কবি বরুণ মজুমদার - এর জন্ম ১৯৪২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর তারিখে, পশ্চিম বঙ্গের হাওড়া
জেলার, শিবপুরে। পিতা স্বর্গত ফণিভূষণ মজুমদার এবং মাতা স্বর্গতা কল্যাণী মজুমদার | ঠাকুরদা ছিলেন
অধুনা বাংলাদেশের জশোহর জেলার কণেজপুরের জমিদার |
স্কুল ফাইনাল পাশ করেন বাজে শিবপুর বি.কে. পালস্ ইনস্টিটিউশন থেকে | এর পর আই.এ. এবং বি.এ.
পাশ করেন দীনবন্ধু কলেজ থেকে এবং তার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এম.এ. পাশ
করেন | দিল্লীর ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন থেকেও সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন |
বি.এ. করার পর চাকরি জীবন শুরু করেন শিবপুর বি.কে. পালস্ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা দিয়ে |
সাংবাদিকতা শুরু করেন যুগান্তর পত্রিকায় এবং কিছুদিন পর চলে আসেন বসুমতী পত্রিকায় | ১৯৭৪ সালে
যোগ দেন আকাশবাণী কলকাতায় সংবাদপাঠক এবং অনুবাদক হিসেবে | এর পর সময়ের প্রবাহে
আকাশবাণীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অত্যান্ত দক্ষতার সঙ্গে অলংকৃত করে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে
অবসর গ্রহণ করেন | আকাশবাণী কলকাতা থেকে মজার মজার খবর নিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবারে “বিচিত্র
সংবাদ” নামের অনুষ্ঠানটি তিনিই চালু করেন | অনুষ্ঠানটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে আকাশবাণী আগরতলা
থেকেও তা প্রতি রবিবার সম্প্রচার করা হতো |
সাংবাদিক জীবন - দুই বাংলার মানুষই জানেন বরুণ মজুমদারকে সংবাদপাঠক রূপে কিন্তু অনেকেই
জানেন না যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ওয়ার করেসপন্ডেন্ট (war correspondent)
হিসেবেও বাংলাদেশে গিয়েছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে | সেই সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিণীর হাতে ধরা
পড়েও সাহস ও উপস্থিতবুদ্ধির জন্য, বেঁচে ফিরে আসতে সমর্থ হন |
তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতার জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণময় এবং রোমাঞ্চকর! তিনি ভারতের সব রকমের, বাম-
ডান-এমন কি উগ্রপন্থী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও কর্মীদের প্রীতি ও ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছিলেন
একজন সাংবাদিক হিসেবে | তাঁরই কিছু সুখস্মৃতিতে আমাদের সামিল করেছিলেন সাক্ষাত্কারের সময় .
. .
৬০ এর দশকে একবার নকশাল নেতা অসীম চ্যাটার্জীকে কলেজ স্ট্রীটে পুলিশ বিভত্সভাবে প্রহার করে |
সেই দৃশ্য দেখে আর থাকতে না পেরে, বরুণবাবু তাঁর ফটোগ্রাফার সুধীর মল্লিককে দিয়ে ছবি তুলিয়ে একটি
লীড-নিউজ করে পাঠান তাঁর কাগজ বসুমতী-তে যার মালিক তখন ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী অশোক সেন |
পরদিন কাগজে খবরটা বেরিয়েছিল উলটো করে - যে, পুলিশের দিকে ইট ছোঁড়ার জন্যই পুলিশ চার্জ করে |
নকশালরা এই খবর পড়ে চটে গিয়ে, একদিন তাঁকে এবং আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক পরিমল
ভট্টাচার্যকে ঘিরে ধরে হেনস্তা করতে শুরু করে | প্রাক্তন কলকাতার পুলিশ কমিশনার শ্রী নিরুপম সোম,
যিনি সে সময় ডি.সি.সেন্ট্রাল ছিলেন, এই খবর পেয়েই তাঁদের সে যাত্রায় উদ্ধার করে এনেছিলেন | এই
ঘটনার পর নকশাল নেতা অসীম চ্যাটার্জীর সাথে তাঁর ভালো সম্পর্ক হয় | পরে পশ্চিম বঙ্গের ৪র্থ মুখ্যমন্ত্রী
অজয় মুখোপাধ্যায়ের সাথে সাংবাদিক হিসেবে সফরকালে, গোপনে, তাঁকে ডেবরা-গোপিবল্লভপুরে
নকশালদের ডেরায় ঘুরিয়ে এনেছিলেন অসীমবাবু |
পশ্চিম বঙ্গের ৪র্থ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে বাংলা কংগ্রেস দলের অজয়
মুখোপাধ্যায় | সেই সময়ে উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির জ্যোতি বসু | অথচ তাঁদেরই
ক্যাডাররা আরামবাগের ডি.এস.পি. কে মাথা ন্যাড়া করে, জুতোর মালা পড়িয়ে, রাস্তায় হাঁটিয়েছিল |
মেদিনীপুরের এক জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছিলেন --- এই সরকার,
অসভ্য সরকার, বর্বর সরকার! নিজেই নিজের সরকারকে ভর্ত্সনা করার এই বিরল ঘটনার সাক্ষী ছিলেন
বরুণ মজুমদার, যা পরদিন তাঁর পত্রিকায় বড় খবর হয়ে ছেপে বেরিয়েছিল |
একবার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর, অধুনা ঝারখণ্ডের চন্দ্রপুরা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করার
অনুষ্ঠানের সংবাদ গ্রহণ করতে যান বরুণবাবু | তখনকার যুগান্তর পত্রিকার চীফ করেসপন্ডেন্ট অনিল
ভট্টাচার্যও ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে গিয়েছিলেন | তিনি বুদ্ধি করে টেলিগ্রাফের অফিসে আগে থাকতে
বুক করিয়ে রেখেছিলেন যে “One day I saw a lame man” মেসেজটি যাতে পাঠানো হতেই থাকে! তাহলে
অন্য কোনো লোক বা রিপোর্টার আর কোনো টেলিগ্রাম পাঠাতে পারবেন না | তাই সংবাদটি তাঁরই পত্রিকার
অফিসে আগে পৌঁছাবে! তখন আকাশবাণীর সংবাদদাতা হিসেবে সরাসরি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা
করে, তাঁর টেলিফোন ব্যবহার করার অনুমতি নিয়ে খবরটি যথাস্থানে পাঠিয়েছিলেন | মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ
শংকর রায়ের আমলেও তিনি এইভাবে মন্ত্রীর ফোন ব্যবহার করে খবর পাঠিয়েছিলেন |
১৯৯৮ সালে বরুণ মজুমদার আকাশবাণী কোহিমার নিউজ ইনচার্জ হয়ে সেখানে যান | সেখানে তখন বিকেল
চারটের পর কেউ রাস্তায় বের হতো না | রাতে জানালা ঢেকে রাখতো যাতে আলো না বের হয় | কারণ সে
সময়টা উগ্রপন্থী আণ্ডারগ্রাউণ্ড নাগাদের হাতে চলে যেতো নাগাল্যাণ্ড! সেখানে প্রচণ্ড লোড-শেডিং এর জন্য
একদিন রাতে দেশলাই কিনতে যাবার পথে, বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁর সর্বস্য কেড়ে নিয়ে যায় আণ্ডারগ্রাউণ্ড
নাগাদের একটি দল | পরে কোহিমার এস.পি. মিস্টার ইয়ারদেন কে এটা জানাতে তিনি সেই দলটির সাথে
যোগাযোগ করে তাঁর জিনিষপত্র ফিরিয়ে দেবার ব্যাবস্থা করেন | সেই দলটি তাঁর জিনিষ ফেরত দিতে এলে,
তাঁর গেস্ট হাউজের বৈঠকখানায় সেই দলটিকে বসিয়ে তাঁদের ইনটারভিউ নেন | সেই ইন্টারভিউটি
আকাশবাণী থেকে প্রচারিতও করেন, যাতে তাঁরা তাঁদের ক্ষোভ, দুঃখ সব ব্যক্ত করেছিলেন | এরপর আরও
অনেকবার তাঁদের কথা আকাশবাণী থেকে সম্প্রচার করার ব্যবস্থাও করেন | এই সব কাজের ফলে তিনি
নাগাল্যাণ্ডের উগ্রপন্থীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেন |
আকাশবাণী আগরতলার নিউজের ইনচার্জ হয়ে গিয়েছিলেন ত্রিপুরায় | সেখানে একদিন মুখ্যমন্ত্রী মানিক
সরকারের অনুরোধে খবরও পড়েছিলেন |
কবিতা - বাড়ীতে গান বাজনার খুব চর্চা ছিল | জ্যাঠামশায় শ্রী বিভূতি মজুমদার ছিলেন উদয়শঙ্করের ছাত্র |
নৃত্য ছাড়াও উনি বিখ্যাত হয়েছিলেন ৮০ রকমের হাসি দিয়ে! তাঁদের বাড়ীতে মহানায়ক উত্তমকুমার,
সঙ্গীতজ্ঞ ভি ভালসারার মত বিখ্যাত ব্যক্তিরা নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন | ছড়া লিখছেন ক্লাস সেভেন-
এইট থেকেই | সমবয়সী জ্যাঠতুতো ভাই অমিতাভকে রাগাবার জন্য প্রথম ছড়া লেখেন ---
আমাদের বড়কাকা
রোজ বিকেলে চালায় চাকা
বড়কাকার মস্ত ভুঁড়ি
ভুঁড়ির উপর বাটনাবাটা নুড়ি |
এর পর ইস্কুল ম্যাগাজিনে ছড়া প্রকাশিত হতে শুরু হয় | আকাশবাণীতে ইন্দিরাদির “শিশুমহল” অনুষ্ঠানেও
কবি আবৃত্তি করতে যেতেন | ইন্দিরাদির পত্রিকা “সাত সমুদ্র”-তেও কবির কবিতা ছেপে বেরিয়েছে |
তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তির পরীক্ষক ছিলেন | ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্দিরা
গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভারসিটির (I.G.N.O.U.) ভিসিটিং লেকচারার |
কবি বরুণ মজুমদারের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মানের মধ্যে রয়েছে “রামধনু পুরস্কার” কলকাতা, “ইণ্ডিয়ান
ক্রিটিক সার্কেল পুরস্কার” কলকাতা, “ইণ্ডিয়ান সোস্যাল এণ্ড কালচারাল লাভার্স অর্গানাইজেশন পুরস্কার”
বারাণসী, হাওড়া পণ্ডিত সমাজের “সাহিত্য রত্ন” উপাধি প্রভৃতি |
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-- রাত্রির ছায়া (১৯৭২), নতুন ফুলের স্বপ্নে (১৯৬৭), সবুজের ছোঁয়া,
খুশির ছড়া মজার ছড়া (১৯৭১) প্রভৃতি। এছাড়া বিজ্ঞান, প্রবন্ধ, খেলা, গল্প প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে ৫০টিরও
বেশি বই প্রকাশিত করেছেন, যার অনেকগুলিই বেস্ট-সেলার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছি! নবকল্লোল,
শুকতারা, কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকার নিয়মিত লেখক। দেশ, অমৃত পত্রিকাতেও তাঁর
কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সনৎ সিংহ ও শর্মিষ্ঠা চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তাঁর কবিতা ও ছড়ায় সুর করে
গানের ক্যাসেট বের হয়েছে |
১৯৭৭ সালে নাগাদ তিন বছর ধরে তিনিই প্রথম “মিমি” নামের একটি শিশুদের মিনি পত্রিকা প্রকাশিত
করেন | যার দাম ছিল মাত্র ২০ পয়েসা!
কবি বরুণ মজুমদার আর সংবাদপাঠক বরুণ মজুমদার যে একই ব্যক্তি, এটা জেনেও বহু মানুষ বিস্ময়
প্রকাশ করেছেন!
আমরা আনন্দিত এই জন্য যে আমাদের সাইটে, কবি তাঁর কিছু স্বনির্বাচিত কবিতা আমাদের তুলতে
দিয়েছেন |
২০১৯ সালের ১৪ই অক্টোবর তারিখে কবি পরলোকে গমন করেন। মিলনসাগরে কবি বরুণ মজুমদারের এই
পাতা তাঁর প্রতি মিলনসাগরের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
কবির বাসস্থানের ঠিকানা -
১২৪/২/৪, রামকৃষ্ণপুর লেন, হাওড়া - ৭১১১০২।
কবিপুত্র বিভাষ মজুমদারের ইমেল - bivashmazumder@gmail.com
কবি বরুণ মজুমদারের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
উত্স -
কবি বরুণ মজুমদারের সঙ্গে একটি সাক্ষাত্কার। তাঁর হাওড়ার বাসগৃহে মিলনসাগরের পক্ষে সাক্ষাত্কারটি
নিয়েছিলেন মিলন সেনগুপ্ত।
আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-
srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১২.১১.২০১০
কবির প্রয়াণে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১১.১১.২০১৯