“সন্তোষ ঘোষ নীলাঞ্জনার অনুষ্ঠান শেষ করে আসবেন”         
এই সংলাপটি প্রখ্যাত নাট্যকার ব্রাত্য বসুর নাটক “রুদ্ধসঙ্গীত” থেকে নেওয়া | ৭০এর দশকের পটভূমিকায়
সত্য ঘটনা এবং চরিত্র অবলম্বনে লেখা নাটকের এই সংলাপটি “সন্তোষ ঘোষ” এবং “নীলাঞ্জনা” কে নিয়ে |
সেই সময়ের বুদ্ধিজীবী মহলের উপর কতটা প্রভাব বিস্তার করলে পরে “নীলাঞ্জনা” ব্রাত্য বসুর নাটকের
সংলাপে আজ অমরত্ব লাভ করতে পারে ?
কে এই সন্তোষ ঘোষ ? কে বা কী এই নীলাঞ্জনা ?
সন্তোষ ঘোষ ছিলেন আনন্দ বাজার পত্রিকার সম্পাদক!
আর নীলাঞ্জনা
ছিল ৭০ এর দশকের একটি সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম যার কর্ণধার ছিলেন সেদিনের
সুমিত্রা বসু বা  আজকের সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়!

সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায় ২৪শে আগস্ট ১৯৪৩ এ কলকাতায় জন্ম গ্রহণ করেন | পিতা অসিত কুমার
ঘোষ এবং মাতা কল্যাণী ঘোষ | শৈশবে প্রথম সঙ্গীতে হাতে খড়ি হয় মায়ের কাছে | ক্লাস থ্রী বা ফোরে
পড়ার সময়ে “ফুল বলে ধন্য আমি” গানটি গেয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন |

ছেলেবেলায় ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলের সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শিক্ষা নিতে শুরু
করেছিলেন অঞ্জলি সুরের কাছে, যিনি নির্মলেন্দু চৌধুরীর শিষ্যা ছিলেন |

সেই সময়ে তিনি নিয়মিত কলকাতার নানা সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহণ করতেন | আরতি মুখার্জীর
সাথে এই সব প্রতিযোগীতায় প্রবল টক্কর চলতো |

তিনি বিষ্ণুপুর ঘরানার, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
শিক্ষা নিতে শুরু করেন | সেই সময় রমেশবাবু ছিলেন রবীন্দ্র ভারতী সোসাইটির (যা পরবর্তীতে রবীন্দ্র
ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিনত হয়) অধীনে রবীন্দ্র ভারতী আকাদেমীর সঙ্গীতের ডীন |

স্কুল শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন ১৯৬২ সালে | এই সময়ে
কলকাতার নানান সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের (ঘোষ) সাথে সুপ্রভা সরকার এবং প্রতিভা
কাপুরের প্রবল প্রতিযোগীতা লক্ষ করা গিয়েছিল |

সেখান থেকে ঐ বছরই তিনি যোগ দেন রবীন্দ্র ভারতী আকাদেমীতে, সঙ্গীতে সিনিয়ার ডিপলোমা নিয়ে | সে
সময় তা এম.এ.-র সমান বলে গণ্য করা হতো | এখানকার ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট
হয়েছিলেন | বাংলা গানে তাঁর সর্বাধিক নম্বর ছিল | সে সময় তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র
ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন |

তাঁর ছাত্র জীবনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দলের
গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা ছিলেন এবং দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়েই প্রতিনিধিত্ব করেন নানা অনুষ্ঠান ও যুবমেলায় |  
এই সময় তিনি দেশ-বিদেশের নানা নেতা নেত্রী ও মনীষীদের সাথে সাক্ষাত করার সুযোগ পান |

তিনি পুরাতনী বাংলা গানের  তালিম নেন কীর্তনীয়া রথীন ঘোষের কাছে এবং নজরুলগীতির শিক্ষা নেন
পূরবী দত্তর কাছে |

এর পর ১৯৬৫ সালে তিনি সুচিত্রা মিত্র-র “রবিতীর্থ” থেকে প্রথম ব্যাচে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে উত্তীর্ণ হন |
সেখান থেকেই তিনি সুচিত্রা মিত্রকে তাঁর জীবন ও সঙ্গীতের গুরু রূপে বরণ করে নেন |

১৯৬৮ সালে তিনি  বিবাহ করেন |  তাঁর পদবী বদলে হয় “বসু” |  শুরু হয় তাঁর জীবনের একটি করুণ
অধ্যায় | টিকে থাকার তাগিদে তাঁকে অসংখ্য গানের টিউশনি শুরু করতে হয় |  তাঁর উপর এই অত্যধিক
চাপের ফলে গানের ক্ষতি হতে শুরু করে | বৈবাহিক জীবনের কালো ছায়া পড়ে তাঁর সঙ্গীত জীবনে | ফলে
গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথেও আসে বাধা | না ছিল বৈবাহিক জীবনের বহু আখাঙ্খিত সুখ,  না পাচ্ছিলেন
গানের জগতে তাঁর প্রাপ্য প্রতিষ্ঠা |  তিনি বলেন যে সেই দুঃস্বপ্নময় দিনগুলিতে তিনি শুধু মাত্র রবীন্দ্র
সঙ্গীতের মধ্যেই খুঁজে পেতেন মনের শান্তি | গুরুদেব যে তাঁরও জীবনে পাওয়া শত দুঃখ-বেদনা, তাঁর গানের
মধ্যে ঢেলে মিশিয়ে আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন “রবীন্দ্রসঙ্গীত” | ১২ বছর পর, ১৯৮০ সালে তিনি বিবাহ
বিচ্ছেদ পান | শেষ হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় |

১৯৮১ সালে তিনি শুরু করেন তাঁর দ্বিতীয় সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “কোরক” |  আজ তাঁর এই স্কুলটি
কলকাতার রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে নিজের আসন করে নিয়েছে | তাঁর হাতে গড়া অনেক ছাত্র-ছাত্রিই আজ
সনামধন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত |

১৯৮৪ সালে তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন |

১৯৮৬ সালে তাঁর পরিচয় হয় প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মিহির চট্টোপাধ্যায়ের সাথে |
ডাঃ চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী কিছুকাল পূর্বেই দূরারোগ্য ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে |
ধীরে ধীরে সুমিত্রা দেবী এই পরিবারের আরও কাছাকাছি চলে আসেন | ১৯৮৭ সালে সুমিত্রা দেবী ও মিহির
চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে হয় | ময়ুখ (৮) ও মণিদীপা (৬) ফিরে পায় মাতৃস্নেহ আর সুমিত্রা দেবীও পান একটি
স্বাভাবিক সংসারের সুখ ও শান্তি |
এর পর তিনি পুরো মাত্রায় সংসারিক জীবনে মনোনিবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে গানের অনুষ্ঠান ইত্যাদি
কমিয়ে আনেন | তাই সুখের জীবনে প্রবেশ করেও তাঁর গানের কেরিয়ার তৈরির ক্ষেত্রে মনোযোগ দেন নি |
তাঁর ছেলে ও মেয়ে দুজনেই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত |

রেডিও   
১৯৬০ সালে সুমিত্রা দেবী আকাশবাণীর অডিশান টেস্ট পাশ করেন রবীন্দ্র সঙ্গীত, ভজন, কীর্তন ও পুরাতনী
বাংলা গানে | এর পর থেকেই নিয়মিত ভাবে আকাশবাণীর শিল্পী হিসেবে তাঁর গান প্রচারিত হয়ে আসছে |

রেকর্ড   
১৯৬৮ সালে তাঁর প্রথম রেকর্ড (৪৫ আর.পি.এম.  একস্টেন্ডেড প্লে বা ই.পি.) প্রকাশিত করে “দি গ্রামোফোন
কোম্পানী অফ ইণ্ডিয়া লিমিটেড” | রেকর্ডটি বার হয় সুমিত্রা ঘোষ  নামে | তাঁর দুটি গান ছিল সেই রেকর্ডে
--- “প্রাণে গান নাই, মিছে তাই” এবং “কে দেবে চাঁদ, তোমায় দোলা” | এর উলটো পিঠ-এ ছিল সাগর সেনের
গাওয়া “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান” এবং “সখি বহে গেল বেলা” গান দুটি | এর পর আরও অনেক
রেকর্ড বার হয় | তবে তাঁর শেষ রেকর্ড বার হয়, ১৯৮১-৮২ সালে অভিজিত গুহ-র  সাথে, “সাউণ্ড উইংগ”
থেকে কেসেট আকারে | এ ছাড়া “দি গ্রামোফোন কোম্পানী অফ ইণ্ডিয়া লিমিটেড”-এর থেকে বার করা গীতি
আলেখ্য “বসন্ত” এবং “যায় দিন শ্রাবণ দিন যায়” |

নেপথ্য কণ্ঠ শিল্পী  
তিনি বেশ কয়েকটি বাংলা ছায়াছবিতে গান গেয়েছেন | ট্রেনার রথীন ঘোষের নির্দেশনায় “নদের নিমাই”,
“নৃত্যের তালে তালে”, “বৃন্দাবন লীলা” প্রভৃতি সিনেমাতে তিনি গান গেয়েছিলেন | এ ছাড়া টিভি সিরিয়াল
“তস্কর” ও “বৃত্তের চারিধারে”-জন্যও তিনি গান গেয়েছেন |

টেলিভিশন   
১৯৭৩ সালে কলকাতায় টেলিভিশন আসার সময় থেকেই তাঁর অনুষ্ঠান দূরদর্শনে প্রচারিত হয়ে আসছে |

অনুষ্ঠান   
২৫শে জুন ১৯৭৫ তাঁর প্রথম একক রবীন্দ্র সঙ্গীত অনুষ্ঠান হয়েছিল “শিশির মঞ্চে” | কিন্তু বিধি বাম | সেদিন
ভোর থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এমারজেন্সী বা জরুরী অবস্থার ডাক দিয়েছিলেন | সরকার কঠোর হস্তে
গণমাধ্যের উপর সেনসরশিপ চাপিয়ে দেন | ফলে অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধে তাঁর গাইবার কথা থাকলেও কোনো
সাংবাদিকই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না | তাই তাঁর সেই অনুষ্ঠানের কথা মানুষের কাছে পৌঁছায় নি |

তিনি একজন জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন | বাংলার বাইরে থেকেও তাঁর
অনুষ্ঠানের ডাক আসতো | নানান অনুষ্ঠানে তিনি নানান শিল্পীদের সাথে গান গেয়েছেন | তাঁর মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য |

পুরস্কার   
শৈশব থেকেই তিনি বিভিন্ন গানের প্রতিযোগীতামূলক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে বিপুল সংখ্যক পুরস্কারে
ভূষিত হয়েছেন | তাঁর এলবামে সেই ছবি ধরা পড়েছে বার বার | বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো “শ্রুতি”
সংস্থার থেকে তাঁকে দক্ষিণ কলকাতার শ্রেষ্ঠ গায়িকার সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল |  পুরস্কারটি প্রদান
করেন লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের অধ্যক্ষা ডঃ রমা চৌধুরী, আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের
উপস্থিতিতে |

বিশেষ মুহুর্ত   
একবার তিনি একটি রেকর্ডিং এর জন্য দমদমের
HMV বা “দি গ্রামোফোন কোম্পানী অফ ইণ্ডিয়া লিমিটেড”
এর স্টুডিও তে গিয়েছিলেন | তাঁর গানের রেকর্ডিং চলাকালীন পণ্ডিত রবিশংকর সেখানে ছিলেন | পণ্ডিতজী
মন দিয়ে তাঁর গান শুনেছিলেন এবং যখন রেকর্ডিং এর শেষে সুমিত্রা দেবীকে ডেকে ভুয়সী প্রসংশা করেন
এবং তাঁর কার্ড দিয়ে বলেছিলেন যোগাযোগ করতে | তা আর হয়ে ওঠে নি |



.                    ---এই লেখাটি ১০ই জুলাই ২০১০ তারিখে তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাত্কারের পর লেখা---


.                                                                                                          
উপরে  

..                                                                                               Click here to read this write up in English


...


মিলনসাগর
...
Click here to read this write up in English   
     
সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে...