কবি অমিতাভ গুপ্তর কবিতা
*
কবি অমিতাভ গুপ্তর পরিচিতির পাতায় . . .
খনির মানুষেরা
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

শৃঙ্খলের আড়াল নও
শৃঙ্খলের গোপন নও
যে-তুমি আর

শৃঙ্খলের ভষ্মে আর
শৃঙ্খলের সংহারে
তোমার মুখ

রাত্রি, রক্তচন্দনের
রাত্রি রক্তজবা, দিনের
কেরক যেন রাত


খনির অস্পষ্টতায় তোমার মুখ
কোরকের প্রখরতায় তোমার রূপস্বভাব

আঘাত মুছে দেওয়ার আগেই শ্রী ফুটেছে
আঘাত মুছে দেবে কে, যারা খনিগর্ভ চেনেনা









*
বন
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

কুঠার, একটি প্রশ্নচিহ্ন
বন যতটুকু জানে
যা জানেনা তার ক্ষমায় বিকেলে
বহে যায় মর্মর
বোবা কাঠুরেরা বিভাষাজড়ানো
কাঠের অর্থ খোঁজে
স্পষ্টত তবু মর্মররেখা
মনে রেখেছিল সেই
শাণিত এবং কেঁপে কেঁপে-ওঠা কোন্
অস্ত্রের অধিকার
তারপর বন ফিরে গেল বনে
প্রশ্নের শুরু হল









*
মাটি
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

জননীভাষার কাছে     এসেছি, ভূমিকাহীন
আমাকে পূর্ণ করো
যেভাবে একটি পাখি    বাউলের ডানা মেলে
উড়ে যায় সায়ন্তনে
আকাশে আধেক আলো    বৃক্ষে অর্ধ জীবন
গোধূলি পূর্ণ করো
যেভাবে মাদল বাজে    মাদলে জাগে মাদল
ধ্বনি যায় ধ্বনির দিকে
আলো তার প্রতিধ্বনি    পরাগে মাদলরেণু
ও মাটি, পূর্ণ করো









*
আকাশ
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

যেকোনো হাত
    আকাশভরা
        মেঘের মতো স্থির
দুঃখ নিয়ে
    আগুন নিয়ে
        বজ্র দিয়ে যায়
আকাশভরা
    তারায় তখন
        দুহাতভরা আলো
যেকোনো হাত
    ধরেই চলো
        আকাশ রেখে যাই









*
দ্যুতি
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

অনেকদূরে যেন স্মৃতির মতো দূরে আদিম তারাটির
বিনাশ শুরু হল
প্রথমে পুড়ে যায় শুভ্র রেখাগুলি এবং ছায়া নামে ক্ষিপ্র স্থিরতায়
ক্রমশ আর কোন দৃশ্য রূপ নেই মুখশ্রীও নেই অনেকদূরে যার
আভাকে আমাদের কুটির ছুঁয়ে আছে
কোথাও যতি নেই আদিম তারাটির এমনই তীব্রতা কৃষ্ণ গহ্বরের কান্তি এত গূঢ়
অনেকদূরে শুধু কুটির বুকে টানে ছন্দময় মাটি দীঘির রেখাপট
চাষারা বীজ বোনে মাঝিরা হাল ধরে
পিতৃপুরুষের ক্ষমায় ভরে ওঠে অসীম শূন্যতা








*
জল
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বাঁশি জাগে ? বাঁশির আড়ালে
গান নেই, রিক্তের স্তব্ধতা
ছুঁয়ে আছে রুদ্রকটি। যেন
নীলজলভ্রষ্ট চন্দ্রাবলী,
কবেকার শ্রীমতী হারালো

কার কাছে তবে আর যাব
কথিত যা সে’ জ্বালা জুড়োতে
জ্যোত্স্নার ঢেউয়ের মতো এই
নীলজলগভীরে, গভীর
স্তব্ধতার মতো বাঁশি নিয়ে








*
নিবেদন ---১
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

বন্ধুজনোচিত কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছিল এই ‘যুক্তিশৃঙ্খল’ নামটিকে নিয়ে। যুক্তিই শৃংখল তবে ? তাহলে কী যুক্তিহীন পারম্পর্যহীন কোনো সত্যের দিকে আমরা চলে যেতে পারি আজ। কবিতা কী তেমনই প্রস্তুত। তেমন যদি না হয় তবুও মানতে হবে কাব্যভাষা আজ---- নিশ্চয় আমার নয় অন্য কোনো যথার্থ ভাষীর ব্যবহারে --- আগুনের শান্তির মতন কিছু আভা কিছু তীব্র অস্বীকার সম্ভব করেছে যার স্পর্শ নিয়ে মনে হয়, মানুষের ইতিহাসে এতদিন যত যুদ্ধ যত ঘৃণা যত লোভ ঈর্ষা শিশুবধ ঘটে গেছে তার যদি যুক্তি থাকে তবে যুক্তিবিরোধিতা ঢের ভালো। শৃংখলমোচন তবে প্রয়োজন আজ আমাদের। কেবল আবেগ নয়, সাধ্যমতো বোধ দিয়ে মনে হয় ইতিহাস ধারাটির যুক্তি ও শৃংখলচিহ্ন এত স্পষ্ট এমনই নির্মম যার আয়োজনে রাজা-বেগমের সব কদর্যতা দাস- উত্পীড়ন আর পেন্টাগন নাজিতন্ত্র সবই সম্ভব হয়ে ওঠে। তবু সম্ভবের সীমা পার হয়ে মানুষের সব দীপ্তি বেঁচে থাকে, ময়ূরসিংহাসন আর রকেটঘাঁটির চেয়ে অসম্ভব মায়া ও মমতা আর সৃষ্টিবোধ বুকে নিয়ে যে-মানুষ ইতিহাসাতীতের রূপমুকুরে জেগেছে, তাদেরই দৃষ্টান্ত তবে যুক্তিমোচনের ?








*
নিবেদন - ২
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

যুক্তিকে, যুক্তির শৃংখলকে পেরিয়ে যাওয়ার একটি স্তরে রইল প্রত্নকথা, অন্যটিতে প্রত্নকথার সীমা, যেখানে ব্যক্তিগত কল্পনাযাপনের ফলে অসম্পূর্ণ শ্রুতি পূর্ণ হয়ে ওঠে। এ’ যদি স্বেচ্ছাচারিতা হয়, তাহলেও কিন্তু অতিরিক্ত কোনো সংঘাতের সুযোগ নেই। যেহেতু মূল সংঘাতটি শুরু প্রত্নকথার সঙ্গে ইতিহাসের বিবাদে। আয়ুহীন স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে যে খনা সিংহল থেকে এলেন ভারতীয় রাজসভায়, গণনা করে দিলেন নক্ষত্র ও রাশিচক্রের অবস্থান, তার সঙ্গে নিশ্চয় ইতিহাসের খনার সঙ্গতি নেই। বরাহমিহিরের জ্যেতিষগ্রন্থের সঙ্গে খনার বচনের যথেষ্ট ভাবগত সাদৃশ্য থাকলেও, ভাষাগত ব্যবধান হাজারবছরের বেশি। প্রত্নকথায় খনা তাই ইতিহাসের অতীত, এবং সেখানেই কী শুরু হয়নি তাঁর সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রচনার ?








*
নিবেদন - ৩
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

কী ঘটেছিল প্রত্নকথার খনার জীবনে, যখন তাঁর প্রজ্ঞা সহ্য করতে না পেরে পুরুষশাসিত সমাজ তাঁকে বাকশক্তিরহিত করে দিল ? প্রত্নকথায়, তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল তখনই , সত্যিই কী মৃত্যু হয়েছিল তাঁর ? প্রত্নকথার সেই ইতিহাসধর্মী প্রবণতা এড়িয়ে আমাদের মনে হয়, বেঁচে ছিলেন তিনি হয়ত সেকালের মেয়েদের সহজলভ্য জীবিকা--- কোনো প্রপাপালিকার কাজ --- জুটেছিল তাঁর। হয়ত এমন পুরুষও এসেছিল তারপর তাঁর জীবনে যে-পুরুষ নাগর বা আত্মগর্বী শৌখিন পন্ডিত নয়, যে প্রকৃত কৃষক এবং প্রেমিক। তাঁদের সন্তানের কাছে পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকারে সঞ্চারিত হল খনার সহজাত স্মৃতিধার্য কৃষিবিদ্যা। এরই অবসরে, ইতিহাস থেকে প্রত্নকথায় এবং প্রত্নকথা থেকে কল্পপ্রকল্পে যাওয়া-আসার টানাপোড়েনে কী পেরিয়ে গেল হাজার বছর ?








*
নিবেদন - ৪
কবি অমিতাভ গুপ্ত
যুক্তিশৃঙ্খল কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া

তীক্ষ্ণাত্ম খনার আবেগ আমাকেও নিয়ে গেল কথিত’র আড়ালে অন্য একটি রূপকথার দিকে। যে প্রত্মকথার নির্মাণ শেষ হয়নি তার সম্ভাবনা চকিতে অর্জন করেছিল এমন একটি আয়তন যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম বা প্রতিজ্ঞার আভাস পাওয়া যায়। সৌন্দর্য বিস্তৃত হয়, বেদনাও হয়ে ওঠে সাংকেতিক। না পাওয়া স্মৃতির সেই সৌন্দর্যে সংকেতে আমার যাপনও কী তখন সংবৃত হয়নি সমগ্র, মিলিতমানুষের কথায় ও অতিকথায় ?