কবি অমিতাভ গুপ্তর কবিতা
*
কবি অমিতাভ গুপ্তর পরিচিতির পাতায় . . .
দুঃখ ও যন্ত্রণা ছাড়া আর অন্যতর সুখ নেই
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দুঃখ ও যন্ত্রণা ছাড়া আর অন্যতর সুখ নেই। কোনো গভীর ঘটনা
ঘটে গেলে হয়তো-বা মায়া যত পড়ে থাকে
স্মৃতিধার্য যেই মায়া, আনন্দিত, উৎসুক যৌবন মধুরার মাধুর্যযামিনী
অথবা ওদের সব দুঃখ নিয়ে রক্ষা তরুণী যুবতী শুধু আমার কৃত্য থেকে
ক্ষরিত হয়নি সেখানে
অনন্তনাগের বধূ তুষ্টি তাঁর প্রাণসখা
ধরিত্রীকে শিরোধার্য করেছেন, অবিচল করে রেখেছেন
ব্রহ্মপুত্রের জননী অমোঘা, অমোঘের মতন গভীর গভীরতর স্রোত
যেন রেখে যেতে পারে এই ভারতবর্ষের জননীরা








*
ওই যে ছোটো ছোটো জারবেরা উড়ে গেল ওদের এখনো ডানা ফোটেনি
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

ওই যে ছোটো ছোটো জারবেরা উড়ে গেল ওদের এখনো ডানা ফোটেনি
ওই যে স্কাইলার্ক বিকশিত হল ভোরের আকাশে
ওই যে আমার লেখার দোয়াত ছুঁয়ে থাকা খাগের কলম
ওই যে করুণ স্মৃতির মতো দীনলিপির মতো
স্পর্শে অথবা ব্রহ্মের স্বরূপচৈতন্য মহাবিশ্বের মতো
বিপুল ও অন্তহীন হয়ে রয়েছে এই অন্তহীনতার মাত্রা
কোথায় যে আমার প্রণাম রাখব জানি না
সপ্তধারাবিভক্ত অলকানন্দার মতো, যদিও সর্বত্র শুধু বিকীর্ণকামা
                আর বস্ত্তকামী
নববধূ দেখলেন অরুন্ধতী নক্ষত্রটি আকাশে আকাশে ভেসে যায়








*
এমন তো হতে পারে বেদান্ত গ্রন্থের সেই ঈশোপনিষদ খণ্ডটি প্রেসে পাঠিয়েছি
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

এমন তো হতে পারে বেদান্ত গ্রন্থের সেই ঈশোপনিষদ খণ্ডটি প্রেসে পাঠিয়েছি
হয়তো একটি প্রুফ এসেছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির
বিদগ্ধজনের কাছে, হয়তো একটি শ্লোক মর্মভেদ করেছিল
অভিজ্ঞ এবং হয়তো ঈষৎ ঐশ্বর্যক্লান্ত জনৈক প্রৌঢ়ের
শুরু হল উপনিষদের পাঠ, সকলের হয়তো হল না চিত্রগ্রাহী
শুধু একজন, সেই প্রৌঢ়ের শেষবয়সের সন্তান,
ভ্রমরের মতন স্বভাবে যেন অংশত চিনতে পেরেছিল
অন্য অংশে, আমি জানি, গানে ও গুঞ্জনে হবে তার
স্পন্দিত লোকায়ত ভারতের কথা

তারপর একদিন সর্বরিক্ত হয়ে শুধু চলে যেতে হয়
চতুর্দিকে কেউ নেই, দেবেন ঠাকুর নেই তেড়ে আসছে রাধাকান্তের লাঠিয়াল
শ্বেত আকন্দের ক্ষুদ্র কুঁড়ির মতন ওই বাংলার বিধবারা যে আর্থিক
সহায়তা চেয়েছিল তাও গড়ে তোলা হয়তো সম্ভব হবে না
উপনিষদের সেই ছিন্ন শ্লোকের মতো ভেসে যেতে হবে,
সেই যাওয়াটিকে যদি পূর্ণ বলে মনে হয় ক্ষতি নেই
হয়তো পূর্ণ নয় পূর্ণের শান্ত অভিমান








*
রংপুরে গিয়ে আমি ইংরেজের নবাবি দেখেছি
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

রংপুরে গিয়ে আমি ইংরেজের নবাবি দেখেছি
দ্বিতীয় আকবর শাহ সম্রাটের দরবারে প্রার্থনা শুনেছি রাজকীয়
এবং দেখেছি আরও, শুনেছিও, দেবালয়ে
আর্ত চিৎকার
সামান্য সম্বল ছিল পারিবারিক সূত্রে পাওয়া, তাই নিয়ে কলকাতায় এসে
একটি মন্দির যদি গড়ে তুলি, যদি তারপর
যেখানেও চতুর্দিকে দেয়ালে দেয়াল দিয়ে ঘেরা আর
মর্মর বেদির উপরে
বেদ ও বেদান্তগ্রন্থ
ভয় করে, ভেবে ভয় করে








