রাম সেতু বিতর্কে ও বীক্ষণে

মিলন সেনগুপ্ত
২৪শে সেপ্টেম্বর ২০০৭
ই-মেল: srimilansengupta@yahoo.co.in                       এই পাতাটি Counter বার দেখা হয়েছে
                                                          
                        এ বিষয় আপনার মতামত এখানে ক্লিক করে COMMENT করে জানান

রাম সেতু বিতর্কে ও বীক্ষণে

রাম সেতু - বিতর্কে
...
রাম-সেতু ভারতের রাজনীতিতে মাথা চারা দিয়ে উঠেছে |
শ্রীলঙ্কা ও ভারতের মধ্যে “পাক প্রণালী” নামের যে সঙ্কীর্ণ
জলরাশি রয়েছে তার স্থানীয় নাম সেতু-সমুদ্রম | সেখান দিয়ে
বর্তমানে বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে না | কিছুকাল হল
ভারত সরকার একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন যার নাম “সেতু
সমুদ্রম প্রজেক্ট” | তাতে সেই প্রণালীতে ড্রেজিং করে নাব্যতা
বাড়িয়ে একটি চ্যানেল তৈরী করা হবে যা দিয়ে জাহাজ
ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল বা পশ্চিম থেকে পূর্ব
উপকূলে যাতায়াত করতে পারবে শ্রীলঙ্কার চারিদিকে না ঘুরে |
তাতে যাত্রাপথ প্রায় ৪০০-৫০০ মাইল কমে যাবে | সুতরাং
কমবে খরচ | তবে অবশ্য এমন শোনা যাচ্ছে না যে ঐ জলপথ
দিয়ে বিশাল আকারের জাহাজ
(VLCC, ULCC etc) যাতায়াত
করতে পারবে |  এই কাজ করতে গিয়ে নানা দিক থেকে
আপত্তি তোলা হয়েছে |

....
নাসা-র (NASA) উপগ্রহ থেকে
তোলা ছবিতে রাম সেতু

১ | ধর্মীয় আপত্তি -  

ক)  হিন্দু ধর্ম - এই প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে যেখানটা ড্রেজ করতে হবে সেটাই হিন্দুদের কাছে অযোধ্যার বনবাসী
রাজা রাম এবং তাঁর বানর সেনার তৈরী সেতু, যা তিনি তৈরী করছিলেন সমুদ্রের উপর দিয়ে রাবণ রাজার দেশ
লঙ্কায় গিয়ে, স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করার জন্য |
খ)  খৃষ্ট ধর্ম - এর মতে আমরা দেখি যে রাম-সেতু কে তাঁরা বলেন
Adams Bridge | তাদের ধর্মে আছে যে এডাম
ছিলেন ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রথম মানব | তার পাঁজরের হাড় থেকেই সৃষ্ট হন প্রথম মানবী ইভ | শয়তান
Lucifer Saturn এর
প্ররোচনায় এবং ইভের পীড়াপীড়িতে এডামই প্রথম ইশ্বরের নিষিদ্ধ ফল খান | তার ফলে তাঁরা ইডেনের উদ্যান থেকে
পৃথিবীতে পতিত হন | এডম নাকি শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত
Adam’s Peak নামের পর্বত চূড়ায় প্রখম পা রাখেন | শ্রীলঙ্কার
সাবারাগামুয়া প্রদেশে, রত্নপুরা শহর থেকে ২০ কিঃমিঃ উত্তরপূর্বে অবস্থিত এই পর্বত চূড়ায় একটি বিশাল আকারের
পদচিহ্নের মত গর্ত রযেছে | খৃষ্টানরা এই সেতু সমুদ্রম প্রজেক্টের বিরোধিতা করছেন বলে শুনি নি | তাঁদের অবস্থান
কি তাও আমার জানা নেই |

গ)  ইসলাম ধর্ম - এর মতেও
Adam বা আদম, হলেন আল্লাহর সৃষ্ট প্রথম মানব | তিনি নাকি এই সেতুর উপরদিয়েই
হেঁটে পার হয়ে শ্রী লঙ্কার
Adam’s Peak এর উপরে উঠে এক হাজার বছর ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে  প্রায়শ্চিত্ত  
করেছিলেন | ঐ পাহাড়ের উপরের পদ চিহ্ন তারই বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন | মুসলমানরাও এই সেতু সমুদ্রম  
প্রজেক্টের বিরোধিতা করছেন বলে শুনি নি | তাঁদেরও এই বিষয়ে কি অবস্থান কি, তাও আমার জানা নেই |


...
২ | জীবন জীবিকা চলে যাবার আশঙ্কায় আপত্তি - রামেশ্বরমের সর্বত্রই বেলেমাটির
আধিক্য | তেমন কিছু চাষবাস এখানে হয় না |  বহু  মানুষের জীবিকা সমুদ্রে মাছ
ধরা | ওই জলরাশি বিশেষ করে চিংড়িমাছের আবাদভূমি বলে পরিচিত |
মত্সজীবিরা ছোট ছোট নৌকায় চড়ে মাছ ধরেন | সেতু সমুদ্রম প্রজেক্ট বাস্তবায়িত
হলে বড় জাহাজের জন্য শিপিং লেন তৈরী হবে, যার ফলে মাছ ধরার এলাকা  
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে তাঁদের আশংকা | বড় জাহাজের যাতায়াতের পথে ছোটো
নৌকার বিচরণ, কাজে কলমে নিষিদ্ধ হবারই শামিল হবে |



...
রাম সেতুর কাছে জেলেদের
পাল তোলা নৌকা
তাছাড়া নাব্যতা বাড়ার সুবাদে, বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলি তাদের অত্যাধুনিক ট্রলার দিয়ে মাছ ধরতে এলে
এই ছোটো মত্সজীবিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই | এ জিনিষ আমরা আগেও দেখেছি |
বিশেষ করে যখন আমরা দেখছি যে আমাদের দেশের প্রায় সব সরকারই নিজেদের দেশের মানুষের স্বার্থের চেয়ে  
এই সব বহুজাতিক সংস্থাগুলির স্বার্থ রক্ষার জন্য গুলি করে দেশের মানুষ মারতে পিছপা হয় না |  তা সে অন্ধ্রের,
রাজ শেখর রেড্ডির কংগ্রেস সরকার হোক বা উড়িষ্যার পট্টনায়েকের জনতা দল সরকার বা আমাদের পশ্চিমবঙ্গের
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কমিউনিস্ট সরকার |

৩।
পরিবেষবিদদের আপত্তি  -  এখন মানুষ জখন বলে যে চল, আমরা প্রকৃতিকে জয় করি, তখন আর আমরা
তাদের শ্রদ্ধা করি না কারণ আজ বড় মূল্য দিয়ে আমরা বুঝেছি যে প্রকৃতির সাথে হার জিতের খেলা নয়, আমাদের
প্রকৃতিকে সাথে নিয়েই চলতে হবে তাকে রক্ষা করে। না হলে মানব জাতি সমেত এই পৃথিবীই ধংসের দিকে এগিয়ে
যাবে |
তাঁরা বলছেন যে এই তথাকথিত রাম-সেতুই বহু বার সামুদ্রিক ঢেউ ও সুনামির থেকে মূল ভুখণ্ডকে অনেকটা রক্ষা
করতে সমর্থ হয়েছে | তার মাঝে কোথাও ড্রেজ করে নাব্যতা বাড়ালে, কোনো সুনামি বা সামুদ্রিক জলস্ফিতির সময়
অনেক বেশি জলরাশি ধেয়ে এসে অনেক বেশি ক্ষতি সাধন করতে পারে মূল ভূখণ্ডের তীরবর্তি জনপদে |

এ ছাড়া এই এলাকায় যে সামুদ্রিক
eco-system তৈরী হয়েছে তাও ধ্বংস হয়ে যাবে | নিশ্চিহ্ন হবে বহু প্রজাতির
কোরাল ও অন্য সামুদ্রিক প্রাণী যা বেড়ে উঠেছে এই সেতুকেই কেন্দ্র করে |
আমি নিজে কর্মসূত্রে সেখানে থেকে দেখেছি যে সেখানকার জল এত পরিস্কার যে সমুদ্রে বহুদূর গেলেও সমুদ্রের তল
স্পষ্টভাবে দেখা যায় | স্পষ্টভাবে দেখা যায় জলের তলায় মাছ ও অন্যান্য প্রাণী তথা উদ্ভিদের খোলা মেলা বিচরণ |
সেখানে একটি শিপিং লেন তৈরী হলে জলদূষণের মাত্রা যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা আর বলে দেবার অপেক্ষা
রাখে না |

এখন নিজেদের প্রশ্ন করার সময় এসেছে যে, যা কিছুই আয় বাড়াবে বা টাকা বাঁচাবে, তাই কি আমাদের করতে
হবে? আমাদের পরিবেশ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ভাবনা চিন্তা, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাসের কি
কোনোই দাম নেই? আদালতে যদি প্রমাণ হয় রাম ছিল না বা আদম বলে কেউ নেই, তাহলেই কি সেতুটি ধ্বংস
করতে হবে? তাহলে কি পূজো-পার্বনের আগে আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে ভগবান বা আল্লাহ বা গড
আছেন? ধর্মের যে  দিকগুলো মানুষের জীবনের কোনো ক্ষতি করে না, বরং তাকে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ করতে শেখায়, সুস্থ সামাজিক জীবন যাপন করতে শেখায়, সত্য ও কর্তব্যের পথে চলতে শেখায়, সে দিক
গুলোকেও কেন আমরা কুসংস্কার বলে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করবো? রাজা রামের রাজত্ব কালের বর্ণনা অনুযায়ী
সেখানে একটি আদর্শ শাসন ব্যবস্থা ছিল | রামের সারা জীবন ধরে সুধু দায়বদ্ধতা পালনের কথা দেখতে পাই |
গান্ধীজীও স্বাধীন ভারতে রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার কল্পনা করেছিলেন |

মানুষ মাত্রেই সম্পূর্ণ ভাবে রেশানাল নাও হতে পারে | একমাত্র রোবোটরাই পূর্ণরূপে রেশানাল | তাই আইনস্টাইনের
মত বিজ্ঞানীও “মায়া”-র মত দর্শন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছেন |




...
কথায় বলে “বিশ্বাসে মেলায় হরি তর্কে বহুদূর” | ধর্ম সম্পূর্ণ একটি
বিশ্বাসের বিষয়, তাই হিন্দুদের যে বিশ্বাসে আঘাত লেগেছে তাতে
কোনো সন্দেহ নেই | বিশেষ করে বর্তমান ভারত সরকার যখন
হলফনামা দিয়ে সুপ্রীম কোর্টে বলেছেন যে রাম নামক কোনো
ঐতিহাসিক চরিএ নেই এবং এমন কোনো প্রমাণও নেই যে শ্রীরামচন্দ্র
ঐ সেতুটি নির্মাণ করেছিলেন |

.                 রামেশ্বরমের ব্যস্ত জনপথ | একটি সম্পূর্ণ ধর্ম-কেন্দ্রিক শহর >>>>

অন্য দিকে ভারতীদশন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল তামিলনাডু উপকূলের বেলাভূমির বিগত ৪০,০০০ বছরের বিবর্তন
নিয়ে সম্প্রতি অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে কার্বন ডেটিং করে দেখেছেন যে রাম সেতুটির বয়স প্রায় ৩৫০০ বছর | যা
কিনা বিজ্ঞান ভিত্তিক ইতিহাস অনুযায়ী রামায়নের রচনার সময়কালের কাছাকাছি | এই দলের নেতৃত্বে অধ্যাপক এস.
এম.রামস্বামী অবশ্য বলেছেন যে রামই এই সেতু বানিয়েছিলেন কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাই বলবেন |

শ্রী রামচন্দ্রকে, যিনি হিন্দুদের মতে ভগবানের দশাবতারের একজন বলে বর্ণিত, যদি এই ভারতবর্ষেরই সরকার,
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে হলফনামা করে বলেন - অস্তিত্বহীন, তাহলে তার অনেক সুদূর-প্রসারী ফল হতে  
বাধ্য | ঠিক সেটাই হয়েছে | দেশের প্রধাণ বিরোধীপক্ষ, বি.জে.পি., যারা কিনা নিজের অন্তর্কলহের জন্য এবং জুতসই
ইস্যুর অভাবে প্রায় ছত্রভঙ্গ হতে বসেছিল, তারা হঠাৎ একটা মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেল | এবার তারা যদি তা দিয়ে
রাজনীতি করে তাতে আমি তো কোনো অন্যায় দেখি না | বিরোধীপক্ষের কর্তব্যই হল শাসক পক্ষের ভুল ত্রুটি ধরে
আন্দোলন করে দেশের মানুষের দৃষ্টি নিজেদের দিকে ঘোরানো যাতে তারা পরের নির্বাচনে জিতে শাসন ভার হস্তগত
করতে পারে | কংগ্রেসও যে এই কাজটা সংখ্যালঘুদের, নিজেদের দিকে টানবার জন্য করলো না, তা আমি বিশ্বাস
করি না!
কংগ্রেসীদের একটা স্বভাব আছে - কোনো বিষয়ে কে খুঁচিয়ে তা দিয়ে রাজনীতি শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত তা  
তাদের হাতের মধ্যে রাখতে না পারা! বহু উদাহরণের মধ্যে খালিস্তান ইস্যু  ( সন্ত জার্নৈল সিং ভিন্দ্রনওয়ালে কে  
কারা তৈরী করেছিলেন!?), অযোধ্যার রাম-মন্দির ইস্যু (রাম মন্দিরের সিংহদ্বারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন কে
করেছিলেন!?) এবং হালের এই রাম সেতু ইস্যু! এবারেও এই ইস্যুটি তারাই তৈরী করলেন এবং এর মধ্যেই এটা
তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে! এর জন্য বি.জে.পি.-র উচিত কংগ্রেসকে ধন্যবাদ দেওয়া!



.....
মানচিত্রে রাম সেতু
..
রাম সেতু - বীক্ষণে

ভারতবর্ষের প্রদেশ "তামিল নাডু"-র রামনাড বা রামনাথপুরম জেলার মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণের শেষ অ,শের নাম
মাণ্ডাপাম |  তারপর শুরু হয় সমুদ্র এবং তার দক্ষিণে গেলে শুরু হয় শ্রীলঙ্কার তটভূমি |   প্রায় ৫০ মাইলের এই
দূরত্বের মধ্যে রয়েছে একটি দ্বীপ যার নাম পামবান, যেখানে রয়েছে একটি ছোট্ট শহর যার নাম বেশীরভাগ  
ভারতবাসীই ইস্কুলে যাবার আগেই জেনে যায় - রামেশ্বরম! এই দ্বীপটি মাণ্ডপম থেকে মাত্র মাইল খানেক দূরে  
অবস্থিত  | এই দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে সব চেয়ে বিখ্যাত অবিনশ্বরদের মধ্যে হলেন রাম এবং তাঁর ঈশ্বর
রামেশ্বর বা শিব! নশ্বর অধিবাসীদের মধ্যে সব চেয়ে বিখ্যাত অবশ্যই আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবুল পাকির
জয়নালআবেদিন আবদুল কালাম!
..
মাণ্ডপম থেকে রামেশ্বরম দ্বীপ এবং এই দ্বীপের শেষ দক্ষিণ প্রান্তে ধনুষ্কোডি থেকে শ্রীলঙ্কার উত্তরের ভূখণ্ড তালাই
মান্নার পর্যন্ত যে সমুদ্রিক জলরাশি দেখা যায় তার তলায় রয়েছে পাথরের বা শিলার দ্বারা নির্মিত একটি ডুবে থাকা
সরু সেতুর আকারের ভূখণ্ড | কোনো কোনো জায়গায় মাত্র মিটার খানেক সমুদ্রপৃষ্ঠ যদি নেমে যায় তবে এই সেতুর
আকারের ভূখণ্ডটি জেগে উঠবে!  
এই দ্বীপের মানুষরা কৃষিজীবী নন | বেলে মাটির এত আধিক্য কৃষিকাজের উপযুক্ত নয় | আমার যখন সেই দ্বীপে
কর্মসূত্রে যাবার সুযোগ হয়েছিল, তখনও সেখানকার মানুষের তিনটে মূল জীবিকা ছিল |

১।  ধর্ম - হিন্দুদের চারটি ধাম আছে ভারতের চার কোণায় | যথা পূর্বে পুরীধাম, পশ্চিমে দ্বারকাধাম, উত্তরে
বদ্রীনাথধাম এবং দক্ষিণে রামেশ্বরধাম | তার মানে এই স্থানটি হিন্দুদের প্রথম চারটি তীর্থস্থানের মধ্যে একটি | তাই
রামেশ্বরম দ্বীপবাসীদের একটা বড় অংশ এই রামেশ্বরমের মন্দিরকে কেন্দ্র করেই জীবন কাটিয়ে দেন | পূণ্যার্থীদের
সারা বছর ধরে সমাগম হওয়ার ফলে মন্দির কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক হোটেল ও ধর্মশালা, নানা রকমের
দোকান পাট ইত্যাদি |  অন্যান্য তীর্থ স্থানের মত এখানেও প্রায় সব পাণ্ডা বা মন্দিরের গাইড কাজ চালাবার মত
বাংলা বলতে পারেন!  

...
এ তো গেল রামের ঈশ্বর শিবের মাহাত্য! দ্বীপের প্রায় সব কিছুই
রাম এবং রাম সেতুর নামে চলে! যেমন সারা পামবান দ্বীপে ছড়িয়ে
আছে বহু মন্দির যা শুধু রাম বা তাঁর কোনো কাজকে কেন্দ্র করেই |
যেমন এই দ্বীপটাই নাকি হনুমানের, ভুলকরে বয়ে নিয়ে আসা
গন্ধমাদন পর্বত! লক্ষণকে বাঁচিয়ে তোলার পরে দ্বীপটাকে নাকি
এখানেই ফেলা হয়েছিল! আছে গন্ধমাদন পর্বতম এবং রাম ঝরুখা
যেখান থেকে রাম তাঁর যুদ্ধ পরিচালনা করতেন ! আছে
কোডণ্ডরামার কোইল বা মন্দির যেখানে অযোধ্যায় ফেরার আগে
রামচন্দ্র বিভিষণের অভিষেক করেছিলেন | লক্ষণ ও সীতা কে
নিয়েও আছে মন্দির এবং বাঁধানো দিঘি |

লেখকের আঁকা সে সব যায়গার স্কেচ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রামেশ্বরম মন্দিরের
গোপুরম বা প্রবেশদ্বার

বহু বহু মানুষের নাম, দোকান পাটের নাম, রাস্তার নাম, বলা যেতে পারে যে প্রতি দ্বিতীয় ব্যক্তি, যার সাথে ধাক্কা
লাগবে, তার নামেই রাম আছে! রামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে | এমন কি রামনাডের রাজা, যারা এই রামেশ্বরমের
মন্দিরটি তৈরী করেছিলেন তাঁদেরও উপাধি হল সেতুপতি! দক্ষিণ ভারতের এক মন্ত্রি কয়েক দিন আগে বলেছেন যে
তিনি নাকি রামসেতু সম্বন্ধে আগে কিছু শোনেনই নি! এটা বোধহয় বিশ্বাস করা অন্যায় হবে |
..
২।  মাছ ধরা - বেশ কিছু লোক জেলে সম্প্রদায়ের। তাঁরা ছোট ছোট
নৌকায় চেপে সমুদ্র থেকে মাছ ধরে আনেন। সেই জলরাশির কিছু
এলাকার চিংড়ি মাছ খুব বিখ্যাত এবং বাইরেও চালান দেওয়া হয় |
রামেশ্বরমের উপকূলে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য।
ডাঙায় ডানদিকে মন্দিরটি দেখা যাচ্ছে  
>>>>

৩।  পর্যটন - তীর্থ যাত্রীদের সঙ্গে আসেন প্রচুর পর্যটক | জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর |
এ ছাড়া এক সময় শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে এখান দিয়েই মানুষ যাতায়াত করতেন | যদিও হালে, শ্রীলঙ্কায় তামিলদের
যুদ্ধের জন্য এই যাতায়াতের ব্যাপারটা বন্ধ রয়েছে |
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় রেল, সরাসরি ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় যাতায়াতের জন্য, মিটার গেজ ট্রেন চালু করেছিলেন
চেন্নাই (তখন মাদ্রাজ) থেকে মাণ্ডাপাম - রামেশ্বরম হয়ে ধনুষ্কোডি পর্যন্ত | সেটাই ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডের শেষ রেল
স্টেশন  | ১৯১৪ সালে তাঁরা মাণ্ডাপাম থেকে পামবাম যাবার জন্য একটি ব্রীজ (ব্যাস্কুল ব্রীজ) তৈরী করেছিলেন, শুধু
রেলগাড়ি যাবার জন্য | ধনুষ্কোডিতে রেল কোম্পানি নিজেরাই স্থাপন করেন ফেরি ঘাট ও নিজেদের ফেরি সার্ভিস, যা
চলাচল করতো ধনুষ্কোডি থেকে শ্রী লঙ্কার তালাইমান্নারে। সেখানে অপেক্ষা করতো অন্য একটি ট্রেন যা যাত্রিদের
নিয়ে পৌঁছে দিত শ্রীলঙ্কার রাজধানী কোলোম্বো | ঐ ফেরি সার্ভিসটিও ১৯৮৬ সাল প্রযন্ত ঐ দ্বীপের বহু মানুষের
জীবিকার যোগান দিয়েছিল |


...
ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও ভারতীয় রেল এই পরিসেবা চালু রাখেন
১৯৬৪ সাল পর্যন্ত কারণ যাত্রি-সমাগম ছিল প্রচুর এবং এটি ছিল রেলের পক্ষে
লাভজনক | তার একটি কারণ অবশ্যই ছিল কোলোম্বোর ডিউটি ফ্রী শপ! রামেশ্বরম -
চেন্নাই কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বিদেশী মাল বিক্রীর জমজমাট ব্যাবসা | এপারের
শত শত লোক (লাইন ম্যান) রোজ চলে যেতো বৈধ পাসপোর্ট ও পারমিট বা ভিসা
নিয়ে শ্রীলঙ্কায় | কোলোম্বোয় পৌঁছে সোজা গিয়ে লাইন দিত ডিউটি ফ্রী শপে | কিনতো
কাস্টমস বা শুল্কবিভাগ অনুমোদিত আমদানী অঙ্কের বিদেশী দ্রব্য | যতদূর মনে পড়ে,
তা বোধহয় এই অঙ্কটা এক সময় হয়ে উঠেছিল প্রায় ২০০০ টাকা! তারপরদিনই ফিরে
আসতো ভারতে ওই রেল ও স্টীমার পথে | এর মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে বে-আইনি কাজ
না থাকলেও সঠিক যায়গায় সঠিক নৈবেদ্যর লেন দেন এবং দীর্ঘকালের সহাবস্থানের
ফলে সমস্ত ব্যাপারটাই মসৃণ হয়ে গিয়েছিল  | শুধু মাত্র ভায়াবল্ ইকনমিকস এর
জোরেই এই ব্যবস্থা চলেছিল প্রায় ষাট বছর সময় ধরে!

...
পামবান ব্যাস্কুল রেল ব্রীজ
সৌজন্যে বিজয় ঘোষ
মাণ্ডাপাম থেকে পামবান পর্যন্ত যাবার পথে সমুদ্রের উপর ব্রীজের (ব্যাস্কুল ব্রীজ) মাঝখানটা উপরে উঁচু হয়ে খুলে
ছোটো জাহাজ পারাপার করার ব্যবস্থা ছিল | ব্রীজটি এখনও আছে কিন্তু ভারতীয় রেল এটি কে ভেঙে ফেলে একটি
নতুন ব্রীজ তৈরীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, যাতে এর পর তারা ব্রডগেজ রেলগাড়ি চালু করতে পারেন | এই
ব্রীজটির পাশেই স্বাধীন ভারতে ...সালে তৈরী হয়েছে একটি রোড ব্রীজ, রেল বাদে অন্য যানবাহন যাতায়াতের জন্য |

...
২৩শে ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে ধনুষ্কোডি অঞ্চলটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় একটি
সামুদ্রিক ঢেউয়ের দাপটে | অনেকটা ২০০৫ সালের সুনামির মত |  সেই মুহুর্তে
রামেশ্বরম থেকে ধনুষ্কোডির মাঝে একটি ট্রেনে ছিল বম্বে থেকে যাওয়া একটি
ইস্কুলের বাচ্চারা | সেই ট্রেন সমেত তাদের সলিল সমাধি ঘটে | ধনুষ্কোডি স্টেশন-
শহরটি, ফেরিঘাট সমেত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় | রেল কোম্পানির দুটি ফেরি
স্টিমার ছিল “আরউইন” এবং “গোশান” | সেই ঢেউ গোশান জাহাজটিকে ঠেলে
নিয়ে ফেলে ডাঙ্গার উপরে, যেখান থেকে সেটাকে আর নামিয়ে আনা সম্ভব হয় নি,
বাতিল করতে হয়েছিল | রেল কোম্পানি এর পর তাদের পরিষেবা রামেশ্বরমেই
শেষ করে দিয়েছিল | ধনুষ্কোডি পরিনত হয় একটি ভুতুড়ে শহরে | রামেশ্বরম
থেকে ধনুষ্কোডি পর্যন্ত আর কোনোদিন ট্রেন চলেনি | ফেরি সার্ভিসের অন্য
জাহাজটিকে (আরউইন) ১৯৬৭ সাল থেকে পুনরায় চালু করে শিপিং কর্পোরেশন
অফ ইণ্ডিয়া | জাহাজটির নতুন নামকরণ করা হয়, বিখ্যাত গণিতজ্ঞের নাম
অনুসারে রামানুজম!
...


....
উপরে - সামুদ্রিক ঢেউয়ে বিদ্দ্বস্ত
এবং পরিত্যক্ত শহর ধনুষ্কোডি
তে লেখক, ১৯৮৬
নিচে - ধনুষ্কোডির ফেরি-ঘাটের
ভগ্ন ও পরিত্যক্ত দশা দেখছেন
লেখক পত্নি সাগরিকা
কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই নামকরণও ছিল রাম কে কেন্দ্র করেই! রামের ছোট ভাই - রামানুজম!
ফেরিটি এর পর থেকে ছাড়া হোতো রামেশ্বরম এঙ্করেজ থেকেই | সেখানে আর কোনো ফেরি ঘাট তৈরী করা হয় নি |
১৯২৯ সাল থেকে ফেরি সার্ভিস শুরু করা হয় | প্রায় ৬০ বছরের জন্য এই জাহাজটি রামেশ্বরমের অবিচ্ছেদ্দ অঙ্গ
হয়ে দাঁড়িয়েছিল |

...
২৬শে জানুয়ারী ১৯৮৬, শেষবারের জন্য মাস্তুলের উপরে জাতীয় পতাকা এবং অন্যান্য পতাকায় সজ্জিত
অবস্থায়, রামেশ্বরমের অদূরে নোঙ্গর করে থাকা
T.S.S. Ramanujam যার আগের নাম ছিল Irwin | রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর এই জাহাজেই ১৯৩৪ সালে শ্রীলঙ্কা সফর সেরে ভারতে ফেরেন |
১৯৮৪ ~ ৮৫ সাল পর্যন্ত সেই ব্যাবস্থা খুব ভাল চলছিল | এখান দিয়ে এত মানুষ যাতায়াত করতেন যে এক সময় এই
ফেরি সার্ভিসটিই হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শিপিং কর্পোরেশন অফ ইণ্ডিয়ার এক মাত্র লাভজনক প্যাসেঞ্জার রুট | তারপর
শুরু হল শ্রীলঙ্কায় তামিলদের যুদ্ধ | বাধ্য হয়ে ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দিতে হয় | তবুও শিপিং কর্পোরেশন অফ
ইণ্ডিয়া, বহুদিন জাহাজটিকে সামলে রেখেছিলেন এই আশায় যে শ্রীলঙ্কায় শান্তি ফিরে আসবে এবং আবার ফেরি
সার্ভিস চালু করা সম্ভব হবে | কিন্তু তা আর হল না দেখে ১৯৮৬ সালের মে মাসে রামানুজম শেষ যাত্রা করে
মুম্বাইয়ের উদ্দেশে যেখানে সেটিকে স্ক্র্যাপ করা হয় | সেখানকার শিপিং কর্পোরেশনের এজেন্ট  
M/s K. O.
Nagoormeera & Sons
ছিলেন মুসলমান | জাহাজটি মুম্বাই উদ্দেশে রওনা হবার আগে অবাক হয়ে দেখলাম যে তাঁরা
নিজেদের উদ্যোগে জাহাজে পূজো করলেন মৌলবী এবং পুরোহিত ডেকে! মনে হয়েছিল আমি যেন সম্রাট আকবরের
সভায় রয়েছি! সব ধর্মের এত সুন্দর সহাবস্থান যে সম্ভব তা আমি রামেশ্বরমেই গিয়ে উপলব্ ধি  করেছিলাম |  

রামানুজমের মুম্বাই যাত্রার সাথেই শেষ হয়ে যায় ভারতবর্ষের স্টীম জাহাজের একটি অধ্যায় |  কিন্তু সে অন্য গল্প!  
এই লেখক সেই শেষ স্টীম জাহাজটির শেষ চিফ ইঞ্জিনিয়ার!


...
বাঙালীদের, এই জাহাজটির সাথে একটি সূক্ষ্ম যোগসূত্র রয়েছে | ১৯৩৪ সালে,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শ্রীলঙ্কা সফর শেষে ভারতে ফিরেছিলেন এই জাহাজটি
চেপেই | শান্তিদেব ঘোষও ছিলেন গুরুদেবের সাথে সেই সফরে | আমাকে এক
পত্রের উত্তরে তিনি জানান যে গুরুদেব সে যাত্রা থেকে ফেরার পথে একটি
স্টিমারে করে ফিরেছিলেন ঠিকই কিন্তু সেই জাহাজটির নাম তাঁর জানা নেই |
এখন আর তা জানার কোনো উপায়ও নেই |
গুরুদেব - মিলনের ভাস্কর্য
তাই আমি মনে মনে এই ভেবে আনন্দ পাই যে গুরুদেবের পদধূলি ওই জাহাজটিতেই পড়েছিল | ঠিক যেমন ভেবে
আনন্দ পাই  যে - রাম তাঁর বানর সেনার সাহায্যে, নিশ্চই ওই সেতু বানিয়েছিলেন রাবণের কাছ থেকে তাঁর স্ত্রী কে
উদ্ধার করে আনতে! এ কথা বলার বোধ হয় অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের এই অঞ্চলটির মানুষের জীবনে,
জীবিকায়, মননে, চিন্তনে রাম এবং তাঁর কর্মকাণ্ড এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মাঝে মাঝে মনে হোতো রাম হয়তো
সত্যিই সেখানে এসেছিলেন | মাণ্ডাপাম থেকে পামবান যাবার পথে রেল ব্রীজ দিয়ে যাবার সময় নিচে সমুদ্রের জলের
তলায় দেখা যায় রাম সেতুর বিশাল বিশাল পাথরের সারি | চারিদিকের ভূগোলের সঙ্গে বেমানান ঐ পাথরগুলো  
দেখে অবশ্যই মনে প্রশ্ন জাগে যে ও গুলি কি এখানেই ছিল, না কি কেউ অন্য কোখাও থেকে এনে ফেলেছে! আসল
সত্য যাই হোক না কেন! ভেবে রোমাঞ্চিত হই যে আদম নামের প্রথম পুরুষ ওই সেতুর উপর দিয়ে গিয়েছিলেন
হাজার বছরের প্রায়শ্চিত্ত করতে অথবা এডাম পৃথিবীতে নেমে প্রথম পদক্ষেপ রাখেন কাছেই
Adam's Peak এ!

...
আমার মতে সেতু সমুদ্রম প্রজেক্টের যা লাভ হবে বলে দেখানো হচ্ছে তার ধারে কাছ দিয়েও তা যাবে না | মাঝখান
থেকে পরিবেশ দূষণ এর সাথে, শ্রীলঙ্কার দুই যুযুধান গোষ্ঠির লড়াই এর চোটে ওই শিপিং লেনে হাইজ্যাকিং ও  
জলদস্যুগিরির মত ঘটনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না | তা রুখতে ভারত সরকারকেই নিজের কোস্ট গার্ড বা
নৌবহর দিয়ে সুরক্ষার বন্দোবস্ত করতে হবে | সেটা করতে গিয়ে নতুন করে কোনো যুদ্ধ-বিবাদেও জড়িয়ে পড়া
অসম্ভব নয় | বিশ্বের সব ডিস্টার্বড্ এরিয়ার জল পথেই এই জলদস্যুবৃত্তির ঘটনা আকছার ঘটছে | আন্তর্জাতিক জল
পরিবহনের এটি এখনই একটি বড় সমস্যা | জাহাজের সমস্ত ক্র্যু-কে নিয়মিত ড্রিল করে করে তৈরী থাকতে হয়, যাতে
সবাই জেনে রাখে জলদস্যুর আক্রমণ হলে জাহাজে কার কী ভূমিকা হবে !     মাত্র ২০০ - ৪০০ মাইলের যাত্রা কম
হলেও এই সব খরচার বহর দেখে আমার তো মনে হয় না যে হরেদরে লাভের কিছু হবে। যারা এই কাজটি বাগিয়ে
নিয়েছেন, তাদের কথা আলাদা!

মাঝখান থেকে হাজার হাজার সরল, সাধারণ মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকা থেকে বঞ্চিত হবেন। একটি সুন্দর
ইকো সিসটেমের সমাপ্তি ঘটবে | আর রাম আর আদম বা এডাম! তাঁরা হয়তো এবার কল্কি-অবতার বা অন্য
কোনো ইকারনেশন-রূপে এসে এই সব সমস্যার সমাধান করে যাবেন!!!



                                      ************************

.                     এ বিষয় আপনার মতামত এখানে ক্লিক করে  COMMENT করে জানান
.                                                                                                                      উপরে  


মিলনসাগর   

...