বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর "জিঞ্জীর"
থেকে কয়েকটি কবিতা
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

অঘ্রাণের সওগাত
কলিকাতা, ১০ই কার্তিক--১৩৩৩


ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত ?
নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হ’ল মাৎ |
.                ‘গিন্নী পাগল’ চালের ফির্ ণী
.                তশ্ তরী ভ’রে নবীনা গিন্নী
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশীতে কাঁপিছে হাত !
ফির্ ণী রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ী গন্ধে তেলেস্ মাত্ !


মিয়া ও বিবিতে বড় ভাব আজি খামারে ধরে না ধান |
বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপাসুরে গাহে গান !
.                শাশবিবি’ কন, “আহা, আসে নাই
.                কতদিন হ’ল মেজ্ লা জামাই |”
ছোট মেয়ে কয়, “আম্মাগো, রোজ কাঁদে মেজো বুবুজান” |
দলিজের পান সাজিয়া সাজিয়া সেজো-বিবি লবেজান  !


হল্লা করিয়া ফিরিছে পাড়ার দস্যি ছেলের দল !
ময়নামতীর শাড়ী-পরা মেয়ে গয়নাতে ঝল্ মল !
.                নতুন পৈঁচি বাজুবন্দ্ প’রে
.                চাষা-বৌ কথা কয় না গুমোরে,
জারিগান আর গাজীর গানেতে সারা গ্রাম চঞ্চল !
বৌ করে পিঠা ‘পুর’ -দেওয়া মিঠা দেখে জিভে সরে জল !


মাঠের সাগরে জেয়োরের পর লেগেছে ভাঁটীর টান |
রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশীতে ঝুরিছে আমন ধান !
.                কৃষক-কন্ঠে ভাটিয়ালী সুর
.                রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর !
ধান ভানে বৌ, দু’লে ওঠে রূপ-তরঙ্গে বান !
বধূর পায়ের পরেশ পেয়েছে কাঠের ঢেঁকিও প্রাণ !


হেমন্ত-গায় হেলান দিয়ে গো রৌদ্র পোহায় শীত !
কিরণ-ধারায় ঝরিয়া পড়িছে সূর্য-----আলো-সরিৎ !
.                দিগন্তে যেন তুর্কী-কুমারী
.                কুয়াশা-নেকাব রেখেছে উতারি’ !
চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ্ !
নতুনের পথ চেয়ে চেয়ে হ’ল হরিৎ পাতারা পীত !


নবীনের লাল  ঝান্ডা উড়ায়ে আসিতেছে কিশলয়,
রক্ত-নিশান নহে যে রে ওরা রিক্ত শাখার জয় !
.                ‘মুজ্ দা’ এনেছে অগ্রাহায়ণ-------
.                আসে নৌ-রোজ খোল গো তোরণ !
গোলা  ভ’রে রাখ সারা বছরের হাসি-ভরা সঞ্চয় !
বাসি-বিছানায় জাগিতেছে শিশু সুন্দর নির্ভর !


.                   **************



.                                                                             
পরে     

মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

মিসেস্ এম্ রহমান
কৃষ্ণনগর, ১৫ই পৌষ---১৩৩৩

মোহর্ রমের চাঁদ ওঠার ত আজিও অনেক দেরী,
কেন কার্ বালা-মাতম্ উঠিল এখনি আমায় ঘেরি’ ?
ফোরাতের মৌজ্ ফোঁপাইয়া ওঠে কেন গো আমার চোখে ?
নিখিল-এতিম্ ভিড় ক’রে কাঁদে আমার মানস-লোকে !
মার্সিয়া-খান ! গা’স্ নে অকালে মর্সিয়া-শোকগীতি,
সর্বহারার অশ্রু-প্লাবনে সয়্ লাব হবে ক্ষিতি |--------

-------------------------------আজ যবে হায় আমি
কুফার পথে গো চলিতে চলিতে কারবালা-মাঝে থামি’
হেরি চারিধারে ঘিরিয়াছে মোর মৃত্যু-এজিদ-সেনা,
ভায়েরা আমার দুশ্ মন্-খুনে মাখিতেছে হাতে হেনা !
আমি শুধু হায় রোগ-শয্যায় বাজু কামড়ায়ে মরি !
দানা পানি নাই পাতার খিমায় নির্জীব আছি পড়ি !
এমন সময় এল ‘দুল্ দুল্ ‘ পৃষ্ঠে শূন্য জিন,
শূন্যে কে যেন কাঁদিয়া উঠিল ----“জয়নাল আবেদিন” !
শীর্ণ-পাঞ্জা দীর্ণ-পাঁজর পর্ণ কুটীর ছাড়ি’
উঠিতে  পড়িতে ছুটিয়া আসিনু, রুধিল দুয়ার দ্বারী !
বন্দিনী মা’র ডাক শুনি শুধু জীবন-ফোরাত-পারে,
“এজিদের বেড়া পারায়ে এসেছি, যাদু তুই ফিরে যা রে !”
কাফেলা যখন কাঁদিয়া উঠিল তখন দুপুর নিশা !------
এজিদে পাইব, কোথা পাই হায় আজ্ রাইলের দিশা ?
জীবন ঘিরিয়া ধূ-ধূ করে আজ শুধু সাহারার বালি,
অগ্নি-সিন্ধু করিতেছি পান দোজখ করিয়া খালি !
আমি পুড়ি, সাথে বেদনাও পুড়ে, নয়নে শুকায় পানি,
কলিজা চাপিয়া তড়্ পায় শুধু বুক-ভাঙা কাৎরানি !
মাতা ফতেমার লাশের ওপর পড়িয়া কাতর স্বরে
হাসান হোসন কেমন করিয়া কেঁদেছিল, মনে পড়ে !

***                ***                ***                ***

অশ্রু-প্লাবনে হাবুডুবু খাই বেদনার উপকূলে,
নিজের ক্ষতিই বড় করি তাই সকলের ক্ষতি ভু’লে !
ভু’লে যাই ---- কত বিহগ-শিশুরা এই স্নেহ-বট ছায়ে
আমারই মতন আশ্রয় লভি’ ভুলেছে আপন মায়ে |
কত সে ক্লান্ত বেদনা-দগ্ধ মুসাফির এরই মূলে
বসিয়া পেয়েছে মা’র তসল্লি, সব গ্লানি গেছে ভু’লে !
আজ তা’রা সবে করিছে মাতন্ আমার বাণীর মাঝে,
একের বেদনা-নিখিলের হ’য়ে বুকে এত ভার বাজে !
আমারে ঘিরিয়া জমিছে অথই শত নয়নের জল,
মধ্যে বেদনা-শতদল আমি করিতেছি টলমল !
নিখিল-দরদী-দিলের আম্মা !  নাহি মোর অধিকার
সকলের মাঝে সকলে ত্যজিয়া শুধু একা কাঁদিবার !
আসিয়াছি মাগো জিয়ারত লাগি’ আজি অগ্রজ হ’য়ে
মা-হারা আমার ব্যথাতুর ছোট ভাইবোনগুলি ল’য়ে !
অশ্রুতে মোর অন্ধ দু’চোখ, তবু ওরা ভাবিয়াছে
হয়ত তোমার পথের দিশা মা জানা আছে মোর কাছে !
জীবন-প্রভাতে দেউলিয়া হ’য়ে যারা ভাষাহীন গানে
ভিড় ক’রে মাগো চ’লেছিল সব গোরস্থানের পানে,
পক্ষ মেলিয়া আবরিলে তুমি সকলে আকুল স্নেহে,
যত ঘর-ছাড়া কোলাকুলি করে তব কোলে তব গেহে !
“কত বড় তুমি” বলিলে , বলিতে “আকাশ শূন্য ব’লে
এত কোটী তারা চন্দ্র সূর্য  গ্রহে ধরিয়াছে কোলে !
শূন্য সে বুক তবু ভরেনি রে, আজো সেথা আছে ঠাঁই,
শূন্য ভরিতে শূন্যতা ছাড়া দ্বিতীয় সে কিছু নাই !”