*
কাল সারারাত যেন অন্ধকার দীর্ঘনিঃশ্বাস
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

কাল সারারাত যেন অন্ধকার দীর্ঘনিঃশ্বাস
ফেলে কিছু বলেছিল। লন্ঠন গিয়েছে নিভে। চোখে ঘুম নেই স্বপ্ন নেই
সেপ্টেম্বরের এই হিমার্ত রাতের মতো ব্যর্থতার স্মৃতি কত দুঃখবেদনার নগ্ন
কত অপমান দিয়ে গড়া রূপকথা
যা কেউ কখনো আর জানবে না। আমার জীর্ণ বহুব্যবহৃত পোশাকের মতো
যা এখন নিরালম্ব। তারপর ভোর হবে।
প্রতিটি রাতের শেষে যেরকম ভোর হয়
শুধু রাত্রির মুহূর্ত আর ফিরেও আসবে না
ইন্দ্রলেখার মতো সচকিত নয়নে নয়ন
মেলে অন্য কেউ সূর্যস্নাত ধরিত্রীকে প্রণাম জানাবে

আগমনীর গানের মতো ভেসে এল শারদোৎসব
কুমারিল ভট্ট জানেন, ইন্দ্রই সূর্য,
অহল্যা রাত্রি ইন্দ্রের উপরে অসূর্যস্পশ্যা
ব্রহ্মার মানসকন্যা অহল্যার মতো যার কোনো বিরূপতা ছিল না
একটি দুর্মতি তাকে, সহস্র বছর ধরে, অদৃশ্য পাথর করে রেখেছিল








*
মহারহস্যের সব তাৎপর্য কেউই সম্পূর্ণভাবে সঠিক জানে না
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

মহারহস্যের সব তাৎপর্য কেউই সম্পূর্ণভাবে সঠিক জানে না
হয়তো রহস্য আছে সেকথাও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত
লাভ নেই ক্ষতি নেই জয় নেই পরাজয় নেই
শুধু এক অনির্ণেয় যাচনা রয়েছে
শুধু এক তরঙ্গিত স্থলভূমি ঘিরে থাকা স্তম্ভিত সমুদ্রের মতো
রয়েছে অধৈর্যময় ব্যক্তিগত হৃদয়ে জড়ানো
একটি সন্ন্যাস যাকে সৌন্দর্যে বিন্যাস করা সম্ভব

তারপর মনে হতে পারে তবু চার্বাকের মতো
প্রত্যক্ষ প্রমাণমাত্র, তাহলে
প্রমাণের চেয়ে বেশি প্রভাবসঞ্চারী
কালোময়ূরের মতো রাত্রির তারায় তারায় যেমন ডানায় ডানায়
দিয়েছি পাঠিয়ে বার্তা, 'কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ এবার ছড়িয়ে যেও এ বিশ্বনিখিলে,
শুধু শান্তিপর্ব থেকে শুরু করো মহাকাব্য নতুন তোমার'








*
মেয়েরা কিছুটা দেবী, এবং আংশিকভাবে দেবদূতী নিশ্চয়
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

মেয়েরা কিছুটা দেবী, এবং আংশিকভাবে দেবদূতী নিশ্চয়
শুধু মানবিনী নয়, কোনো কোনো ধর্মশাস্ত্রে স্পষ্ট লেখাই আছে নারী
একটি মানবেতর জাতি আর কোনো কোনো শাস্ত্রহীন ধর্ম তাদের
জীবন্ত দগ্ধ করা কর্তব্য মনে করে। অহিফেন দিয়ে আর ঢাক ঢোল
শঙ্খ বাজিয়ে গেল জ্বলন্ত চিতায়। বাঁশ দিয়ে চেপে ধরে হতভাগিনীকে
স্বামীর শবের পাশে। সহমরণের সঙ্গে অনুমরণেরও
প্রথা আছে। স্বামী যদি দূরদেশে মরে যায়।
অথবা জমির লোভে ওই এপ্রিলের তিরিশ তারিখে ১৯৮২ সন।
যোলোজন পঁচিশ-তিরিশ বয়সের যুবতীকে গায়ে
কেরোসিন ও পেট্রোল ঢেলে দিয়ে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মারা হল
বালিগঞ্জে কলকাতার বন্ডেল গেটের কাছে। কুড়ি-একুশ বছর বয়সী
একটি মেয়ে পুড়ে মারা গেল ঘণ্টাতিনেক ধরে। ধন্যবাদ রাজনীতি
ধন্যবাদ হে সাম্প্রদায়িক








*
এই সব নির্বাসনের দিনে রাতে যতিচিহ্নের মতো
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

এই সব নির্বাসনের দিনে রাতে যতিচিহ্নের মতো
কয়েকটি মুহূর্ত রইল। মিরাত-উল-মুলব সংবাদপত্রটিও
বন্ধ করে দিয়েছিল। স্নেহময়ীদের চোখের জল মুছিয়ে দিতে
পারিনি একা তাই বেন্টিঙ্কের দরজায়
এসে দাঁড়াতে হয়েছে বারবার। মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে ভট্টাচার্যের সঙ্গে তর্ক করে
সময় নষ্ট হয়েছে বিস্তর। পাথর টলেনি
যেন এগারো বছর বয়সী বালক এবং ক্রুদ্ধ ও উদ্ভ্রান্ত চোখে চেয়ে রইল
চিতাগ্নির দিকে, যেন বৌদি আলোকমঞ্জরীর
অর্ধদগ্ধ চেহারায় ওই ওই মিলে গেল
আধপোড়া নারী যেন আধপোড়া কাঠে।








*
আমার জীবনে কোনো ইতিহাস নেই তাই ইতিহাস ঘিরে আছে আমার জীবন
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

আমার জীবনে কোনো ইতিহাস নেই তাই ইতিহাস ঘিরে আছে আমার জীবন
১৭৬৪ সন, জেমস ওয়াট, স্টিম ইঞ্জিন, তখনই আবার শুনি সাবমেরিনও
তৈরি হয়েছিল
দ্রুতি ও ধ্বংসের উন্মাদনা নিয়ে
সতেরো শতক ধেয়ে চলেছিল অষ্টাদশের দিকে
তবু সেই মুহূর্তেই মহাকাশে চোখ রেখে নাডি লালদে
সতেরো হাজারের বেশি নক্ষত্রের খোঁজ পেয়ে নক্ষত্রকে খুঁজে পেয়েছেন
আমিও ভূমিষ্ঠ, আর বেটোফেন একটি একটি সিম্ফনি রচনা করেছেন
'সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে, আমার কৈশোরে আর যৌবনে ঋতুচক্র ঘিরে
টমাস পেনের লেখা “রাইজ অব ম্যান', ইউরোপে ইহুদি নির্যাতনের প্রতিবাদ
এতদিনে, বকসার যুদ্ধের পরে টিপু সুলতানের পরে ইংরেজের উপনিবেশ
'ভারতবর্ষের সাথে পরিচয় হয়েছিল, ইংল্যান্ডের রাজদরবারে
আমি তার ভৌগোলিক অনুপুঙ্খ, লোকায়ত সভ্যতার কথা জানিয়েছি।
বিস্মিত হয়েছে ওরা। ওরা তো জানে না আমি আসমুদ্র হিমাচল
'ভারতীয় দর্শনেই পৃথিবীর প্রতিবিম্ব সম্পূর্ণ দেখেছি








*
সিন্ধুভৈরবীর মতো ভারতবর্ষের রাগ-রাগিনীরা ওই সন্ধ্যাগোধূলির
কবি অমিতাভ গুপ্ত
ডিসেম্বর ২০২২ এ আধুনিক ভারতের জনক রাজা রামমোহন রায়ের সার্ধদ্বিশতবর্ষ জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত, কবি অমিতাভ গুপ্তর “পূর্ণের অভিমান” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

সিন্ধুভৈরবীর মতো ভারতবর্ষের রাগ-রাগিনীরা ওই সন্ধ্যাগোধূলির
আড়ঠেকা আভায় জড়িয়ে আছে। পাইনের ঝরাপাতা থেকে
আভাটিকে খুঁজে এনে যদি বুকে তুলে নিতে যাই
পাইনে পপলারে ওকে মৃদু আর মর্মরিত ঠুংরির তালের মতন
অথবা অনেকদূরে ভেসে যাওয়া বেহাগ ও টোড়ি কিংবা বাগেশ্রী ইমন
ভারতবর্ষের মতো লাবণ্যমধুর স্বরন্যাসে
যে প্রেম অমূর্ত যার দিব্যতায় একদিন মহাবিশ্বে মহাকাশে রবীন্দ্রসংগীত
গাওয়া হবে, মনে হবে, আমারই বিস্ময় থেকে জেগে উঠবে অন্যান্য বিস্মিতজাত
অন্যান্য মুগ্ধ যারা নরেন দত্ত'র মতো গান শিখবে ব্রাহ্মমন্দিরে