কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
দেওয়ালের লেখা     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


দেওয়ালের লেখাগুলিকে
কারা যেন মুছে দিতে চাইছে |
কারা যেন
বত্রিশ সিংহাসনের প্রচণ্ড স্পর্ধায় চক্ষু লাল ক'রে
নির্দেশ দিচ্ছে : "এবার থামো ;
এখন থেকে বিপ্লব আমাদের হুকুম মেনে চলবে" |

একবার সিংহাসনে উঠে বসতে পারলে
তখন দেওয়ালের লেখাগুলি অশ্লীল প্রলাপের মতো মনে হয় |
তখন অপরের পোস্টার ছেঁড়াই শ্রেণী-সংগ্রামের কাজ ;
অথবা ডজন খানেক মন্ত্রী জড়ো ক'রে রাস্তায় বক্তৃতা দেওয়া :
"সাবধান! যারা দেয়ালকে কলঙ্কিত করছ! তোমাদের পেছনে
.                            এবার গুণ্ডা লেলিয়ে দেব |"

তারা বত্রিশ সিংহাসনের আশ্চর্য মহিমায়
এখন থেকে বাংলা দেশের তামাম দেওয়ালগুলোকে
নতুন ক'রে চুনকাম ক'রে দেবে, যেন কোথাও কোনো
.                            গুলি খাওয়া মানুষের রক্ত
ছিটেফোঁটাও দাগ না রাখে |

.       ******************   ২২ মার্চ ১৯৬৯   

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে
ছিঁড়ুক সর্বাঙ্গ তার ভাড়াটে জল্লাদ ;
উপড়ে নিক চক্ষু, জিহ্বা দিবা-দ্বিপ্রহরে
নিশাচর শ্বাপদেরা ; করুক আহ্লাদ
তার শৃঙ্খলিত ছিন্নভিন্ন হাত-পা নিয়ে
শকুনেরা | কতটুকু আসে-যায় তাতে
আমার, যে-আমি করি প্রত্যহ প্রার্থনা,
"তোমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে |"

যে-আমি তোমার দাস ; কানাকড়ি দিয়ে
কিনেছ আমাকে রাণী, বেঁধেছ শৃঙ্খলে
আমার বিবেক, লজ্জা ; যে-আমি বাংলার
নেতা, কবি, সাংবাদিক, রাত গভীর হ'লে
গোপনে নিজের সন্তানের ছিন্ন শির
ভেট দিই দিল্লীকে ; গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে
ভোরবেলা বুক চাপড়ে কেঁদে উঠি, "হায়,
আত্মঘাতী শিশুগুলি রক্তে আছে শুয়ে!"

আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে আশ্চর্য চুমায়
তোমারই দাক্ষিণ্য, রাণী দিয়েছ নিভৃতে ;
এবার পাঠিয়ে দাও প্রকাশ্যে ঘাতক,
বাগানে যে-ক'টি ফুল আছে ছিঁড়ে নিতে |
প্রত্যেক কাগজে আমি লিখবো ফুলের
ভেতর পোকার নিন্দা, খুনীর বাহবা
প্রত্যহ বাংলার শিশু-গোলাপ ক'টির
সর্বনাশে সরগরম করবো আমি সভা |

আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে
ছিঁড়ুক সর্বাঙ্গ তার ভাড়াটে জল্লাদ ;
উপড়ে নিক চক্ষু, জিহ্বা দিবা-দ্বিপ্রহরে
নিশাচর শ্বাপদেরা ; করুক আহ্লাদ
তার শৃঙ্খলিত ছিন্নভিন্ন হাত-পা নিয়ে
শকুনেরা | কতটুকু আসে-যায় তাতে
আমার, যে-আমি করি প্রত্যহ প্রার্থনা,
"তোমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে |"

.         ******************  ১৯৭০  

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এই নরকে     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


কবিরা কোথায় আজ? উত্তরার জলসা-ঘরে এখনো কি নাচ সেখায় তারা?
এদিকে যে শমীবৃক্ষে মন্ত্রপড়া অস্ত্রগুলি কীচকের বাড়ায় আহ্লাদ!
শুনি পাড়ায় পাড়ায় জল্লাদের আস্ফালন ; দেখি ঘরে ঘরে
.                        নরখাদকের রক্তমাখা থাবা, পিশাচের মার...
কবিরা কোথায় আজ? সবাই কি দুর্যোধনের কেনা,
.                                            নাকি বিরাট রাজার কৃতদাস |

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একলা জেলে বন্দী তিনি     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


একলা জেলে বন্দী তিনি
শোনেন, দূরে চিড়িয়াখানায়
বাঘ ডাকছে | আবার কখন
বাঘের ডাককে ছাড়িয়ে যায়

একশো গাধার জয়ধ্বনি
দিনদুপুরে---শোনেন তিনি |
শুনতে শুনতে ভাবেন তিনি
বাঘের তাতে কী আসে যায়?

মানুষের বা কী আসে যায়?

.        ********* ৩ আশ্বিন ১৩৮৪     

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মহান নেতৃবৃন্দ     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত "চাচা
আপন বাঁচা"-র ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ;
যদিও নিজেকে সে তুলতে চায় সে মাচায়,
ভুলে যায়, যারা গতকাল ছিল মিত্র
এখনো পচছে খাঁচায়...

কিন্তু সে বেপরোয়া |
"আগে নিজে বাঁচো, তবে আকাশ ছোঁয়া
পাহাড়ে উঠবে |" বলেছেন নাকি লেনিন :
বেনামে স্তালিন, স্বপ্নে মাও সে তুং :

"জাহান্নামে যে যাবে, তাকে যেতে দিন---
আবার আসবে বদলা নেবার দিন |

মহান নেতৃবৃন্দ! যে মরে মরুক, আপনারা
.                                  সুখে বাঁচুন ||"

.        ********* ১৯৭৮     

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ফুটপাথের কবিতা : এক
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


ন্যাংটো ছেলে আকাশে হাত বাড়ায় |
যদিও তার খিদেয় পুড়ছে গা
ফুটপাতে আজ লেগেছে জোছ্না---
চাঁদ হেসে তার কপালে চুমু খায় |

লুকিয়ে মোছেন চোখের জল, মা |

.    *********  ১৯৭৯           

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ন্যাংটো ছেলে আকাশ দেখছে     
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


ঘর ফুটপাথ
আহার বাতাস,
ন্যাংটো ছেলেটা
দেখছে আকাশ |

সেখানে এখন
টেক্কা সাহেব
বিবি ও গোলাম---
রাজ্যের তাস

সবাই ব্যস্ত ;
সবাই করছে
চাঁদ-সূর্য ও
তারাদের চাষ ;

সবাই চাইছে
রাজত্ব, আর
সবাই লিখেছে
দারুণ গল্প |

সেই শুধু ফুট-
পাথের ন্যাংটো
ছেলে, তাই তার
বুদ্ধি অল্প---

দূর থেকে তাই
দেখেছে দৃশ্য,
দেখছে এবং
দিচ্ছে সাবাস!

.    ********* ২৪ জুলাই ১৯৭৬

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
*
ফুটপাথের কবিতা : দুই
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


পেটের আগুন খিদে
হাঁটতে শিখছে |
লার রক্ত খিদে
পৃথিবী দেখছে!

হাতদুটি তার খিদে
কেবল বলে : "দে!"
পা দুটি তার খিদে
পৃথিবী গিলছে |

.    ********* ২১ মার্চ ১৯৮১       

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আকাল
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


সারাবছর অমাবস্যা, সারাবছর
"নেই বৃষ্টি"-র অন্ধকার
এ কোন্ বসুন্ধরা আমার, শোনাস্
বারমাস্যা মাটির হা---হা!

গাঁয়ের মানুষ মাঠে যায় না, শুকনো কুয়ো
জল দেয় না--- সারা বছর
হাতের মুঠোয় কান্না ছাড়া আর কিছু নেই ;
সন্ধ্যাবাতি না জ্বলতেই রাজ্যি জুড়ে
শেয়াল ডাকে!

নাকি মানুষ, দিনের আলোয় যাদের দেখলে
পুলিশ পালায়? ঘুমের মধ্যে তারা আসে,
স্বপ্নে আসে সমস্ত রাত!

ফুল্লরা | তুই বুকের জ্বালা বলবি কাকে?
কে শুনতে চায় একটার পর একটা অসুখের গল্প, যখন
রাত ফুরলে দিন আসে না---শুধু আকাল, শুধু শ্মশান---
শ্মশান জুড়ে ভুতের নৃত্য | যাকে জানতি সূর্য্যি ঠাকুর
সে এখন ডাকাতের রাজা | আকাশ খেয়ে, মাটি খেয়ে
তার খিদে মেটে নি---এবার তোদের খাবে |

.    ********* ৯ ডিস্মেবর ১৯৮২

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ক্রোধ যা অগ্নির মতো            
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


ক্রোধ যা অগ্নির মতো
আমাকে দিও না আর
ঘৃণা যা অগ্নিতে ঘৃত
আমাকে দিও না আর |

আমার যজ্ঞের ঘোড়া
নিয়ে যাক যুবকেরা
বাঘের সাহস চোখে
আগুনে হাঁটুক তারা |

আমার বয়স গেছে
আমার সাহস গেছে
যে প্রেম অপ্রেমে জ্বলে
সে আমাকে ছেড়ে গেছে |

আমার পৃথিবী থেকে
যুবকেরা চলে গেছে
যেখানে জীবন আছে
যেখানে কবিতা আছে...

.    ********* সপ্টেম্বর ১৯৮৩      

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর