কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
যুদ্ধের বিরুদ্ধে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “সেরা আবৃত্তির কবিতা সংগ্রহ” কাব্য
সংকলন (২০০৯) থেকে।


চলো আমরা চাঁদের দেশে যাই
চলো আমরা সময় থাকতে যে যার দেশের জাতীয় পতাকা
চাঁদের দেশের সবার চাইতে উঁচু পাহাড়টার
চূড়ায় দিই উড়িয়ে, তার মাটিকে করি সোনার চেয়ে দামী!

পৃথিবীতে কোথাও আর নদী পাহাড় আকাশ
কোথাও আর ঘুমিয়ে থাকাপ ছ’ফুট জমি নেই।
একটি পাখির বাসা গ’ড়ে তোলার মতো সামান্য আশ্রয়
একটি ঘাসের দাঁড়িয়ে থাকার মাটি
আজ আমাদের অতীত ইতিহাসের স্বপ্ন, ঠাকুরমার মুখের রূপকথা।
মিছেই মানুষ বেতার টেলিভিশনে সাংবাদিকের গোলটেবিল বৈঠকে
পরস্পরকে নিন্দা করার উজ্জ্বলতায় নিজের মুখ দেখতে চায় আলো
নিছেই মানুষ নিজের দেশের নিজের দলের গর্ব করে।
আসলে তার পায়ের নিচে কোথাও আর মাটির কোনো চিহ্ন নেই
ছ’ফুট জমি মেপে নিয়ে যেখানে উপনিবেশ গড়া যায়।

চলো আমরা চাঁদের দেশে যাই
সময় থাকলে সোনার চেয়ে মূল্যবান চাঁদকে দিই জাতীয় সংগীত।
অতঃপর চাঁদ ফুরোলে, ঠাকুরমার শোলক শেষ হলে
আবার আমরা নতুন অঙ্ক কষব, শনি বৃহস্পতি মঙ্গলের ভূমি
অগস্ত্যের মতো আমরা শুষে নেব, শান্তিকামী মানুষ ;
বেঁচে থাকতে ছ’ফুট জমি চাই।

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভিসা অফিসের সামনে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


দুটি মানুষ দুই পথে চলে গেল ;
যতক্ষণ মিখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়
ওরা অপেক্ষা করেছিলো।

একজন অস্ফুট কণ্ঠে বলেছিলো,
আসি!
আরেকজন অনুভব করেছিলো সত্ভাইয়ের যন্ত্রণা।
দুটি কঠিন পাথরের মুখ
খোদাই করা
নিষ্প্রাণ দুই জোড়া ঘোলাটে চোখ
অদৃশ্য রক্তের তোলপাড়ে একই অধিকারে মৃত পিতাকে স্মরণ করেছিলো।

আর এখন, এমন দিনে
যদি সে-মুখ আবার মনে পড়ে, রক্তে বাজে না-দেখার কঠিন ব্যর্থতা
তখন কোথায়, কোন রাস্তায় এসে দাঁড়াবে
দুটি সত্ভাই ? সমস্ত আকাশটাই যেখানে দেয়াল দিয়ে আপাদমস্তক ঢাকা॥

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুখে যদি রক্ত ওঠে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


মুখে যদি রক্ত ওঠে
সে-কথা এখন বলা পাপ।
এখন চারিদিকে শত্রু, মন্ত্রীদের চোখে ঘুম নেই ;
এ-সময়ে রক্ত-বমি করা পাপ ; যন্ত্রণায় ধনুকের মতো
বেঁকে যাওয়া পাপ ; নিজের বুকের রক্তে স্থির হয়ে শুয়ে থাকা পাপ।

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাইকেলের সমাধি
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


জল থেকে, মাটি থেকে পাথরের অন্ধকার থেকে
বিষপুল ছিঁড়ে আনব ;
পুরুষ নামের যত ফুল ফোটে রুক্ষ ও কঠিন
তোমার ঘুমের ঘরে প্রণামের মতো রাখবো।

লাবণ্যের মতো নাম যে-সব ফুলের
রমণীর মতো নাম যে-সব ফুলের
করুণার মতো নাম যে-সব ফুলের
সে-সব শান্তির ফুল হাতে ক’রে
সারকুলার রোড ধরে পথ হাঁটতে আমার হৃদয়
সাড়া দেয় না।

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি আত্মার শপথ
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।

ভ্রাতৃহত্যার প্রতিরোধে নিহত আমীর হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিতে নিবেদিত


‘মারতে জানা যত সহজ
মরতে জানা তত সহজ নয়,
তাই কি ভাবিস ? তাই কি দেখাস ভয় ?

এইটুকু তো বুকের মণি
তাকেই আবার টুকরো করা চাই ?
ভলেই গেছিস, ওরা আমার ভাই।

মারতে জানা সত্যি সহজ
মরতে জানা আরও সহজ যে,
নে রে মূর্খ! আমার জীবন নে!’

এই ব’লে সে চ’লে গেল, রক্তে ভাসা বুকের মণি তার
কাঁপিয়ে দিল বুড়িগঙ্গার ভাগীরথীর পাষাণ
.                                                অন্ধকার॥

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায়
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায়
হেঁড়ে গলায় ঘর দুয়ার কাঁপায়।
যখন তারা হাঁক পাড়ে, বাপস্ রে!
আকাশ যেন মাথায় ভেঙ্গে পড়ে ;
ভয়ের চোটে খোকাখুকুরা হাঁপায়!

মানুষখেকো বাঘেরা বড় লাফায় . . .

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পৃথিবী ঘুরছে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


চোখ রাঙালে না হয় গ্যালিলিও
লিখে দিতেন, ‘পৃথিবী ঘুরছে না।’
পৃথিবী তবুও ঘুরছে, ঘুরবেও ;
যতই তাকে চোখরাঙাও না।

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভূতপত্রীর দেশে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ছাত্রসংগ্রাম প্রকাশনী সংকলিত “প্রতিবাদী বাংলা কবিতা সংকলন” কাব্য
সংকলন (২০০৭) থেকে।


একটি লাতিন বাক্য মনে রেখে

পাহাড়গুলি কাঁপছে প্রসব যন্ত্রণায়!

এবার তবে জন্ম নেবে
এবার তবে জন্ম নেবে
এবার তবে জন্ম নেবে

কয়েক লক্ষ ধাড়ী ইঁদুর, মানুষখেকো বাঘের চেয়ে ভীষণ!

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বর্ষা
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা ১” কাব্য
সংকলন (১৯৯২) থেকে।


কালো মেঘের ফিটন চ’ড়ে
কালীঘাটের বস্তিটাতেও বর্ষা এল।
সেখানে যত ছন্নছাড়া গলিরা ভিড় ক’রে
খিদের জ্বালায় হুগলি-গঙ্গাকেই
রোগা মায়ের স্তনের মতো কামড়ে ধ’রে
.                        বেহুঁশ প’ড়ে আছে।

আষাঢ় এসে ভীষণ জোরে দুয়ারে দিল নাড়া---
শীর্ণ হাতে শিশুরা খোলে খিল॥

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কবিতা পরিষদের ‘বইমেলা’য়
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা ১” কাব্য
সংকলন (১৯৯২) থেকে।


আমরা সবাই চাঁদের আলোয় বামন
ব’সে আছি অনন্ত ইথারের
একটি বিন্দু কোটিতে ভাগ ক’রে
এই পৃথিবীর কয়েক কোটি মানুষ ;
এবং ক’জন মার্কাস স্কোয়ারে।

আমরা সবাই ক্ষুদ্র ইতর বামন
চাঁদের আলোয় যে যার মুখ দেখে
অন্য সময় মাথার চুল ছিঁড়ি
আয়না ভাঙি ; তবু এখন অবাক
ঘাসে ওপর মার্কাস স্কোয়ারে।

কবিতা শুধু কবিতা চার দিকে
যেন জীবন এখন কালপুরুষ
সপ্তর্ষির চেতনা : যেন চুমা
ইতর মুখে চোখে, ইতর বুকে ;
আধফোটা এই মার্কাস স্কোয়ারে।

আমরা ক’জন সৌরলোকের বামন
কয়েকটি রাত বাঁশির মতো বাজি।

.              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*