গোর-পলাতক মোরা বুঝি নাই মাগো তুমি আগে থেকে
গোরস্থানের দেনা শুধিয়াছ আপনারে বাঁধা রেখে !
ভুলাইয়া রাখি গৃহ-হারাদের দিয়া স্ব-গৃহের চাবি
গোপনে মিটালে আমাদের ঋণ----মৃত্যুর মহাদাবী !
সকলেরে তুমি সেবা ক’রে গেলে, নিলেনা কারুর সেবা,
আলোক সবারে আলো দেয়, দেয় আলোকেরে আলো কেবা ?

আমাদেরও চেয়ে গোপন গভীর কাঁদে বাণী ব্যথাতুর,
থেমে গেছে তার দুলালী মেয়ের জ্বালা-ক্রন্দন-সুর !
কমল-কাননে থেমে গেছে ঝড় ঘূর্ণীর ডামাডোল,
কারুর বক্ষে বাজেনাক’ আর ভাঙন-ডঙ্কা রোল !------
বসিবে কখন জ্ঞানের তখ্ তে বাঙ্ লার মুসলিম !
বারেবারে টুটে কলম তোমার না লিখিতে শুধু ‘মিম্’ !

***                ***                ***                ***

সে ছিল আরব-বেদুঈনদের পথ-ভুলে আসা মেয়ে,
কাঁদিয়া উঠিত হেরেমের উঁচা প্রাচীরের পানে চেয়ে !
সকলের সাথে সকলের মত চাহিত সে আলো বায়ু,
বন্ধন-বাঁধ ডিঙাতে না পেরে ডিঙাইয়া গেল আয়ু !
সে বলিত, “ঐ হেরেম-মহল নারীদের তরে নহে,
নারী নহে যারা ভুলে বাঁদি-খানা ঐ হেরেমের মোহে !
নারীদের এই বাঁদি ক’রে রাখা অবিশ্বাসের মাঝে
লোভী পুরুষের পশু প্রবৃত্তি হীন অপমান রাজে !
আপনা ভুলিয়া বিশ্বপালিকা নিত্য-কালের নারী
করিছে পুরুষ-জেলদারোগার কামনার তাঁবেদারী !
বলেনা কোরান, বলেনা হাদিস, ইসলামী ইতিহাস,
নারী নর-দাসী, বন্দিনী রবে হেরেমেতে বারোমাস !
হাদিস কোরান ফেকা ল’য়ে যারা করিছে ব্যবসাদারী,
মানেনাক’ তারা কোরানের বাণী-----সমান নর ও নারী !
শাস্ত্র ছাঁকিয়া নিজেদের যত সুবিধা বাছাই ক’রে
নারীদের বেলা গুম্ হ’য়ে রয় গুম্ রাহ যত চোরে !”
দিনের আলোকে ধরেছিল এই মুনাফেক্ দের চুরি,
মস্ জিদে ব’সে স্বার্থের তরে ইসলামে হানা ছুরি !
আমি জানি মাগো আলোকের লাগি’ তব এই অভিযান
হেরেম-রক্ষী যত গোলামের কাঁপায়ে তুলিত প্রাণ !
গোলা-গুলি নাই, গালাগালি আছে, তাই দিয়ে তারা লড়ে,
বোঝেনাক’ থুথু উপরে ছুঁড়িলে আপনারি মুখে পড়ে !
আমরা দেখেছি, যত গালি ওরা ছুঁড়িয়া মেরেছে গায়ে,
ফুল হ’য়ে সব ফুটিয়া উঠিয়া ঝরিয়াছে তব পায়ে !

***                ***                ***                ***

কাঁটার কুঞ্জে ছিলে নাগমাতা সদা উদ্যত-ফণা
আঘাত করিতে আসিয়া ‘আঘাত’ করিয়াছে বন্দনা !
তোমার বিষের নীহারিকা-লোকে নিতি নব নব গ্রহ
জন্ম লভিয়া নিষেধ-জগতে জাগায়েছে বিদ্রোহ !
জহরের তেজ পান ক’রে মাগো তব নাগ-শিশু যত
নিয়ন্ত্রিতের শিরে গড়িয়াছে ধ্বজা বিজয়োদ্বত !
মানেনিক’ তা’রা শাসন ত্রাসন বাধা-নিষেধের বেড়া,-----
মানুষ থাকে না খোঁয়াড়ে বন্ধ, থাকে বটে গরু ভেড়া !
এস্ ম্ - আজম তাবিজের মত আজো তব রুহু পাক্,
তাদের ঘিরিয়া আছে কি তেমনি বেদনায় নির্বাক্ ?
অথবা ‘খাতুনে-জান্নাৎ’ মাতা ফাতেমার গুলবাগে
গোলাব-কাঁটায় রাঙা গুল্ হ’য়ে ফুটেছে রক্তরাগে ?

***                ***                ***                ***

তোমার বেদনা-সাগরে জোয়ার জাগিল যাদের টানে,
তা’রা কোথা আজ ? সাগর শুকালে চাঁদ মরে কোন্ খানে ?

যাহাদের তরে অকালে আম্মা, জান দিলে কোর্ বান,
তাদের জাগায় সার্থক হোক তোমার আত্মদান !
মধ্যপথে মা তোমার প্রাণের নিবিল যে দীপ-শিখা,
জ্বলুক নিখিল-নারী-সীমন্তে হ’য়ে তাই জয়টীকা !
বন্দিনীদের বেদনার মাঝে বাঁচিয়া আছ মা তুমি,
চিরজীবী মেয়ে, তবু যাই ঐ কবরের ধূলি চুমি’ !
মৃত্যুর পানে চলিতে আছিলে জীবনের পথ দিয়া,
জীবনের পানে চলিছ কি আজ মৃত্যুরে পারাইয়া ?


.                   **************



.                                                                             
পরে     

মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

ঈদ মোবারক
কলিকাতা, ১৯শে চৈত্র---১৩৩৩

শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,
কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো,
.        বরষের পরে আসিলে ঈদ !
ভুখারীর দ্বারে সওগাত্ বয়ে রিজ্ ওয়ানের,
কন্টক-বনে আশ্বাস এনে গুল্ -বাগের,
.        সাকীরে “জাম” এর দিলে তাগিদ্ ?

খুশীর পাপিয়া পিউ-পিউ গাহে দিগ্বিদিক্,
বধূ জাগে আজ নিশীথ-বাসরে নির্নিমিখ্ !
.        কোথা ফুলদানী, কাঁদিছে ফুল !
সুদূর প্রবাসে ঘুম নাহি আসে কার সখার,
মনে পড়ে শুধু সোঁদা-সোঁদা-বাস এলো খোঁপার,
.        আকুল করবী উল্ ঝলুল্ !!

ওগো কা’ল সাঁঝে দ্বিতীয়া চাঁদের ইশারা কোন্
মুজ্ দা এনেছে, সুখে ডগমগ মুকুলী মন !
.        আশাবরী-সুরে ঝুরে সানাই !
আতর-সুবাসে কাতর হ’লগো পাথর-দিল্
দিলে দিলে আজ বন্ধকী দেনা---- নাই দলিল,
.        কবুলিয়তের নাই বালাই !

আজিকে এজিদে হাসানে হোসেনে গলাগলি,
দোজখে ভেশ্ তে ফুলে ও আগুনে ঢলাঢলি,
.        শিঁরী ফরহাদে জড়াজড়ি !
সাপিনীর মত বেঁধেছে লায়্ লি কায়েসে গো,
বাহুর বন্ধে চোখ বুঁজে বঁধূ আয়েসে গো,
.        গালে গালে চুম্ গড়াগড়ি !!

দাউ-দাউ জ্বলে আজি স্ফুর্তির জাহান্নাম,
শয়তান আজ ভেশ্ তে বিলায় শরাব জাম,
.         দুশ্ মন দোস্ত্ এক-জামাত্ !
আজি আরফাত্-ময়দান পাতা গাঁয়ে-গাঁয়ে,
কোলাকুলি করে বাদ্ শা ফকীরে ভায়ে ভায়ে,
.        কা’বা ধ’রে নাচে “লাত মানাত” !!

আজি ইস্ লামী-ডঙ্কা গরজে ভরি’ জাহান,
নাই বড় ছোট---সকল মানুষ এক সমান,
.        রাজা প্রজা নয় কারো কেহ !
কে আমীর তুমি নওয়াব বাদ্ শা বালাখানায় ?
সকল কালের কলঙ্ক তুমি  ;   জাগালে হায়
.        ইস্ লামে তুমি সন্দেহ !!

ইস্ লাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,
সুখ দুখ সম-ভাগ ক’রে নেব সকলে ভাই,
.        নাই অধিকার সঞ্চয়ের !
কারো আঁখি-জলে কারো ঝাড়ে কি রে জ্বলিবে দীপ ?
দু’জনার হবে বুলন্দ্-নসিব, লাখে লাখে হবে বদ্ নসিব ?
.        এ নহে বিধান ইস্ লামের !!

ঈদ্-অল্-ফিতর্ আনিয়াছে তাই নববিধান,
ওগো সঞ্চয়ী,  উদ্বৃত্ত যা করিবে দান,
.        ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার !
ভোগের  পেয়ালা উপ্ চায়ে পড়ে তব হাতে,
তৃষ্ণাতুরের হিস্ সা আছে ও পেয়ালাতে,
.         দিয়া ভোগ কর, বীর, দেদার !!

বুক খালি ক’রে আপনারে আজ দাও জাকাত,
ক’রোনা হিসাবী, আজি হিসাবের অঙ্কপাত !
.        একদিন কর ভুল হিসাব |
দিলে দিলে আজ খুনসুড়ি করে দিল্ লাগী,
আজিকে সায়েলা-লায়েলা-চুমায় লাল যোগী !
.        জাম্ শেদ বেচে চায় শরাব !!

পথে পথে আজ হাঁকিব বন্ধু,
.        ঈদ্ মোবারক !  আস্ সালাম !
ঠোঁটে ঠোঁটে আজ বিলাব শির্ ণী ফুল-কালাম !
.        বিলিয়ে দেওয়ার আজিকে ঈদ্ |
আমার দানের অনুরাগে রাঙা ঈদ্ গা’ রে !
সকলের হাতে দিয়ে দিয়ে আজ আপনারে------
.        দেহ নয়, দিল্ হবে শহীদ !!


.                   **************



.                                                                             
পরে     

মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয়
কলিকাতা,১লা পৌষ----১৩৩৪

আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয়
প্রাণের বুল্ ন্দ দরওয়াজায়,
‘তাজা ব-তাজা’র গাহিয়া গান
চির-তরুণের চির-মেলায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


যুবা-যুবতীর সে-দেশে ভিড়,
সেথা যেতে নারে বুঢ্ঢা পীর,
শাস্ত্র-শকুন জ্ঞান-মজুর
যেতে নারে সেই হুরী-পরীর
শরাব সাকীর গুলিস্তাঁয় |
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


সেথা হর্দম খুশীর মৌজ্,
তীর হানে কালো-আঁখির ফৌজ,
পায়ে পায়ে সেথা আরজি পেশ,
দিল্ চাহে সদা দিল্-আফরোজ,
পিরাণে পরাণ বাঁধা সেথায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


করিল না যারা জীবনে ভুল,
দলিল না কাঁটা, ছেঁড়েনি ফুল,
দারোয়ান হ’য়ে সারা জীবন
আগুলিল বেড়া ছুঁলনা গুল,----
যেতে নারে তারা এ জল্ সায় |
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


বুড়ো নীতিবিদ-----নুড়ির প্রায়
পেলনাক’ এক বিন্দু রস
চিরকাল জলে রহিয়া হায় !------
কাঁটা বিঁধে যার ক্ষত আঙুল
দোলে ফুলমালা তারি গলায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয়  ||


তিলে তিলে যারা পিশে মারে
অপরের সাথে আপনারে,
ধরণীর ঈদ-উত্সবে
রোজা রে’খে প’ড়ে থাকে দ্বারে,
কাফের তাহারা এ ঈদ্ গায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


বুল্ বুল গেয়ে ফেরে বলি’
যাহারা শাসায়ে ফুলবনে,
ফুটিতে দিলনা ফুলকলি ;
ফুটিলে কুসুম পায়ে দলি’
মারিয়াছে, পাছে বাস বিলায় !
হারাম তারা এ-মুশায়েরায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


হেথা কোলে নিয়ে দিলরুবা
শরাবী গজল গাহে যুবা,
প্রিয়ার বে-দাগ কপোলে গো
এঁকে দেয় তিল মনোলোভা,
প্রেমের-পাপীর এ মোজ্ রায় |
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


আসিতে পারে না হেথা বে-দিন
মৃত প্রাণ-হীন জরা-মলিন |
নৌ-জোয়ানীর এ মহফিল
খুন ও শরাব হেথা অ-ভিন,
হেথা ধনু  বাঁধা ফুলমালায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


পেয়ালায় হেথা শহীদী খুন
তলোয়ার-চোঁয়া তাজা তরুণ
আঙ্গুর-হৃদি চুয়ানো গো
গেলাসে শরাব রাঙা অরুণ !
শহীদে প্রেমিকে ভিড় হেথায়
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||


প্রিয়া-মুখে হেথা দেখি গো চাঁদ,
চাঁদে হেরি প্রিয়-মুখের ছাঁদ !
সাধ ক’রে হেথা করি গো পাপ,
সাধ ক’রে বাঁধি বালির বাঁধ,
এ রস-সাগরে বালু-বেলায় !
.        আয় বেহেশ্ তে কে যাবি আয় ||

                                            

.                   **************



.                                                                             
পরে     

মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

নওরোজ
কৃষ্ণনগর, ১৫ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৪


রূপের সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,
.        নওরোজের            এ মেলায় !
.        ডামাডোল আজি চাঁদের হাট,
.        লুট হ’ল রূপ হ’ল লোপাট !
.        খুলে ফেলে লাজ-শরম-ঠাট্
.        রূপসীরা সব রূপ বিলায়
বিনি-কিম্মতে হাসি-ইঙ্গিতে হেলাফেলায় !
.        নওরোজের       এই মেলায় !


শা’জাদা উজির নওয়াব-জাদারা----রূপ-কুমার
.        এই মেলায়        খরিদ্-দার !
.        নও-জোয়ানীর জহুরী ঢের
.        খুঁজিছে বিপনি জহরতের,
.        জহরত নিতে---টেড়া আঁখের
.        জহর কিনিছে নির্বিকার !
বাহানা করিয়া ছোঁয় গো পিরান জাহানারার
.        নওরোজের      রূপ-কুমার !


ফিরি ক’রে ফেরে শা’জাদী বিবি ও বেগম সা’ব
.        চাঁদ মুখের          নাই নেকাব ?
.        শূন্য দোকানে পসারিণী
.        কে জানে কী করে বিকি-কিনি !
.        চুড়ি-কঙ্কণে কোমল কড়ি রেখাব !
অধরে অধরে দর-কশাকশি----নাই হিসাব !
.        হেম্-কপোল        লাল গোলাব !


হেরেম-বাঁদীরা দেরেম ফেলিয়া মাগিছে দিল্,
.        নওরোজের          নও-ম’ফিল !
.        সাহেব গোলাম, খুনি আশেক,
.        বিবি-বাঁদী,----সব আজিকে এক !
.        চোখে চোখে পেশ দাখিলা চেক
.        দিলে দিলে মিল এক শামিল !
বেপর্ ওয়া আজ বিলায় বাগিচা ফুল-ত’বিল !
.        নওরোজের          নও-ম’ফিল !


ঠোঁটে ঠোঁটে আজ মিঠি শরবৎ ঢাল উপুড়,
.        রণ্-ঝনায়            পা’য় নূপুর !
.        কিস্ মিস্ ছেঁচা আজ অধর,
.        আজিকে আলাপ ‘মোখ্ তসর’ !
.        কার পায়ে পড়ে কার চাদর,
.        কাহারে জড়ায় কার কেয়ূর,
প্রলাপ বকে গো কলাপমেলিয়া মন-ময়ূর,
.        আজ দিলের নাই সবুর !


