পাহাড়পুরের পাথর রেখে বামে পেরিয়ে খাল পুরনো গড়খাই এগোলে কেউ আসে না আর ঘরে এই কথা তো জানতে, তবু কেন হাটের মাঝে আসতে দিয়েছিলে ?
তোমার শিকেয় রং মাখাতো যারা তোমায় এনে দিত মোরগফুল তাদের হাত ফেরালে একবার কখনো তারা আসে না আর গাঁয়ে এই কথা তো জানাই ছিল তবু বানের জলে ভাসতে দিয়েছিলে |
তোমায় যারা বলতো জাদুকরী তোমায় যারা ডাকতো কালো সাপ যাদের দেখে ভাঙে কাঁখের ঘড়া যাদের ভয়ে মুখ লুকোতে জলে দীঘির পাড়ের অন্ধ জনরবে তখন কেন হাসতে দিয়েছিলে |
কোনো এক ভোরবেলা রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ অপ্রস্তুত, এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনে নেব এ আমার ঈদ। ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন--- নিরুপায় কিছু স্মৃতি, কিছু নাম কিংবা কিছু নয়, অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন কার হাত ভাঙে চুড়ি ? কে ফোঁপায় ? পৃথিবী নিশ্চয় ; স্মৃতির মেঘলা ভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক ? অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায় ? কেন দোলে হৃদপিণ্ড আমার কি ভয়ের অসুখ ? নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়! আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।
কে যেন বললেন ভেতরের দিকে দেখো। আমি আমার ঘরের সবগুলো দুয়ারই খোলা ভাবতাম। এখন দেখি কারা যেন হুড়কো এঁটে দিয়েছে। পরিচিত আসবাব বইপত্র লেখার টেবিল ইত্যাদির ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে মনে হল এতো আর ভেতর দিকে দেখা নয়। অকস্মাৎ বুকের বাঁ পাশ থেকে আদেশটা বাজল এইখানে। আর অমনি আমার কামরাটা উধাও হয়ে গিয়ে সামনেই মিনারের মত উঁচু আমার উল্টানো হৃদপিণ্ড। এক অতিকায় আতাফলের মত কাঁপছে।
আমি একটা গঞ্জের দিকে যাচ্ছি টের পেয়েই আমার স্ত্রী দৌড়ে এসে বাজারের থলিটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এক কুড়ি সবুজ কৈ মাছ আর মাষের বড়ি আনতে ভুলো না। আর টেবিল ছেড়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এল আমার মেয়েটি, শুনেছি ঐ বাজারে আদ্যিকালের নোটবই পাওয়া যায়। ফুটপাতে নজর করে একটা খুঁজে এনোতো আব্বা। মেয়েটি স্নাতক হবে। মানবেতিহাসকে তারও তো যথাসম্ভব ছেঁটে ছোটো করে ফেলা দরকার।
পয়সা বাঁচাবার জন্য আমি হেঁটে হেঁটেই বাজারে পৌঁছলাম। একটা পুরানো টিনের এ্যারোচিহ্নর ওপর কে যেনো ভুল বানানে লিখেছে ‘রিদয়পুর’। আমি এক হলুদ গুল্ম বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা জিয়ল মাছের বাজারটা কোনদিকে ? লোকটা হাসল। আপনি উল্টোপথে বাজারে এসেছেন। এটা তো বেঈমানের গলি। গাধামুখো পুরুষ আর কুকুরমুখো কস্ বীদের বাজার। এখানে সবুজ কোথায় পাবেন ? আপনি বুঝেছি এ হাটের লোক নন। আবার কোনোদিন আনাজের গেট ধরে আসবেন। তরতাজার তোরণ।
আমি বহুবার সবজির বাজারটা খুঁজতে মাংসের মার্কেটে সওদা করেছি। ইতিহাসের সার সংক্ষেপ কিনতে, কিনে এনেছি গরিলার ছবি ভর্তি জানোয়ারের বিশাল
রাত্রির গান গেয়েছিল এক নারী আমার সাথেও ছিল কিছু পরিচয়, এক হাতে রেখে আগুনের মতো শাড়ী বলেছিল, ভীতু তোমারও কি আছে ভয় ? কাজলের ঘরে ঢুকেছিলে তুমি বোকা, কালির চিহ্ন ললাটে ধরেছ স্থায়ী, কলঙ্কি চাঁদ শুনেছিল সেই টোকা তুমি ফিরে গেছ বাতাসকে করে দায়ী।
সেই নিশিথেরই নদী এক খাপ খোলা ঢেউ তুলে তার বিবেকের ঘোলা জলে, প্রমাণ রেখেছে তরঙ্গে ফুল তোলা যেন ব্যভিচার বাতাসে না যায় গলে ; কবির পোশাকে ঢাকবে কি অপরাধ? ঢাকবে কি প্রেম, ঢাকবে কি পরাজয় ?
সেই কালোজল-তটিনীর প্রতিবাদ--- বলো, ‘ভালোবাসি’ --- তোমার কিসের ভয় ?
ওগো নদী শোনো, ওগো খণ্ডিতা স্মৃতি, তুলো না অতীত, এনো না জলের পীড়া একটি কবিতা শিরোনামে, বিস্মৃতি--- লিখেছি বলেই বিমুখ কি সাক্ষীরা ? ভালোবাসা বলো কি চাও প্রেমের দাম ? রতিতে মেটেনি ? রক্তে মেটাও সাধ, প্রথম পাতায় যেখানে তোমার নাম কেটে সেখানেই লিখে দাও প্রতিবাদ।
নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল। ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর। মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ, পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ? দরগাতলা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয় কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল, আয় আয়। পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘিটার পার এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার।
আমায় দেখে কলকলিয়ে দিঘির কালো জল বলল, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল--- পকেট থেকে খোলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ। দিঘির কথায় উঠল হেসে ফুল পাখিরা সব কাব্য হবে, কাব্য হবে, জুড়ল কলরব। কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।