কবি বিপুল চক্রবর্তী-র কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
চারপাশে তোমার আমার
("আমি দেখছি" থেকে, মার্চ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত)

নদীতে থাকে না নদী, পাহাড়ে পাহাড়
জলের ভূগোল সরে যায়, মাটির ভূগোল সরে যায়
চারপাশে তোমার আমার


নদীর মাছেরা সব জানে
এক স্রোতে ডিম রেখে অনায়াসে ভেসে যায়
অন্য স্রোতে অন্য কোনখানে


রাজা বা রাজত্ব বলে কোন শব্দ নেই প্রকৃতির
পায়ের নিচের মাটি সতত অস্থির

পাহাড়ি পাখিরা সব জানে
এক গাছে বাসা ফেলে অনয়াসে চলে যায়
অন্য গাছে অন্য কোনখানে


নদীতে থাকে না নদী, পাহাড়ে পাহাড়
জলের ভূগোল সরে যায়, মাটির ভূগোল সরে যায়
চারপাশে তোমার আমার


.                   ****************                                                   
উপরে   


মিলনসাগর
*
লিখে নাও
("আমি দেখছি" থেকে, মার্চ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত)

এই সব পাহাড়ের নাম
লিখে নাও

কেননা
তোমার হুকুম জেনেও
এরা মাথা নোয়ায়নি

এই সব নদীর নাম
লিখে নাও

কেননা
তোমার ধমক শুনেও
এরা থমকে দাঁড়ায়নি


.       ****************                                                               
উপরে    


মিলনসাগর
*
নদীর নামে নাম তার
("দুঃখের আঁধার রাতে, প্রিয়" থেকে, মার্চ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত)

নদীর নামে রেখেছি আমি নাম তার
চাই না তাকে শেখাতে আর চার-দেয়ালের নামতা

শেখাব তাকে নদীর মতো ছুটতে
ছোটার পথে হাজারো নদ-নদীর সাথে জুটতে

আদর করে বলব, ওরে কন্যে
এই আকাশ, উধাও মাঠ, এ সবই তোর জন্যে

ঢের হয়েছে হেঁসেল-ঘরে রান্না
হরেক গ্রাসে আটকে আছে মা-ঠাকুমার কান্না

ঢের হয়েছে, আর না


.       ****************                                                              
উপরে   


মিলনসাগর
*
স্বদেশ
("দুঃখের আঁধার রাতে, প্রিয়" থেকে, মার্চ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত)


কান্নায় ভাঙতে থাকে নদী
তাকে ঘিরে, হলুদ সবুজে আঁকা বিচিত্র জ্যামিতি জুড়ে
শুনশান শব্দ তোলে অস্থির বাতাস
রক্তের ফোঁটার মতো ঝরতে থাকে পলাশ শিমুল

সৌন্দর্য রচিত হয়

অন্য কিছু রচিত হবার কথা ছিল ?
এই জিজ্ঞাসায়, রাত্রির আকাশে জাগে সপ্তর্ষিমন্ডল


.       ****************                                                               
উপরে   


মিলনসাগর
*
মুক্তি
("দুঃখের আঁধার রাতে, প্রিয়" থেকে, মার্চ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত)


পাখিটি উড়িয়ে দিই সন্ধ্যার আকাশে

মুক্তি
এই উচ্চারণে
যখন তৃপ্ত আমি

দেখি
আমার হাতের মধ্যে
তার ছিঁড়ে থাকা কয়েকটি পালক

কাঁপছে হাওয়ায়


.       ****************                                                              
উপরে   


মিলনসাগর
*
সৌন্দর্যের দিকে
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)


আমার সমস্ত কান্না চলে যায় সৌন্দর্যের দিকে

এই মাটি-----
এখানে হাতের বেড়ি, একদিন
.            শাঁখা হয়ে পলা হয়ে বাজে

আমার সমস্ত কান্না চলে যাক সৌন্দর্যের দিকে

আমার সমস্ত কান্না
.            ভাটিয়ালি, আউল-বাউল


.       ****************                                                              
উপরে     


মিলনসাগর
*
পোড়া হাঁড়ি
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)


আমাদের পোড়া হাঁড়ি
শোকে তাপে পুড়েছে কেবলই

তবু কী আশ্চর্য, দেখো
ভাতগুলি জুঁইয়ের মতন আজও শাদা


.       ****************                                                               
উপরে   


মিলনসাগর
*
দহন
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)

মুখ নিয়ে থাক মূর্খ সময়, সে
ঝাঁপ দিয়েছে মুখর নদীতে

দশদিগন্তে কী প্রবাহ
জাপটাতে চায় ক্ষিপ্র বাহু

গাছগাছালি মাছমাছালি, কে
মন মজালি ? বাঁধতে পারবি নে

দশদিগন্তে ভীষণ  দাহ
দিবারাত্রি তার বিবাহ


.       ****************                                                              
উপরে     


মিলনসাগর
*
পোলট্রি
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)

পোলট্রির ডিম ভেঙে দেখি
ভিতরে কুসুম নেই

ভয় পাই
একদিন এমন রাত্রি ঘনাবে কি
যার ভিতরে সকাল নেই

কথা ভাঙি
কবিতা কোথায়
সুর ভাঙি
কোথায় কোথায় তোর গান


.       ****************                                                              
উপরে    


মিলনসাগর
*
বর্ণ--পরিচয়
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)

শ্মশানের ছাই ওড়ে, যেদিকে তাকাই
হরিজনবস্তি জ্বলে রূপ কানোয়ার জ্বলে যায়

ভাষাহীন, এই বর্ণ-অপরিচয়ের দেশে
তুমি আজও পিপাসার জল


.       ****************                                                               
উপরে     


মিলনসাগর
*
ময়লাগাড়ি
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)


একটা বোটকা গন্ধ আটকে আছে

ভোর
দেখো, সদ্য ফুটে ওঠা মেয়েটি
নাকে মুখে রুমাল
এরই মধ্যে কেমন মুষড়ে পড়েছে

ওকে সইতে বলো

ওকে বলো
এই কটু গন্ধ এই ময়লাগাড়ি যত দূরেই যাক
আরও ঢের ঢের দূরে আমাদের যাওয়া


.       ****************                                                              
উপরে    


মিলনসাগর
*
একজন অন্ধ, তার গান
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)


একজন অন্ধকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কীভাবে পেরিয়ে এলে এই পথ,
তা হলে, পথ-চলা তার কাছে যেমন কষ্টকর তারও চেয়ে কষ্টকর হয়ে পড়ে
তার পক্ষে সে কথা বলা | দেয়াল ধরে ধরে তো পথ-চলা তার |

দেয়ালে কোথাও ফুল-লতা-পাতা আঁকা | ময়ূর-মোরগ আঁকা |  সে দেখেনি,
ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করেছে শুধু আর তখনই দূরে-কাছে ভোর--পাখিরা
ডেকে উঠেচে দশদিকে---- খুব নিচু গলায় কোন পথ-বাউল গেয়ে উঠেছে :
প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে- - - -

দেয়ালে কোথাও সারি সারি ঘুঁটে |  সারি সারি আঙুলের ছাপ |  সে দেখেনি,
ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করেছে শুধু আর তার মনে হয়েছে ঘুঁটে দেওয়া তো
আলপনা দেয়ার মতোই |  কিন্তু অন্যেরা বলেছে , ছিঃ সে কী করে হবে! তার
ভিতরে গুনগুনিয়ে উঠেছে ব্যথা, ঘুঁটে-কুড়ানি মা আমার , আলপনা আর দেয়া
হল না তোর | দূরে, খুব দূরে কোথাও জেগে উঠেছে সারি সারি লক্ষ্মীর পা,
ভেসে এসেছে পাঁচালির সুর : এসো গো এসো গো লক্ষ্মী- - - -

দেয়ালে কোথাও রক্ত |  কী ভীষণ রক্ত ! না, সে দেখেনি, কিন্তু ছুঁয়ে
ফেলেছে আর আঁতকে উঠে শুনেছে হৈ হৈ বন্দুকের হুঙ্কার তার চারপাশে |
কিন্তু সেই সঙ্গে আরও সে শুনেছে, গান, বন্দুকের গর্জনের সামনে
দাঁড়িয়েও কী আশ্চর্য গান : হাসি হাসি পরব ফাঁসি- - -

গান, তার গান |


দেয়াল ধরে দেয়াল ধরে তার পথ-চলা |  কিন্তু কোথাও কোথাও কোন
দেয়াল থাকে না |  সে সময় বাতাসের কাঁধে হাত রেখে তাকে পথ হাঁটতে
হয় | বাতাস, সেই যে কবে থেকে বইতে শুরু করেছে , বইছে আর বইছে |

বাতাস তাকে নিয়ে যায় পুবে, পশ্চিমে , উত্তরে, দক্ষিণে | সূর্যোদয়ের কাছে ,
সূর্যাস্তের কাছে, কাঞ্চনচূড়ার কাছে, সমুদ্র বা সাগরের কাছে |

তাকে নিয়ে যায় ভোরবেলার ফসলের মাঠে, দুপুরের অরণ্য প্রান্তরে, সন্ধ্যার
সুপুরি-বাগানে |

বাতাস তাকে নিয়ে যায় রাত্রির নদীর কাছে |

সে কিছুই দেখেনি | শুধু অনুভব করেছে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো বুকে নিয়েছে
এই সব |

গান, তার গান |

তাকে নিয়ে যায় মন্দিরে , মসজিদে, মঠে , গির্জায় |

সে ভিক্ষুকের মতো দু-হাত পেতে দাঁড়াতে গিয়ে কখন দু-হাত জোড় করে
দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রার্থনা-সঙ্গীতের পাশে |

গান, তার গান |

তাকে নিয়ে যায় এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে |  গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত
ও বসন্তে |

বাতাস আস্তে বইলে , আস্তে আস্তে পথ হেঁটেছে সে | আছড়ে পড়লে , সে--ও
আছড়ে পড়েছে বালিতে-পাথরে | বাতাসে ভর দিয়েই উঠে দাঁড়িয়েছে আবার |
পথ হেঁটেছে |  বাতাস যখন ঝড়, তখনও পথ-চলা তার থেমে থাকেনি  | সে
তো অন্ধই , আরল অন্ধ হবার ভয় নেই তার |

বাতাস তাকে নিয়ে যায় এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে |


গান, তার গান  |

তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কীভাবে পৌঁছুলে এইখানে, সে হয়তো বলে
উঠবে, পৌঁছুলাম ? কোথায় ?


.       ****************                                                                   
উপরে    


মিলনসাগর
*
দীপমালা
("ছেলের ঠোঁটে আকন্দের দুধ" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)


একটি প্রদীপ জ্বলে, যেদিকে তাকাই
একটি শীর্ণ, শাদা হাত
আঁধারে আঁধারে হেঁটে যাই, বুকে
ওই হাত ওই আলোশিখা


একটি দুটি একটি দুটি করে
.                ফোটে না কি তারারা আকশে
একটি দুটি একটি দুটি করে
.                ফুটে ওঠে ফুল
আঁধারের ডালে ডালে
.                ফুটে ওঠে অসংখ্য জোনাকি


সব আলো নিভে যায়
নিভে যায় ম্লান তারাটিও

ফুটে ওঠে সারি সারি জলভরা চোখ


ঝড় আসে, ঝড় সরে যায়
মেঘ জমে, মেঘ সরে যায়

একটি প্রদীপ জ্বলে
তোমার প্রদীপ জ্বলে
তার আলো পথে পথে আকাশে আকাশে


.       ****************                                                                 
উপরে    


মিলনসাগর
*
নীল পাহাড়ের দেশে
( অগষ্ট ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত )


যেদিকে ইচ্ছে তোর সেদিকে তাকাস
চিমনি, টাওয়ার নেই
.                 ধোঁয়ার পাহাড় নেই
আকাশ আকাশ শুধু আকাশ আকাশ

যেদিকে ইচ্ছে, ঘাঢ় সেদিকে  বাঁকাস
টেলিগ্রাফ-তার নেই
.            ‘টাটা সেন্টার’ নেই
আকাশ আকাশ শুধু আকাশ আকাশ


হাওযায়  হাওয়ায়
টিয়ার ঝাঁকের মতো সবুজ ধানের দেশ
উড়ে যেতে চায়

রুদ্ধ ডানার সেই ছটফটানি
শুনেছি কোথায় যেন
শুনেছি আমি


‘দে ছাইড়ে দে
.        লাজ লাইগছে
.                সইরে দাঁড়া
.                        সর না’------


‘চল্ লি কোথায়’
.        পাহাড় শুধোয়
.                নদীকে
ছুটতে ছুটতে
.        নদী বলে ‘যাই
.                ওদিকে-------‘


সোনার ডালিম বুকে
.        কী গভীর প্রেম-সুখে
.                কাঁপে তার হৃদয়ের ডাল
নীল পাহাড়ের কোলে
.        নীল ঝরনার জলে
.                স্নান করে কিশোরী সকাল


চোখ-দুটি কী যে বলে
ভুরু-দুটি বাঁকিয়ে
ঠোঁট-দুটি কী যে চায়
ঠোঁটপানে তাকিয়ে


ফুলের গন্ধে
.        বনে বনে বুঝি
.                বাতাসেরা এসে জোটে
নাকি বাতাসের
.        পেছনেই সব
.                ফুলের গন্ধ ছোটে


সোহাগ ছড়ানো ভাদরে
মাচায় লুটায় ডিংলার ফুল
ভ্রমরের চুমা-আদরে

ও মেয়ে , বাপের ঘরে এসে তবু
কার লাগি তুই কাঁদো রে


আহা        কালো মেয়ে, আকাশের কালো মেঘ তুই
তোর        বাঁকাদু-চোখের বিদ্যুৎ ইশারায়
আমি        পোড়া মাটি, এত কাল পুড়েছি শুধুই
আজ        বুক জুড়ে কী ভীষণ ঝড় বয়ে যায়

আহা        কালো মেয়ে, আকাশের কালো মেঘ তুই
আয়        বুকে আয় বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায়

১০
বারান্দাতে
.        ঝিমোচ্ছিলাম
বুকের ভেতর
.        নিঝুম দুপুর

হঠাৎ শুনি
.        আমরা এলাম
টাপুর টুপুর
.        টাপুর টুপুর-------

১১
তুমি দেখো নীল তোমার চোখের পদ্ম
আমার চোখের হ্রদে

আর, আমি দেখি আমার মাতাল দুই চোখ
তোমার চোখের মদে

১২
চারদিক ভরে
.           গেছে হৃদয়ের
.                  ঘ্রাণে
কিছুতেই ঢাকা
.          যায় না রে আর
.                যৌবন
ডাকাত ভ্রমর
বুকের বসন
.                টানে
দুপুরের রোদে
.          লজ্জায় কাঁপে
.                 মৌ-বন

১৩
গাঁয়ের মোড়লের
.         ছেলেরা সুন্দর
ও মেয়ে, কাছে তুই
.          যাস নে তা বলে

রঙিন চামড়ার
.        সাপেরা সুন্দর
কিন্তু বিষ ভরা
.         ছোবলে ছোবলে

১৪
নীল পাহাড়ী
.        লাল পলাশ
বোবাকে তুই
.        কথা বলাস

১৫
অস্তাচলের সূর্য চুম্বন আঁকে তার ঠোঁটে
বলে, ‘ফের দেখা হবে কাল’

ম্লান, তবু, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে
সুন্দরী পাহাড়ি বিকাল

১৬
মাদল বাজে
দূরে
মাদল বাজে
কাছে

‘দাদারিয়া’র
সুরে
নাচে পাহাড়
নাচে

১৭
বনে আগুন লাগল, প্রিয়
সবার চোখে পড়ল তা
মনে আগুন লাগল, প্রিয়
কারুর চোখে পড়ল না

