রাস্তায় যে হেঁটে যায় জানে কি সে, কার এই রাস্তা ? এ শহর কার? এই দেশ ...... নাকি ভাবে সবার ! এ রাজপথ রাজার এবং ভিক্ষুকের । এ রাজপথ রাজার এবং ভিক্ষুকের । এই দেশ ইন্দিরার, এবং যে জেলখানায় রাত কাটায়,তার......
চোপ রও,উল্লুকের বাচ্চা !বাঁচতে চাও, এই রাস্তা ছেড়ে হাঁটো !বাঁচতে চাও, ভুলে যাও এই শহরের নাম ! এই দেশ ফুটপাতে শুয়ে থাকা উলঙ্গের ; কিন্তু যে উলঙ্গ আকাশের দিকে মাথা রেখে জেগে থাকে, তার নয়।
হওয়া না-হওয়ার গল্প কাব্যগ্রন্থঃ "আর এক আরম্ভের জন্য" কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সে চেয়েছিলো একটি সত্যিকারের প্রেমের কবিতা লিখতে।
তার তো একটাই জীবন। মানুষের জীবনে প্রেমের চেয়ে নির্মল পিপাসার জল আর কী থাকতে পারে?
সে আরও অনুভব করতো প্রেমই কবিতার প্রাণ, তার শব্দ, তার ধ্বনি – তার মন্ত্র।
কিন্তু তবু তার কবিতা, একটার পর একটা তার নিজের লেখা কবিতা কি প্রেম কি জল এমনকি পায়ের নিচের শক্ত মাটি পর্যন্ত খুঁজে পেলো না। কবিতার জন্য তার দিবস-রজনীর জাগরণ যা ছিলো তার জীবনের কঠিনতম সত্য প্রেম নয় – তাকে বারবার অপ্রেমের দারুণ আগুনে ছুঁড়ে দিয়ে বলতোঃ ‘এখানেই তোর পরিশুদ্ধি। এই যে আগুন, মানুষের পৃথিবী আগে তার খিদে মেটা। তোর সমস্ত কবিতা, তোদের সমস্ত কবিতা সে তার ক্ষুধার্ত জিভ দিয়ে চেটে খাবে। তুই মুর্খ, জীবনের পাঠ এখান থেকেই শুরু কর।‘
দেখতে দেখতে তার কৈশোর গেল, যৌবন গেল, এখন তার মাথার সব চুল সাদা, হাতের পাঁচ আঙুলে মাঘের শীত! মাঝেমধ্যেই রাতদুপুরে ঘুমুতে না-পারার যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠতোঃ ‘আমি একটি প্রেমের কবিতা লিখতে চাই, মাত্র একটি প্রেমের কবিতা।‘ আর তখনই শোনা যেত তার মাথার ভিতর, তার বুকের মধ্যে সেই কঠিন তিরস্কারঃ ‘বুড়ো হয়ে গেলি, এখনও স্বপ্ন দেখছিস! দ্যাখ! ভাল করে দ্যাখ! তোর চারদিকে এখন হলুদ হেমন্তের পৃথিবী। কিন্তু তারপর? তারপর কী দেখছিস? – ধান কাটা হয়ে গেছে, চাষীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে... কিন্তু মাঝখানে ও কে? ওরা কারা?’
দেখতে দেখতে তার পাকা ধানের হলুদ পৃথিবী খুনখারাপি লাল, লাল থেকে আগুন! আবার আগুন! ‘আগুন! তুমি আমাকে সারা জীবন ধরে পুড়িয়েছ। কিন্তু আমি তো শুদ্ধ হলাম না। শুধু পুড়ে গেলাম। আমি সারা জীবন শুধু হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস, তাদের সর্বনাশ আমার জটায় বেঁধে সরস্বতী-নদীর জলে ঝাঁপ দিতে গেলাম, কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না। তুমি আমাকে কী জীবন শেখাও, আগুন? – এই কি মানুষের জীবন!’
তার একটিমাত্র প্রেমের কবিতা? ... ‘কবিতা! তুমি এখন তিন ভুবনের কোন্ অতলান্ত অপ্রেমের মধ্যে ঘুমিয়ে আছ? ঘুমাও! তুমি ঘুমাও! আর, আমি জেগে থাকি আর এক আরম্ভের জন্য... মৃত্যুর মুখোমুখি... আমি জেগে থাকি...
আমরা কৃতজ্ঞ কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য কবি বিপুল চক্রবর্তীর কাছে, জিনি আমাদের অনুরোধে এই প্রায় দুষ্প্রাপ্য কবিতাটি আমাদের ইমেল করে পাঠিয়েছেন |
মানুষের নামে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গোপাল হালদার ও মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকার মাঘ ১৩৭০ (জানুয়ারী ১৯৬৪) সংখ্যায় প্রকাশিত।
কালা সাদা হলদে বাদামী নানা রঙের মানুষ শিশু বৃদ্ধ যুবক যুবতী দেশে দেশে যারা পাখির চেয়েও বড় প্রতীক্ষার নীড় বাঁধে জনক জননী সন্তান সন্ততি-কে নিয়ে
তাদের আমি দেখতে পৃথিবীর সব দেশে রুশ ভারত চীন আমেরিকা মিশর পাকিস্তান . কংগো কিউবা যেখানে যখন একটি সদ্যোজাত শিশুর কান্না শুনি অথবা প্রেমিক প্রেমিকার মৃদু গুঞ্জনে অনুভব করি . একটি রাত ভোর হচ্ছে তাদের আমি দেখতে পাই
অন্ধকারের মধ্যে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আর . তখনই তাদের মুখে আমার নিজের নাম শুনতে পাই বুঝতে পারি আমিও একজন মানুষ, পবিত্র . এবং নিরপরাধ॥
এই স্বাধীনতা প্রাণহীন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সান্যাল সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকার বৈশাখ-আশাঢ় ১৩৮১ (মে-জুলাই ১৯৭৪) সংখ্যায় প্রকাশিত।
সাতাশ বছর ধ’রে এই স্বধীনতা, প্রাণহীন, ধাতব শব্দের উচ্চারণ শুধু!
কে শেখাও আমাকে সংবিধানের মহিমা : গণতন্ত্র : দেশপ্রেম ? এই দেশে পদব্রজে একগ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতে কঠিন নিষেধ! তোমাকে পেছিন থেকে, সামনে থেকে ভয় দেখাবে হাজার হাজার শবদেহের নৈঃশব্দ আর শ্মশানের অন্ধকার!
যতদূর যাওয়া যায় স্মশান ও শবদেহ, নৈঃশব্দ ও অন্ধকার ; এ-আমার দেশ! নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, বুক এমন পাথর : অথচ পাথরে একদিন দুর্বাশ্যাম কিশলয় জন্ম নেয় ; আমার তেমন কোনো উত্তরণ, এই দেশে, ঘোর উন্মাদের প্রলাপের মত মনে হয়।