কবি বরুণ মজুমদার-এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
জীবন মানেই যুদ্ধ

কাছের মানুষ সব চলে গেলে পড়ে থাকে স্মৃতি
শোকসভা সাময়িক, উচ্চারিত হয় কত কথা
নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে ক্ষণেক বিরাম
তবু সব চলে যায় নিয়মের বেড়াজাল ঘিরে
 
পৃথিবী আমার কাছে সুখময় হয়েছে অনেক
শবযাত্রা নিয়ে কিন্তু কারো কোনো মাথাব্যথা নেই
পরিচিত বান্ধবেরা গুণগান করেছে রচনা
শোক জ্ঞাপনের জন্য কত কিছু সভা আয়োজন।
মরুভূমি নয় সব, মরুদ্যান তাতেও রয়েছে
মরীচিকা হতে পারে জীবনের কঠিন সময়ে
বাঁচার নতুন মন্ত্র আমাদের প্রাত্যহিক নেশা
সহৃদয় আকাশে নিচে তাই বসতি গড়েছি।
যে তোমাকে ভীতু বলে তার কথা মানা বড় দায়
জীবন মানেই যুদ্ধ, যন্ত্রণাকাতর হতে নেই।



.                ****************                                                       
উপরে    


মিলনসাগর
*
ঘরের খেলা

এ ঘর ও ঘর ক’রে কত ঘর পেরিয়ে এলাম
এক দুই তিন চার ক্রমাগত বাড়ছে বয়স
সামনে দাঁড়িয়ে আছে দণ্ড হাতে ভয়ানক যম
মনে পড়ে পরিচিত পুরাতন ঘর ঘর খেলা
ছোট গঙ্গা বড় গঙ্গা অতি কষ্টে পার হয়ে শেষে
এল সেই গুটি ফেলে এক ঘর কিনবার পালা
আর আমি পারবো না কোনো ঘর পার হয়ে যেতে
শেষ ঘরে এসে গেছি আর কোনো ঘর নেই বাকি
এবার খেলার শেষে চলে যাব বহুদূর বাড়ী

.                ****************                                                       
উপরে    


মিলনসাগর
*
জীবনের খেলাঘর

তবে হে মৃত্যুর দূত, শোকমগ্ন সমাধির পরে
এখন রচনা কর আনন্দের অভিনব ঘর |
রঙীন চেতনা নিয়ে আমি আজ এইবেলা শুধু
ফিরে যাবো সমারোহে আলোকিত মোহনার দিকে |

একদিন দ্বিধাহীন স্রোতের সমীপে বসে বসে
ঢেউ গোনা শেষ হলে ওপারের
দেবতার ডাকে
যেতে হবে, তাঁর কাছে দিতে হবে কাজের হিসাব---
যেহেতু জীবন নয় হাসি গানে কাটাবার ধন
|
দু'দিনের কোলাহল শেষ হলে পৃথিবীর পরে
সকলেই চলে যাবে অভিশপ্ত সময়ের ডাকে
|
তবুও মানুষ চায় সব কিছু রমণীয় ধন,---
শূণ্য আসন তার পড়ে থাকে শুধু খেলাঘরে
|

এখন তাহলে বন্ধু নদীর কিনারে ফিরে যাও,
পরস্পর মুখ দ্যাখো যদি পারো জলের ভিতর
|

.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
বুও নন্দিত প্রেম
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শামসুর রাহমান সম্পাদিত "দুই বাংলার ভালবাসার কবিতা" থেকে নেওয়া)

প্রতিদিন রৌদ্রদগ্ধ পৃথিবীর কোলাহল নিয়ে
অব্বেকী সময়ের ঘড়িটাকে বন্ধ করে দিয়ে
নদীর দর্পণে শুধু চেয়ে দ্যাখো হৃদয়ের ছবি,
অথচ জানোনা তুমি এতটুকু হৃদয়ের দাম
|

তবু তুমি সারাদিন সেই মূর্খ বালকের মত
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ফুল ফোটা দেখে যাবে বলো
আরক্ত ভোরের বেলা বসে আছো অন্য অভিসারে
তবু তুমি পরাজয় স্বীকার করতে রাজী নও |