কাকে জানাই, কাকে জানাই
শরীর পুড়ে হচ্ছে ছাই

একটি অসমীয়া লোকগীতি অনুসরণে

১৮
আকাশে চাঁদ
টলছে
নদীতে চাঁদ
টলছে

আমি সোজাই হাঁটছি
তবু
লোকে মাতাল
বলছে

১৯
আহা, রাত সুন্দর ! আর তারও চেয়ে
সুন্দর তুই, ওগো সাঁওতাল মেয়ে

তারা উজ্জ্বল, যত উজ্জ্বলই হোক
তারও চেয়ে উজ্জ্বল তোর দুটি চোখ

আর, তোর পাহাড়িয়া সাঁওতাল--মন
জ্যোত্স্না ছড়ানো গোল চাঁদের মতন

২০
ঐ দূরে
সবুজ মাঠের শেষে

সেখানে যেতেই

ঐ দূরে
রুপালি নদীটি ঘেঁষে

সেখানে যেতেই

ঐ দূরে
নীল পাহাড়ের দেশে

সেখানে যেতেই

ঐ দূরে--------


.       ****************                                                   
উপরে    


মিলনসাগর
*
তোকে ছুঁয়ে
("রাত্রি জল ছুঁয়ে জেগে আছি" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত )

তোকে ছুঁয়ে এত যে আনন্দ
তুই আমার কে

কবে তোর সঁদালের রঙ
আর ঝিঁঝিঁর আঁধার
মনে লেগেছিল

আজও তা যায় না

শালে শালে সেগুনে পলাশে
তোরও কি আনন্দ বাজে
আমি কাছে এলে

ও পোড়া মাটির দেশ


.       ****************                                                                 
উপরে   


মিলনসাগর
*
হে পথ হে স্বদেশ
("রাত্রি জল ছুঁয়ে জেগে আছি" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত )

চলার পথে পথে  আমাকে ঘিরে থাকে
আলো ও আঁধারের দারুণ ভয়
যেখানে যেতে চাই, রাস্তা চিনে চিনে
সেখানে পৌছুতে পারব তো
চলার পথে পথে চপল সূর্যের
হঠাৎ ডুবে যাওয়া, ফের উদয়
যেখানে যেতে চাই, কোথায় যেতে চাই
এমন প্রশ্নও সঙ্গত


হে পথ হে স্বদেশ, এভাবে আর নয়
এবার খুলে দাও উত্সদ্বার
তোমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দেখতে চাই আমি
তোমার মাটি জল মেঘমালা
এবার এসো প্রিয় ভীষণ ঝঞ্ঝায়
আমূল কেঁপে যাক আলো আঁধার
আমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে তুমিও দেখে নাও
আমার আগ্নেয় ডালপালা

.       ****************                                                                 
উপরে    


মিলনসাগর
*
হাতে ভাঙা লাটাই
("রাত্রি জল ছুঁয়ে জেগে আছি" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত )

গায়ের জামা মলিন, তাতে
কী আসে যায়
উড়ছে ঘুড়ি, রঙিন ঘুড়ি
উড়ছে হাওয়ায়


হাতে ভাঙা লাটাই, তবু
নেই পরোয়া
উড়ছে ঘুড়ি, রঙিন ঘুড়ি
আকাশছোঁয়া

.       ****************                                                               
উপরে   


মিলনসাগর
*
মৃত্যু
("রাত্রি জল ছুঁয়ে জেগে আছি" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত )

মৃত্যুর মুখ দেখার প্রশ্নই ওঠে না
কেননা পরস্পর মুখোমুখি হইনি কখনও

সে শুধুই পিছন নিয়েছে
পিছন নিয়েছে ধূর্ত শেয়ালের মতো

আমি কি মুরগি, হাঁস
ঘুরে দাঁড়িয়েছি আর ত্রস্ত ছুটে যেতে

দেখেছি মৃত্যুকে, ভীরু, গোটানো লাঙুল


.       ****************                                                                
উপরে   


মিলনসাগর
*
মাঠ
("রাত্রি জল ছুঁয়ে জেগে আছি" থেকে, জানুয়ারি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত )


মাঠের বাতাস এল ধান দূর্বা নিয়ে
বাতাস নিলাম বুকে
ধান দূর্বা নত হয়ে মাথায় নিলাম

বাজো শঙ্খ বাজো শব্দ বাজো


খেজুর গাছের মতো
সারি সারি ভাঙাচোরা মাঠের মানুষ

আর এই দৃশ্যের আড়ালে
খেজুর কাঁটার কথা, খেজুর রসের গূঢ় কথা


খরায় ফেটেছে মাটি

মায়ের শুকনো কাঁখে
রসের হাঁড়ির মতো তবু
কী করে যে ভরে ওঠে মাঠের শিশুরা


মাঠজল ভেঙে যে মানুষ রাত্রি জুড়ে হেঁটে যায়
মাঠের সকলে তাকে জানে

ডানহাতে মেঘ তার বাঁহাতে বিদ্যুৎ
সে মাঠপুরুষ

আলকেউটেও তাকে পায়ে পায়ে রাস্তা ছেড়ে দেয়


তেচোখা মাছের মতো
নক্ষত্ররা সারা রাত খেলা করে মাঠের শরীরে

তারপর, ধানে দুধ আসে


বাতাসে বাতাসে
পরীদের নগ্ন অভিযান,  নক্ষত্রের
শস্যের মর্মর থেকে
উঠে আসে সুর, মাটির মাদল

বিকেল গড়ায় আরও
আরও আরও বিকেলের দিকে


পাখির শিসের পাশে
মাঠে আজ শিষচোর শিশুরা এসেছে

শিষ ওড়ে নখে নখে
শিষ ওড়ে আকাশে আকাশে


কাদাজল ছেনে যে মেয়েটি মাছ ধরে
মাছের আঁশের মতো পিঠ তার

মত্সকন্যার কথা সে কি জানে


মাঠ-ও খোলস ছাড়ে

তখন চড়ুই , টিয়া, পায়রার  আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়
তখন শুধুই খড়, নষ্ট ডিম, ইঁদুরের গর্ত জেগে থাকে

হা মাঠ হা মাঠ তুনি কোথায় লুকোলে

তারপর, আবার বর্ষায়
আদিগন্ত সবুজ ফণায় মাঠ মাঠে ফিরে আসে

১০
মাঠ মানে অন্তহীন প্রাণের প্রবাহ
মৃত্যু আসে, নতমুখ মৃত্যু ফিরে যায়

বন্যা খরা হিরোশিমা শেষ হয়ে গেলে
আবার প্রাণের শিষ সবুজ দূর্বায়

আহত মাটিতে নামে গানের পাখিরা
দূরে উনুনের ধোঁয়া  আবার আবার

১১
সেদিন কুয়াশা ছেঁড়া তোমার উত্সব

দুলে ওঠে লক্ষ লক্ষ লাঙলের ফণা
বজ্র হাতে হাতে

সেদিন তোমার পাশে
আমার কলম যেন বল্লমের মতো হয়ে ওঠে

১২
আমি কোন দিন কোন মন্দিরে যাইনি
মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি

তোমার লাঙলধোয়া জল
তোমার ধান ও দূর্বা মাথায় ছুঁইয়ে

গেয়েছি মাঠের গান
গাইব মাঠের গান, মাঠমঙ্গল


.       ****************                                                                 
উপরে   


মিলনসাগর
*
নদী, অরণ্যে
("তোমার মারের পালা শেষ হলে" থেকে, মে ১৯৮০ সালে প্রকাশিত )

নদীর জলে হাত রাখলাম
আমার শরীরে উঠে এল
নদী
অরণ্যের পথে পা রাখলাম
আমার শরীরে উঠে এল
অরণ্য

উঠে এল কিছু স্মৃতি :
বাদামের খোসার মতো ভেসে যাওয়া
মানুষের লাশ
শূন্য ঠোঙার মতো পড়ে থাকা
মানুষের লাশ

আমি হাঁটছি
আমার শিরায় শিরায় নদী, তার
ফুলে ফুলে ওঠা----
আমি হাঁটছি
আমার শিরায় শিরায় অরণ্য, তার
আদিম হিংস্রতা----

আমি হাঁটছি
আমি হাঁটছি


.       ****************                                                                 
উপরে   


মিলনসাগর
*
তোমার মারের পালা শেষ হলে
("তোমার মারের পালা শেষ হলে" থেকে, মে ১৯৮০ সালে প্রকাশিত )

পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাবুকের দাগ যেন থাকে
এমন ভাবে মারো


দাগ যেন বসে থাকে বেশ কিছু দিন
এমন ভাবে মারো

এমন ভাবে মারো
তোমার মারের পালা শেষ হলে
আমাকে দেখায় যেন ডোরাকাটা বাঘের মতন


.       ****************                                                                
উপরে    


মিলনসাগর
*
দু-হাঁটু জড়িয়ে
("তোর মুখ দেখতে চাই" থেকে, জুন ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত )

নদীতে
মেয়েটির চোখের জল
আর, নদী
মেয়েটির চোখের জলে

মেয়েটি কাঁদছিল------
নদীকে
তার ঘর-বন্দি জীবনের কথা বলছিল সে

নদীটিও কাঁদছিল
মেয়েটির দু-হাঁটু জড়িয়ে
সে বলছিল তার ভাসতে থাকা জীবনের কথা

নদীতে
মেয়েটির চোখের জল
আর, নদী
মেয়েটির চোখের জলে


.       ****************                                                                
উপরে   


মিলনসাগর
*
পুরনো  পোস্টার
("তোর মুখ দেখতে চাই" থেকে, জুন ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত )

কে বলে তাদের মৃত

ভীষণ ঝড়ের রাতে গাছেরা যখন শনশন
হাওয়ায় শ্লোগান তোলে হাওয়ায় হাওয়ায়

ঝরা পাতারাও কথা বলে

ভীষণ ঝড়ের রাতে
প্রতিটি শহিদ বেদি জেগে ওঠে
ডানা ঝাপটায় ছিঁড়ে যাওয়া পুরনো পোস্টার


.       ****************                                                                 
উপরে   


মিলনসাগর
*
আমার কবিতা
("তোর মুখ দেখতে চাই" থেকে, জুন ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত )

ছোট ছোট আমার কবিতা

গরিবের কূঁড়ের মতন
বুকের লন্ঠন জ্বেলে সারা রাত

ছোট ছোট আমার কবিতা

তাই দিয়ে সাজাতে চেয়েছি
বর্ণময় নক্ষত্রের বিশাল আকাশ


.       ****************                                                                
উপরে    


মিলনসাগর
*
আছি হাঁটাহাঁটিতে

কেউ যায় ইংল্যান্ড, কেউ যায় ফ্রান্সে
গান আনে গান গায় জমকালো গান সে
কেউ যায় আমেরিকা, কেউ যায় ইটালি
আমি চাই, বাংলায় বাংলার মিতালি
বিশ্ব-ও চাই আমি আমাদের আকাশে
শিমূলে-শিরীষে চাই কুয়াসায় ঢাকা সে
বিশ্বকে চাই আমি, চাই এই মাটিতে
আজও তাই হেঁটে যাই, আছি হাঁটাহাঁটিতে |


.       ****************                                                                    
উপরে


এই কবিতাটি কানোরিয়া জুট এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে
প্রকাশিত, দোলা সেন সম্পাদিত, 'কানোরিয়ার পর সিঙ্গুর' পুস্তিকায় ১৭ নভেম্বর ২০০৭ এ
প্রকাশিত হয়েছিল |



মিলনসাগর
*
নন্দীগ্রাম

ছায়ার কথা মিথ্যে আজ
রোদের কথা বলো
ব্যাথার কথা হয়েছে ঢের
ক্রোধের কথা বলো

আগুন লিখছে একটি নাম
নন্দীগ্রাম নন্দীগ্রাম
রক্তে ভিজছে একটি নাম
নন্দীগ্রাম নন্দীগ্রাম

নিজের কথা ছাড়ো এবার
ওদের কথা বলো


.       ****************                                                                    
উপরে   


নন্দীগ্রাম এর উপর লেখা কবির কবিতা | এই কবিতাটি "হেই সামালো" পত্রিকার ১৫ ই
এপ্রিল,২০০৭  এ প্রকাশিত হয়েছিল |



মিলনসাগর
*
স্বাধীনতা, কার স্বাধীনতা

এই ভাবে কথা শুরু হয়েছিল একদিন -
পেট ভ’রে যেন খেতে পারি, আহা , সকলে
ব’য়ে যায় ষাট ষাটটি বছর , রাত-দিন
খাবার এখনও মুষ্টিমেয়রই দখলে


খাওয়া তাহাদের দাওয়া তাহাদের , দাওয়াতে
ঠায় বসে আছে ষাটটি বছর তাহারা
স্বাধীনতা কার স্বাধীনতা ওড়ে হাওয়াতে
দশদিকে কার সতর্ক চোখ, পাহারা

মাথা তুললেই উড়ে যাবে  গুলি-গোলাতে
স্বাধীনতা, তবু স্বাধীনতা মাথা তোলাতেই

.       ****************                                                                    
উপরে


এই কবিতাটি "সংশপ্তক" পত্রিকার আগস্ট ২০০৮  এ প্রকাশিত হয়েছিল |



মিলনসাগর
*
পাথরফাটা জল

এক মুঠো চাল বাড়িয়ে দিতেই
এক দঙ্গল হাত
কেন যে সংঘাত তবু
কেন যে সংঘাত


দু-পাঁচ জনের পিঠে দেখেছি
সহস্র হাঁ-মুখ
কেন যে বন্দুক তবু
কেন যে বন্দুক

খুঁজছো কাকে, খুঁজছো কাকে
সামনে শিশুর দল
একটি শিশু এগিয়ে দিল
পাথরফাটা জল

শিশুকে নয়, খুঁজছো তুমি
কোথায় শিশুর বাপ
ঘর-দুয়োর জুড়ে শুধুই
ছড়ানো সন্তাপ

ভাত দাওনি, কিল মেরেছো
মানবো কেন তোমায়
এক একটা খিদের মুখ
এক একটা বোমা


.       ****************                                                                    
উপরে   


এই কবিতাটি "লালগড়ের সুখদুঃখ" পত্রিকার শ্রাবণ ১৪১৬ (আগস্ট ২০০৯)  এ প্রকাশিত
হয়েছিল |



মিলনসাগর
.        
গণসঙ্গীত   
আন্ধারে কো গো   
 
কবিতা                 
চারপাশে তোমার আমার      
লিখে নাও    
নদীর নামে নাম তার      
স্বদেশ   
মুক্তি   
সৌন্দর্যের দিকে    
পোড়া হাঁড়ি     
দহন     
পোলট্রি     
বর্ণ--পরিচয়     
ময়লাগাড়ি     
একজন অন্ধ, তার গান   
দীপমালা   
নীল পাহাড়ের দেশে   
তোকে ছুঁয়ে   
হে পথ হে স্বদেশ   
হাতে ভাঙা লাটাই   
মৃত্যু   
মাঠ   
নদী, অরণ্যে      
তোমার মারের পালা শেষ হলে   
দু-হাঁটু জড়িয়ে   
পুরনো  পোস্টার   
আমার কবিতা   
আছি হাঁটাহাঁটিতে       
নন্দীগ্রাম   
স্বাধীনতা, কার স্বাধীনতা   
পাথরফাটা জল     

"রঙ তোমাকে" কাব্যগ্রন্থ থেকে   
দোল    
তোমাকে চেয়েছি      
পীতম     
অনুষ্টুপ     
তোকে চাই     
কুপি    
নিভৃতি    

"শিউরে উঠে বলেছিলাম" কাব্যগ্রন্থ থেকে   
আকাশপথে   
সহজ বিশ্বাসে    
নাভি    
আমাদের ভাষা    
ঘূর্ণন  
সিঙ্গুর কিম্বা খাম্মাম     
তোমাকে ডাকছে, তসলিমা      
সহজ    
কলকাতা   
বদল     
একটি নদী কথা    
ডেমোক্রেসি      
ডাক      


মিলনসাগর
.

১।


২।
৩।
৪।
৫।
৬।
৭।
৮।
৯।
১০।
১১।
১২।
১৩।
১৪।
১৫।
১৬।
১৭।
১৮।
১৯।
২০।
২১।
২২।
২৩।
২৪।
২৫।
২৬।
২৭।
২৮।
২৯।



৩০।
৩১।
৩২।
৩৩।
৩৪।
৩৫।
৩৬।


৩৭।
৩৮।
৩৯।
৪০।
৪১।
৪২।
৪৩।
৪৪।
৪৫।
৪৬।
৪৭।
৪৮।

৪৯।