কবি বলরাম দাস-এর শ্রীরাধিকার বারমাস্যা
*
শ্রীরাধিকার দ্বাদশমাসিক বিরহাবস্থা
কবি বলরাম দাস
১৯০৫ সালে (১৩১১বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত “পূর্ণিমা” পত্রিকায়, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের “প্রাচীন সাহিত্য-
কীর্ত্তি” প্রবন্ধে এই বারমাস্যার পদটি তিনি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করেন, টীকা ও পাঠান্তর সহ। এ বিষয়ে তাঁর
উদ্ধৃতি আমরা বলরামদাসের পরিচিতির পৃষ্ঠায় প্রকাশ করলাম। পাঠক তা দেখে নিতে পারেন। আমরা
তাঁর টীকা অনুয়ায়ি, তাঁর পাওয়া পদের দুটি রূপ নীচে দিচ্ছি সহজ-পাঠ্য করে দেবার জন্য।

রাধিকার বারমাস।
(প্রথম পুথির রূপ।)

মাগে মুগধমতি আসিল অক্রুর।
কৃষ্ণ হেন প্রাণনাথ নিল মধুপুর॥ ১॥
হিম হিম বায়ু করে সহন না যাএ।
দারুণ মদন বাণে প্রাণি দহি জাএ॥ ধুআ॥
অক্রুর সনে কি বাদ ছিল।
গুণের মাধব হব়্যা নিল॥ ১। (২)
ফাল্গুনে ফাগুর দোল ফুলের বৃন্দাবন।
ফাগু বেষ্টিত হইল যথ গোপীগণ॥ (৩)
কৃষ্ণে কোলে করি গোপী তোল এ বিমানে।
বিমানে তুলিয়া কৃষ্ণ হরে(?) গোপীগণে॥ ধু (৪)
কৈওরে (৫) মাধবের ঠাই।
হুলি খেলা শ্যামের মনে নাই॥ ২।
চৈত্রে চাতকপক্ষী ডাকে প্রিয়া প্রিয়া।
বিধাতা বঞ্চিত কৈল হাতে নিধি দিয়া॥
পলাশ কাঞ্চন যথ বিকাশ (নানা) কুল।
আর নি প্রাণকৃষ্ণ আসিব গোকুল॥ ধূ। (৬)
আমারে ছাড়িল শ্যাম।
কে লবে শ্রীরাধার নাম॥ ৩। (৭)
বৈশাখ মাসেতে সখি প্রচণ্ড তপন।
হেন হি সময়ে সখি শূন্য বৃন্দাবন॥ (৮)
ভ্রমরা উড়িয়া পড়ে (৯) মধু করে পান।
শ্রীনন্দের নন্দন বিনে দগধে পরাণ॥ ধু। (১০)
যে আমার সুহৃদ হওয়ে (হয়রে?)।
গুণের মাধব হব়্যা নিলে॥ ৪। (১১)
জ্যৈষ্ঠে নিঠুর ভানু হানিলসভায়।
দারুণ মদনবাণ প্রাণি দহি যায়॥ (১২)
তাহাতে বিষম সখি মদন ধন্য (১৩) বীরবর।
প্রাণনাথ বিনে মোর শূন্য হইল ঘর॥ ধু।
তার সখী পদ্মভানু। (?)
তেমনি রাধার তনু॥ ৫। (১৪)
আষাঢ় মাসেত সখি ঘোর (১৫) গর্জ্জন (গরজন)।
শুনিয়া বিদরে বুক স্থির নহে মন॥ (১৬)
তাহাতে বিষম সখি ধন্য বীরবর।
প্রাণনাথ বিনে মোর দগধে অন্তর॥ ধু। (১৭)
যেমন কংসারীয়ে কাঁসা পিটে।
তেমনি রাধার (১৮) অন্তর ফাটে॥ ৬।
শ্রাবণে সঘন ঘন বরিষএ বারি।
শয়নে স্বপনে মনে পড়এ মুরারি॥ (১৯)
তাহাতে বিষম সখি মদন প্রবল (২০)।
*        *        *        *        * (২১)॥ ধু।
কৈঅরে মাধবের আগে।
রাই দরশন মাগে॥ ৭। (২২)
ভাদ্র মাসেত হইল (২৩) তিমির রজনী।
কৃষ্ণ শুক্ল দুই পক্ষ একহি যামিনী॥ (২৪)
ডাউকের কলরবে প্রাণি জর জর।
শ্রীকৃষ্ণ বিরহে প্রাণ সদাএ কাকর॥ ধু। (২৫)
কৈওরে মাধবের আগে।
রাধে মৈলে বধ লাগে॥ ৮। (২৬)
আশ্বিন মাসেতে হৈল সরত সময়।
নির্ম্মল গগনে হৈল চন্দ্রের উদয়॥ (২৭)
তাহাতে বিষম সখি কোকিলার রাও।
আনল সমান বহে মলয়ার বাও॥ ধু। (২৮)
দারুণ মলয়ার বাও।
না যুড়ায় রাধার গাও॥ ৯। (২৯)
কার্ত্তিক মাসেত হৈল নবীন তামসী।
সেই হোতে তারাগণ প্রকাশিত শশী॥ (৩০)
বলরাম দাসে (কহে) শুন বিনোদিনী (নীলমণি?) ] ধু।
তারা সবে বেহার করিলেক শ্রীবৃন্দাবন।
হেন হি সময় সখি শূন্য শ্রীবৃন্দাবন॥ ধু। (৩১)
কৈঅরে মাধবের ঠাঁই।
রাসলীলা শ্যামের মনে নাই॥ ১০। (৩২)
অগ্রা’ণ নাসেত সখি নূতন (৩৩) সকল।
তাহাতে বিষম সখি সদাএ চঞ্চল॥ (৩৪)
প্রাণ যায় রসাতল বকুল পড়ে ডালে।
শ্রীনন্দের নন্দন কৃষ্ণ পাবো কথা (কোথা) গেলে॥ ধু। (৩৫)
হেদে গো লতিকা সখি।
অন্তরে গোবিন্দ দেখি॥ ১১। (৩৬)
পোউষে প্রবল শীত প্রভু নাহি ঘরে।
রহিয়াছে মনের দুঃখ কহিমু কাহারে॥ (৩৭)
এমন ভাগ্য কোবে (কবে) হবে।
ব্রজনাথের দয়া হবে॥ (৩৮)

“ইতি রাধিকার বারমাস সমাপ্তা। লিখন শ্রীফকির চাঁদ দেঅদাস ইতি সন ১২০১ মঘী।”


টীকা ও পাঠান্তর -
(১)। প্রানাথ কৃষ্ণ লই গেল মধুপুর। পাঠান্তর।
(২)। প্রাণের মাধব মোর হরিয়া নিল। পাঠান্তর।
(৩)। ফাল্গুনে দ্বিগুণ শীত বসন্তের বাও।পাঠান্তর।
সহন না জায় সখি কোকিলার রাও।পাঠান্তর।
(৪)। প্রাণ যায় রসাতল বকুল পরে ডালে।
শ্রীনন্দের নন্দন কৃষ্ণ পাব কোথা গেলে।পাঠান্তর।
(৫)। ‘কৈওরে’ স্থলে ‘কহিও’।পাঠান্তর।
(৬)। পলাশ কাঞ্চন বিকাশিত নানাকুল।
আর নি প্রাণের নাথ রে আসিব গোকুল।পাঠান্তর।
(৭)। আমা ছাড়ি গেল শ্যাম।
কে লইব রাধার নাম।পাঠান্তর।
(৮)। হেন হি সময়ে কৃষ্ণ নাহি বৃন্দাবন।পাঠান্তর।
(৯)। ‘পড়ে’ স্থলে ‘কুলে’।পাঠান্তর।
(১০)। ‘দগধে’ স্থলে ‘না রহে’।পাঠান্তর।
(১১)। তোমরা কহ কৃষ্ণ কথা।
জুড়ালেক রাই অন্তর বেথা।পাঠান্তর।
(১২)। জ্যৈষ্ঠে নিষ্ঠুর ভানু অনলের প্রায়।
নিদাঘে বিরহ হিয়া সহন না জাএ।পাঠান্তর।
(১৩)। সম্ভবতঃ ‘ধন্য’ শব্দটি হইত না।পাঠান্তর।
(১৪)। দারুণ মলয়ার বাও।
না জুড়াএ রাধার গাও॥ পাঠান্তর।
(১৫)। ‘ঘোর’ স্থলে ‘মেঘের’।পাঠান্তর।
(১৬)। শুনিয়া বিদরে হিয়া সা জাএ সহন। পাঠান্তর।
(১৭)। তাহাতে বিষম সখি বিরহ আনল।
প্রাণনাথ বিনে আমি কারে দিমু কোল॥ পাঠান্তর।
(১৮)। ‘রাধার’ স্থলে ‘রাইর’। পাঠান্তর।
(১৯)। শ্রাবণ মাসেত ঘন বরিষএ বারি।
শয়নে স্বপনে মুই দেখিলুম মুরারি॥ পাঠান্তর।
(২০)। ‘মদন প্রবল’ স্থলে ‘ধন্য বিহ্বল’ (?)। পাঠান্তর।
(২১)। প্রাণনাথ বিনে কেবা করিব শীতল। পাঠান্তর।
(২২)। কহিও বন্ধের (বন্ধুর) ঠাই।
বিরহিনী শ্যামের মনে নাই॥ পাঠান্তর।
(২৩)। ‘হইল’ স্থলে ‘সখি’। পাঠান্তর।
(২৪)। কৃষ্ণ শুক্ল পক্ষ দুই একহি না জানি। পাঠান্তর।
(২৫)। কোকিলের কলরবে প্রাণ মোর ঝুরে।
প্রাণনাথ কৃষ্ণ বিনে দগধে অন্তরে॥ পাঠান্তর।
(২৬)। তার আখির পরে দুই ভানু।(?)
তেমত হইল রাধার তনু॥ পাঠান্তর।
(২৭)। আশ্বিন মাসেত সখি নির্ম্মল যে নিশি।
সহিত যে তারাগণ প্রকাশিত শশী॥ পাঠান্তর।
(২৮)। হাস রস বেহার করিতে বৃন্দাবন।
অখনে সে সব দুঃখ সহিব কেমন॥ পাঠান্তর।
(২৯)। শ্যাম মধুপুরে রৈল।
কাঁদি আমার জনম গেল॥ পাঠান্তর।
(৩০)। কার্ত্তক মাসেত সখি শরত সময়।
নির্ম্মল গগনে তারা চন্দেরর উদায়। পাঠান্তর।
(৩১)। শূন্য দেখি কদমতলা শূন্য বৃন্দাবন।
রাধিকার মন্দির শূন্য শূন্য বৃন্দাবন॥ পাঠান্তর।
(৩২)। কহিও কানুর আগে।
রাই (দরশন) দান মাগে॥ পাঠান্তর।
(৩৩)। ‘নূতন’ স্থলে ‘নবীন’। পাঠান্তর।
(৩৪)। প্রাণনাথ বিনে চিত্ত সদাএ বিকল। পাঠান্তর।
(৩৫)। শুন শুন প্রাণ সখি মথুরাতে যাও।
প্রাণনাথ কৃষ্ণ বিনে না যুড়ায় গাও॥ পাঠান্তর।
(৩৬)। কহিঅ কানুর আগে।
রাই দান মাগে॥ পাঠান্তর।
(৩৭)। পোউষে প্রবল শীত বন্ধু নাই মোর ঘোর।
কানু গিয়াছে মোর দেশ দেশান্তর॥ পাঠান্তর।
(৩৮)। এমন দশা কবে হবে।
ব্রজনাথ দর্শন হবে॥ পাঠান্তর।

পরে দেওয়া পাঠান্তর প্রয়োগ করে আমরা বলরাম দাসের রচিত বারমাস্যাটির, আবদুল
করিম সাহিত্য বিশারদের পাওয়া দ্বিতীয় পুথির রূপ, সম্পূর্ণ নীচে দেওয়া হোলো। এতে পাঠক সরাসরি
পাঠ করতে পারবেন।

রাধিকার বারমাস।
(দ্বিতীয় পুথির রূপ।)

মাগে মুগধমতি আসিল অক্রুর।
প্রানাথ কৃষ্ণ লই গেল মধুপুর॥ ১॥
হিম হিম বায়ু করে সহন না যাএ।
দারুণ মদন বাণে প্রাণি দহি জাএ॥ ধুআ॥
অক্রুর সনে কি বাদ ছিল।
প্রাণের মাধব মোর হরিয়া নিল॥ ১। (২)
ফাল্গুনে দ্বিগুণ শীত বসন্তের বাও।পাঠান্তর।
সহন না জায় সখি কোকিলার রাও॥ (৩)
প্রাণ যায় রসাতল বকুল পরে ডালে।
শ্রীনন্দের নন্দন কৃষ্ণ পাব কোথা গেলে॥ ধু (৪)
কহিও (৫) মাধবের ঠাই।
হুলি খেলা শ্যামের মনে নাই॥ ২।
চৈত্রে চাতকপক্ষী ডাকে প্রিয়া প্রিয়া।
বিধাতা বঞ্চিত কৈল হাতে নিধি দিয়া॥
পলাশ কাঞ্চন বিকাশিত নানাকুল।
আর নি প্রাণের নাথ রে আসিব গোকুল॥ ধূ। (৬)
আমা ছাড়ি গেল শ্যাম।
কে লইব রাধার নাম॥ ৩। (৭)
বৈশাখ মাসেতে সখি প্রচণ্ড তপন।
হেন হি সময়ে কৃষ্ণ নাহি বৃন্দাবন॥ (৮)
ভ্রমরা উড়িয়া কুলে (৯) মধু করে পান।
শ্রীনন্দের নন্দন বিনে না রহে পরাণ॥ ধু। (১০)
তোমরা কহ কৃষ্ণ কথা।
জুড়ালেক রাই অন্তর বেথা॥ ৪। (১১)
জ্যৈষ্ঠে নিষ্ঠুর ভানু অনলের প্রায়।
নিদাঘে বিরহ হিয়া সহন না জাএ॥ (১২)
তাহাতে বিষম সখি মদন (১৩) বীরবর।
প্রাণনাথ বিনে মোর শূন্য হইল ঘর॥ ধু।
দারুণ মলয়ার বাও।
না জুড়াএ রাধার গাও॥ ৫। (১৪)
আষাঢ় মাসেত সখি মেঘের (১৫) গর্জ্জন (গরজন)।
শুনিয়া বিদরে হিয়া সা জাএ সহন॥ (১৬)
তাহাতে বিষম সখি বিরহ আনল।
প্রাণনাথ বিনে আমি কারে দিমু কোল॥ ধু। (১৭)
যেমন কংসারীয়ে কাঁসা পিটে।
তেমনি রাইর (১৮) অন্তর ফাটে॥ ৬।
শ্রাবণ মাসেত ঘন বরিষএ বারি।
শয়নে স্বপনে মুই দেখিলুম মুরারি॥ (১৯)
তাহাতে বিষম সখি ধন্য বিহ্বল (২০)।
প্রাণনাথ বিনে কেবা করিব শীতল (২১)॥ ধু।
কহিও বন্ধের (বন্ধুর) ঠাই।
বিরহিনী শ্যামের মনে নাই॥ ৭। (২২)
ভাদ্র মাসেত সখি (২৩) তিমির রজনী।
কৃষ্ণ শুক্ল পক্ষ দুই একহি না জানি॥ (২৪)
কোকিলের কলরবে প্রাণ মোর ঝুরে।
প্রাণনাথ কৃষ্ণ বিনে দগধে অন্তরে॥ ধু। (২৫)
তার আখির পরে দুই ভানু।(?)
তেমত হইল রাধার তনু॥ ৮। (২৬)
আশ্বিন মাসেত সখি নির্ম্মল যে নিশি।
সহিত যে তারাগণ প্রকাশিত শশী॥ (২৭)
হাস রস বেহার করিতে বৃন্দাবন।
অখনে সে সব দুঃখ সহিব কেমন॥ ধু। (২৮)
শ্যাম মধুপুরে রৈল।
কাঁদি আমার জনম গেল॥ ৯। (২৯)
কার্ত্তক মাসেত সখি শরত সময়।
নির্ম্মল গগনে তারা চন্দেরর উদায়॥ (৩০)
বলরাম দাসে (কহে) শুন বিনোদিনী (নীলমণি?) ] ধু।
শূন্য দেখি কদমতলা শূন্য বৃন্দাবন।
রাধিকার মন্দির শূন্য শূন্য বৃন্দাবন॥ ধু। (৩১)
কহিও কানুর আগে।
রাই (দরশন) দান মাগে॥ ১০। (৩২)
অগ্রা’ণ নাসেত সখি নবীন (৩৩) সকল।
প্রাণনাথ বিনে চিত্ত সদাএ বিকল॥ (৩৪)
শুন শুন প্রাণ সখি মথুরাতে যাও।
প্রাণনাথ কৃষ্ণ বিনে না যুড়ায় গাও॥ ধু। (৩৫)
কহিঅ কানুর আগে।
রাই দান মাগে॥ ১১। (৩৬)
পোউষে প্রবল শীত বন্ধু নাই মোর ঘোর।
কানু গিয়াছে মোর দেশ দেশান্তর॥ (৩৭)
এমন দশা কবে হবে।
ব্রজনাথ দর্শন হবে॥ (৩৮)

.            ********************************            

.                                                                              
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর