কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
এখন সন্ধ্যা নেমেছে            
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


যাঁরা এলেন, তাঁদের আমি চিনি না
তাঁরা আমাকে স্পর্শ ক'রে বললেন, "তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন |"

যাঁদের চিনি তাঁরা কেউ আজ আসেন নি |
এখন আকাশে সন্ধ্যা নেমেছে, একটি দু'টি তারা
দেখা যাচ্ছে |
আমি প্রতীক্ষা করছি যে-কোনো চেনা-মুখের জন্য!

.                ********* ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৫   

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঠাকুরপুকুর হাসপাতালে           
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


এ লড়াই মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের
আর হার-জিত দুটো কথাই যখন অভিধানে রয়েছে
বিনা যুদ্ধে কেউ কাউকে মাটি ছেড়ে দেবে না |

শুধু ডাক্তার আর নার্সরাই নন
যাদের নামের পিছনে মৃত্যুর পরোয়ানা ঝুলছে
তারাও জানে, এখানে পিছন-হটার কোনো কারন নেই |
মৃত্যুকে হটিয়ে দেবার কঠিন সংকল্প নিয়ে
তারাও এখানকার মাটিতে, ঘাসে, পায়ের ছাপ রেখে যায় |
কেউ কেউ বাড়ি ফেরে না, কিন্তু যারা ফেরে, তাদের
কণ্ঠে আমরা শুনতে পাই নবজীবনের গান |

.       ********* ৪ বৈশাখ ১৩৯২

.                     *******************
.                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শীত         
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


"সুখে থাকো"!---
বলে পাখি,
বলে ফুল |

কাকে বলে?

এখন বাতাসে
শীত,
এখন মাটিতে
শীত |

ফুটপাথের ন্যাংটো ছেল,
তার শীত নেই
কিন্তু খিদে আছে ;

কিংবা খিদে তার শীতকেও
চায়
গিলে খেতে...
পাখি দূর থেকে
তাকে দেখে,
ফুল দূর থেকে
তাকে দেখে |

তারপর
পাখি উড়ে যায়,
তারপর
ফুল যায় ঘুমুতে |

সুখে থাকার পৃথিবী
পড়ে থাকে
কালো মানুষের স্বপ্ন,
ছেঁড়া কাঁথা গায় দিয়ে
ধূলোয় |

অনেক দূর থেকে
বাতাসে তখনও শব্ দ
ভেসে আসে :
"সুখে থাকো" |

আর গন্ধ ভেসে আসে,
ভাতের |




.    ********* ১ জানুয়ারি ১৯৮৪

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
উলঙ্গের স্বদেশ      
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  
The proletariat has nothing to loose but his chains.
.                                                                --- Communist Manifesto

এক অদ্ভুত মাটির উপর
আমরা দাঁড়িয়ে আছি ;
অর্থাৎ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য
প্রাণপণ চেষ্টা করছি

এ মাটির গর্ভে কী আছে
আজও আমাদের জানা নেই
যদিও কান পাতলে শুনতে পাওয়া যায়
এক লক্ষ সাপের গর্জনের চেয়েও
কোন ভয়ঙ্কর পরিণাম, যা ক্রমেই আসন্ন হচ্ছে |

কিন্তু আমরা এক পা-ও এদিক ওদিক
নড়ছি না ; যেন স্থির দাঁড়িয়ে থাকাই
আমাদের নিরাপত্তা, এবং তা সম্ভব | আমরা গির্জার গম্বুজগুলির
এবং স্টক এক্সচেঞ্জের চার দিকের বিরাট স্তম্ভগুলির দিকে
বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থেকে
এক সময় ঈশ্বরের মহিমাকে জানতে পারছি
আর এই কথা ভেবে নিশ্চিন্ত হচ্ছি---
আমাদের স্বদেশ স্বাধীন এবং তার সীমান্তে
বন্দুকধারী প্রহরীরা প্রত্যহ টহল দিচ্ছে |

যদিও পায়ের নিচে মাটি এখন অগ্নিগর্ভ ;
যদিও আমাদের মাথার উপর আকাশ বলতে কিছুই নেই |

.       ********* ২২ জুলাই ১৯৬৮   

.                     *******************
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নীরেন, তোমার ন্যাংটো রাজা           
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


নীরেন! তোমার ন্যাংটো রাজা
পোশাক ছেড়ে পোশাক পড়েছে!
নাকি, তোমার রাজাই বদলেছে?

সেই শিশুটি কোথায় গেল
যেই শিশুটি সেদিন ছিল?
নীরেন, তুমি বলতে পারো,
কোথায় গেল সে?
নাকি, তুমি বলবে না আর ;
তোমার যে আজ মাইনে বেড়েছে!

হেইও হো! হেইও হো!
পোষাক ছাড়া নীরেন, তুমি,
তুমিও ন্যাংটো |
কিন্তু ঘরে তেমন একটি
আয়না রাখে কে?
এই রাজা না, ঐ রাজা না |
তুমিও না ; আমিও না |

হেইও হো! হেইও হো!
পোষাক ছাড়া নীরেন, আমরা,
সবাই যে ন্যাংটো |
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই
রাজার রাজত্বে!

কিন্তু তুমি বুঝবে কি আর ;
তোমার যে ভাই, মাইনে বেড়েছে!

.                     *******************
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আর এক মহিষাসুর
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


অসুর রে। তুই যাত্রাদলে যেই লেখালি নাম,
হলি মহিষাসুর, সে কী তিড়িং নাচ তখন তোর ;
বাপ রে সে কী ভয়-দেখানো সার্কাসের খেলা !

যতই বাড়ে বেলা, ততই মেজাজ তোর চড়া ,যেন
এর মুন্ডু খসাবি, ওর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাবি !
আমরাভাবি কোথায় পালাই,এমনি তোর হুলস্থুল কান্ডকারখানা !
তোকে করবে মানা,কারুর নেই এমন বুকের পাটা-
তুই যে বাপের ব্যাটা । পরের হাড় কড়মড় করে খাওয়াই
.               ধর্ম তোর,সেই তোর ছৌ-নাচ!
সূর্য় অস্ত গেলে বুঝি এবার শান্তি-কিন্তু তুই স্বয়ং অশান্তি;
হুঙ্কারে তোর গাছগুলিও পাথর,কোলের শিশু কান্না ভুলে
.                   কঠিন কাঁপতে থাকে-
গাঁয়ের মানুষ যে-যার ঘরে দরজা দিয়ে সমস্ত রাত জেগে কাটায় !
যতক্ষণ না ফুরায় তোর স্পর্ধা,তোর সার্কাস,তোর মুখোস নাচের বাহাদুরি-
যতক্ষণ না পাড়ার থুথ্বুড়ে বুড়ি তোর দু’গালে চড় ক’ষিয়ে
  বলে তোকে হারামজাদা! এবার ঘুমুতে যা !

.                     *******************
.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বক্তৃতা বাবু
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


হেই বক্তৃতা বাবু!  তুই হুই শহরের সাততলা বাড়ী থেকে
নামলি মাচায়, এলি গাড়ী চড়ে মিটিং করতে
আমাদের শরীরের কালো রঙ সাবান মাখিয়ে ফর্সা করতে,আমাদের
.                 ছেলেমেয়েদের ভালো,সভ্যকরতে ;
এলি যেন লাটসাহেবের নাতি! বক্তৃতা দিয়ে যাবিও সেখানে---
কল টিপলেই জল পড়ে। ঘর আলো হয় ঘুটঘুটে কালো রাতে;
আবার বিজলি পাখাও ঘোরে- বক্তৃতা দিয়ে শরীরে যদি ঘাম
.                  লাগে তোর, বক্তৃতা বাবু!
তুই বড় ভালো ছেলে। আমাদের জন্য কত যে খাটিস-পিটিস!
কেবল ঘরের বিজলী পাখাটা বন্ধ হলেই মেজাজ গরম;
জলকে বরফ করার যন্ত্র-সেটাও বিকল!
তুই না রাজার বেটা! রেশনে চাল ছেড়ে দিয়ে খাস বাসমতী চাল-
তবু আমাদের জন্য রাত্রে ঘুমাস না তুই ; আহারে সোনার বাবু!

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রতিবাদ
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


এভাবে মানুষ নিয়ে খেলা
মানুষের স্বপ্ন সাধ বিশ্বাস সন্মান নিয়ে
মানুষের মস্তিস্ক হৃদয় নিয়ে
হৃৎপিণ্ড ধমনী রক্ত অস্থি নিয়ে খেলা
চক্ষু জঠর গর্ভ পৌরুষ মাতৃত্ব নিয়ে খেলা    

গর্ভের সন্তান আর তারও পর যারা আসবে
আর যারা ইতিমধ্যে হামাগুড়ি দিচ্ছে,বইখাতা নিয়ে স্কুল কিংবা কারখানায়
যে-সব শিশু  বালক-বালিকা,
স্বাধীন দেশেই যারা জন্মেছে, স্বাধীন দেশে জন্মাবে,
তাদের স্বাস্হ্য ঘরবাড়ি পড়াশুনা  নিয়ে
তাদের মুখের ভাত নিয়ে এই খেলা
জন্মভূমি নিয়ে, দেশের নগর গ্রাম খামার কারখানা নিয়ে
দেশের সীমান্ত নিয়ে,দেশের ভিতর
পোস্টাপিস রেলগাড়ী রাস্তাঘাট হাসপাতাল স্কুল-কলেজ নিয়ে
দেশের ভূগোল ইতিহাস বিঞ্জান সাহিত্য নিয়ে
গান নিয়ে, ছবি নিয়ে,নুন আর রুটি নিয়ে
দেশের আকাশ জল মাটি আলো অন্ধকার নিয়ে
এই খেলা, এই ভয়ঙ্কর খেলা

এর চেয়ে আর কী নরক,স্বাধীন স্বদেশ।

.                     *******************
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
স্বদেশপ্রেমের  দীপ্ত মহিমায়
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


কে তুমি হে!  দেবদারু বীথিতেও গন্ধ পাও কালো পুলিশের ?
তোমার অসীম স্পর্ধা ! জাননা কি এখন স্বদেশ
ভিতরে বাহিরে নিস্প্রদীপ, তার বাতাসে বিষের ধোঁয়া
কে তাকে বাঁচাতে পারে যদি না পুলিশ ঢালে বৃক্ষের শিকড়ে গ্যালন
.                        গ্যালন রক্ত?
কার রক্ত-নির্বোধের মতো প্রশ্ন কর তুমি । দুধ-কলা দিয়ে পোষা
সাপ তার । দেবশিশু তোমার চোখের ভ্রম ! ওরা কেউ শিশু নয়,জানে
.                        তা পুলিশ,জানে দিল্লীর ঈশ্বরী।
তুমি অন্ধ! তাই গাছের পাতায় কালো ছায়া দেখ, গোলাপেও পুলিশের
গন্ধ পাও, যে-সুবাস পবিত্র,নিহত পশুর রক্ত। যার চোখ আছে,দ্যাখে
কলকতায় পার্কে ময়দানে রাজভবনে অথবা এঁদো গলির
.                       বস্তির মুখ আলো ক’রে
যেখানে যা বৃক্ষ আছে, ঈশ্বর-প্রতিম তারা,স্বদেশ-প্রেমের দীপ্ত মহিমায়
.                        জ্বলে যেন ত্রিবর্ণ পতাকা!

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শান্তি, ওঁ শান্তি    
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


শান্তি,ওঁ শান্তি! তুমি সর্বত্র বিরাজো
পশ্চিম বাংলার পীঠস্থানে ।
আহা! সম্রাটের মহিমায় তুমি সাজো
যা অশান্তি, অবাধ্যতা তোমার চরণতলে পিষ্ট করতে যুগ সন্ধিক্ষণে !
আমাদের সন্তানের মুন্ডুহীন ধড়গুলি তোমার কল্যাণে ঘোর
.                            লোহিত পাহাড় ;
আমরা সেই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে গাইব উলঙ্গের স্বদেশ-বন্দনা ;
‘শান্তি, ওঁ শান্তি! তুমি কি বাহার সেজেছ বাহার’
আ মরি পশ্চিম-বাংলা ! তোর রক্তে স্বদেশের নিরাপত্তা,ঘরে ঘরে
.                            সোনার আলপনা !

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*