কবি বৃন্দাবন দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
শ্রীধর    
কবি বৃন্দাবন দাস
বিশ্বম্ভর ও খোলা বেচা শ্রীধরের আখ্যান।
আনুমানিক ১৫৩৮ সাল নাগাদ বৃন্দাদন দাস দ্বারা বিরচিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী দ্বারা ১৯১৫
সালে সম্পাদিত, “শ্রীচৈতন্যভাগবত”, মধ্যখণ্ড, ৯ম অধ্যায়, ২৩০-পৃষ্ঠা।

সেই শ্রীধরের কিছু শুনহ আখ্যান
খোলার পসার করি রাখ নিজ-প্রাণ॥
একবার খোলাগাছি কিনিঞা আনয়।
খানিখানি করি তাহা কাটিয়া বেচয়॥
তাহাতে যে-কিছু হয় দিবসে উপায়।
তার অর্দ্ধ গঙ্গার নৈবেদ্য লাগি যায়।
অর্ধেক সদায় হয় নিজ-প্রাণ-রক্ষা।
এই মত হয় বিষ্ণু ভক্তের পরীক্ষা॥
মহাসত্যবাদী তিঁহো যেন যুধিষ্ঠির।
যার যেই মূল্য বোলে, না হয় বাহির॥
মধ্যেমধ্যে যে বা জন তার তত্ত্ব জানে।
তাঁহার বচনে মাত্র দ্রব্য-খানি কিনে॥
এইমতে নবদ্বীপে আছে মহাশয়।
'খোলাবেচা' জ্ঞান করি কেহ না চিনয়॥
চারি-প্রহর রাত্রি নিদ্রা নাহি কৃষ্ণনামে।
সর্ব-রাত্রি 'হরি' বোলে দীঘল-আহ্বানে॥
যতেক পাষণ্ডী বোলে "শ্রীধরের ডাকে।
রাত্রে নিদ্রা নাহি যাই, দুই কর্ণ ফাটে॥
মহা-চাষা বেটা, ভাতে পেট নাহি ভরে।
ক্ষুধায়ে ব্যাকুল হৈঞা রাত্রি জাগে মরে॥
এইমত পাষণ্ডী মরয়ে মন্দ বলি।
নিজ কার্য্য করয়ে শ্রীধর কুতুহলী॥
'হরি' বলি ডাকিতে যে আছয়ে শীধর।
নিশাভাগে প্রেমযোগে ডাকে উচ্চস্বর॥
আধপথ ভক্তগণ গেল মাত্র ধায়্যা।
শ্রীধরের ডাক শুনে---তথাই থাকিয়া॥
ডাক অনুসারে গেলা ভাগবতগণ।
শ্রীধরেরে ধরিয়া লইলা ততক্ষণ॥
"চলচল মহাশয়! প্রভু দেখসিয়া।
আমরা কৃতার্থ হই তোমা পরশিয়া॥"
শুনিঞা প্রভুর নাম শ্রীধর মূর্চ্ছিত।
আনন্দে বিহ্বল হই পড়িলা ভূমিত॥
আথেব্যথে ভক্তগণ লইল তুলিয়া।
বিশম্ভর-অগ্রে নিল আলগ করিয়া॥
শ্রীধর দেখিয়া প্রভু প্রসন্ন হইলা।
'আইস-আইস' করি বলি ডাকিতে লাগিলা॥
"বিস্তর করিয়া আছ মোর আরাধন।
বহু জন্ম মোর প্রেমে ত্যজিলা জীবন॥
এহ জন্মে মোর সেবা করিলা বিস্তর।
তোমার খোলায় অন্ন খাইলুঁ নিরন্তর॥
তোমার হস্তের দ্রব্য খাইলুঁ বিস্তর।
পাসরিলা আমা'সঙ্গে যে কৈলা উত্তর॥
যখনে করিলা প্রভু বিদ্যার বিলাস।
পরম-উদ্ধত হেন যখনে প্রকাশ॥
সেইকালে গূঢ়-রূপে শ্রীধরের সঙ্গে।
খোলা-বেচা-কেনা-ছলে কৈল বহু-রঙ্গে॥
প্রতিদিন শ্রীধরের পসারেতে গিয়া।
থোড়, কলা, মূল, খোলা আনেন কিনিয়া॥
প্রতিদিন চারিদণ্ড কলহ করিয়া।
তবে সে কিনয়ে দ্রব্য অর্ধ-মূল্য দিয়া॥
সত্যবাদী শ্রীধর --- যে নিব তাহা বোলে।
অর্দ্ধমূল্য দিয়া প্রভু নিজ-হস্তে তোলে॥
উঠিয়া শ্রীধরদাস করে কাঢ়াকাঢ়ি।
এইমত শ্রীধর-ঠাকুরে হুড়াহুড়ি॥
প্রভু বোলে "কেনে ভাই শ্রীধর তপস্বি।
অনেক তোমার অর্থ আছে হেন বাসি॥
আমার হাথের দ্রব্য লহসি কাঢ়িয়া।
এত-দিন কেবা আমি না জানিল ইহা॥"
পরম ব্রহ্মণ্য শ্রীধর---ক্রুদ্ধ নাহি হয়।
বদন দেখিয়া সব দ্রব্য কাঢ়ি লয়॥
মদনমোহন রূপ গৌরাঙ্গসুন্দর।
ললাটে তিলক ঊর্দ্ধ শোভে মনোহর॥
ত্রিকচ্ছ-বসন শোভে কুটিল-কুন্তল।
প্রকৃতে নয়ন দুই পরম-চঞ্চল॥
শুভ্র যজ্ঞসূত্র শোভে বেঢ়িয়া শরীরে।
সূক্ষ্মরূপে অনন্ত যেহেন কলেবরে॥
অধরে তাম্বুল---হাসে শ্রীধরে চা'হিয়া।
আরবার খোলা লয়ে আপনে তুলিয়া॥
শ্রীধর বোলেন "শুন ব্রাহ্মণ-ঠাকুর!
ক্ষমা কর' মোরে মুঞি তোমার কুকুর॥"
প্রভু বোলে "জানি তুমি পরম-চতুর।
খোলা-বেচা অর্থ আছে তোমার প্রচুর॥"
"আর কি পসার নাহি?" শ্রীধর সে বোলে।
"অল্প কড়ি দিয়া তথা কিন' পাত-খোলে॥"
প্রভু বোলে "যোগানিঞা আমি নাহি ছাড়ি।
থোর কলা দিয়া মোরে তুমি লহ কড়ি॥"
রূপ দেখি মুগ্ধ হৈয়া শ্রীধর সে হাসে।
গালি পাড়ে বিশ্বম্ভর পরম-সন্তোষে॥
"প্রত্যহ গঙ্গারে দ্রব্য দেহ' ত কিনিয়া।
আমারে বা কিছু দিলে মূল্যেতে ছাড়িয়া॥
যে গঙ্গা পূজহ তুমি, আমি তার পিতা।
সত্যসত্য তোমারে কহিলুঁ এই কথা॥"
কর্ণ ধরি শ্রীধর সে 'হরিহরি' বোলে।
উদ্ধত দেখিয়া তারে দেই পাত-খোলে॥
এই মত প্রতিদিন করেন কন্দল।
শ্রীধরের জ্ঞান---"বিপ্র পরম-চঞ্চল॥"
শ্রীধর বলেন "মুঞি হারিলুঁ তোমারে।
কড়ি-বিনু কিছু দিব ক্ষমা কর' মোরে॥
একখণ্ড খোলা দিব, একখণ্ড থোড়।
একখণ্ড কলা মূল ; আর দোষ মোর॥"
প্রভু বোলে "ভালভাল আর নাহি দায়।
শ্রীধরের খোলে প্রভু প্রত্যহ অন্য খায়॥
ভক্তের পদার্থ প্রভু হেনমতে খায়।
কোটি হৈলে অভক্তের উলটি না চায়॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
নবদ্বীপ    
কবি বৃন্দাবন দাস
গৌরচন্দ্রের উদয়ের আগে এবং অদ্বৈত আচার্য্যের হুঙ্কার আখ্যান।
আনুমানিক ১৫৩৮ সাল নাগাদ বৃন্দাদন দাস দ্বারা বিরচিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী দ্বারা ১৯১৫
সালে সম্পাদিত, “শ্রীচৈতন্যভাগবত”, আদিখণ্ড, ২য় অধ্যায়, ১৭-পৃষ্ঠা।


নবদ্বীপ হেন গ্রাম ত্রীভূবনে নাঞি।
যহিঁ অবতীর্ণ হৈলা চৈতন্য গোসাঞি॥
অবতরিবেন প্রভু জানিয়া বিধাতা।
সকল সম্পূর্ণ করি থুইলেন তথা॥
নবদ্বীপের সম্পত্তি কে বর্ণিবারে পারে।
একো গঙ্গাঘাটে লক্ষ লোক স্নান করে॥
ত্রিবিধ বয়সে একো জাতি লক্ষলক্ষ।
সরস্বতী দৃষ্টিপাতে সভে মহাদক্ষ॥
সভে 'মহা-অধ্যাপক' করি গর্ব্ব ধরে।
বালকে-হো ভট্টাচার্য্য-সনে কক্ষা করে॥
নানা দেশ হৈতে লোক নবদ্বীপে যায়।
নবদ্বীপে পঢ়িলে সে বিদ্যারস পায়॥
রমা-দৃষ্টিপাতে সর্বলোক সুখে বসে।
ব্যর্থ কাল যায় মাত্র ব্যবহার রসে॥
কৃষ্ণনাম-ভক্তিশূন্য সকল সংসার।
প্রথম-কলিতে হৈল ভবিষ্য-আচার॥
"ধর্ম-কর্ম্ম" লোক সভে এইমাত্র জানে।
মঙ্গলচণ্ডীর গীতে করে জাগরণে॥
দম্ভকরি বিষহরি পূজে কোন জনে।
পুত্তলি করয়ে কেহো দিয়া বহুধনে॥
ধন নষ্ট করে পুত্র কন্যার বিভায়ে।
এই মত জগতের ব্যর্থ কাল যায়ে॥
যেবা ভট্টাচার্য্য, চক্রবর্ত্তী, মিশ্র সব।
তাহারা-হো না জানয়ে গ্রন্থ-অনুভব॥
শাস্ত্র পঢ়াইয়া সভে এই কর্ম্ম করে।
শ্রোতার সহিতে যম-পাশে বন্ধি মরে॥
না বাখানে যুগধর্ম্ম---কৃষ্ণের কীর্ত্তন।
দোষ বহি গুণ কারো না করে কথন॥
যেবা সব বিরক্ত-তপস্বী-অভিমানী।
তা'সভার মুখে-হ নাহিক হরিধ্বনি॥
অতি বড় সুকৃতি সে স্নানের সময়।
"গোবিন্দ পুণ্ডরীকাক্ষ" নাম উচ্চারয়ে॥
গীতা-ভাগবত যে যে জনে যা পঢ়ায়ে।
ভক্তির ব্যাখ্যান নাহি তাহার জিহ্বায়ে॥
এইমত বিষ্ণুমায়া-মোহিত সংসার।
দেখি, ভক্ত সব দুঃখ ভাবেন অপার॥
"কেমতে এসব জীব পাইব উদ্ধার।
বিষয়-সুখেতে সব মজিল সংসার॥
বলিলেও কেহ নাহি লয় কৃষ্ণ নাম।
নিরবধি বিদ্যকূল করেন ব্যাখ্যান"॥
স্বকার্য্য করেন সব ভাগবতগণ।
কৃষ্ণপূজা, গঙ্গাস্নান, কৃষ্ণের কথন॥
সভে মেলি জগতেরে করে আশীর্ব্বাদ।
"শীঘ্র কৃষ্ণচন্দ্র করো সভারে প্রসাদ॥"  
সেই নবদ্বীপে বৈসে বৈষ্ণবাগ্রগণ্য।
'অদ্বৈত-আচার্য্য' নাম সর্ব্বলোকে ধন্য॥
জ্ঞান-ভক্তি-বৈরাগ্যের গুরু মুখ্যতর।
কৃষ্ণভক্ত বাখানিতে যেহেন শঙ্কর॥
ত্রিভুবনে আছে যত শাস্ত্র-পরচার।
সর্ব্বত্র বাখানে 'কৃষ্ণপদ-ভক্তি সার'॥
তুলসীমঞ্জরী সহিত গঙ্গাজলে।
নিরবধি সেবে কৃষ্ণ মহা-কুতূহলে॥
হুঙ্কার করয়ে কৃষ্ণ--আবেশের তেজে।
যে ধ্বনি ব্রহ্মাণ্ড ভেদি বৈকুণ্ঠেতে বাজে॥
যে প্রেমার হুঙ্কার শুনিয়া কৃষ্ণ নাথ।
ভক্তিবশে আপনেই আইলা সাক্ষাত॥
অতএব অদ্বৈত বৈষ্ণব-অগ্রগণ্য।
নিখিল-ব্রহ্মাণ্ডে যাঁর ভক্তিযোগ ধন্য॥
এইমত অদ্বৈত বৈসেন নদীয়ায়।
ভক্তিযোগ-শূন্য লোক দেখি দুঃখ পায়॥
সকল সংসার মত্ত ব্যবহার-রসে।
কৃষ্ণপূজা কৃষ্ণভক্তি কারো নাহি বাসে॥
বাশুলী পূজয়ে কেহো নানা-উপহারে।
মদ্য মাংস দিয়া কেহ যক্ষ পূজা করে॥
নিরবধি নৃত্য-গীত-বাদ্য-কোলাহলে।
না শুনে কৃষ্ণের নাম পরম মঙ্গলে॥

.            ****************      
.                                                                               
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর