া নিস্তব্ধে ক্ষণকাল
চিত্র পুত্তলিকার ন্যায় দণ্ডায়মান থাকিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন পরে বহু বিলম্বে সুপ্রেন্টেণ্ডেন্ট সাহেবের
আদেশ লইয়া আসিয়া জমাদার ঐ কন্যাকে মেডিকেল কলেজে লইয়া গিয়াছে, আমরা সারজন সাহেবের
বিবেচনায় আশ্চর্য্য হইয়াছি, ঐ মেডিকেল কলেজে পাঠাইতে তাঁহার সাধ্য হইল না, তিনি উচ্চপদস্থ
কর্ম্মচারির অনুমতি অপেক্ষা করিলেন, কি আশ্চর্য্য! ঐ সময়ের মধ্যে কন্যার প্রাণ বিয়োগ হইলে কে তাহার
দায়ী হইত। ঐ কন্যা ভদ্রকুলোদ্ভবা বিধবার গর্ভজাত তদ্বিষয়ে কোন সংশয় নাই, পুলিশের লোকেরা এরূপ
ঘোষণা করিয়াছে যে, যে তাঁহার জননী ও জন্মদাতা'র নির্দ্দেশ করিতে পাবিবেক তাহাকে ১০০ টাকা
পারিতোষিক দিবেন।

বিধবাদিগের বিবাহের নিয়ম থাকিলে এরূপ ঘটনা কদাচ হইতে পারে না, আহা! অন্ধকারে যদ্যপি
কোন গাড়ী ঐ সদ্যপ্রসূত কন্যার উপর দিয়া যাইত, তবে তৎক্ষণাৎ সে বিনষ্ট হইত, আহা যে কুল-কলঙ্কিনী
এই কার্য্য করিয়াছে তাহার অসাধ্য কোন কার্য্যই বোধ হয় না।

আমরা ষে বিষয়ে লিখিলাম এ বঙ্গদেশের ব্যভিচারিণীদিগের দ্বারা এইরূপ কত শত ঘটনা হইতেছে তাহার
সংখ্যা হয় না, ইহাতেও হিন্দুমণ্ডলী বিধবাবিবাহে সম্মত হয়েন না, কি চমৎকার! আমরা অবগত হুইলাম যে
মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকেরা নাড়িচ্ছেদ করিয়া ঐ কন্যাকে উত্তমাবস্থায় রাখিয়াছেন, একজন
দাই নিযুক্ত করিয়া দিয়াছেন এবং সে বিলক্ষণ সুস্থ আছে
।”

[ দুর্ভাগ্যবশত “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার ১০ই মে ১৮৫৫ তারিখের সংখ্যাটি আমাদের সংগ্রহে নেই। কিন্তু
আমরা সেই দিনের এই সম্পাদকীয়টি পেয়েছি, ১৯৬০ সালে প্রকাশিত, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত “সাময়িক পত্রে
বাংলার সমাজচিত্র” ৪র্থ খণ্ড গ্রন্থের, পরিশিষ্ট ১, ৭৬১-পৃষ্ঠা থেকে। ]

কবি ঈশ্বর গুপ্তর জীবনীকারগণের মতে, ১৮২৯ সাল থেকে তাঁকে সামাজিক আন্দোলনে নবীনদের সাথী হতে
দেখা যায়। তত্ববোধিনী সভা ও হিন্দু থিয়ফিলানথ্রপিক সভার সঙ্গেও তাঁর সক্রীয় যোগাযোগ ছিল। তিনি
ধর্মসভার বিরোধী ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক উন্নতি বিষয়ক আন্দোলনের সমর্থন করতেন ও
নিপীড়িত জনসাধারণের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
.