কবি আল মাহমুদ-এর কবিতা
*
আমার আঙুল
কবি আল মাহমুদ

তোমার জন্যে লোকালয়
হেঁটে এসে আজো কড়া নাড়ি
তোমার জন্যে করি জয়
অভাবের ক্ষিপ্র তরবারি |


তুমি আছো -----এই সন্মোহনে
খুলতে যাই মৃত্যুর তামস,
অবারিত চুম্বনে, গুঞ্জনে
ধরে থাকি তোমাকে অবশ |


সবুজ গন্ধের এক গাছ
যেন  আমি :  স্ফটিকের ঘর
কাচের আধারে কালো মাছ
মুখে নেয় সোনালী পাথর |


একুরিয়ামের মত ছোট
স্বচ্ছ সাদা সংসার আমার
কে মৎসিনী দীপ্ত হয়ে ওঠ
ছলকে নীল জলের আধার ?


ক্ষুধার্ত এ-মুখ তুলে যত
বাতাসের বিন্দু আনা যায়
এ-মহার্ঘ বুদ্বুদ কহ তো
রাখবে কোন শৈবালের গায় ?



হঠাৎ এই ভুরভুরি গতি
হয়ে যায় আনন্দের  ফুল
খায় এক মাছের যুবতী
ঠুকরে খায়, আমার আঙুল  |


.       ****************                                                       
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
আসে না আর
কবি আল মাহমুদ

পাহাড়পুরের পাথর রেখে বামে
পেরিয়ে খাল পুরনো গড়খাই
এগোলে কেউ আসে না আর ঘরে
এই কথা তো জানতে, তবু কেন
হাটের মাঝে আসতে দিয়েছিলে ?

তোমার শিকেয় রং মাখাতো যারা
তোমায় এনে দিত মোরগফুল
তাদের হাত ফেরালে একবার
কখনো তারা আসে না আর গাঁয়ে
এই কথা তো জানাই ছিল তবু
বানের জলে ভাসতে দিয়েছিলে  |

তোমায় যারা বলতো জাদুকরী
তোমায় যারা ডাকতো কালো সাপ
যাদের দেখে ভাঙে কাঁখের ঘড়া
যাদের ভয়ে মুখ লুকোতে জলে
দীঘির পাড়ের অন্ধ জনরবে
তখন কেন হাসতে দিয়েছিলে |

.       ****************                                                       
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
পাপড়ির ফুল (ছড়া)
কবি আল মাহমুদ

১. চাকমা মেয়ে রাকমা
ফুল গুঁজেনা কেশে
কাপ্তায়ের হ্রদের জলে
জুম গিয়েছে ভেসে |
জুম গিয়েছে, ঘুম গিয়েছে
ডুবলো হাড়িকুড়ি  ;
পাহাড় ডুবে পাথর ডুবে
উঠেনা ভুরভুরি !

২. ঝালের পিঠা, ঝালের পিঠা
কে রেঁধেছে, কে ?
এক কামুড়ে একটুখানি
আমায় এনে দে |
কোথায় পাবো লঙ্কাবাটা,
কোথায় আতপ চাল ?
কর্ণফুলীর ব্যাঙ দেখেছি
পোগোনটাতে কাল !

৩.  লিয়ানা লো লিয়ানা
সোনার মেয়ে তুই,
কোন পাহাড়ে তুলতে গেলি
গন্ধভরা যুঁই ?
  বনবাদাড়ে যাইনি মাগো
ফুলের বনেও না,
রাঙা খাদির অভাবে মা
পাতায় ঢাকি গা |
 চিবিদ গাছের ছায়ার পিনন্
 অঙ্গে জড়িয়ে,
 পাঁচ পাহাড়ের খাদের নীচে
  যাচ্ছি গড়িয়ে |


.       ****************                                                       
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
একটি সনেট       
কবি আল মাহমুদ

কোনো এক ভোরবেলা রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ
অপ্রস্তুত, এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনে নেব এ আমার ঈদ।
ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন---
নিরুপায় কিছু স্মৃতি, কিছু নাম কিংবা কিছু নয়,
অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন
কার হাত ভাঙে চুড়ি ? কে ফোঁপায় ? পৃথিবী নিশ্চয় ;
স্মৃতির মেঘলা ভোরে শেষ ডাক ডাকছে ডাহুক ?
অদৃশ্য আত্মার তরী কোন ঘাটে ভিড়ল কোথায় ?
কেন দোলে হৃদপিণ্ড আমার কি ভয়ের অসুখ ?
নাকি সেই শিহরণ পুলকিত মাস্তুল দোলায়!
আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার।

.                ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
হৃদয়পুর       
কবি আল মাহমুদ

কে যেন বললেন ভেতরের দিকে দেখো। আমি আমার ঘরের
সবগুলো দুয়ারই খোলা ভাবতাম। এখন দেখি কারা যেন
হুড়কো এঁটে দিয়েছে। পরিচিত আসবাব বইপত্র
লেখার টেবিল ইত্যাদির ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে মনে হল
এতো আর ভেতর দিকে দেখা নয়। অকস্মাৎ
বুকের বাঁ পাশ থেকে আদেশটা বাজল এইখানে।
আর অমনি আমার কামরাটা উধাও হয়ে গিয়ে সামনেই
মিনারের মত উঁচু আমার উল্টানো হৃদপিণ্ড।
এক অতিকায় আতাফলের মত কাঁপছে।

আমি একটা গঞ্জের দিকে যাচ্ছি টের পেয়েই আমার স্ত্রী
দৌড়ে এসে বাজারের থলিটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
এক কুড়ি সবুজ কৈ মাছ আর মাষের বড়ি আনতে ভুলো না।
আর টেবিল ছেড়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এল আমার মেয়েটি,
শুনেছি ঐ বাজারে আদ্যিকালের নোটবই পাওয়া যায়।
ফুটপাতে নজর করে একটা খুঁজে এনোতো আব্বা।
মেয়েটি স্নাতক হবে। মানবেতিহাসকে তারও তো
যথাসম্ভব ছেঁটে ছোটো করে ফেলা দরকার।

পয়সা বাঁচাবার জন্য আমি হেঁটে হেঁটেই বাজারে পৌঁছলাম।
একটা পুরানো টিনের এ্যারোচিহ্নর ওপর কে যেনো
ভুল বানানে লিখেছে ‘রিদয়পুর’।
আমি এক হলুদ গুল্ম বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা
জিয়ল মাছের বাজারটা কোনদিকে ? লোকটা হাসল।
আপনি উল্টোপথে বাজারে এসেছেন। এটা তো বেঈমানের গলি।
গাধামুখো পুরুষ আর কুকুরমুখো
কস্ বীদের বাজার। এখানে সবুজ কোথায় পাবেন ?
আপনি বুঝেছি এ হাটের লোক নন। আবার কোনোদিন
আনাজের গেট ধরে আসবেন। তরতাজার তোরণ।

আমি বহুবার সবজির বাজারটা খুঁজতে
মাংসের মার্কেটে সওদা করেছি।
ইতিহাসের সার সংক্ষেপ কিনতে, কিনে এনেছি
গরিলার ছবি ভর্তি জানোয়ারের বিশাল

.                ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
রাত্রির গান       
কবি আল মাহমুদ

রাত্রির গান গেয়েছিল এক নারী
আমার সাথেও ছিল কিছু পরিচয়,
এক হাতে রেখে আগুনের মতো শাড়ী
বলেছিল, ভীতু তোমারও কি আছে ভয় ?
কাজলের ঘরে ঢুকেছিলে তুমি বোকা,
কালির চিহ্ন ললাটে ধরেছ স্থায়ী,
কলঙ্কি চাঁদ শুনেছিল সেই টোকা
তুমি ফিরে গেছ বাতাসকে করে দায়ী।

সেই নিশিথেরই নদী এক খাপ খোলা
ঢেউ তুলে তার বিবেকের ঘোলা জলে,
প্রমাণ রেখেছে তরঙ্গে ফুল তোলা
যেন ব্যভিচার বাতাসে না যায় গলে ;
কবির পোশাকে ঢাকবে কি অপরাধ?
ঢাকবে কি প্রেম, ঢাকবে কি পরাজয় ?

সেই কালোজল-তটিনীর প্রতিবাদ---
বলো, ‘ভালোবাসি’ --- তোমার কিসের ভয় ?

ওগো নদী শোনো, ওগো খণ্ডিতা স্মৃতি,
তুলো না অতীত, এনো না জলের পীড়া
একটি কবিতা শিরোনামে, বিস্মৃতি---
লিখেছি বলেই বিমুখ কি সাক্ষীরা ?
ভালোবাসা বলো কি চাও প্রেমের দাম ?
রতিতে মেটেনি ? রক্তে মেটাও সাধ,
প্রথম পাতায় যেখানে তোমার নাম
কেটে সেখানেই লিখে দাও প্রতিবাদ।

.            ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
আকাশ নিয়ে       
কবি আল মাহমুদ

আকাশটাকে নিয়ে আমার মস্ত বড় খেলা,
মেঘের কোলে ভাসাতে চাই চিলেকোঠার ভেলা।
বাতাস যখন থমকে গিয়ে শান্ত হয়ে রয়ে
মেঘের ঈগল ভেঙে কেবল ফুলের তোড়া হয় ;
জলকদরের খাল পেরিয়ে জলপায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ্য রেখে শঙ্খনদীর বাঁক।
মন হয়ে যায় পাখি তখন, মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলে ডানা, মিষ্টি হাওয়ার বেগ।
আবার যখন সন্ধ্যা নামে ছড়িয়ে কালোর ছিট
আকাশটাতে কে এঁকে দেয় নীল হরিণের পিঠ।
ব্রহ্মদেশের বাতাস এসে দরজা টানে রোজ
কোথায় পেল আমার মত দুষ্টু ছেলের খোঁজ!

.              ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
পাখির মতো       
কবি আল মাহমুদ

আম্মা বলেন পড় রে সোনা
.        আব্বা বলেন মন দে ;
পাঠে আমার মন বসে না
.        কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।

আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
.        নদীর কাছে থাকতে,
বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে
.        পাখির মতো ডাকতে।

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
.        কর্ণফুলির কূলটায়।
দুধভরা ওই চাঁদের বাটি
.        ফেরেস্তারা উল্টায়॥

তখন কেবল ভাবতে থাকি
.        কেমন করে উড়ব,
কেমন করে শহর ছেড়ে
.        সবুজ গাঁয়ে ঘুরব!

তোমরা যখন শিখছ পড়া
.        মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হব,
.        পাখির মতো বন্য।

.         ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
ধমনির ধ্বনি       
কবি আল মাহমুদ

আমাদের দিন শেষ হয়ে গেছে সই,
তোমার ছাপানো শাড়িতে নদীর নাম---
দেখে আর কেউ করবে না হই-চই ;
বিস্মৃতির শেষ প্রেমিকের পরিণাম।

তোমার ছাপানো শাড়িতে মাছের ঝাঁক
স্মৃতির লবণ-সমুদ্রে তোলে মুখ,
মৌসুমী হাওয়া হয়ে আছে নির্বাক
যেন নাবিকের পেশল তপ্ত বুক।

ঝড়ের নকশা ঈশানের কোলে শোনে
পাখিদের শেষ বিদায়ের ফিসফাস
যেন বা হৃদয় ধমনির ধ্বনি গোনে
আর ভরে ওঠে আমাদেরি নিশ্বাস।

পেছনে দেখার প্রলোভনে প্রিয়তমা,
আমরা যেন না হয়ে যাই প্রেতলোক,
একটি বিন্দু রেখো বাম চোখে জমা
কারো কবিতায় লেখা হোক এই শোক।

কালচক্রের কামনার কাছে দায়ী
জেনো গরীয়সী আমরা তো কেউ নই,
শেষ শয্যায় রয়েছি শয্যাশায়ী
আমাদের দিন শেষ হয়ে গেছে, সই।

.         ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর
*
পাখির কাছে ফুলের কাছে       
কবি আল মাহমুদ

নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর।
মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,
পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ?
দরগাতলা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয়
কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল, আয় আয়।
পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘিটার পার
এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার।

আমায় দেখে কলকলিয়ে দিঘির কালো জল
বলল, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল---
পকেট থেকে খোলো তোমার পদ্য লেখার ভাঁজ
রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ।
দিঘির কথায় উঠল হেসে ফুল পাখিরা সব
কাব্য হবে, কাব্য হবে, জুড়ল কলরব।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।

.                ****************    
.                                                                          
সূচিতে . . .    



মিলনসাগর