অমর আশা কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদিত “প্রেম যুগে যুগে” কাব্য সংকলন ১৩৫২ (১৯৪৫) থেকে।
ক্ষমা করো অনুপমা! তোমারে বুঝিয়াছিনু ভুল ; অলস মস্তিষ্কে ছিলো বুদ্ধিদীপ্ত বাক্যেরা নির্বাক! অভাবে মরিচা পড়ে হৃদয়ের তীক্ষ্ণ ছুরিকায়। . . অতীতের কথা মোর অতীতেই তাই ফিরে যাক। আজ তুমি ফিরে এসো, মুখোমুখী বসি আরবার, ভালো করে ও নয়নে এ ক্ষুধার্ত নয়ন মেলাই। পুরাতন সব দ্বন্দ্ব, মানসিক মিথ্যা আভরণ পরিত্যক্ত পড়ে থাক্। চলো মোরা ঘরে ফিরে যাই।
যে প্রেম ঘুমায়েছিলো ঈর্ষা-অন্ধ-মৌনবক্রতায় তাহারে পৌরুষ দানো,---মৃত্যুত্তীর্ণ মুক্তির ফসল! চিত্ত তার মরুচারী অগ্নিগর্ভ তপ্ত লাভাস্রোত, তোমার পশে হোক্ উজ্জীবন-সিক্ত সুনির্মল!
অশান্ত এ নগরীর ছিন্নপথে আমরা অমর চিরদিন রহিব না জীর্ণদেহ, ভিন্ন যাযাবর।
আয়োজন, সব স্তব্ধ! এমন কি শ্মশানে শিবার আর কোনো মুখ নেই ; কোনো শকুনের চোখ নেই! তবে কার শবাধার সময়ের নিজের ঘরেই পরিত্যক্ত পড়ে আছে রক্তহীন বিবর্ণ আত্মার বিলুপ্তির মতো এক শূন্য অনুভবের চাদরে আপাদ-মস্তক ঢাকা ? তবে কার শব যাত্রায় সময় হল না এই পরিত্যক্ত প্রাণের প্রান্তরে ?
নাকি হৃদয়েরই মৃত্যু এইখানে ? তোমার আমার সকলি হয়েছে বলা ? নক্ষত্রের, পাখির, ফুলের তাই আর কথা নেই, তাই আজ ক্লান্ত কুকুরের
প্রেমিকের মতো আর মন নেই ? ফণীমনসার বুক তাই শূন্য, তাই ত্রিভূবনে সকলি অসার ?
একটি পুরানো চীনা কবিতা কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যামিনীমোহন কর সম্পাদিত “মাসিক বসুমতী” পত্রিকার চৈত্র ১৩৫২ (মার্চ ১৯৪৬) সংখ্যায় প্রকাশিত।
এ শুধু চ’লতেই থাকবে। ---দিন আসে দিন যায় ; তোমার আমার এই যে বিরহ, ছেড়ে যাওয়া . চিরটি জনমের মতো! . . . যেন দশ হাজার মাইল পেছনে ফেলে আমরা গিয়েছি চ’লে নিরিদ্দিষ্ট পৃথিবীর দু’টি শেষ সীমানায়। মাঝখানের পথটিতে র’য়েছে পার্থক্য আর দূরত্ব ; কী ক’রেই বা আমরা মুখোমুখী আবার এসে মিলিত হবো ? তাতারের ঘোড়া বেছে নিয়েছে উত্তরের হাওয়া ; ইউয়ের পাথী দক্ষিণের কোনো গাছের শাখায় বেঁধেছে . তার বাসা। এরি মধ্যে আমাদের বিচ্ছেদের দিন হ’য়েছে কত দীর্ঘ। প্রতিদিনই আমার পোশাক বুকের কাছটিতে আলগা হ’য়ে . আসছে। . . . ভেসে আসা মেঘ সম্পূর্ণ সূর্যটিকেই ফেলে ঢেকে! তোমার চিন্তা হঠাৎ আমার বয়সে এনেছে বার্ধক্য ; মাস থেকে বছর দ্রুত এগিয়ে চ’লেছে সমাপ্তির দিকে। . . . তোমাকে আমি মন থেকে ফেলবো ঝেড়ে ; আর . ভুলে থাকবো এ জীবনের মতো--- খেয়ে দেয়ে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টাতেই এখন থেকে . কাটবে আমার দিন।
পিকাসোর জন্য কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা ১৯২০। বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য সংকলন, মাঘ ১৩৬৯ (জানুয়ারী ১৯৬৩) থেকে।
এই এক ছবি দেখি, দিন রাত দুর্বোধ্য আয়নায় বিকেলের মতো এক ক্লান্ত নারী রহস্য বিতরে ; কিংবা আমাদের মন আছে কি না, অস্ফুট বার্তায় প্রশ্ন শুনি যেন ; কিংবা যতটুকু এ হৃদয়ে ধরে ততটুকু নিতে গিয়ে দেখি ছবি অগাধ গভীর কোথায় যে নিয়ে যায় ? তারপর সকলি নিবিড় চেতনা, চেতনা শুধু! এক ছবি বহু ছবি হয় তখন কি ? তখনো কি নিরুত্তর কিছু প্রশ্ন থাকে ? পৃথিবীর সব নিয়ে, তবু যেন সব পাওয়া নয় এমনি অভাব ? . . . যারা আয়নায় ক্লান্ত মুখ রাখে তারা তো একটি মেয়ে ; তবু তারা কেমন ছড়ায় সর্বত্র ; সর্বত্র তারা অব্যর্থ অস্বস্তি রেখে যায় চিলে ঘরে, রাস্তায়, এভিন্যুয়ে, উদ্বাস্তুমিছিলে, অথবা প্রথম প্রেম-গুঞ্জনে কি বিবাহসভায়!
প্রভাস কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা ১৯২০। বিষ্ণু দে সম্পাদিত “এ কালের কবিতা” কাব্য সংকলন, মাঘ ১৩৬৯ (জানুয়ারী ১৯৬৩) থেকে।
স্মৃতির বালুচরে মুখেরা ভীড় করে কেন যে ভীড় করে ? আমি তো ক্লান্ত। এখানে নদীপারে গোধূলি গান ধরে আকাশ নীলে নীল ; হৃদয় শান্ত ; ঘুমাবো আমি তাই ঘুমপাড়ানি গানে ভরেছে চরাচর মিলেছে প্রাণে প্রাণ তবুও ভীড় করে ; মুখেরা ভীড় করে ; অতীতে এত জ্বালা ; কে আগে জানতো!
দোসর কেউ নেই, চাইনে মিতালিও তবুও পিছু ডাকে বিদুর, পার্থ। কী হবে প্রেম দিয়ে, দেহের জ্ব সেও ; রাধার মুখ তবু কেমন আর্ত। ঘুমুতে চাই আমি মাটিতে বুক মেখে, মরণ চাই আমি আকাশে মুখ রেখে ; তবুও হাঁটে তারা ক্ষুব্ধ বলরাম, অন্ধ কুরুরাজ, কুরুক্ষেত্র।
তোমরা ফিরে যাও। কোথায় দ্বারকায় নারীর দেহমদে পুশুরা লুব্ধ ; কোথায় শিশুকে জ্যান্ত ছিঁড়ে খায় আহত নেকড়েরা ; এমনি যুদ্ধ! কী হবে ঘুম থেকে সে দেশে হেঁটে গেলে ? সুদর্শন আমি দিয়েছি ছুঁড়ে ফেলে। এখানে এই ঘাসে হৃদয় ঢেকে নিয়ে ঘুচাবো দ্বন্দ্বের জয়ের ক্লান্তি। বলো না কথা পাখি, আস্তে ঝরো ফুল ; ঘুমের রাত আসে। শান্তি শান্তি!
কালো রাত কাটে না কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত “গণসংগীত সংগ্রহ” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৯০) থেকে। এই কবিতা বা গানটি “কালো বস্তির পাঁচালি” নামে মেঘ বসু সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” কাব্য সংকলন, ২০০৯ এ প্রকাশিত হয়েছে। এই গানটিতে সুর দিয়েছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। পৃথকভাবে অংশ নিয়ে আরেকটি সুর দিয়েছেন বিপুল চক্রবর্তী।
১ কালো রাত কাটে না, কাটে না এত ডাকি, রোদ্দুর এই পথে হাঁটে না--- ঘরে না, মাঠে না। সূয্যি ঠাকুর, শোনো, সূয্যি ঠাকুর গো, আমাদের খোকাখুকু তোমারও কি পর গো ?
২ মাগো, এত ডাকি খিদের দেবতাটাকে বেশি নয় যেন দু’বেলা দু’মুঠো নুনমাখা ভাত রাখে--- তুই আর আমি দুঃখ ভুলবো, ভুলবো পেটের জ্বালা ; খিদের দেবতা, সে কি একেবারে কালা!
বাছা রে আমার অচ্ছুৎ, তাই যেভাবে যতই ডাকো কোনো দেবতাই বস্তিতে আসে নাকো।
৩ আয় রোদ্দুর, আয়। আয় আমাদের ন্যাংটা খুকুর নোংরা বিছানায়। আয় রোদ্দুর, বস্তিতে--- আধমরা ওই খুকুর ঠোঁটে একটু চুমুর স্বস্তি দে। আয় লক্ষ্মী, আয় রে সোনাঔ এইটুকুতেই জাত যাবে না।
৪ আয় রোদ্দুর, আয়। দারুণ শীতে খুকু মোদের ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আয় রে শীত মাড়িয়ে--- ভয়ের জুজু ডাইনি বুড়ির চুল ধরে দে তাড়িয়ে। আয় লক্ষ্মী, আয় রে সোনা। রাত গেলে কি ভোর হবে না ?
৫ শূন্য উঠান শূন্য মাচা শূন্য ভাঁড়ার ঘর ; এমন দিনে বাছা রে তোর এ কোন কঠিন জ্বর ?
এর ঝাঁটা ওর লাথি খেয়ে বেড়েছিস তুই ছেলে ; বাঁচবি কি তুই এই জ্বরেও ইপোসে দিন গেলে ?
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর আমি কি তোর মা ? চোখের জলে ঘর ভেসে যায় তাপ তো কমে না।
ক্ষুধার আগুন দাউ দাউ দাউ কান্না-ভেজা ঘরে ; মায়ের কোলে দুধের শিশু দুধ ছাড়া আর মরে।
বাইরে বাতাস আছড়ে পড়ে . . . আমি কি তোর মা ? ঝাঁটা সইলাম, লাথি সইলাম, কী-জন্যে সোনা!!
জন্মভূমি আজ কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মেঘ বসু সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” কাব্য সংকলন, ২০০৯ থেকে।
একবার মাটির দিতে তাকাও একবার মানুষের দিকে।
এখনো রাত শেষ হয়নি ; অন্ধকার এখনো তোমার বুকের ওপর
কঠিন পাথরের মতো, তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারছো না। মাথার ওপর একটা ভয়ঙ্কর কালো আকাশ এখনো বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে আছে। তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে দাও আর আকাশের ভয়ঙ্করকে শান্ত গলায় এই কথাটা জানিয়ে দাও--- তুমি ভয় পাওনি।
মাটি তো আগুনের মতো হবেই যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো ; যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি। যে মানুষ গান গাইতে জানে না যখন প্রলয় আসে সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়। তুমি মাটির দিকে তাকাও, সে অপেক্ষা করছে ; তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়।
রাস্তা কারও একার নয় কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মেঘ বসু সম্পাদিত “আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি” কাব্য সংকলন, ২০০৯ থেকে।
ধর্ম যখন বিজ্ঞানকে বলে ‘রাস্তা ছাড়ো!’ বিজ্ঞান কি রাস্তা ছেড়ে দেয় ?
পোপের ভয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। সারাদিন একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই ; তাঁকে পাহাড়া দেবার জন্য বসে থাকতো একজন ধর্মের পেয়াদা, যার চোখের পাতা বাতাসেও নড়তো না।
বিজ্ঞান কি তখন থেমে ছিল ? তীর্থের পাণ্ডাদের হই হই, তাদের লাল চোখ কি পেরেছিল পৃথিকে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে, সূর্যকে তার চারদিকে ওঠবোস করাতে ?
ধর্ম যতদিন দুঃখী মানুষকে বেঁচে থাকার সাহস দেয়, ততদিন রাস্তা নিয়ে কারও সঙ্গে তার ঝগড়া থাকে না। রাস্তা কারও একার নয়।
বরং তাকেই একদিন রাস্তা ছাড়তে হয়, যার স্পর্ধা আকাশ ছুঁয়ে যায়।
বিজ্ঞান যখন প্রেমের গান ভুলে ভাড়াটে জল্লাদের পোশাক গায়ে চাপায়, আর রাজনীতির বাদশারা পয়সা দিয়ে তার ইজ্জত কিনে নেয়, আর তার গলা থেকেও ধর্মের ষাঁড়েদের মতোই কর্কশ আদেশ শোনা যায় : ‘রাস্তা ছাড়ো! নইলে---’
পৃথিবীর কালো সাদা হলুদ মানুষের গান, তাদের স্বপ্ন এক মুহূর্ত সেই চিত্কার শুনে থমকে তাকায়।
তারপর যার যেদিকে রাস্তা, সেদিকে মুখ করেই তারা সামনে, আরও সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
কেউ কারোকে রাস্তা ছেড়ে দেয় না, যতদিন এই পৃথিবীতে গান থাকে, গানের মানুষ থাকে, স্বপ্ন থাকে . . .