দিন যায় ঘুরে ফিরে, ক্রমাগত বাড়ছে বয়স---
সময়ের পদচিহ্ন আঁকা হয় কপালের ঘামে |
এখন মানুষ চায় পুরাতন সমৃতিটাকে ধরে
সব দুঃখ ভুলে যেতে, সব শোক রেখে দিতে |

ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনি, ছায়া ক্রমে গাঢ়তর হয়
তবুও নন্দিত প্রেম সময়ের বহমান স্রোতে |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
খাদ্য আন্দোলন : ১৯৬৬

রা নেবোনা বৃক্ষ পৃথিবীতে রোপনের ভার
মাঠে মাঠে বুনবোনা কোনদিন একটিও বীজ,
অথচ বৃক্ষ যদি ফল দেয়, ফলে যদি সোনার ফসল---
আমরা সবাই হবো সে সময় তার ভাগীদার


চাইনা সে ধন তবে, চাইনা সে মানিক রতন,
যে ধন লুটবে জানি আমাদের চেনাশুনা রাজা |
কেননা রাজত্ব তাঁর, রাজধানী শয়তানে ভরা
মুখে কোন ভাষা নেই, তবু শুনি আমরা স্বাধীন |

এখন সময় বড় গ্লানিময়, চারিদিকে হাহাকার ওঠে---
"অন্ন চাই, বস্ত্র চাই"---বুকে বেঁধে পুলিশী বুলেট!


.                ****************                                                       
উপরে    


মিলনসাগর
*
এক একটা শব্দ যেন

ক একটা শব্দ যেন মনের গভীরে বাসা বাঁধে
এক একটা ধ্বনি তবু প্রতিধ্বনি বাড়ায় কেবল
|
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিচ্ছবি নিয়ে
স্মৃতির গভীর থেকে উঠে আসে ব্যথার কাহিনী |

এখন মনের মধ্যে ভেসে ওঠে এক একটা প্রতীক
জলের দর্পণে শুধু মুখ দেখে কাটানো সময় |
অথচ গভীর প্রেম শুধু নিয়ে আসে
অন্য এক অনুভূতি, যার নাম বাঁচার শপথ |

সেমৃতি, সুখ,দুঃখ প্রেম, দেনার হিসাব
সবকিছু জমা হয় হৃদয়ের খাতার পাতায় |
কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসো ?
অথচ এমন স্বপ্ন কোনোদিন ছিল না আমার |

এক একটা শব্দ যেন মনের গভীরে আনে প্রেম
অসুখ করে না তবু, সুস্থতার ঘনিষ্ঠ প্রতীক |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
এক একটা মানুষ

ক একটা মানুষ জানি স্বার্থপর হতে পারে |
ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয় বলে
আমরা সকলে চাই ঘনিষ্ঠ বিষাদের ঘরে
বিবেকের সব ছবি বন্দী হয়ে থাক |

তিনটি অক্ষর নিয়ে মানুষ প্রতিমা হতে পারে
পুরুষ কি নারী তার তফাৎ করাটা কষ্টকর |
সবকিছু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলে পরে
জাতিভেদ, বর্ণভেদ সবকিছু ভুলে যাওয়া যায় |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
বিপন্ন পথিক

কে তুমি পথিক একা নদীর কিনারে বসে আছো ?
প্রাচীন দুঃখের স্মৃতি হৃদয়ে ভাসছে অবিরত
|
অথচ দেখছো না তুমি ভোরের সে নন্দিত ফুল,
অখচ শুনছো না তুমি পাখিদের গান |

এখন যন্ত্রণা ভুলে স্বাভাবিক বালকের মত
দৃশ্য থেকে ভেসে যাও অন্য এক দৃশ্যের ভিতর |
কেননা রাতের সব প্রহরেরা কেটে গেলে
অবশেষে আসতে পারে নতুন সকাল |

বাগানে সমস্ত ফুল ঝরে যায়,
তবু দ্যাখো খড়কুটো নিয়ে আসে ব্যস্ত চড়ুই ;
সারাদিন একমনে বাঁধবে বলে ঘর |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
ভিশপ্ত রমণীর কাছে

নিরালা নদীর প্রান্তে রাতজাগা নাবিকের মত
কে তুমি রমণী একা বসে আছো সারাদিন মান ?
আনন্দ দুঃখের স্মৃতি হৃদয়ে ভাসছে অনুরত,
অথচ জানোনা তুমি সম্ভ্রান্ত প্রেমিকের কথা
|

অহরিত ফুল সব ঝরে গেছে, বাগানে শূণ্যতা ;
অথচ সযত্নে আমি বাগানে ফোটাবো বলে ফুল
সারারাত জেগে আছি গোলাপ চারার দিকে চেয়ে |
কে আনবে আলো আজ পরিচিত শ্রাবণের রাতে!

বেলাশেষে রমণীয় পৃথিবীর সব নায়কেরা
জীবন নাট্যের অঙ্ক শেষ করে ফিরে গেছে ঘরে,
আজ তাই কিংবদন্তী হয়ে গেছে তাদের শরীর!
তবু হে রমণী আজ কথাকলি মানুষের ভীড়ে
ফিরে এসো অতীতের সব গ্লানি ভুলে |

শুকনো বকুল বৃথা এখন ভোরোনা ফুলদানি |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
শব্দের ভাবনা   

তিনটে অক্ষর জুড়ে প্রেমিকা প্রতিক
মহেঞ্জোদাড়োর থেকে উঠে আসা প্রেম
চেনাবে নতুন পথ জীবনের গানে
|
অলীক প্রহর যেন প্রতীকী বাহার |

শরার জ্বালিয়ে তবু আনো সেই প্রেম,
শোধ করো জীবনের প্রাত্যহিক দেনা |
ফুলদানি শূণ্য হলে পড়ে থাকা ফুল
সযত্নে বাগান থেকে তুলে আনা যায় |

তিনটে অক্ষর নিয়ে "প্রতীকী" বাহার
ক্ষত না অক্ষত করে বলিষ্ঠ হৃদয় ?
এ প্রশ্ন কোরো না আর, বিকালের ঝড়ে
হানো তীব্র কশাঘাত অবিবেকী মনে |

তিনটে অক্ষর নিয়ে প্রেমিকা প্রতীক
মনের গভীর ক্ষত সারাতে পারেনি |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
তুর্দ্দশ পদী   

তৃষ্ণার আগুণে আমি অতৃপ্ত তিমিরে
জ্বলে যাবো দাবদাহে রমণীকে ঘিরে ;
দীর কিনারে তবু সকাল বিকাল
যাবোনা পরম স্নেহে একাকী প্রেমিক
|

সুতীব্র ঝড়ের বেগে আঘাতে হৃদয়
দৃঢ় করো হে নন্দিত বেদনা আমার ;
যেহেতু পরাবো আমি একা অন্ধকারে
অনেক তারার মালা তোমার গলায় |

অনন্ত দুঃখে আমি সমর্পিত প্রেমে
সাজাবো বরণডালা প্রবীণ শরীরে!
সব আলো নিভে গেলে তবুও তখন
আনন্দে জ্বালাবো দীপ প্রথম প্রেমের |

আমি একা নিদারুণ শ্রাবণ বেলায়
ভেসে যাবো বর্ণহীন স্রোতের ভেলায় |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
লকাতার ছড়া   

জব শহর কলকাতা ভাই
.        আজব শহর বটে,
হৈ হল্লা , মিছিল বেরোয়
.        কাণড কি যে ঘটে
|
ট্রামো চলে, বাসও চলে
.        যাচ্ছে মানুষ ঝুলে ঝুলে,
কেউবা হাসে, কেউবা কাঁদে
.        ভরা শুধু ভুলে |
যাদুঘর আর চিড়িয়াখানা
.        হরেক মজা ভাই,
আকাশবাণী, দূরদর্শন
.        তুলনা তার নাই |
মজার শহর কলকাতা ভাই
.        হচ্ছে পাতাল রেল,
পিওন আসে জলদি ক'রে
.        বাজলে কলিং বেল |
হোক না যতো ধোঁয়া কালি
.        উঠছে তবু বাড়ি,
এদিক ওদিক উড়াল পুল
.        ছুটছে মোটরগাড়ি ||


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
বাঁদরওয়ালা   

বাঁদরওয়ালা, বাঁদরওয়ালা, যাচ্ছো কোথা সাতসকালে ?
তোমার বাঁদর দুষ্টু ভারী, ঘুরে বেড়ায় ডালে ডালে |
কেমন করে পোষ মানালে ? একটুও নেই রাগ,
পড়াশুনা করে না মোটেই --- পড়ে না প্রথম ভাগ
|
তোমার বাঁদর উঁকুন মারে কুটুস কুটুস করে,
দাওনা গো ভাই কলা খেতে নয়তো যাবে মরে
|
ডুগডুগিটা বাজাও তুমি নাচুক বাঁদর তালে তালে
ধেড়ে বাঁদর, ছোট বাঁদর আসুক আরো পালে পালে |


.                ****************                                                      
উপরে    


মিলনসাগর
*
মাদের বড়বাবু      
(প্রথম প্রকাশ "টগবগ" পত্রিকার বইমেলা সংখ্যা, ২০০৪)

মাদের এক বড়বাবু
.                রামকৃষ্ণ শর্মা
এই তো সেদিন প্লেনে করে
.                ঘুরে এলেন বর্মা
|
সেই দেশটা এখন জানি
.                নামে মায়ানমার
মানুষগুলো একই আছে
.                একই সাগর পার |
সেদিন বাবু নৌকা করে
.                বাগবাজারে গিয়ে
কাদায় পড়ে বলেন এসে
.                এলাম সাঁতার দিয়ে |
গুলবাজিতে মাস্টার আর
.                ডিগবাজিতে পটু
সদাই তিনি রেগে থাকেন
.                কথা বলেন কটু |
যাকেই দ্যাখেন হাতটা ধরে
.                জ্ঞন দিয়ে যান খালি
এমনতরো বড়বাবুর বাড়ি
.                হাওড়া জেলার বালি ||


.                ****************                
                                         উপরে    


মিলনসাগর
*
জোনাকি   

জোনাকি, তোর সোনা কি
.        করেছে আলো ছোট্ট ঘর,
আঁধার রাতে বেড়াস উড়ে,
.        করবি কি আর অতঃপর
|
তোর বুঝি নেই ঘর কোথাও
.        তাইতো উড়িস খালি
গায়ে কেন নেই জামা তোর
.        মাখিস ধুলো বালি ?
ছোট্ট দেহে এমন সোনার
.        আলো কোথায় পেলি ?
আয়নারে ভাই আমার কাছে
.        আয়না বসে খেলি
|
তোর কেন নেই লেখাপড়া
.        তোর কেন নেই ঘুম ?
অঙ্কটা না পারলে আমি
.        শুধুই বকার ধুম |
মা বলে তোর হবে না কিছু
.        দাদা বসায় কিল,
দিদি বলে মুখ্যু ছেলে
.         মাথায় মারবো ঢিল!
ও জোনাকি তোর মত ঐ
.        ছোট্ট পাখা পেলে,
ইচ্ছে করে ঘুড়ে বেড়াই
.        লেখাপড়া ফেলে ||



.                ****************                                                         
উপরে    


মিলনসাগর
*
লাল কালো পাখীগুলো   

লাল কালো পাখীগুলো
.        সাদা সাদা ডিম,
রোদ্দুরে তেতে যায়
.        শীতে হয় হীম
|
সেই ডিম ফুটে হয়
.        পাখীদের ছানা
পাখ্না না হলে তার
.        উড়ে যেতে মানা
|
ধীরে ধীরে বড় হয়
.        খায় খুদ দানা,
গাছের কোটরে থেকে
.        হয় সব জানা |
তারপর একদিন
.        নীল আকাশে
রঙীন ডানাটা তার
.        মেলে দেয় সে |
বহুদূর চলে যায়
.        বুঝি কোন দেশে ;
সন্ধ্যায় নীড়ে তার
.        ফিরেই সে আসে ||



.                ****************                                                         
উপরে    


মিলনসাগর