নেতাজী এবং কিছু প্রতিক্রিয়া
মিলন সেনগুপ্ত
৩০শে জুন ২০০৬
ই-মেল: srimilansengupta@yahoo.co.in                       এই পাতাটি Counter বার দেখা হয়েছে
                                                                    
                                  এ বিষয় আপনার মতামত এখানে ক্লিক করে COMMENT জানান      


নেতাজীর মৃত্যু রহস্যের অন্ধকার এবারও দুর করা সম্ভব হল না। কিন্তু মুখার্জী কমিশনই প্রথম
কমিশন যার রিপোর্ট আগের দুটি কমিশনের হাওয়াই-জাহাজ দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর থিওরিকে
নস্যাত্ করে দিয়েছে। এই নিয়ে বহু পত্র-পত্রিকা বিশেষ করে বর্তমান এ ধারাবাহিক বহু লেখা  বার  
হচ্ছে। খোঁজখবর টিভি চ্যানেলও খুব সুন্দর ভাবে ব্যপারটা উত্থাপন করছেন। আমি তাই রিপোর্টের
বিষয় বস্তু নিয়ে কিছু বলব না। আমি বলবো মুখার্জী কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে কিছু প্রতিক্রিয়া
সম্বন্ধে।

ভারত সরকার - যেন বিবৃতি লিখে বসেছিলেন, রিপোর্ট বার হওয়ার অপেক্ষায়। রিপোর্ট বেরোবার
খবর পাওয়া মাত্রই তাঁরা জানিয়ে দিলেন যে এই রিপোর্ট তাঁরা সসন্মানে আস্তাকুরে বিসর্জন দিচ্ছেন।
নেহেরু পরিবারের উওরসুরিদের কাছে অবশ্য আমরা অন্য কিছু আশা করিনি। কমিশন চলা কালীন
তাঁরা সর্ব শক্তি দিয়ে নানাভাবে অসহযোগিতা করেও যখন মনমত রিপোর্ট পাওয়া গেল না তখন এ
ছাড়া তাঁদের কাছে আর কোন পথ খোলা ছিল না। প্রশ্ন ওঠে - কেন ? তাহলে কি তাঁদের সত্যি
কিছু লুকোবার আছে ? আমরা বিশ্বাস করি - আছে। এমন কিছু অতি গোপন চক্রান্তের কথা যা
ভারতের জনগণ যদি কোনদিন জানতে পারেন তবে কংগ্রেস পার্টি আর লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না।

বি জে পি - কমিশনের কথা থেকেই বোঝা গেছে যে অটলজীর সরকারও মুখার্জী কমিশনকে
সহযোগীতা করতে যথেষ্ট টালবাহানা করেছিলেন। কংগ্রেসের বিরোধীতা করতে তাঁরা অবশ্য এখন কিছু
কথা খরচ করছেন। কিন্তু তাঁরা ক্ষমতায় থাকার সময় আরো কিছু করলে বুঝতাম যে নেতাজীর প্রতি
তাঁরা সত্যিই শ্রদ্ধাবান। অটলজীর আমলে আমরা টের পেলাম ইন্দিরাজীর অনুপস্থিতি। কার্গিলের
যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে অটলজী পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছিলেন বটে। আমাদের ছ'শোর বেশী জওয়ান
বিনাবাক্যে প্রাণ দিতে একটুও দ্বিধা করেননি। কিন্তু অটলজীর চারিত্রিক দৃড়তার অভাবের জন্যই
আমরা hot pursuit করে পাকিস্তানের ভেতরে অবস্থিত আতঙ্কবাদীদের শিবির গুঁড়িয়ে দিতে পারিনি।
সেই সুযোগ হাতছাড়া করার মূল্য এখনও আমাদের সাধারণ মানুষের রক্ত দিয়ে চুকাতে হচ্ছে। তা
ছাড়া অটলজী নাকি নেহেরুর একজন ণ্ডণমুগ্ধ ভক্ত। তাঁদের কাছে বেশী কিছু আশা না করাই সমিচীন।

ফরওয়ার্ড  ব্ লক বাদে বাম দলগুলি - তাঁদের একদা প্রধাণ শত্রু, শ্রেণীশত্রু বুর্জোয়া দল কংগ্রেস
এখন তাঁদের বন্ধু! যে সুভাষ বোস একদা তাঁদের চোখে তোজোসানের কুকুর ছিলেন, পরবর্তি কালে
ভোট নামক দশচক্রের পাঁকে তিনি হয়ে উঠলেন এক অতি দুর্ভাগ্যজনক ঐতিহাসিক ভুলের শিকার, এক
মহান নেতা! তাই তাঁরাও বিশেষ কিছু হৈ চৈ করছেন না। তার উপর বাংলায় ইলেকশন সদ্য শেষ
হয়েছে। পরেরটা আসতে অনেক দেরী। ইলেকশন কমিশনের দৌলতে, রিগিং এর অপবাদ ছাড়া
অভূতপূর্ব জণসমর্থন পেয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছেন। যদিও নিন্দুকরা বলছেন এবার নাকি
ভোটবাক্সের সফ্টওয়ারে কারচুপি করা হয়ে ছিল।এই পোড়া রিগিং শব্ দটা যে কবে তাঁদের ছেড়ে
যাবে কে জানে। নেতাজীকে নাকি রাশিয়াতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল - মুখার্জী কমিশনের সামনে এ
তথ্যও নাকি উঠেছে। কাজেই ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়লে তাদেরও জনগণের সামনে মুখ রক্ষা
করা মুশকিল হবে !

ফরওয়ার্ড  ব্ লক - সংগঠিত প্রতিবাদের বেশীর ভাগটা ওঁরাই করছেন। নেতাজীর নিজের হাতে এই
দলটি তৈরী হয়েছিল। নেতাজীকে এই দলের জনক বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না।তাই নেতাজীর
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁদের দাবী সর্বাধিক। নেতাজীর অন্তর্ধান বা সাজানো মৃত্যুকে কেন্দ্র
করে তাঁদের নেতাদেরই সংসদে সব চেয়ে বেশী সরব হতে দেখা গেছে। কার্জতঃ এই একটি বিষয় কে
ঘিরেই তাঁদের মূল কর্মযজ্ঞ। মানে এদের ধ্যান জ্ঞান সবই নেতাজী। তবু তাঁদের কাজের উপর বাংলা
তথা ভারতের বেশীর ভাগ মানুষই আস্থা রাখেন না। একটি মাত্র কারণ। এই দল কি করে কমিউনিস্ট
পার্টিদের সাথে নির্দ্বিধায় বন্ধুত্ব পাতিয়ে এত বছর আছে - এই প্রশ্নের কি কোন সদুত্তর আছে ?
নেতাজীকে যারা কুইসলিং , তোজোর কুকুর ইত্যাদি বলে নিজেদের মুখপত্রে প্রচার করেছেন, তাঁদের
সাথে কোনো আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ কি কোনো অবস্থাতেই গাঠছড়া বেঁধে, নিশ্চিন্তে, সুখে
৩০ বছর ধরে রাজত্ব করতে পারে ? যাঁরা করেন তাঁদের আমরা বলি আপোসকামি নিপাট সুবিধাবাদি।
একটি আপোসহীন সংগ্রামী জীবন নেতাজী আমাদের সামনে রেখেছেন। তার উত্তরসুরিদের এই
অবস্থান নেতাজীকে দেখে যেতে হয়নি, এর জন্য উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ জানাই। মুখার্জী কমিশনের
রিপোর্ট কংগ্রেস সরকার বাতিল করার পর তাঁদের কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। উচিত ছিল
সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া। তা তাঁরা করেন নি।

তৃণমূল কংগ্রেস - তাঁদের নামকরণ সার্থক। তাঁরা সর্বত্র তৃণমূল আকারেই রয়েছেন। প্রকৃতির রোষ
থেকে মানুষকে বাঁচাবার ক্ষমতাশালী মহিরুহু কবে হবেন উপরওয়ালাও জানেন কি না সন্দেহ।
জনগণের এত আর্তনাদ তারা কাজে লাগাতে পারছেন না। তবু বিরোধী পক্ষ হিসেবে এখনও তাঁদের
উপরেই কিছু একটা প্রতিকারের আশা নিয়ে দিন ণ্ডনছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। তাঁরা কি করবেন নেতাজীর
বিষয় সঠিক জানি না। তবে তাও যেন তৃণমূল আকারের না হয়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের নেতৃবর্গ - প্রথমে ধরা যাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর কথা। সম্প্রতি
তাঁর গাড়ীর কাফেলা আটকে ছাত্রদের (তাঁরা যে দলেরই হোক না কেন) বিক্ষোভ প্রদর্শণে উনি বলেছেন
stupidity! যথার্থ বলেছেন। সেই কোন মান্ধাতার আমলে নেতাজী বলে একটা মাথামোটা লোক, যাকে
সুখে থাকতে ভুতে কিলাচ্ছিল, দুধেভাতে থাকার বদলে, চরম নাটকীয়তা করে তত্কালীন বিশ্বের প্রথম
শক্তি মহান ইংরেজদের, যাদের সাম্রাজ্যে কি না সূর্যাস্ত যেত না, সরাসরি যুদ্ধে আহবান করার পাগলামি
করেছিল। তা, তাঁর হাপিস হয়ে যাওয়াতে আমাদের কি এমন ক্ষতি হয়েছে ? সবচেয়ে বড় কথা নেহেরু
পরিবার ও কংগ্রেসের আজ্ঞাবহ নেতারা বড় নিশ্চিন্তে এদেশে এতদিন কাটিয়েছেন। সেই লোকটার থুড়ি
নেতাজীর, সেই কোন কালে কি হয়েছিল, এখনও কেন এদেশের বোকা জনতা জানতে চায় ?
stupidity
তো বটেই। প্রণববাবু এমন নেতা যার উপর তাঁর নিজের দলের লোকজনরাই একাধিকবার গায়ে হাত
তুলেছে। তিনিও যে বিশুদ্ধ গান্ধীবাদী নন তার প্রমাণও তিনি দিয়েছেন। টিভি তে সারা দেশের মানুষ
তা দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। তাই সাধারণ বাংলার মানুষ তাঁকে এবং তার মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়াকে
কোন চোখে দেখছেন সহজেই অনুমেয়। রাজীব গান্ধীর সময় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে টাকার জোরে
নতুন দল বানিয়ে ইলেকশনে দাঁড়িয়ে তাঁর জমানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

প্রিয় রঞ্জন দাশমুন্সী - এক সময় কংগ্রেস ছেড়ে এসে বলেছিলেন - "...যদি শোনেন আমি চরিত্রহীন, বিশ্বাস
করবেন ...কিন্তু যদি শোনেন যে আমি কংগ্রেস এ আবার যোগ দিয়েছি - বিশ্বাস করবেন না"! বর্তমানে
তিনি ভারতের কংগ্রেসী সরকারের একজন পূর্ণ মন্ত্রি এবং কংগ্রেসের একজন মুখপাত্র! মুখার্জী
কমিশনের রিপোর্ট কংগ্রেস সরকার বাতিল করার সংকল্প শোনাতে তাঁর কি গলা একটুও কেঁপেছিল ?

সোমেন মিত্র -  যিনি একবার নিজেই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে তিনি তরমুজ নন।

সুব্রত মুখার্জী -  যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সৌজন্যে একদা নেতাজীর অলঙ্কৃত কলকাতা করপোরেশনের
মেয়র পদে বসার সুযোগ সদ্ব্যবহার করে পরক্ষণেই সেই তৃণমূলের সর্বনাশ করতে দ্বিধা করেননি।

অন্যান্য নেতাদের কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল। এঁদের কাছ থেকে মানুষ আজ আর কিছু
প্রত্যাশা করেন না।

বর্তমানে দেশের সিংহ ভাগ নেতাদের প্রতিক্রিয়া নেতাজী ও দেশের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া
আর কিছুই নয়। ইতিহাসে জয়চন্দ বা মীরজাফরের পাশেই এদের স্থান দেওয়া হবে, সেকথা কি তাঁরা
বুঝতে পারছেন না ? জয়চন্দের কবর নেই । বেঁচে গেছেন! মীরজাফরের আছে! ভবিষ্যত প্রজন্ম কি
ভাবে এদের পুরস্কৃত করবেন তাও মীরজাফরকে দিয়ে আমাদের জানা হয়ে গেছে!

 

                                                   ************************

.                     এ বিষয় আপনার মতামত এখানে ক্লিক করে  COMMENT  জানান .
.                                                                                                                  উপরে  


       মিলনসাগর