"কোন্ দেশের দুর্দশায় মোরা
সবার অধিক পাই রে দুখ?
কোন্ দেশের গৌরবের কথায়
ভরে ওঠে মোদের বুক?
মোদের পিতৃপিতামহের
চরণধূলি কোথায় রে?
সে আমাদের বাংলাদেশ,
আমাদেরই বাংলা রে!
"
--- কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, “কোন্ দেশে” কবিতা।

রাজেশ দত্তর কথা --- আমার জন্ম একাত্তরের  
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল ও উদ্দীপিত সময়ে।
রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলির
কথা, মুক্তি সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বের গাথা, এ-
সব ছোটোবেলা থেকেই শুনেছি বাবার মুখে। রেডিওতে
শুনেছি এপার বাংলার খ্যাতনামা শিল্পীদের কণ্ঠে
মুক্তিযুদ্ধের কিছু অবিস্মরণীয় গান। আমার বাবা, মা
দু'জনেরই জন্মগ্রহণ  ও  শৈশব  কেটেছিল ওপার  
বাংলায়। মা সুব্রতা দত্তের জন্ম ১৯৪১ সালের ২০  
জানুয়ারি ঢাকা শহরে মামাবাড়িতে। পিতৃপরিচয়ে তিনি
রাজশাহী জেলার ভবানীপুরের জমিদার চৌধুরী  
পরিবারের কন্যা। বাবার জন্ম ১৯৩৫ সালের ৫ নভেম্বরে
অবিভক্ত বাংলাদেশের ঢাকা ডিভিশনের মানিকগঞ্জ
জেলার লেছড়াগঞ্জ গ্রামে। আমার বাবা জ্যোতির্ময় দত্ত
ছিলেন চন্দননগর কানাইলাল বিদ্যামন্দিরের  মাস্টার
মশাই, বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ও প্রশিক্ষক, শিল্পী, লেখক এবং
নিবেদিতপ্রাণ যুক্তিবাদী গণবিজ্ঞান আন্দোলনকর্মী ও
সমাজসেবী। বাবা শৈশবে মাত্র দশ বছর বয়সে পিতৃহারা
হন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে প্রায় নিঃস্ব
অবস্থায় মা, দাদাদিদি-সহ পরিবারের সকলের সাথে
এপার বাংলায় চলে আসেন। পাঁচ ভাই, চার বোনের  
মধ্যে বাবা ছিলেন সবার ছোটো। এদেশে এসে শুরু হয়
তীব্র কঠিন জীবনযুদ্ধ। চরম দারিদ্র্যের  সঙ্গে লড়াই  
করেন। কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়ে কাঁচরাপাড়া  
রেলওয়ে ওয়ার্কশপে কর্মজীবন শুরু। পরে চন্দননগরের
ঐতিহ্যমণ্ডিত কানাইলাল বিদ্যামন্দিরে কর্মশিক্ষক-এর
পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ চার দশক ধরে তিনি এই
স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। সদাশয়, মিষ্টভাষী, সৎ,
আদর্শবাদী ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে ছাত্র-শিক্ষক
সকলের কাছেই বাবা ছিলেন পরম প্রিয়। বহুমুখী
প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। ব্যায়াম ও ক্রীড়াজগৎ
থেকে শুরু করে প্রযুক্তিবিদ্যা, চিত্র ও কারুশিল্প, বিবিধ
হস্তশিল্পকলা ও যাত্রা-নাটক, সংগীত-সহ ললিতকলার
জগৎ – সবেতেই তিনি ছিলেন প্রবল উৎসাহী ও অনায়াস
দক্ষতায় পারদর্শী। ২০১৪ সালের ৪ মে (২০ বৈশাখ,  
১৪২১ বঙ্গাব্দ) চন্দননগরের কলুপুকুরের বাসভবনে  
বার্ধক্যজনিত অসুখে আটাত্তর বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস
ত্যাগ করেন তিনি। আটের দশকের শেষে গণবিজ্ঞান
আন্দোলনের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই আন্দোলনে যোগ
দেন। মুক্তমনা এই মানুষটি পঞ্চান্নোর্ধ্ব বয়সে দীর্ঘলালিত
ধর্মীয় সংস্কার ও ভাববাদী ধ্যানধারণার মোহান্ধতা
কাটিয়ে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী জীবনদর্শন গ্রহণ করেন।  
জীবনের শেষার্ধে মননে ও জীবনচর্যায় ছিলেন
আপোসহীন যুক্তিবাদী ও কঠোর নাস্তিক। বিজ্ঞান চেতনা,
যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের প্রচার ও প্রসারে এবং নানা
সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। তিনি ছিলেন  
‘ভারতের মানবতাবাদী সমিতি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও
সভাপতি। মরণোত্তর দেহদানে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।
কিন্তু  সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোগত  
ব্যর্থতায় দুঃখজনকভাবে বাবার মরদেহ দান করা সম্ভব
হয়নি। অন্ধজনের দৃষ্টিদানের উদ্দেশ্যে তাঁর চোখ (কর্নিয়া)
‘শ্রীরামপুর সেবা কেন্দ্র ও চক্ষু ব্যাঙ্ক’-এ দান করা হয়।
তাঁর দান করা কর্নিয়ায় দু'জন দৃষ্টিহীন চোখের আলো
ফিরে পেয়েছেন।
ডাঃ চিত্তরঞ্জন দত্ত ( "ভোলা ডাক্তার" )।
রাজেশ দত্তর বড়ো জ্যাঠামশাই অনুশীলন
পার্টির সক্রিয় সদস্য, ৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধা
ও স্বনামধন্য চিকিৎসক। ছবিটি বড় করে
দেখতে ছবির উপর ক্লিক করুন।
শ্রী জ্যোতির্ময় দত্ত।
রাজেশ দত্তর পিতা। ছবিটি বড় করে
দেখতে ছবির উপর ক্লিক করুন।
রাজেশদের বাংলাদেশের বাড়ির নকশা।
মানিকগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হরিরামপুর থানা
বা উপজেলার লেছড়াগঞ্জে তাঁর প্রপিতামহ
ডাঃ কালীমোহন দত্ত'র কেনা জমিতে বাড়ি
বানিয়েছিলেন  ঠাকুরদা  ডাঃ  তরণীমোহন
দত্ত। এটি ছিল একটি সুদৃশ্য কাষ্ঠনির্মিত  
বাড়ি। বার্মা সেগুন ও লোহা কাঠ দিয়ে তৈরি
হয়েছিল সেই বাড়িটি। বাড়ির পাশ দিয়ে
অদূরেই বয়ে যেত পদ্মা ও ইছামতী নদীর
সংযোগকারী খাল। ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধের
সময় খানসেনারা তাঁদের লেছড়াগঞ্জের এই
কাঠের বাড়িটি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে
দিয়েছিল। কালক্রমে পদ্মার করাল ভাঙনে
সেই বাড়ির জমিও চলে যায় নদীর অতল
গর্ভে। রাজেশ দত্তর বাবার আঁকা বাড়ির
নকশা থেকে ডিজিটাল গ্রাফিক্স রূপায়ণে তাঁর
ভাগ্নে তপোমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
আমার ঠাকুরদা ডাঃ তরণীমোহন দত্ত ছিলেন  বাংলাদেশের একজন যশস্বী চিকিৎসক। ঠাকুমার নাম
হেমলতা দত্ত। আমাদের পূর্বপুরুষের আদি বসতবাড়ি ছিল বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ (পূর্বতন বিক্রমপুর)
জেলার "পঞ্চসার"-এ। মানিকগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হরিরামপুর থানা বা উপজেলার একটি ইউনিয়ন --
"লেছড়াগঞ্জ"।  সেখানে আমার প্রপিতামহ ডাঃ কালীমোহন দত্ত'র কেনা জমিতে বাড়ি বানিয়েছিলেন
ঠাকুরদা ডাঃ তরণীমোহন দত্ত। এটি ছিল একটি সুদৃশ্য কাষ্ঠনির্মিত বাড়ি। বার্মা সেগুন ও লোহা কাঠ
দিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই বাড়িটি। বাড়ির পাশ দিয়ে অদূরেই বয়ে যেত পদ্মা ও ইছামতী নদীর
সংযোগকারী খাল। আমার প্রপিতামহ ও পিতামহ দু'জনেই ছিলেন স্বনামধন্য অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার।
প্রপিতামহ ডাঃ কালীমোহন দত্ত কলকাতার "ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল" (বর্তমানে "নীলরতন সরকার
মেডিক্যাল কলেজ") থেকে এবং পিতামহ ডাঃ তরণীমোহন দত্ত কলকাতার 'আর. জি. কর মেডিক্যাল
কলেজ' থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। ঠাকুরদার জন্ম ১৮৮৩ সালে।  জীবনাবসান হয় ১৯৪৬-এর ৫
জানুয়ারি। দরদি মনের সুচিকিৎসক হিসেবে গ্রামবাসীদের কাছে তাঁর বিপুল সুনাম ছিল। সকলে তাঁকে
বলত, "ধন্বন্তরি"। তিনি "লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন বোর্ডে"র প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন। দুঃস্থ, অসহায়
রোগার্তজনের সেবায় তিনি আজীবন নিয়োজিত ছিলেন। দরিদ্র রোগীদের বিনা ভিজিটে  চিকিৎসা
করতেন। কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাষট্টি বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যুতে শোকাতুর গ্রামবাসীরা তাঁদের
প্রাণাধিক 'প্রিয় ডাক্তারবাবু'কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে  আমাদের বাড়ির আঙিনায় দলে দলে ভিড় করেন। যে
সকল গরিব মানুষদের তিনি বিনা ডাক্তারি ফি-তে চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই সেদিন
সাধ্যমতো অর্থ "প্রণামী" হিসেবে দাদুর চরণে অর্পণ করেছিলেন। দাদুর মরদেহের পায়ের কাছে অজস্র
ফুলের সাথে স্তূপাকারে জমে ছিল রাশি রাশি খুচরো পয়সা।

পিতৃ-পিতামহের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমার বড়ো জ্যাঠামশাই ডাঃ চিত্তরঞ্জন দত্ত-ও চিকিৎসাশাস্ত্র
অধ্যয়ন করে ডাক্তারি প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশের ঢাকার "মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ"
(বর্তমানে "স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল") থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। ঠাকুরদার
মতোই তিনিও শুধুই পেশাদার চিকিৎসক ছিলেন না, সেবাব্রতী ডাক্তার হিসেবে সম্মান ও সুখ্যাতি অর্জন
করেন। গ্রামবাসীদের কাছে তিনি তাঁর ডাকনামে "ভোলা ডাক্তার" বলে সুপরিচিত ছিলেন। আমার বড়ো
জ্যেঠিমা পারুলরানী পাল (দত্ত) নজরুল গীতি ও লোকগীতির শিল্পী ছিলেন। তাঁর গানের রেকর্ড ছিল।

১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় সপরিবারে "ছিন্নমূল" হয়ে বড়োজ্যেঠু লেছড়াগঞ্জের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে মা,  
ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সকলকে নিয়ে ভারতে চলে আসেন। তাঁরা সবাই পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার
চুঁচুড়ায় একটি ভাড়াবাড়িতে এসে ওঠেন। কিন্তু একদিকে অজানা, অচেনা নতুন জায়গায় এসে চিকিৎসক
হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের গভীর অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে দেশের ভিটেমাটির প্রবল টান তাঁকে অশান্ত ও
অস্থির করে তুলেছিল। দেশই তো শুধু দু'টুকরো হয়নি, জ্যেঠুর অন্তর ও সত্তাও হয়েছিল "দ্বিখণ্ডিত"।
একদিকে মা, অন্যদিকে মাতৃভূমি। একদিকে নিজের ভাইবোন,  অন্যদিকে স্বদেশবাসী ভাইবোনেরা।
মানসিকভাবে  অনেক টানাপোড়েনের পরে শেষমেশ আর উপেক্ষা  করতে পারলেন না জন্মভূমির ডাক।
অন্তরের সব  দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে কিছুকাল পরেই তিনি আবার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে ফিরে গেলেন পূর্ব
পাকিস্তানে তাঁর দেশের বাড়িতে। যে ক'দিন তিনি ভারতে ছিলেন হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে লেছড়াগঞ্জ
গ্রামের সাধারণ মানুষই আমাদের দেশের বাড়িটি সুরক্ষিত রেখেছিল।

এরপরে এলো বাংলার ইতিহাসে সাড়া জাগানো ১৯৭১ সাল। দেশকে স্বাধীন করার দু'চোখ ভরা স্বপ্ন,
বুকভরা দুর্বার আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যোগ দিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় পরে শুরু
হল ফেরারি জীবন। পাকসেনারা তাঁকে  হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগল। জ্যেঠুকে ধরার জন্য তাঁর  
মাথার দাম ধার্য করা হয়েছিল ১০ হাজার টাকা। কিন্তু জ্যেঠু যুদ্ধ চলাকালে দীর্ঘ নয় মাস সপরিবারে  
বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে ছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যান। জ্যেঠুকে না পেয়ে খানসেনারা প্রচণ্ড  
আক্রোশে আমাদের লেছড়াগঞ্জের সেই কাঠের বাড়িটি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ  
স্বাধীন হওয়ার পর জ্যেঠুরা আবার স্বগ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু কালক্রমে পদ্মার করাল ভাঙনে সেই  
বাড়ির জমিও চলে যায় নদীর অতল গর্ভে। জ্যেঠু অন্যত্র (হরিনায়) বাড়ি করেন। বড়োজ্যেঠু-র জন্ম  
১৯১৮ সালে। মৃত্যু ১৯৯৯ -এর ২১ জুলাই। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আমার অগ্রজ উৎপলদা (ঢাকানিবাসী  
বিশিষ্ট কবি, গল্পকার ও সাহিত্যসেবী উৎপল দত্ত) আমার দিদি সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সোশ্যাল মিডিয়ার
মাধ্যমে একটি বার্তায় জ্যেঠুর স্মৃতিচারণায় জানিয়েছেন, "বাবার প্রয়াত হওয়ার সংবাদটি
ইংরেজী-বাংলা সহ পাঁচটি জাতীয় দৈনিক কভার করেছিল।  টিভিতে  প্রধানমন্ত্রী [বর্তমান প্রধানমন্ত্রী  
শেখ হাসিনা-ই তখন ক্ষমতায় ছিলেন] শোকবার্তা দিয়েছিলেন।" তিনি জানান, "আজ হরিরামপুর
উপজেলায় (লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন, হরিরামপুর থানা বা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত) বাবা একটি 'মিথ' বা
'লিজেন্ড'। মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে সে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনন্য সাহসী ভুমিকা ছিলো
।  হরিরামপুরে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভে তাঁর নাম খোদিত করেছে জনতা। পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও  
কিংবদন্তীর ‘ডাক্তারবাবু'র গল্প, রহস্যগাঁথা তুলে দিচ্ছে মানুষ। আজ আর হরিরামপুরে যেতে পারি না।
যদি কেউ জেনে যায় ডাক্তারবাবু ('ভোলাবাবু', তোমার বড় জেঠুকে ওই নামেই মানুষ বেশি চেনে)  
ডাক্তারবাবুর ছেলে এসেছে, অমনি আমাকে ঘিরে মানুষের হাট বসে গেল। তখন আর চোখের জল ধরে
রাখা যায় না। কোন এক কাজে হরিরামপুর যেয়ে আমার এই অভিজ্ঞতাই হয়েছিল। শুধু হরিরামপুর  
কেন, মানিকগঞ্জ জেলা, সমগ্র বাংলাদেশের অনেকাংশ এবং তুমি অবাক হবে যদি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া
জেলায় যাও, অনেকের মুখেই তোমার বড় জেঠুর নাম শুনতে পাবে। দেশভাগের পর, আর মুক্তিযুদ্ধের
পর দুটো পর্যায়ের মাইগ্রেশন হয়েছে। এপার বাংলার অনেক হিন্দুই ওপার বাংলায়। তাদের একটা বড়
অংশ আবাসের জন্য নদীয়াকে বেছে নেয়। বিশেষত, যারা কৃষিকাজের সাথে জড়িত।" জ্যেঠু সম্পর্কে
দাদা আরও লেখেন, "কলোনিয়ালিজম প্রসঙ্গে মনে পড়লো, বাবার মুখে শুনেছি ভারতীয় স্বাধীনতা  
আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিলো। বহুবার উচ্চারণ করেছেন তিনি একথা। অনুশীলন পার্টির সক্রিয়  
সদস্য ছিলেন। বিস্ময়ের মতো শোনালেও বাবারই মুখের কথা সরাসরি তোমাকে লিখছি। চট্টগ্রাম  
অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে (প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যে অপারেশনে আত্মাহূতি দেন) বাবা পরোক্ষভাবে যুক্ত  
ছিলেন তার সাথে। সংবাদ আদান-প্রদান করতেন। প্রমাণ নেই।"

আজকে আমার এই মুক্তিযুদ্ধের গান ও কবিতার  অন্বেষণ, সংগ্রহ ও সংকলনের কাজটি আমার বড়ো  
জ্যাঠামশাই, আমার বাবা, পিতামহ ও প্রপিতামহের  অমর ও অম্লান স্মৃতির প্রতি অন্তরের অন্তহীন
অনুরাগে, বিনম্র শ্রদ্ধায় প্রণাম জানিয়ে তাঁদের উদ্দেশে নিবেদন করলাম।

--- রাজেশ দত্ত, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, চন্দননগর। ঋণস্বীকার: সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় ও উৎপল দত্ত।













.