আমার ভারতবর্ষ পঞ্চাশ কোটি নগ্ন মানুষের যারা সারাদিন রৌদ্রে খাটে, সারারাত ঘুমুতে পারে না ক্ষুধার জ্বালায়, শীতে ; কত রাজা আসে যায়, ইতিহাসে ঈর্ষা আর দ্বেষ আকাশ বিষাক্ত করে জল কালো করে, বাতাস ধোঁয়ায় কুয়াশায় ক্রমে অন্ধকার হয় | চারদিকে ষড়যন্ত্র, চারদিকে লোভীর প্রলাপ যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ আসে পরস্পরের মুখে চুমু খেতে খেতে মাটি কাঁপে সাপের ছোবলে, বাঘের থাবায় ; আমার ভারতবর্ষ চেনে না তাদের মানে না তাদের পরোয়ানা ; তার সন্তানেরা ক্ষুধার জ্বালায় শীতে চারিদিকের প্রচণ্ড মারের মধ্যে আজও ঈশ্বরের শিশু, পরস্পরের সহোদর |
হোক পোড়া বাসি ভ্যাজাল মেশানো রুটি তবু তো জঠরে, বহ্নি নেবানো খাঁটি এ এক মন্ত্র ! রুটি দাও, রুটি দাও ; বদলে বন্ধু যা ইচ্ছে নিয়ে যাও : সমরখণ্ড বা বোখারা তুচ্ছ কথা হেসে দিতে পারি স্বদেশেরও স্বাধীনতা |
শুধু দুই বেলা দু'টুকড়ো পোড়া রুটি পাই যদি তবে সূর্যেরও আগে উঠি, ঝড়ো সাগরের ঝুটি ধরে দিই নাড়া উপড়িয়ে আনি কারাকোরামের চূড়া : হৃদয় বিষাদ চেতনা তুচ্ছ গণি রুটি পেলে দিই প্রিয়ার চোখের মণি |
মুখোশ কাব্যগ্রন্থঃ "রাণুর জন্য" (১৩৫৮) কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
কান্নাকে শরীরে নিয়ে যারা রাত জাগে, রাত্রির লেপের নিচে কান্নার শরীর নিয়ে করে যারা খেলা পৃথিবীর সেই সব যুবক যুবতী রোজ ভোর বেলা ঘরে কিংবা রেস্তোরাঁয় চা দিয়ে বিস্কুট খেতে-খেতে হঠাত্ আকাশে ছোঁড়ে দু-চারটি কল্পনার ঢেলা এবং হাজারে কয় রান ক'রে আউট হ'য়ে গেছে ভুলে গিয়ে তারা হয় হঠাত্ অদ্ভুত | যুবতীকে মনে হয়, কোনো-এক রহস্যের দূত কার যেন স্মৃতিমুখ পাঠায়েছে আমাদের মতো কোনো প্রণয়ীর কাছে ; সুন্দর কি কুত্সিত জানি না, তবু জানি মার্চেন্টের মারে নেই এই সব খুত |
কান্নাকে সরিয়ে রেখে দৈনিক কাগজ খুঁজি তাই, যুবককে ভুলে যাই, যুবতীকে দূরে-দূরে রাখি ; তারপর কোনো দিন যদি মনে হয় দিনগুলি বাসি বড়ো, বিবর্ণ, একাকী, প্রেমিক কি উদ্বাস্তুর মতো এক সমস্যার নিতান্তই মূর্খ হ'য়ে গেছে আমার কী আসে যায়, তুড়ি মেরে এগজামিনে দিয়ে যাবো ফাঁকি !
অথবা কবিতা দিয়ে সমর্থন জানাবো তোমাকে, হে প্রেমিক, হে উদ্বাস্তু, তোমাদের দুঃখে আমি গলে হব নদী !
হে দিন, হে কালরাত্রি, না হয় আগলাবো আমি তোমাদের দুর্দিনের গলি | তোমরা নির্বোধ হাতে স্মৃতিমুখ খুঁজে-খুঁজে প'ড়ে যাবে যখন অসুখে, তোমাদের দুঃখে আমি ম'রে যেতে রাজি আছি---কারো দুঃখে মরা যায় যদি | কী আশ্চর্য ! সেই ছেলে আমার দর্শন শুনে তবু অর্ধেক বিস্কুট ফেলে রেস্টোরেন্ট থেকে চ'লে গেলো | সেই মেয়ে সিনেমার বিজ্ঞপনে ভিড়ে ডুবে গেলো, তারপর কী যেন বললো সঙ্গিনীকে | মনে হ'লো হেমিংওয়ে মম্ নিয়ে ওদের বিবাদ আজন্ম চলছে যেন, বন্ধুত্বটা কোনোমতে আছে তবু টিকে ! হঠাত্ পড়লো চোখে কাগজের এডিটোরিয়াল, আমেরিকা ভালো, চীন ভালো... ষ্ট্রম্যান পাঠাবে অন্ন আমাদের কাল হৃদয় জুড়ালো |
গুলি চলছে, গুলি চলছে, গুলি চলবে --- এই না হলে শাসন? ভাত চাইতে গুলি, মিছিল করলে গুলি, বাংলা বন্ ধ গুলির মুখে উড়িয়ে দেওয়া চাই | দেশের মানুষ না খেয়ে দেয় ট্যাক্স, গুলি কিনতে, পুলিশ ভাড়া করতে, গুণ্ডা পুষতে ফুরিয়ে যায় তাই | একেই বলে গণতন্ত্র ; এরই জন্য কবিতার সর্দার সাহিত্যের মোড়লরা কেঁদে ভাসান ; যখন গুলিবিদ্ধ রক্তে ভাসে আমার ঘরের বোন, আমার ভাই |
১ রাজা আসে যায় রাজা বদলায় নীল জামা গায় লাল জামা গায় এই রাজা আসে ওই রাজা যায় জামা কাপড়ের রং বদলায়.... . দিন বদলায় না! গোটা পৃথিবীকে গিলে খেতে চায় সে-ই যে ন্যাংটো ছেলেটা কুকুরের সাথে ভাত নিয়ে তার লড়াই চলছে, চলবে | পেটের ভিতর কবে যে আগুন জ্বলেছে এখনো জ্বলবে!
২ রাজা আসে যায় আসে আর যায় শুধু পোষাকের রং বদলায় শুধু মুখোশের ঢং বদলায় . পাগলা মেহের আলি . দুই হাতে দিয়ে তালি এই রাস্তায়, ওই রাস্তায় . এই নাচে ওই গান গায় : "সব ঝুট হায়! সব ঝুট হায়! সব ঝুট হায়! সব ঝুট হায়!"
৩ জননী জন্মভূমি! সব দেখে সব শুনেও অন্ধ তুমি! সব জেনে সব বুঝেও বধির তুমি! . তোমার ন্যাংটো ছেলেটা . কবে যে হয়েছে মেহের আলি, . কুকুরের ভাত কেড়ে খায় . দেয় কুকুরকে হাততালি... . তুমি বদলাও না ; . সে-ও বদলায় না!
কুৎসিত বাঁকানো মুখে জীবনের অদ্ভুত উত্সব অফুরন্ত আলোকের উদ্ভাসিত ঐশ্বর্যে, প্লাবনে ; ধীরে ধীরে সেই মুখ হয়ে এলো আশ্চর্য সুন্দর অবিশ্রাম তারা-ঝরা জীবনের বর্ষণে ও গানে |
অনেক দেখেছি ছবি, দেখিনি উন্মত্ত দ্বিপ্রহর পদ্মার কি মেঘনার নীলকণ্ঠ স্বর্ণায়ু জটায়, সাপ-খেলানোর নেশা মৃত্যু দিয়ে কেনে বাজিকর দেখিনি এমন ছবি মথুরায় কিম্বা অযোধ্যায় কোনদিন! আজ দেখি রঙচটা তথাপি বিচিত্র, অসুন্দর, তবু মুখ সূর্যের কি সমুদ্রের মিত্র |
এই ছবি দেখে দেখে স্পষ্ট হ'লো কেন মরা হাড়ে দধীচি এখনো বজ্র | সব গ্রহ আগুন তো নয় একথা যেমন সত্য, তবু কেউ পুড়ে যেতে চায় পৃথিবীকে আলো দিয়ে, কী আশ্চর্য, সে-ই সূর্য হয়!