আঁখির নিক্তি করিছে ওজন প্রেম দেদার
.        ভার কাহার       অশ্রু-হার !
.        চোখে চোখে আজ চেনাচেনি,
.        বিনি মূলে আজ কেনাকেনি,
.        নিকাশ করিয়া লেনিদেনি
.        ‘ফাজিল’ কিছুতে কমে না আর !
.        দিল্ সবার          ‘বে-কারার’ !
পানের বদলে   ‘মুন্না’  মাগিছে পান্না-হার !


সাধ ক’রে আজ বর্ বাদ করে দিল সবাই
.        নিম্ খুন কেউ        কেউ জবাই !
.        নিক্ পিক্ করে ক্ষীণ কাঁকাল,
.        পেশোয়াজ কাঁপে টাল্ মাটাল,
.        গুরু উরু ভারে তনু নাকাল,
.        টল্ মল্ আঁখি জল-বোঝাই !
হাফিজ উমর শিরাজ পালায়ে লেখে ‘রুবাই’ !
.        নিম্ খুন কেউ       কেউ জবাই !


শিরী লায়লীরে খোঁজে ফর্ হাদ খোঁজে কায়েস্
.        নওরোজের        এই সে দেশ !
.        ঢুঁড়ে ফেরে হেথা যুবা সেলিম
.        নূরজাহানের দূর সাকিম,
.        আরংজিব আজ হইয়া ঝিম্
.        হিয়ায় হিয়ায় চাহে আয়েস !
তখ্ ত্ তাউস কোহিনূর কারো নাই খায়েশ,
.        নওরোজের           এই সে দেশ !


গুলে-বকৌলি উর্বশীর           এ চাদনী-চক,
.        চাও হেথায়                রূপ নিছক |
.        শরাব সাকী ও রঙে রূপে
.        আতর লোবান ধূনা ধূপে
.        সয়্ লাব সব যাক ডুবে,
.        আঁখি-তারা হোক নিষ্পলক !
চাঁদো মুখে আঁক’  কালো কলঙ্ক তিল-তিলক !
.        চাও-হেথায়           রূপ নিছক !


হাসিস্-নেশায় ঝিম্ মেরে আছে আজ সকল,
.        লাল-পানির          রংমহল !
.        চাঁদ-বাজারে  এ নওরোজের
.        দোকান ব’সেছে মোম্ তাজের
.        সওদা করিতে এসেছে ফের
.        শা’জাহান হেথা রূপ-পাগল !
হেরিতেছে কবি সুদূরের ছবি ভবিষ্যতের তাজমহল-------
.        নওরাজের            স্বপ্ন-ফল !


.            ***********************************

                                                    
নেকাব -- আব্ ছা ঘোমটা, মুখাবরণ,   
দেরেম--রৌপ্য মুদ্রা, ত’বিল--তহ্ বিল ,
ম’ফিল-- সভা, আশেক-- প্রেমিক,
মোখ্ তসর--সংক্ষেপ,  মুন্না-সাধারণত বাঁদীর নাম,  
ফাজিল--অতিরিক্ত, বে-কারার-- ধৈর্যহারা ,  শিরী, ফর্ হাদ,
কায়েস্---- জগৎবিখ্যাত প্রেমিক-প্রেমিকা,  
রুবাই --চতুষ্পদী কবিতা, খায়েশ--ইচ্ছা,  
সেলিম-- জাহাঙ্গীর,
গুলে-বকৌলি--পরীদের রাণী  |



.                   **************                                                 
পরে     




মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

.        অগ্র--পথিক        

.        অগ্র-পথিক হে সেনাদল,
.        জোর্ কদম্     চল্ রে চল্ !
রৌদ্রদগ্ধ মাটি-মাখা শোন্ ভাইরা মোর,
বাসি বসুধায় নব অভিযান আজিকে তোর !
রাখ্ তৈয়ার হাতেলিতে হাথিয়ার জোয়ান,
হান্ রে নিশিত্ পাশুপতাস্ত্র অগ্নিবান !
.        কোথায় হাতুড়ি কোথা শাবল ?
.        অগ্র-পথিক রে সেনাদল,
.        জোর্ কদম্        চল্ রে চল্  ||


কোথায় মানিক ভাইরা আমার, সাজ্ রে সাজ্ !
আর বিলম্ব সাজেনা, চালাও কুচ্ কাওয়াজ !
আমরা নবীন তেজ-প্রদীপ্ত বীর তরুণ !
বিপদ বাধার কন্ঠ ছিঁড়িয়া শুষিব খুন !
.        আমরা ফলাব ফুল-ফসল !
.        অগ্র-পথিক রে যুবাদল,
.        জোর্ কদম্           চল্ রে চল্  ||



প্রাণ-চঞ্চল প্রাচী-র তরুণ, কর্মবীর,
হে মানবতার প্রতীক গর্ব উচ্চশির !
দিব্যচক্ষে দেখিতেছি, তোরা দৃপ্তপদ
সকলের আগে চলিবি পারায়ে গিরি ও নদ,
.        মরু-সঞ্চয় গতি-চপল !
.        অগ্র-পথিক রে পাঁওদল,
.        জোর্ কদম্      চল্ রে চল্ ||


স্থবির শ্রান্ত প্রাচী-র প্রাচীন জাতিরা সব
হারায়েছে আজ দীক্ষা দানের সে গৌরব !
অবনত-শির গতিহীন তারা--মোরা তরুণ
বাহির সে ভার, লব শাশ্বত ব্রত দারুণ,
.        শিখাব নতুন মন্ত্রবল |
.        রে নব পথিক যাত্রীদল,
.        জোর্ কদম্       চল্ রে চল্  ||


আমরা চলিব  পশ্চাতে ফেলি’ পচা অতীত্ ,
গিরি-গুহা ছাড়ি’ খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত !
সৃজিব জগৎ বিচিত্রতর, বীর্যবান,
তাজা জীবন্ত সে নব সৃষ্টি শ্রম-মহান,
.        চলমান-বেগে প্রাণ-উছল !
.        রে নবযুগের শ্রষ্টাদল,
.        জোর্ কদম্        চল্ রে চল্  ||
অভিযান-সেনা আমরা ছুটিব দলে দলে
বনে নদীতটে গিরি-সঙ্কটে জলে থলে !
লঙ্ঘিব খাড়া পর্বত-চূড়া অনিমিষে,
জয় করি’ সম তস্ নস্ করি’ পায়ে পিশে,
.        অসীম সাহসের ভাঙি’ আগল !
.        না জানা পথের নকীব-দল,
.        জোর্ কদম্       চল্ রে চল ||



পাতিত করিয়া শুষ্ক বৃদ্ধ অটবীরে
বাঁধ বাঁধি চলি দুস্তর খর স্রোত-নীরে |
রসাতল চিরি’ হীরকের খনি করি খনন,
কুমারী ধরার গর্ভে করি গো ফুল সৃজন,
.        পায়ে হেঁটে মাপি ধরণীতল !
.        অগ্র-পথিক রে চঞ্চল,
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্  ||


আমরা এসেছি নবীন প্রাচীর-র নব-স্রোতে
ভীম পর্বত ক্রকচ-গিরির চূড়া হ’তে,
উচ্চ অধিত্যকা প্রণালিকা হইয়া পার
আহত বাঘের পদ-চিন্ ধরি’ হয়েছি বা’র ;
.        পাতাল ফুঁড়িয়া, পথ-পাগল !
.        অগ্রবাহিনী পথিক-দল,
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্ ||


আয়র্ল্যান্ড, আরব, মিশর, কোরিয়া, চীন,
নরওয়ে, স্পেন, রাশিয়া----সবার ধারি গো ঋণ |
সবার রক্তে মোদের লোহুর আভাস পাই,
এক বেদনার “কমরেড্” ভাই মোরা সবাই !
.        সকল দেশের মোরা সকল |
.        রে চির-যাত্রী পথিক-দল,
.        জোর্ কদম্          চল্ রে চল্  ||


বল্ গা বিহীন শৃঙ্খল-ছেঁড়া প্রিয় তরুণ !
তোদের দেখিয়া টগবগ করে বক্ষে খুন |
কাঁদি বেদনায়, তবু রে তোদের ভালোবাসায়
উল্লাসে নাচি আপনা-বিভোল, নব আশায় |
.        ভাগ্য-দেবীর লীলা-কমল,
.        অগ্র-পথিক রে সেনাদল !
.        জোর্ কদম্      চল্  রে চল্  ||


তরুণ তাপস !  নব শক্তিরে জাগায়ে তোল্ !
করুণায় নয়---- ভয়ঙ্করীর দুয়ার খোল্ |
নাগিনী-দশনা রণরঙ্গণী শস্ত্রকর
তোর দেশ-মাতা, তাহারি পতাকা তুলিয়া ধর্ |
.        রক্ত-পিয়াসী অচঞ্চল !
.        নির্মম-ব্রত রে সেনাদল !
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্ ||


অভয়-চিত্ত ভাবনা-মুক্ত যুবারা, শুন !
মোদের পিছনে চীত্কার করে পশু, শকূন |
ভ্রুকুটি হানিছে পুরাতন পচা গলিত শব,
রক্ষণ-শীল বুড়োরা করিছে তা’রই স্তব
.        শিবারা চেঁচাক, শিব অটল !
.        নির্ভীক বীর পথিক-দল,
.        জোর্ কদম্        চল্ রে চল্  ||


আগে ---আরো আগে সেনা-মুখ যথা করিছে রণ,
পলকে হতেছে পূর্ণ মৃতের শূন্যাসন,
আছে ঠাঁই আছে, কে থামে পিছনে ? হ’ আগুয়ান্
যুদ্ধের মাঝে পরাজয় মাঝে চলো জোয়ান্ !
.        জ্বাল্ রে মশাল জ্বাল্ অনল !
.        অগ্রযাত্রী রে সেনাদল,
.        জোর্ কদম্       চল্ রে চল্ ||


নতুন করিয়া ক্লান্ত ধরার মৃত শিরায়
স্পন্দন জাগে আমাদের তরে, নব আশায় |
আমাদেরি তা’রা ----চলিছে যাহারা দৃঢ় চরণ
সন্মুখ পানে, একাকী অথবা শতেক জন |
.        মোরা সহস্র-বাহু-সবল |
.        রে চির-রাতের সান্ত্রীদল,
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্ ||



জগতের এই বিচিত্রতম মিসিলে  ভাই
কত রূপ কত দৃশ্যের লীলা চলে সদাই !-----
শ্রমরত ঐ কালি-মাখা কূলি, নৌ-সারং,
বলদের মাঝে হলধর চাষা দুখের সং,
.        প্রভু স-ভৃত্য পেষণ-কল----
.        অগ্র-পথিক উদাসী-দল,
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্  ||



নিখিল গোপন ব্যর্থ-প্রেমিক আর্ত-প্রাণ,
সকল কারার সকল বন্দী আহত-মান,
ধরার সকল সুখী ও দুঃখী, সৎ, অসৎ ,
মৃত জীবন্ত, পথ-হারা, যারা ভোলেনি পথ,-----
.        আমাদের সাথী এরা সকল |
.        অগ্র-পথিক রে সেনাদল,
.        জোর্ কদম্       চল্ রে চল্  ||


ছুঁড়িতেছে ভাঁটা জ্যোতির্চক্র ঘূর্ণ্যমান,
হের পুঞ্জিত গ্রহ-রবি তারা দীপ্তপ্রাণ ;
আলো-ঝলমল দিবস, নিশীথ স্বপ্নাতুর,----
বন্ধুর মত ছেয়ে আছে সবে নিকট-দূর |
.        এক ধ্রুব সবে পথ-উতল |
.        নব যাত্রীক পথিক দল,
.        জোর্ কদম্         চল্ রে চল্  ||



আমাদের এরা, আছে এরা সবে মোদের সাথ,
এরা সখা----সহযাত্রী মোদের দিবস-রাত !
ভ্রুণ-পথে আছে মোদের পথের ভাবী পথিক,
এ-মিসিলে মোরা অগ্র-যাত্রী সুনির্ভীক |
.        সুগম করিয়া পথ পিছল
.        অগ্র-পথিক পথ রে সেনাদল,
.        জোর্ কদম্              চল্ রে চল্ ||



ওগো ও প্রাচী-র দুলালী দুহিতা তরুণীরা,
ওগো জায়া ওগো ভগিনীরা  ! ডাকে সঙ্গীরা !
তোমরা নাই গো, লাঞ্ছিত মোরা তাই আজি,
উঠুক তোমার মণি-মঞ্জীর ঘন বাজি’,
.        আমাদের পথে চল চপল
.        অগ্র-পথিক তরুণ-দল,
.        জোর্  কদম্        চল্   রে  চল্  ||



ওগো অনাগত মরু-প্রান্তর বৈতালিক !
শুনিতেছি তব আগমনী-গীতি দিগ্বিদিক !
আমাদেরি মাঝে আসিতেছ তুমি দ্রুত পায়ে !-----
ভিন্-দেশী কবি থামাও বাঁশরী বট-ছায়ে,
.        তোমার সাধনা আজি সফল |
.        অগ্র-পথিক চারণ-দল,
.        জোর্ কদম্        চল্ রে চল্ ||


আমরা চাহিনা তরল স্বপন, হাল্ কা সুখ,
আরাম-কুশন, মখ্ মল্-চটি, পান্ সে থুক,
শান্তির বাণী, জ্ঞান-বানিয়ার বই-গুদাম্,
ছেঁদো ছন্দের পল্ কা ঊর্ণা সস্তা-নাম,
.        পচা দৌলৎ,----- দু’পায়ে দল্ !
.        কঠোর দুখের তাপস দল,
.        জোর্ কদমু          চল্ রে চল্  ||


পান আহার ভোজে মত্ত কি যত ঔদারিক ?
দুয়ার জানালা বন্ধ করিয়া ফেলিয়া চিক্
আরাম করিযা ভুঁড়োরা ঘুমায় !------বন্ধু, শোন্ ,
মোটা ডালরুটী, ছেঁড়া কম্বল, ভূমি-শয়ন,
.        আছে  ত মোদের পাথেয়-বল !
.        ওরে বোদনার পূজারী দল,
.        মোছ্ রে অশ্রু,        চল্ রে চল্  ||


নেমেছে কি রাতি ?  ফুরায় না পথ সুদুর্গম ?
কে থামিস্ পথে ভগ্নোত্সাহ নিরুদ্যম ?
ব’সে নে খানিক পথ-মঞ্জিলে ভয় কি ভাই,
থামিলে দুদিন ভোলে যদি লোকে-----ভুলুক তাই !
.        মোদের লক্ষ্য চির-অটল !
.        অগ্র-পথিক ব্রতীর দল,
.        বাঁধ রে বুক,       চল্ রে চল্  ||


শুনিতেছি আমি, শোন্ ঐ দূরে তূর্য নাদ
ঘোষিছে নবীন ঊষার ঊদয়-সুসংবাদ !
ওরে ত্বরা কর্ ! ছুটে চল্ আগে----আরো আগে !
গান গেয়ে চলে অগ্র-বাহিনী, ছুটে চল্  তারো
.                                        পুরোভাগে !
.        তোর অধিকার কর্ দখল !
.        অগ্র-নায়ক রে পাঁওদল !
.        জোর্ কদম্        চল্ রে চল্  ||




.                   **************                                                 
পরে     




মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

চিরঞ্জীব জগ্ লুল
কৃষ্ণনগর, ১৬ই ভাদ্র ১৩৩৪

প্রাচী’র দুয়ারে শুনি কলরোল সহসা তিমির-রাতে,
মেসেরের শের, শির, শম্ শের----সব গেল এক সাথে !
সিন্ধুর  গলা জড়ায়ে কাঁদিতে ----দু’তীরে ললাট হানি’
ছুটিয়া চ’লেছে মরু-বকৌলি ‘নীল’ দরিয়ার পানি !
আঁচলের তার ঝিনুক মাণিক কাদায় ছিটায়ে পড়ে,
সোঁতের শ্যাওলা এলো কুন্তল লুটাইছে বালুচরে !-------
মরু--‘সাইমুম’ ----তাঞ্জামে চড়ি’ কোন্ পরীবানু আসে ?
‘লু’-হাওয়া ধরেছে বালুর পর্দা সম্ভ্রমে দুই পাশে !
সূর্য নিজেরে লুকায় টানিয়া বালুর আস্তরণ,
ব্যজনী দুলায় ছিন্ন পাইন-শাখায় প্রভঞ্জন !
ঘূর্ণী-বাঁদীরা ‘নীল’ দরিয়ায় আংচল ভিজায়ে আনি’
ছিটাইছে বারি, মেঘ হ’তে মাগি’ আনিছে বরফ-পানি |
ও বুঝি মিসর-বিজয়লক্ষ্ণী মুরছিতা তাঞ্জামে,
ওঠে হাহাকার ভগ্ন-মিনার আঁধার দীওয়ান-ই-আমে !
কৃষাণের গরু মাঠে মাঠে ফেরে, ধরেনিক আজ হাল,
গম-ক্ষেত ভেঙে পানি ব’য়ে যায়  তবু নাহি বাঁধে আ’ল,
মনের বাঁধেরে ভেঙেছে যাহার চোখের সাঁতার পানি
মাঠের পানি ও আ’লের কেমনে বাঁধিবে সে, নাহি জানি !
হৃদয়ে যখন ঘনায় শাঙ্ন, চোখে নামে বরষাত,
তখন সহলা হয় গো-মাথায় এমনি বজ্রপাত |-----
মাটীরে জড়ায়ে উপুড় হইয়া কাঁদিছে শ্রমিক কুলি,
বলে----“মাগো তোর উদরে মাটীর মানুষই হয়েছে ধূলি,
রতন মানিক হয় না ত মাটী, হীরা সে হীরাই থাকে,
মোদের মাথায় কোহিনূর মণি----কি করিব বল্ তাকে ?
দুর্দিনে মাগো যদি ও-মাটীর দুয়ার খুলিয়া খুঁজি,
চুরি করিবি না তুই এ মানিক ?  ফিরে পাব হারা পুঁজি ?
লৌহ পরশি’ করিনু শপথ, ফিরে নাহি পাই যদি,
নতুন করিয়া তোর বুকে মোরা বহাব রক্ত---নদী !”


আভীর-বালারা দুধাল গাভীরে দোহায় না, কাঁদে শুয়ে,
দুম্বা-শিশুরা দূরে চেয়ে আছে দুধ ঘাস নাহি ছুঁয়ে !
মিষ্টি ধারাল মিছ্ রীর ছুরি মিস্ রী মেয়ের হাসি,
হাসা পাথরের কুচি-সম-দাঁত,---সব যেন আজ বাসি !
আঙুর-লতার অলকগুচ্ছ---ডাঁশা আঙুরের থোপা,
যেন তরুণীর আঙুলের ডগা---হুরী বালিকারখোঁপা,
ঝুরে’ ঝুরে’ পড়ে হতাদরে আজ অশ্রুর বুঁদ-সম !
কাঁদিতেছে পরী, চারিদিকে অরি কোথায় অরিন্দম !
মরু-নটী তার সোনার ঘুঙুর ছুঁড়িয়া ফেলেছে কাঁদি’
হলুদ খেজুর-কাঁধিতে বুঝি বা রয়েছে তাহারা বাধি’ |
নতুন করিয়া মরিল গো বুঝি আজি মিসরের মমি,
শ্রদ্ধায় আজি পিরামিড যায় মাটির কবরে নমি’ !


মিসরে খেদিব ছিল বা ছিল না ভুলেছিল সব লোক,
জগ্ লুলে পেয়ে ভুলেছিল ওরা সুদান-হারার শোক !
জানি না কখন্ ঘনাবে ধরার ললাটে মহাপ্রলয়,
মিসরের তরে ‘রোজ-কিয়ামত’ ইহার অধিক নয় !
রহিল মিসর, চ’লে গেল তার দুর্দম যৌবন,
রুস্তম গেল, নিষ্প্রভ কায়খস্ রু-সিংহাসন |
কি শাপে মিসর লভিল অকালে জরা যযতির প্রায়,
জানি না তাহার কোন্ সূত দেবে যৌবন ফিরে তায় !
মিসরের চোখে বহিল নতুন সুয়েজ খালের বান,
সূদান গিয়াছে ---গেল আজ তার বিধাতার মহাদান !
‘ফেরাউন’ ডুবে না মরিতে হায় বিদায় লইল মুসা,
প্রাচী’র রাত্রি কাটিবে না গো, উদিবে না রাঙা ঊষা ?

***                ***                ***                ***

শূনিয়াছি, ছিল মমির মিসরে সম্রাট্ ফেরাঊন ;
জননীর কোলে সদ্যপ্রসূত বাচ্চার নিত খুন !
শুনেছিল বাণী, তাহারি রাজ্যে তারি রাজপথ দিয়া
অনাগত শিশু আসিছে তাহার মৃত্যু-বারতা নিয়া !
জীবন ভরিয়া করিল যে শিশু-জীবনের অপমান,
পরের মৃত্যু-আড়ালে দাঁড়ায়ে সে-ই ভাবে, পেল প্রাণ !
জনমিল মুসা, রাজভয়ে মাতা শিশুরে ভাসায় জলে,
ভাসিয়া ভাসিয়া সোনার শিশু গো রাজারই ঘাটেতে চলে !
ভেসে এল শিশু রানীরই কোলে গো, বাড়ে শিশু দিনে দিনে,
শত্রু তাহারি বুকে চ’ড়ে নাচে ফেরাঊন নাহি চিনে |
এল অনাগত তারি প্রাসাদের সদর দরজা দিয়া,
তখনো প্রহরী জাগে বিনিদ্র দশ দিক্ আগুলিয়া !
.                        রসিক খোদার খেলা,
তারি বেদনায় প্রকাশে রুদ্র যারে করে অবহেলা !


মুসারে আমরা দেখিনি, তোমায় দেখেছি মিসর-মুনি,
ফেরাঊন মোরা দেখিনি, দেখেছি নিপীড়ন ফেরাঊনী !
ছোটে অনন্ত সেনা-সামন্ত অনাগত কার ভয়ে,
দিকে দিকে খাড়া কারা-শৃঙ্খল, জল্লাদ ফাঁসি ল’য়ে !
আইন-খাতার পাতায় পাতায় মৃত্যুদন্ড লেখা,
নিজের মৃত্যু এড়াতে কেবলি নিজেরে করিছে একা !
সদ্য প্রসূত প্রতি শিশুটিরে পিয়ায় অহর্নিশ
শিক্ষা দীক্ষা সভ্যতা বলি, তিলে-তিলে-মারা বিষ |
ইহারা কলির নব ফেরাঊন ভেল্কি খেলায় হাড়ে,
মানুষে ইহারা না মেরে প্রথমে মনুষ্যত্ব মারে !


মনুষ্যত্ব এই সব মানুষেরই মাঝে কবে
হে অতিমানুষ, তুমি এসেছিলে জীবনের উত্সবে |
চারি দিকে জাগে মৃত্যুদন্ড রাজাকারা প্রতিহারী,
এরই মাঝে এলে দিনের আলোকে নির্ভীক পদচারী |
রাজার প্রাচীর ছিল দাঁড়াইয়া তোমারে আড়াল করি’
আপনি আসিয়া দাঁড়াইলে তার সকল শূন্য ভরি’ !
পয়গম্বর মুসার তবুও ত ছিল ‘আষা’ অদ্ভুত,
খোদ সে খোদার প্রেরিত ডাকিলে আসিলে স্বর্গ-দূত !
পয়গম্বর ছিলো না ক’ তুমি----পাওনি ঐশী বাণী,
স্বর্গের দূত ছিল না দোসর, ছিলে না শস্ত্র-পাণি ;
আদেশে তোমার নীল দরিয়ার বক্ষে জাগেনি পথ,
তোমারে দেখিয়া করেনি সালাম কোনো গিরি-পর্বত !
তবুও এশিয়া আফ্রিকা গাহে তোমার মহিমা-গান,
মনুষ্যত্ব থাকিলে মানুষ সর্বশক্তিমান !
দেখাইলে তুমি, পরাধীন জাতি হয় যদি ভয়হারা,
হোক নিরস্ত্র----অস্ত্রের রণে বিজয়ী হইবে তারা  |
অসি দিয়া নয়, নির্ভীক করে মন দিয়া রণ জয়,
অস্ত্রে যুদ্ধ জয় করা সাজে----দেশ জয় নাহি হয় |
ভয়ের সাগর পাড়ি দিল যেই শির করিল না নীচু,
পশুর নখর দন্ত দেখিয়া হাটিল না কভু পিছু,
মিথ্যাচারীর ভ্রূকুটী শাসন নিষেধ রক্ত-আঁখি
না-মানি----জাতির দক্ষিণ করে বাঁধিল অভয় রাখী,
বন্ধন যারে বন্দিল হ’য়ে নন্দন-ফুলহার
না-ই হ’ল সে গো পয়গম্বর নবী দেব অবতার,
সর্ব কালের সর্ব দেশের সকল নর ও নারী
করে প্রতীক্ষা, গাহে বন্দনা, মাগিছে আশিস্ তারি !

***                ***                ***                ***

“এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে” হে ঋষি
তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল চরিতেছে দিবানিশি !
গোষ্ঠে গোষ্ঠে আত্মকলহ অজাযুদ্ধের মেলা,
এদের রুধিরে নিত্য রাঙিছে ভারত-সাগর-বেলা |
পশুরাজ যবে ঘাড় ভেঙে খায় একটারে ধরি আসি’
আরটা তখনো দিব্যি মোটায়ে হ’তেছে খোদার খাসি !
শুনে হাসি পায় ইহাদের নাকি আছে গো ধর্ম জাতি,
রাম-ছাগল আর ব্রহ্ম-ছাগল আরেক ছাগল পাতি !
মৃত্যু যখন ঘনায় এদের কশা’য়ের কল্যাণে,
তখনো ইহারা আঙুল উচাঁয়ে এ উহারে গালি হানে |
ইহাদের শিশু শৃগালে মারিলে এরা সভা ক’রে কাঁদে,
অমৃতের বাণী শুনাতে এদের লজ্জায় নাহি বাধে !
নিজেদের নাই মনুষ্যত্ব, জানি না কেমনে তা’রা
নারীদের কাছে চাহে সতীত্ব হায় রে সরম-হারা  !
কবে আমাদের কোন্ সে পুরুষে ঘৃত খেয়েছিল কেহ,
আমাদের হাতে তারি বাস পাই, আজো করি অবলেহ !


আশা ছিল, তবু তোমাদেরি মত অতি মানুষেরে দেখি’
আমরা ভুলিব মোদের এ গ্লানি, খাঁটি হবে যত মেকি !
তাই মিসরের নহে’ এই শোক এই দুর্দিন আজি,
এশিয়া আফ্রিকা  দুই মহাভূমে বেদনা উঠেছে বাজি !
অধীন ভারত তোমারে স্মরণ করিয়াছে শতবার,
তব হাতে ছিল জলদস্যুর ভারত-প্রবেশ-দ্বার |
হে ‘বনি ইস্ রাইলের’ দেশের অগ্রনায়ক বীর,
অঞ্জলি দিনু ‘নীলে’র সলিলে অশ্রু ভাগীরথীর !
সালাম করাও স্বাধীনতা নাই সোজা দুই হাত তুলি’
তব ‘ফতেহায়, কি দিবে এ জাতি বিনা দুটো বাঁধা বুলি ?
মলয়-শীতলা, সুজলা এ দেশে ---- আশিস্ করিও খালি----
উড়ে আসে যেন তোমার দেশের মরুর দু’মুঠো বালি |

***                ***                ***                ***

তোমার বিদায়ে দূর অতীতের কথা সেই মনে পড়ে,
মিসর হইতে বিদায় লইল মুসা যবে চিরতরে,
সভ্রমে স’রে পথ ক’রে দিল ‘নীল’ দরিয়ার বারি,
পিছু পিছু চলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া মিসরের নর-নারী,
শ্যেন-সম ছোটে ফেরাঊন সেনা, ঝাঁপ দিয়া পড়ে স্রোতে,
মুসা হ’ল পার ফেরাঊন ফিরিল না ‘নীল’ নদ হ’তে !
তোমার বিদায়ে করিব না শোক, হয়ত দেখিব কাল
তোমার পিছনে মরিছে ডুবিয়া ফেরাঊন দজ্জাল !



.                   **************                                                 
পরে     




মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

.                        ভীরু
.             কৃষ্ণনগর,৩রা শ্রাবণ ১৩৩৪

                    ( ১ )


.               আমি জানি তুমি কেন চাহনাক’ ফিরে |
গৃহকোণ ছাড়ি আসিয়াছি আজ দেবতার মন্দিরে |
.              পুতুল লইয়া কাটিয়াছি বেলা
.               আপনারে ল’য়ে শুধু হেলা-ফেলা,
জানিতে না, আছে হৃদয়ের খেলা আকুল নয়ন-নীরে,
এত বড় দায় নয়নে নয়নে নিমেষের চাওয়া কি রে ?
.              আমি জানি তুমি কেন চাহনাক’ ফিরে ||



                    ( ২ )

.             আমি জানি তুমি কেন চাহনাক’ ফিরে |
জানিতে না আঁখি আঁখিতে হারায় ডুবে যায় বাণী ধীরে,
.             তুমি ছাড়া আর ছিলনাক’ কেহ
.             ছিল না বাহির ছিল শুধু গেহ,
কাজল ছিল গো জল ছিল না ও-উজল আঁখির তীরে |
সে দিনো চলিতে ছলনা বাজেনি ও চরণ-মঞ্জীরে |
.             আমি জানি তুমি কেন চাহনাক’ ফিরে ||



                    ( ৩ )
.          আমি জানি তুমি কেন কহনাক’ কথা !
সে দিনো তোমার বনেপথে যেতে পায়ে ঝড়াত না লতা !
.          সে দিনো বেভুল তুলিয়াছ ফুল
.          ফুল বিঁধিতে গো বিঁধেনি আঙুল,
মালার সাথে যে হৃদয়ও শুকায় জানিতে না সে বারতা
জানিতে না, কাঁদে মুখর মুখের আড়ালে নিঃসঙ্গতা !
.               আমি জানি তুমি কেন কহনাক’ কথা ||



                    ( ৪ )

.             আমি জানি তব কপটতা, চতুরালি,
তুমি জানিতে না, ও কপোলে থাকে ডালিম-দানার লালী !
.             জানিতে না ভীরু রমণীর মন
.            মধুকর-ভারে লতার মতন
কেঁপে মরে কথা কন্ঠ জড়ায়ে নিষেধ করে গো খালি  |
আঁখি যত চায় তত লজ্জায় লজ্জা পাড়ে গো গালি !
.             আমি জানি তব কপটতা, চতুরালি ||


                    ( ৫ )

.                     আমি জানি, ভীরু !  কিসের এ বিস্ময় !
জানিতে না কভু নিজেরে হেরিয়া নিজেরি করে যে ভয় !
.                 পরুষ পুরুষ-----শুনেছিলে নাম ;
.               দেখেছ পাথর, করনি প্রণাম,
প্রণাম ক’রেছ লুব্ধ দু’-কর চেয়েছে চরণ-ছোঁয় |
জানিতে না, হিয়া পাথর পরশি’ পরশ-পাথরও হয় !
.              আমি জানি, ভীরু, কিসের এ বিস্ময় ||


                    ( ৬ )

.                     কিসের তোমার শঙ্কা এ,  আমি জানি |
পরাণের ক্ষুধা দেহের দু’--তীরে করিতেছে কানাকানি |
.                বিকচ বুকের বকুল-গন্ধ
.             পাপ্ ড়ি রাখিতে পারে না বন্ধ
যত আপনারে লুকাইতে চাও তত হয় জানাজানি !
অপাঙ্গে আজ ভিড় করেছে গো লুকানো যতেক বাণী |
.              কিসের তোমার শঙ্কা এ, আমি জানি ||





                    ( ৭)

.            আমি জানি, কেন বলিতে পার না খুলি’ |
গোপনে তোমায় আবেদন তার জানায়েছে বুলবুলি  !
.            যে-কথা শুনিতে মনে ছিল সাধ,
.            কেমনে সে পেল তারি সংবাদ ?
সেই কথা বধূঁ তেমনি করিয়া বলিল নয়ন তুলি’ !
কে জানিত এত যাদু-মাখা তার ও কঠিন অঙ্গুলি !
.             আমি জানি কেন বলিতে পার না খুলি’ ||


                    ( ৮ )

.                   আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা,
যাহার পরশে হয়েছে তোমার সকল অঙ্গ সোনা !
.               মাটির দেবীরে পরায় ভূষণ
.             সোনার সোনায় কিবা প্রয়োজন ?
দেহ-কূল ছাড়ি নেমেছে মনের অকূল নিরঞ্জনা |
বেদনা আজিকে রূপের তোমার করিতেছে বন্দনা !
.             আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা ||


                    (৯)
.          আমি জানি, ওরা বুঝিতে পারে না তোরে !
নিশীথে ঘুমালে কুমারী বালিকা, বধূ জাগিয়াছে ভোরে !
.          ওরা সাঁতারিয়া ফিরিতেছে ফেনা,
.          শুক্তি যে ডোবে ---বুঝিতে পারে না !
মুক্তা ফলেছে ----আঁখির ঝিনুক ডুবেছে আঁখির লোরে !
বোঝা কত ভার হ’লে ----হৃদয়ের ভরাডুবি হয়, ওরে,
.          অভাগিনী-নারী, বুঝাবি কেমন ক’রে !



.                   **************                                                 
পরে     




মিলনসাগর
*
জিঞ্জীর , কাজী নজরুল ইসলাম

এ  মোর অহঙ্কার
কৃষ্ণনগর, ২৬শে চৈত্র ১৩৩৪

নাই বা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার,
তোমার আমি কর্ ব সৃজন ----এ মোর অহঙ্কার !
.          এম্ নি-চোখের দৃষ্টি দিয়া
.          তোমায় যারা দেখ্ ল প্রিয়া,
তাদের কাছে তুমি তুমিই !  আমার স্বপনে
তুমি নিখিল-রূপের রাণী------মানস-আসনে !---


সবাই যখন তোমার ঘিরে কর্ বে কলরব,
আমি দূরে ধেয়ান-লোকে র’চ্ ব তোমার স্তব |
.         রচ্ ব সুরধূনী-তীরে
.         আমার সুরের ঊর্বশীরে,
নিখিল-কন্ঠে দুল্ বে তুমি গানের কন্ঠ-হার----
কবির প্রিয়া অশ্রুমতী গভীর বেদনার !


যেদিন আমি থাকব না ক’, থাক্ বে আমার গান,
বল্ বে সবাই, “ কে সে কবির কাঁদিয়েছিল প্রাণ ?”
.          আকাশ-ভরা হাজার তারা
.          রইবে চেয়ে তন্দ্রাহারা,
সখার সাথে জাগ্ বে রাতে, চাইবে আকাশে,
আমার গানে পড়্ বে মনে আমার আভাসে !


বুকের তলা করবে ব্যথা, ব’লবে কাঁদিয়া,
“বন্ধু !  সে কে তোমার গানের মানসী প্রিয়া ?”
.         হাস্ বে সবাই, গাইবে গীতি,----
.         তুমি নয়ন-জলে তিতি’
নতুন ক’রে আমার গানে আমার কবিতায়
গহীন নিরালাতে ব’সে খুঁজ্ বে আপনায় !


রাখ্ তে যেদিন নার্ বে ধরা তোমায় ধরিয়া,
ওরা সবাই ভুল্ বে তোমায় দু’দিন স্মরিয়া,
.         আমার গানের অশ্রুজলে,
.          আমার বাণীর পদ্মদলে
দল্ বে তুমি চিরন্তনী চির-নবীনা !
রইবে শুধু বাণী, সেদিন রইবে না বীণা !



তৃষ্ণা- “ফোরাত’--কূলে কবে “সাকিনা” –সমা,
এক লহমার হ’লে বধূ, হায় মনোরমা |
.         মুহূর্তে সে কালের রেখা
.         আমার গানে রইল লেখা
চিরকালের তরে প্রিয়া !  মোর সে শুভক্ষণ
মরণ-পারে দিল আমায় অনন্ত জীবন !



নাই বা পেলাম কন্ঠে আমার তোমার কন্ঠহার,
তোমায় আমি ক’রব সৃজন ---এ মোর অহঙ্কার !
.          এই ত আমার চোখের জলে,
.          আমার গানে সুরের ছলে,
কাব্যে আমার, আমার ভাষায়, আমার বেদনায়,
নিত্যকালের প্রিয়া আমার ডাক্ ছে ইশারায় !-------



চাইনা তোমায় স্বর্গে নিতে, চাই এ ধূলাতে
তোমর পায়ে স্বর্গ এনে ভুবন ভুলাতে !
.         ঊর্ধ্বে তোমার -----তুমি দেবী,
.         কি হবে মোর সে রূপ সেবি’ ?
চাই না দেবীর দয়া, যাচি প্রিয়ার আঁখিজল,
একটু দুখে অভিমানে নয়ন টলমল !


যেমন ক’রে খেল্ তে তুমি কিশোর বয়সে----
মাটীর মেয়ের দিতে বিয়ে মনের হরষে,
.         বালু দিয়ে গড়্ তে গেহ,
.         জাগ্ ত বুকে মাটীর স্নেহ,
ছিলনা ত স্বর্গ তখন সূর্য তারা চাঁদ,
তেমনি ক’রে খেলবে  আবার পাত্ বে মায়া-ফাঁদ !



মাটীর প্রদীপ জ্বালবে তুমি মাটীর কুটীরে,
খুশীর রঙে কর্ বে সোনা-ধূলি-মুঠি রে |
.         আধখানা চাঁদ আকাশ ‘পরে,
.         উঠ্ বে যবে গরব-ভরে
তুমি বাকী আধখানা চাঁদ হাস্ বে ধরাতে,
তড়িৎ ছিঁড়ে পড়বে তোমার খোঁপায় জড়াতে !


তুমি আমার বকুল যুঁথি----মাটীর তারা-ফুল,
ঈদের প্রথম চাঁদ গো তোমার কানের পার্সি-দুল !
.         কুস্ মী-রাঙা শাড়িখানি
.         চৈতী সাঁঝে প’রবে রাণী,
আকাশ-গাঙে জাগ্ বে জোয়ার রঙের রাঙা বান,
তোরণ-দ্বারে বাজ্ বে করুণ বারোয়াঁ মূলতান !



আমার-রচা গানে তোমার সেই বেলা-শেষে
এম্ নি সুরে চাইবে কেহ পর্ দেশী এসে !
.          রঙিন সাঁঝে ঐ আঙিনায়
.          চাইবে যারা, তাদের চাওয়ায়
আমার চাওয়া রইবে গোপন !---- এ মোর অভিমান
যাচ্ বে যারা তোমায় ---রচি তাদের তরে গান !


নাই বা দিলে ধরা আমার ধরার আঙিনায়,
তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ম্বর-সভায় !
.          তোমার রূপে আমার ভুবন
.          আলোয় আলোয় হ’ল মগন্ !
কাজ কি জেনে----কাহার আশায় গাঁথ্ ছ ফুল-হার,
আমি তোমার গাঁথ্ ছি মালা----- এ মোর অহঙ্কার !

                                           

.                   **************                                                 
পরে     




মিলনসাগর