কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
উদ্বাস্তু
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা ১” কাব্য
সংকলন (১৯৯২) থেকে।


বের করো তেমন সুরা, মুক্তাভস্ম, গোলাপি আতর
যাতে নেশা লাগে, আমরা নেশা করতে এসেছি এখানে।
দেখাও গোখরে কিংবা শঙ্খচূড় বুকের ভিতর
কী ক’রে ছোবল মারে, কালনাগিনী কত খেলা জানে!

আমরা প্রেমের অভিজ্ঞতা পেতে ঘর ছেড়ে এসেছি ;
যদি তাতে রক্ত লাগে দোষ নেই ; যদি লাল চোখে
মনে হয় এই সভা অন্য জন্মে নরকে দেখেছি,
যদি বুক কাঁপে, আমরা বেশি ক’রে ভালোবাসবে তাকে।

বুক থেকে একটি টানে ছিঁড়ে ফেল রেশমি কাঁচুলি
বিষ-মাখানো যুগস্তন মুক্ত করো, চাঁদের কুয়াশা
জ্বলুক হীরার মত নগ্ন দেহে, যাতে আমরা ভুলি :
এসো, বুকে বুক রেখে জ্বলতে জ্বলতে মিটাই পিপাসা!

যে ঘরে ছিলাম আমরা, পুড়ে গেছে ঈর্ষ্যায়, অপ্রেমে ;
আমরা হত হতে রাজি, কিন্তু প্রেমে, রমণীর প্রেমে।

.                     *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত “বাংলা আধুনিক কবিতা ১” কাব্য
সংকলন (১৯৯২) থেকে।


‘কবিতা,
তুমি কেমন আছ ?’

‘যেমন থাকে ভালোবাসার মানুষ
অপমানে।’

.          *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
এদিনে মানুষ নাম
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা নভেম্বর ১৯৭১। “আমার রাজা হবার স্পর্ধা” (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্য সংকলন (১৯৭৭) থেকে।


মাথা উঁচুতে রাখতে হয় ঝড়ে, জলে
কুয়াশায়,
দসদিকের কবন্ধ আঁধারে। কানে আসে
ক্রীতদাস-ক্রীতদাসীদের হল্লা ; তিন ভূবন
মাছের বাজার, নাকি মানুষের মাংস নিয়ে
চলে কাড়াকাড়ি! রাস্তায় রক্তের নদী
পার হয় জল্লাদেরা। কবিরা কবিতা লেখে
শীতের কাঁথায় মুড়ি দিয়ে
আপাদমস্তক ; নেতারা বক্তৃতা দেয়, ধূমাবতী জন্মভূমি
সর্বাঙ্গে ক্ষুধার অগ্নি দাউ দাউ
ঝাঁপ দেয়---কোথায়---কে জানে ?

এ দিনে মানুষ নাম
মনে হয় অশ্লীল তামাশা! আমাদের সন্তানেরা আমাদের চোখের সামনে
রক্ত মাংস কর্দম, অথবা আততায়ী---কাপুরুষ! আমরা গলিত নখদন্ত সিংহ
নিরাপদ, সার্কাসের খাঁচায়, ঘোলাটে চোখের মণি---
.                                                বিস্ফারিত---ক্রমে অন্ধকার হ’য়ে আসে---

তবু মাথা উঁচু রাখতে হয় নরকেও। আমাদের চোখের আড়ালে
ক্রমাগত রক্তক্ষরণের
পিচ্ছিল নৈপথ্যে আজও রয়েছে মানুষ---একা---নরক দর্শন করে,
.                                                তবু অন্ধ নয়, খোঁড়া নয় ;
রক্ত মাংস কর্দমের পাহাড় ডিঙিয়ে, নদী সাঁতরিয়ে
নরক উত্তীর্ণ হ’তে ক্লান্তিহীন যাত্রা তার ;

মাথা উঁচু রাখাই নিয়ম।

.          *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মিছিলে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা ১৮ জুন ১৯৭৪। “বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা” (১৯৭৪) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্য সংকলন (১৯৭৭) থেকে।



সামনে, পিছনে, ডানে, বাঁয়ে
মাত্র কয়েকটি পুরনো মুখ ;
আর যারা, একেবারেই কিশোর
আর যারা, জেলের অন্ধকারে বহুদিন হারিয়ে যাওয়া
.                        শিশুগুলির কেউ মা, কেউ বোন . . .



বৃষ্টির পর আকাশ এখন
রৌদ্রের দিকে মাথা তুলছে। তাদের কণ্ঠের ঐকতান
বিষাদ এবং প্রতিজ্ঞার একটিই অবগাহন।
তারা এখন সেই সব শব্দ আর ধ্বনিকে খুঁজছে
যারা আমাদের ধমনীর ভিতর প্রবাহিত রক্তকেও
গাঢ় এবং অর্থময় ক’রে তুলতে পারে।
অথচ তাদের রং নিংড়ানো ভালোবাসা থেকে
শব্দ আর ধ্বনিগুলি যখন জন্ম নিচ্ছে, হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে
.                ঊর্ধ্বে আকাশের দিকে
তারা বহু শৃঙ্খলিত মানুষের ধিক্কার, ঘৃণা, প্রতিবাদ আর দাবি ছাড়া
.                কিছু না।
আবার অনেক কিছু ; কেননা মানুষের অভিজ্ঞতার শেষ নেই---
দিনের পর দিন রক্তের সমুদ্র সাঁতরিয়ে, মানুষ জেনেছে,
.                ভালবাসার আরেক নাম ঘৃণা ;
রাতের পর রাত স্পর্ধার পাহাড়ে আছাড় খেতে কেতে, সে জেনেছে,
.                ভালবাসার আরেক নাম প্রতিবাদ!



কিছু আগে, আর একেবারে পিছন থেকে
কালো রঙের পুলিশ ভ্যান একটাবিরাট অজগরের মতো তাদের ঘিরে রয়েছে।
তারা সংখ্যায় মাত্র কয়েকজন, কেন না পুরোনো বন্ধুরা
তাদের পরিত্যাগ করেছে। তবু তারা রাস্তায় নেমেছে, এক ভয়াবহ
.                পাশবিক শক্তির প্রহারে জর্জর
হাজার হাজার কিশোরের আর কিশোরীর রক্তেভাসা মুখগুলি মনে রেখে।

.                              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি অসমাপ্ত কবিতা
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা ১৯৭৬। পরিবর্তিত “আমার যজ্ঞের ঘোড়া” (১৯৮৫) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।
পুলক চন্দ সম্পাদিত “রক্তে ভাসে স্বদেশ সময়” কাব্য সংকলন (১৯৭৭) থেকে।


আদিম অন্ধকারের মুখোস-দেবতা
তোমার একটিই আনন্দ
আমাদের মুখ ম্লান করে দেওয়া।

তুমি আমাদের ভয় দেখাও, দিন নেই রাত নেই
তুমি দু’চোখ লাল ক’রে আমাদের ভয় দেখাও
কেননা আমাদের পূর্বপুরুষ, যিনি দেবতা নন, মানুষ---
তোমার তিমিরবিলাসী অহঙ্কারকে অস্বীকার করেছিলেন।
তুমি আমাদের পৃথিবীকে আড়াল করো দারুণ অপ্রেমে
আর আমরা তিমিরবিনাশী মানুষ তোমার ক্রোধকে অতিক্রম করি
আমাদের প্রেমে। তাতে তোমার উত্তেজনা বাড়ে, তোমার
হত্যা কুঠা নিয়ে
তুমি আমাদের আঘাত করো, চাও একেবারে ধ্বংস ক’রে দিতে।

তবু মানুষের মুখের লাবণ্য থেকে যায় . . .

.                              *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অথ মন্ত্রী কথা
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা ডিসেম্বর ১৯৬৭।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৮০) থেকে।



রাজভবনে মন্ত্রী গজায়
খবর পেয়ে ব্যাঙের ছাতা
চিঠি লিখেছে আড়াই পাতা,
সে-ও একটি রাজত্ব চায়।


আয় বৃষ্টি হেনে
মন্ত্রী দেবো কিনে
বাজার থেকে সস্তা
এক পয়সায় দশটা।

‘কটা মন্ত্রী কিনলি বাছা ?’
‘তিনটে পাকা, সাতটা কাঁচা।’
মন্ত্রী পড়ে টুপ্ টাপ
সোনা গেলে গুপ্ গাপ্।


হ্যা দে লো ব্যাঙের ছাতা
এতকাল ছিলি কোথা ?
ছিলেম ভাই রাজভবনে ;
দাদা আমার মন্ত্রী হলো
আমারে যেতে হলো।
দাদা নেন বংশী হাতে
আমি নিই কলসী কাঁখে ;
গিয়েছি খিড়কী দিয়ে।

ছেলেটা দিচ্ছে দুয়ো
মেয়েটা তুরুক কাটে।


নেডে চেড়ে দেখি বুড়ো
মরে রয়েছে ;
মন্ত্রী হবার সময় বুড়ো
নেচে উঠেছে।

.           *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ওলাবিবি
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা অক্টোবর ১৯৭৫।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৮০) থেকে।


রাগলে তিনি ছড়ান ওলাওঠা
কিন্তু যদি জড়িয়ে ধরো পা,
তিনিই আবার অসুখ সারান :
ডাইনি থেকে তখন ‘মা-ঠান’---
ভক্তিতে তাই শিউড়ে ওঠে গা!
হাসলে তিনি দারুণ উপোসে
উলঙ্গ দেশ খিলখিলিয়ে হাসে!

.           *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভারতবর্ষ এবং গোপালের মা
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা অক্টোবর ১৯৭৭।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৮০) থেকে।


কল্য ছিলেন টেরোরিস্ট্
অদ্য তাঁরাই ট্যুরিস্ট্ ;
দিল্লী থেকে জিতে আনলেন
‘হিপ্ হিপ্ হুরিস্ট্’ ---

একটি করে তামার পাত।
কারণ তাদের লম্বা হাত . . .
হাতের চেটোয় গোপালের মা
দিয়েছে সুরসুরিস্ট্।

.           *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভাগ্যি ছিলেন তিনি
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা ১৯৭৯।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৮০) থেকে।


ভাগ্যি ছিলেন তিনি
তাই ভোট দিয়েছি তাকে।
তিনিই যদি না থাকতেন
দিল্লী যেতো কে ?

.           *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাজায় রাজত্ব করে
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রচনা ১৯৭৯।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “ব্রাত্য পদাবলী” কাব্য সংকলন (অক্টোবর ১৯৮০) থেকে।



রাজা রে রাজা।
বাদ্যি বাজা!

কার বাদ্যি ?
নিজের বাদ্যি।


রাণী বসেন সিংহাসনে
রাণী যান বনে
বসুমতী দু’ভাগ হলে
রাণী থাকেন মনে।


ঘরে এলেন মন্ত্রীমশাই
ভাবছি তাকে কোথায় বসাই ?
মাথায় বসাই ? বুকে বসাই ?
না-কি ভাঙা খাটেই বসাই ?


বড় কোটাল, মেজ কোটাল,
ছোট কোটালের ছা।
চেটেপুটে খেলি যাকে---
আমার ছেলে না ?

কেন দিস না রা।

.           *******************
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*