কবি বলাই দাস - তিনটে পদে “বলাই দাস”
বা “দাস বলাই” ভণিতা পাওয়া গিয়েছে।
বাংলা ভাষায় মাধাই, মাধবের অপভ্রংশ বা
ডাক নামের মতো বলাই, বলরামের অপভ্রংশ
বা ডাক নাম হিসেবে চলে আসছে। এই বলাই
দাসের পদকে বলরাম দাসেরই পদ বলে মনে
করেছেন বিভিন্ন বৈষ্ণব পদাবলী বিশেষজ্ঞগণ।
দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
তাঁর ১৯৭৭ সালে সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন” গ্রন্থে বলাই দাস ভণিতার একটি পদ
সংকলন করেছেন কিন্তু তাঁর পরিশিষ্টে দেওয়া বর্ণানুক্রমিক কবিপরিচয়-তে বলরাম দাসের পরিচয়
থাকলেও, বলাই দাস সম্বন্ধে কিছু লেখেন নি। তিনি সম্ভবত ধরেই নিয়েছিলেন যে বলাই দাস ও বলরাম দাস
এক ও অভিন্ন কবি। তিনি লিখেছেন . . .
বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে একাধিক বলরাম দাসের অস্তিত্ব বর্ত্তমান। তার মধ্যে প্রেমবিলাস কাব্য রচয়িতা
শ্রীখণ্ডবাসী নিত্যানন্দ বলরাম নামে যেমন পদ লিখেছেন তেমনি কৃষ্ণলীলামৃত কাব্য রচয়িতা দীন বলরামের
পদ আছে। কিন্তু পদাবলী খ্যাত বলরাম মুখ্যতঃ দুজন। ভাব মধ্যে একজন দোগাছিয়া গ্রামের বলরাম দাস।
ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে এর জন্ম। নিত্যানন্দের নিকট ইনি দীক্ষিত হন। কবি ছিলেন কৃষ্ণের বালগোপাল
মূর্তির উপাসক। বাত্সল্যের পদে তিনি শ্রেষ্ঠ। প্রধানতঃ বাংলা ভাষায় পদ রচনায় তিনি বিখ্যাত। ব্রজবুলি
পদে খ্যাতি অর্জন করেছেন একজন পরবর্তীকালের বলরাম দাস (কবিরাজ) ইনি গোবিন্দদাস কবিরাজের
ভাগিনেয় বলে প্রসিদ্ধ। মতান্তরে গোবিন্দদাসের পৌত্র ঘনশ্যামই বলরাম।
দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষোক্ত মন্তব্যটির কোনো প্রমাণ বা পোষক-তথ্য তিনি দেন নি, যেখানে তিনি
বলেছেন যে মতান্তরে বলরাম কবিরাজই গোবিন্দদাসের পৌত্র ঘনশ্যাম। কারণ বৈষ্ণবদাসের পদে স্পষ্ট
রয়েছে “ঐছন দুহুঁ জন” কথাটি, অর্থাৎ ওই দুই জন।
কবি-নৃপ-বংশজ ভুবন-বিদিত যশ
. ঘনশ্যাম বলরাম।
ঐছন দুহুঁ জন নিরুপম গুণগণ
. গৌর-প্রেমময় ধাম॥
---বৈষ্ণবদাস, পদকল্পতরু, প্রথম খণ্ড, প্রথম শাখা, প্রথম পল্লব, মঙ্গলাচরণ, পদসংখ্যা ১৮॥
প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৫৫ সালে প্রিয়নাথ জানা সংকলিত, সম্পাদিত “বঙ্গীয় জীবনীকোষ, প্রথম খণ্ড” প্রকাশিত হয় ভারত
সরকারের শিক্ষা বিভাগের, ডিপার্টমেন্ট অব্ কালচারের অর্থানুকুল্যে পুষ্ট কলকাতার “মাতৃভাষা পরিষদ”
থেকে, যাঁর পুর্বতন নাম ছিল “গ্রন্থবাণী পাঠচক্র”।
পাঠক আমাদের ক্ষমা করবেন, আমরা “বলরাম দাস” প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে এই গ্রন্থের লেখক প্রিয়নাথ জানা
সম্বন্ধে দু-এক কথা বলে নিচ্ছি। বাঙালীর মত আত্মবিস্মৃত জাতিকে এই মানুষটির পরিচয় পুনর্বার মনে
করিয়ে দেবার প্রয়োজন বোধ করছি। তিনি ছিলেন মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁর ছাত্র জীবন
গৌরবময় কারণ তিনি মাতৃভূমির স্বাধীনতা-কল্পে ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক আগস্ট বিপ্লব বা ভারত-ছাড়ো
আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দীর্ঘকাল কারাবরণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকার এই বীর
স্বাধীনতা সংগ্রামীকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মানিত করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল।
স্বাধীনতার পর ক্রমে তিনি বঙ্গীয় পশুচিকিত্সা মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থগারিক পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি
"গ্রন্থবাণী" নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, যা ছিল মাতৃভাষা তথা ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রথম
প্রবন্ধপঞ্জী পত্রিকা। এ ছাড়া তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে “জাতীয় মন্ত্রগুরু যাঁরা”, “ছাত্রজীবন সংগঠন”,
“মনীষীদের ছাত্রজীবন”, “আমাদের বিদ্যাসাগর” প্রভৃতি গ্রন্থ।
“বঙ্গীয় জীবনীকোষ, প্রথম খণ্ড”-এ বলাই দাস প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন . . .
বলাইদাস একজন কবি ও পদকর্তা। বলাই দাস ভণিতায় একটি মাত্র পদ পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হয়েছে।
কোন্ বলে গিয়াছিলা ওরে রাম কানু ইত্যাদি উত্তরগোষ্ঠবিষয়ক এই পদটির অব্যবহিত পরেই বলরাম
দাসের দু’টি পদ এবং উহার আগেও কয়েকটি পদ আছে। এ জন্য বলাইদা স্বতন্ত্র কোন পদকর্তা না হয়ে
বলরাম দাস নামেই প্রচলিত অপভ্রংশ রূপ বলে কেউ কেউ মনে করেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোন বলিষ্ঠ
যুক্তি না থাকায় বলাই দাস স্বতন্ত্র ব্যক্তি বলে অনুমিত হন। এঁর অবস্থিতি সম্ভবতঃ সপ্তদশ শতাব্দী।
[ আসলে পদকল্পতরুতে আরও একটি পদে বলাই দাস ভণিতা রয়েছে, ১২২১ সংখ্যক “নন্দরাণি যাহ গো
ভবনে” গোষ্ঠলীলার পদটি। এখানে ভণিতা “দাস বলাই”। পদটি পদাবলীর পাতায় তোলা হয়েছে। সেখানে
গেলেই পড়তে পারবেন। মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥ ]
সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৩১ সালে বৈষ্ণবদাস বিরচিত ও তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকায়, পদকর্তাদের
পরিচয়ে বলই দাস সম্বন্ধে সতীচন্দ্র রায় লিখেছেন . . .
"বলাই দাস" ভণিতার শুধু একটি মাত্র (১২১২ সংখ্যক) পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে। “কোন বনে গিয়াছিলা
ওরে রাম কানু।” ইত্যাদি উত্তরগোষ্ঠ বিষয়ক এই পদটীর অব্যবহির পরেই বল বলরাম দাসের দুইটী পদ
এবং উহার আগেও কয়েকটী পদ আছে। এজন্য বলাই দাস স্বতন্ত্র কোন পদ-কর্ত্তার নাম না হইয়া, বলরামে
দাস নামেপই প্রচলিত অপভ্রংশ রূপ বলিয়া মনে হয়। বলাই দাস নামে স্বতন্ত্র কোন পদ-কর্ত্তার বিষয়ে জানা
যায় নাই এবং বলাই দাস ভণিতার পদটীর সহিত বলরাম দাসের গোষ্ঠ-লীলার বংলা পদের যথেষ্ট সাদৃষ্য
আছে, ---এই সমস্ত কারণেই আমরা বলাই দাসকে বলরামদাস বলিয়াই বিবেচনা করি।
[ আসলে পদকল্পতরুতে আরও একটি পদে বলাই দাস ভণিতা রয়েছে, ১২২১ সংখ্যক “নন্দরাণি যাহ গো
ভবনে” গোষ্ঠলীলার পদটি। এখানে ভণিতা “দাস বলাই”। পদটি পদাবলীর পাতায় তোলা হয়েছে। সেখানে
গেলেই পড়তে পারবেন। মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥ ]
বলরামদাস-শ্রীশচন্দ্র-বিমানবিহারী-মালবিকা-মঞ্জুলিকা - পাতার উপরে . . .
"বলরাম দাস" জ্যোতিষ্কের মতো বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যাকাশে বিরাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রবীণ
বলরামদাস ছিলেন দোগাছিয়া নিবাসী। তাঁর বংশধররাও উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পুরুষানুক্রণে
বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারে লিপ্ত থেকেছেন। আধুনিক কালে, সর্ব্বপ্রথম বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“পদরত্নাবলী” প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে। সম্পাদনা করেন অনুর্ধ ত্রিশ, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার এবং
তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এঁরাই সর্বপ্রথম ধর্মীয় ভক্তিরসের বাইরে গিয়ে, কেবলমাত্র
সাহিত্যরসের নিরিখে বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন করে এক নতুন দিশার উন্মোচন করেন।
শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র বিমানবিহারী মজুমদার ইতিহাস ও অর্থনীতির অধ্যাপনা করলেও, বৈষ্ণব
সাহিত্যের এক অগ্রণী বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তাঁর “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”
(১৯২০), “শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান” (১৯৫৯), খগেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে “বিদ্যাপতির পদাবলী” (১৯৫৯),
“চণ্ডীদাসের পদাবলী” (১৯৬০), “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী” (১৯৬১), “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য”
(১৯৬১), গোবিন্দদাসের পদাবলী ও তাঁহার যুগ (১৯৬১), প্রভৃতি গ্রন্থাবলীর মধ্য দিয়ে।
তাঁর দুই কন্যা মালবিকা চাকী এবং মঞ্জুলিকা মজুমদারও বৈষ্ণব সাহিত্যে তাঁদের স্থান চিরস্থায়ী করে
গিয়েছেন। মালবিকা দেবীর অবদান তাঁর অতি মূল্যবান “বাসু ঘোষের পদাবলী” সংকলন সম্পাদনা এবং
মঞ্জুলিকা দেবীর দৃঢ় উল্লেখ পাওয়া যায় রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখা “বিদ্যাপতির পদাবলী” গ্রন্থের
ভূমিকায়।
শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ও বিমান বিহারী মজুমদার তাঁদের এই বংশ-পরিচয় নিয়ে তাঁদের গ্রন্থে তেমন কোনো
উল্লেখ বা আলোকপাত করে যান নি, যা এককথায় তাঁদের আভিজাত্যেরই প্রমাণ।
দোগাছিয়ার বলরাম দাস যে তাঁদের পূর্বপুরুষ একথা আমরা জানতে পারি "বিদ্যাপতির পদাবলী" গ্রন্থের
খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মুখবন্ধে, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান" ১ম
খণ্ডে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত, ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, পদাবলী সংকলন
“পদরত্নাবলী”-র পরিবর্ধিত আনন্দ সংস্করণ ২০০৬ -এর গ্রন্থ প্রসঙ্গ, পূর্বকথা, ৩৩৫-পৃষ্ঠায়।
---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
এখানে আমরা কয়েকজন বৈষ্ণব পদাবলীর বিশেষজ্ঞের, বলাই দাস ভণিতার কবি সম্বন্ধে তাঁদের মতামত
উদ্ধৃত করছি . . .