মিলনসাগর সম্বন্ধে এই লেখাটি লেখেন শ্রীমতী সাগরিকা সেনগুপ্ত এবং ৩০ অগাস্ট ২০০৯ তারিখে কলকাতার বিড়লা সভাঘরে "বাংলা জ্বলছে তাই
ভাঙো বাস্তিল" অনুষ্ঠানে এই লেখাটি পাঠ করেন
শ্রীমতী সাগরিকা হোড় :---

পন হ’তে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
.         বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া ||”

আজকের যুগে বিশ্বলোকের সাড়া পেতে “কমপিউটর” নামক যন্ত্রটির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য | বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে
ঘরে বসে একটি “মাউসের” ক্লিকে সমগ্র পৃথিবীকে আজ হাতের মুঠোয় ধরতে পেরেছে মানুষ |

বিশ্বের সমস্ত কমপিউটরকে নানান যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক সূত্রে গ্রথিত করে বিছিয়ে আছে একটি তথ্য সমৃদ্ধ
“অন্তরজাল” বা ইনটারনেট, যেখানে
Google বা Yahoo-র মত সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে আমরা নানান ঠিকানার ওয়েবসাইটে
পৌঁছে যেতে পারি | একেই আমরা নেট সার্ফিং বলে থাকি | নিজের ভাবনা বা সৃষ্টিকে এই তথ্য-সমুদ্রে ভাসিয়ে
দিলে আমরা নিমেষের মধ্যে বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে যেতে পারি |

www.milansagar.com বাংলাভাষায় এমনই একটি সার্থক প্রয়াস | গত ২০০৫ সালের ৪ঠা জুন এই ওয়েবসাইটটি উদ্বোধন
করেন
জনাব শেখ মহম্মদ আলী | বাংলা ভাষায় আরো কিছু ওয়েবসাইট থাকলেও প্রযুক্তিগত এবং তথ্যগত দুটি দিক
থেকেই বিচার করলে সম্ভবত এটি বাংলা ভাষার বৃহত্তম ওয়েবসাইট |

বাংলায় যে সব ওয়েবসাইট আছে তাতে বেশীর ভাগই রোমান হরফে বাংলা লিখতে বা পড়তে হয় বা লেখা কে ছবির
আকারে দেওয়া হয়, কিন্তু মিলনসাগরে বাংলা হরফেই এর তথ্য ভাণ্ডারে বিচরণ করা যায় | এতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার
করা হয়েছে যাতে কোনো কমপিউটরে বাংলা ফন্ট বা হরফ ইনস্টল না করা থাকলেও বাংলা ফন্ট পড়া যাবে | এই
প্রযুক্তির বলে বিদেশের নানান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কম্পিউটর থেকে ইনটারনেট সার্ফিং করার সময়
বহু খ্যাতনামা বাংলা সংবাদ পত্রের প্রফেশনাল ওয়েবসাইটের বাংলা পড়া না গেলেও মিলনসাগরের বাংলা ঠিকঠাক পড়া
যায় |

এ ছাড়াও যাবতীয় দৈনন্দিন লেখাপড়ার কাজ, ই-মেল ইত্যাদি সব কাজই যাতে সম্পূর্ণ বাংলায় করা যায়, তার
ব্যবহার
বিধিও সরল ভাবে এই ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে |

বিগত চার বছর ধরে এই ওয়েবসাইটি যে সব সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে “বাংলা কবিতা” তার মধ্যে অন্যতম | এখানে
প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বহু সংখ্যক কবির কবিতা পাওয়া যাবে | তাই বাংলা ভাষার পূর্বসূরী
অবহট্ট থেকে শুরু করে প্রাচীন চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, মৈমনসিংহ গীতিকা, অষ্টাদশ শতকের ভারতচন্দ্র,
রামপ্রসাদ, উনবিংশ শতকের মধুসূদন, অতুল প্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল - রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি পেরিয়ে
আধুনিক কালের
জীবনানন্দ, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হাংরি জেনারেশন- এর কবি মলয় রায়চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ
ঘোষ, তরুণ সান্যাল, শিশির কুমার দাশ, জয় গোস্বামী, তসলিমা নাসরিন,  মৃদুল শ্রীমানী-তে পৌঁছে যেতে কোন অসুবিধাই
হয় না | এত সংখ্যক কবির নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হলেও এঁরা সকলেই এক ধারার কবি নন | বিভিন্ন ধারার এই কবির
সংখ্যা প্রায় ২০০ এবং ২০০০ এর উপর এঁদের কবিতার সংখ্যা | সংখ্যাটি অবশ্যই নগন্য নয় |

এ তো গেল কবিতার মূলস্রোতের দিক | অন্যদিকে সাম্প্রতিক অস্থির রাজনৈতিক আবহে উঠে
আসা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম
আন্দোলন থেকে প্রতিবাদী কবিতার বিস্ফোরণ, সমৃদ্ধ করে তুলেছে এই ওয়েবসাইটটিকে | নানান সংবাদপত্র, লিটল্
ম্যাগাজিন, পোস্টার, স্টেশনের দেওয়ালে সাঁটা নানা টুকরো কাগজ থেকে সংগৃহিত কবিতা --- এতে আছে ৩০০র অধিক
কবির ৬০০র উপর কবিতার সংকলন | এখানে বহু প্রতিষ্ঠিতের পাশে বহু প্রথমবারের-কবির মেলা | এই ক্রমবর্ধমান
সংগ্রহে আছে সিঙ্গুরের কবি
নয়নতারা ধারা, নন্দীগ্রামের অনুরাধা মহাপাত্র, আশিস দলপতি এবং আরো অনেকে |

এবার আমরা একটু অন্য দিকে চোখ ফেরাব | ১৩ই নভেম্বর ১৯১৩ সাল --- নোবেল প্রাইজ পেলেন
রবীন্দ্রনাথ | বাংলা তথা
বাঙালী জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করল | আমাদের রবি ঠাকুর হলের
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ |  কিন্তু  এ কি শুধুই
আনন্দের ইতিহাস !? না !

১৯০২ থেকে ১৯০৮, এই ক’বছর কবির জীবনের সবচেয়ে কঠিন শোকময় সময় | একে একে স্ত্রী মৃণালিনী, কন্যা রেণুকা,
পিতা দেবেন্দ্রনাথ ও কনিষ্ঠ পুত্র শমী-র মৃত্যুতে তিনি আঘাতে জর্জরিত | এই শোকাগ্নি কবির হৃদয়কে জ্বালিয়ে
পুড়িয়ে বের করে আনল “গীতাঞ্জলির” আলো ও আঘ্রাণ |

“আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে
আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো ||
এই করেছ ভালো নিঠুর হে ||’
--- ১৯১০ এর রচনা |

বাংলা “গীতাঞ্জলি”-র প্রথম প্রকাশ ১৩১৭ সালের ভাদ্রমাসে, শান্তিনিকেতনে | অর্থাৎ আমাদের গীতাঞ্জলি ১০০ বছরে পা
রাখতে চলেছে | এই শুভমুহুর্তে
মিলনসাগর, বাংলা এবং ইংরেজী গীতাঞ্জলিকে ওয়েবসাইটের পাতায় মেলে ধরে গুরুদেব-
এর প্রতি তার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করছে |

১৯১৩ সালের ১লা নভেম্বর, লণ্ডনের “ইণ্ডিয়া সোসাইটি” থেকে একই নামে কবি
William Butler Yeats এর লেখা ভূমিকা সহ
রবীন্দ্রনাথ-এর নিজের অনুবাদ করা ১০৩টি গান নিয়ে ইংরেজী গীতাঞ্জলি বইটি প্রকাশিত হয় | উল্ল্যেখ্য এর মধ্যে ৫৩টি
গান
বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে নেওয়া | বাকী ৫০টি অন্য কাব্যগ্রন্থ --- গীতালি, গীতিমাল্য, নৈবেদ্য ও শিশু থেকে নেওয়া |
মিলনসাগরে
ইংরেজী গানগুলির পাশাপাশি বাংলা মূল গানগুলি এমনভাবে দেওয়া আছে, যাতে কেউ ইচ্ছা করলে নির্দিষ্ট
ইংরেজী গানটির নীচে
options-এ ক্লিক্ করে মূল বাংলা গানটি দেখে নিতে পারেন | বাংলা গীতাঞ্জলির গানগুলি বাদেও
বাকি ৫০টি গানও একই ভাবে দেখে নেওয়া যায় |

Milansagar.com একটি On Line Gallery ও বটে | এর একটি বর্ণাঢ্য অঙ্গ হল এর চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের পাতাগুলি | অনামী
থেকে খ্যাতনামা, নবীন থেকে প্রবীণ, নানা শিল্পীর শিল্পকর্ম দ্বারা এই পাতাগুলি অলঙ্কৃত |

এখানে প্রথিতযশা শিল্পী
ফাল্গুনী দাশগুপ্ত, সান্ত্বনা কুমার গোস্বামী, স্বনামধন্য ভাস্কর সুরজিত দাস এর কাজও যেমন আছে,
তেমনই
অদ্রীশ দাস,  ভাস্কর শুচিস্মিতা গোস্বামী, সন্দীপ মিশ্র, অমৃতা অরোরা, কে.এল্. ইন্দুমতি  প্রমুখের কাজও স্থান
পেয়েছে | পাশাপাশি অবশ্যই আছে
মিলনের ভাস্কর্য |

ভাস্কর্যের বিভাগে একটি আকর্ষনীয় অঙ্গ হল সাধারণ ব্ল্যাকবোর্ড
চকের ভাস্কর্য | শুনতে নতুন হলেও ভাস্কর্যের এই মাধ্যম
খুব কিছু নতুন নয় | দেশে-বিদেশে বহু মানুষ এই মাধ্যমে কাজ করে চলেছেন | সেই রকম বহু শিল্পীর কাজ, এই
On Line
Gallery তে বিনামূল্যে প্রদর্শিত করে সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এই ওয়েবসাইট Milansagar.com | এই On Line
Gallery থেকে বহু পেশাদার শিল্পীরা কাজের অর্ডার পেয়ে থাকেন |

এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরণের সাহিত্য, প্রবন্ধ, সংবাদ প্রতিবেদন, গল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হয়ে চলেছে আমাদের ওয়েবসাইটের
"
আপনার মতামত" বিভাগে |

পরিশেষে মিলনসাগর সম্বন্ধে
Yahoo! ওয়েবসাইট বিশেষজ্ঞদের কিছু মতামত আপনাদের সামনে রাখছি :---
Yahoo! Web hosting এর Amanda জানিয়েছেন ---
“Your website is one of the most attractive site which I have seen !”
আবার Yahoo Customer Care এর Wilmer জানিয়েছেন ---
“I’ve viewed the website ‘milansagar.com’ and I must appreciate that you have built an amazing website . . .!”

অতএব, বন্ধু! এই Milansagar.com এ এসে আপনারা এতটুকুও আনন্দলাভ করলে, বাংলা ভাষায় অন্তত ব্যক্তিগত কাজ
করতে উদ্বুদ্ধ হলে অথবা বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে কোনোও ভাবে উপকৃত হলে, এই উদ্যোগ সার্থক হবে |

আজকের এই সন্ধ্যায়
মিলনসাগর নিবেদন করছে প্রতিবাদী সংগীতানুষ্ঠান “বাংলা জ্বলছে তাই ভাঙো বাস্তিল” |

২৩শে সেপ্টেম্বর ২০০৬ সিঙ্গুরের বিডিও অফিসের কালো রাত্রি, ২রা ডিসেম্বর সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে
নন্দীগ্রামের ১৪ই মার্চ ২০০৭-এর প্রথম এবং নভেম্বরের দ্বিতীয় গণহত্যার এই সময়কাল কে নিয়ে রচিত
দুষ্ট কবির ধৃষ্ট
কবিতা অবলম্বনে, সুরকার-গায়ক দেবাশিস রায়-এর সুরে, মানিক মণ্ডল-এর পরিচালনায়, “কলকাতা প্রকাশন” প্রকাশ করে
ভিডিও এবং অডিও সিডি “
বাংলা জ্বলছে”, যা গ্রাম বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সবিনয়ে অতি ক্ষুদ্র
হলেও একটি ভূমিকার দাবী রাখে | কালের বিচারে এটি একটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক নথি হিসাবে বিবেচিত হবে বলে
আমাদের স্থির বিশ্বাস |

পরবর্তী সময়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পথ ধরে আসে ---  জুন ২০০৮ এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের জয়,
অগাস্ট ২০০৮ এ টাটার কারখানাকে ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অবরোধ | এই পট পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে
রাজ্যের ৩২ বছরের অপশাসনের চূড়ান্ত প্রতীক --- সিঙ্গুরে জোর করে কেড়ে নেওয়া জমি ঘিরে দেওয়া পাঁচিলকে
দুষ্ট কবি বাস্তিল দুর্গের সাথে তুলনা করে যে কবিতা রচনা করেছেন সেই কবিতা অবলম্বনে সুরকার-গায়ক
দেবাশিস রায়-
এর সুরে এবং কণ্ঠে “রাগা মিউজিক” ২০০৯ সালের গানমেলায় প্রকাশ করেন অডিও সিডি “
ভাঙো বাস্তিল” | গান মেলায়
ভাঙো বাস্তিল”-এর উদ্বোধন করেন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সুনন্দ সান্যাল মহাশয় |

আজ আমরা এই সিডি দুটির গানগুলি নিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি | আমরা আশা রাখি এই গানগুলি নতুন
দিনের আন্দোলনের গান হিসেবে জায়গা করে নেবে |

.                                                                       ......
৩০ অগাস্ট ২০০৯, বিড়লা সভাঘর, বালিগঞ্জ,
কলকাতা


          **********

                                                                                                                        উপরে