কবি বৃন্দাবন দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
কবি শ্রীমদ্বৃন্দাবনদাসঠক্কুর-বিরচিত শ্রীশ্রীবৈষ্ণব-বন্দনা
১৯১১ সালে প্রকাশিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত চৈতন্য সমকালীন কবি দৈবকীনন্দন
দাস ও বৃন্দাবন দাসের “শ্রীশ্রীবৈষ্ণব বন্দনা” গ্রন্থের প্রথম বন্দনা। অতুলকৃষ্ণ গোস্বামীর
মতে ইনিই শ্রীচৈতন্যভাগবতের রচয়িতা বৃন্দাবন দাস।



আজানুলম্বিতভুজৌ কনকাবদৌতৌ
সঙ্কীর্ত্তনৈকপিতরৌ কমলায়তাক্ষৌ।
বিশ্বম্ভরৌ দ্বিজবরৌ যুগধর্ম্মপালৌ
বন্দে জগৎপ্রিয়করৌ করুণাবতারৌ॥
নমস্ত্রিকালসত্যায় জগন্নাথসুতায় চ
সপুত্রায় সভৃত্যায় সকলত্রায় তে নমঃ


জয়জয় বিশ্বম্ভর জয় দ্বিজরাজ
জয় বিশ্বম্ভর-প্রিয়গোষ্ঠীর সমাজ
জয় গৌরচন্দ্র ধর্ম্মসেতু মহাধীর
জয় সঙ্কীর্ত্তনময়--- সুন্দর-শরীর
জয় নিত্যানন্দের বান্ধব ধন প্রাণ
জয় গদাধরের অদ্বৈতের প্রেমধাম
জয় শ্রীজগদানন্দপ্রিয় অতিশয়
জয় বক্রেশ্বর-কাশীশ্বরের হৃদয়
জয়জয় শ্রীবাস-আদি-প্রিয়বর্গনাথ
জীব-প্রতি কর প্রভু শুভ দৃষ্টিপাত

      ( ২ )

ঠাকুর চৈতন্য বন্দোঁ একচিত্তমনে।
ইষ্টদেব-আদি বন্দোঁ যত প্রিয়গণে॥
বন্দোঁ ঠাকুর নিত্যানন্দ অদ্বৈত-সহিত।
গৌর আকার ---ভুজ আজানুলম্বিত॥
শুনশুন ওরে ভাই মঙ্গল চরিত্র।
শুনিলে দুরিত হরে--- ভুবন পবিত্র॥
নিত্যানন্দস্বরূপের দাসের মহিমা।
শতবর্ষ কহি যদি --- তভু নাহি সীমা॥
তথাপি যে কহি নাম জানি যার যার।
সভে নন্দগোষ্ঠী গোপ-গোপী-অবতার॥
সহস্র-মুকুটমণি নিত্যানন্দরায়।
সহস্র-বদনে প্রভু গোরাগুণ গায়॥
সেই সে সহস্র ফণা ধরি নানা রঙ্গে।
নিজ মূর্ত্তি ধরে প্রভু আপনার অঙ্গে॥
নিত্যানন্দ-মহিমা বলিতে শক্তি কার।
যার যার সঙ্গে নিত্যানন্দের বিহার॥
সভে নন্দগোষ্ঠী গোপ-গোপী-অবতার।
নিত্য শুদ্ধ বস্তু সভে প্রভুর আকার॥
এই কৃপা কর প্রভু হইয়া সদয়।
তোমার দাসের পায় যেন মতি হয়॥
সভেই জন্মিলা প্রভু-চৈতন্য-আজ্ঞায়।
নিত্যানন্দপ্রভু বুলে সংসার-মায়ায়॥
বেদব্যাস-আদি করি কহিল সকলে।
যার যেই রতি-মতি সেইমতে বলে॥


          (  ৩ )

নিত্যানন্দস্বরূপের নিষেধ লাগিয়া।
পূর্ব্বনাম না লিখিল বিদিত করিয়া॥
প্রিয় পারিষদ রামদাস মহাশয়।
নিরন্তর ঈশ্বরভাবে সেই কথা কয়॥
যার বাক্যে কেহ ঝাট না পারে বুঝিতে।
নিরন্তর গৌরচন্দ্র যার হৃদয়েতে॥
সভার অধিক ভাব গৃহস্থ রামদাস।
যাহার হৃদয়ে কৃষ্ণ ছিলা তিনমাস॥
শ্রীদাম করিয়া যারে ভাগবতে কয়।
রামদাস সেই বস্তু জানিহ নিশ্চয়॥
প্রেমের অধিক প্রেমবিগ্রহ প্রকাশ।
নববিধা প্রেমভক্তি যাঁহার বিলাস॥
প্রেমের সমুদ্রে শ্রীসুন্দরানন্দ-নাম।
নিত্যানন্দস্বরূপের মহাপ্রেমধাম॥
পারিষদমধ্যে যার প্রথমে গণনা।
নিত্যানন্দস্বরূপের ধন প্রাণ বাণা॥
সুদাম করিয়া যারে পুরাণে বাখানে।
সুন্দরানন্দ সেই বস্তু জানে সর্ব্বজনে॥
পণ্ডিত কমলাকর পরম উদ্দাম।
যাঁহারে দিলেন নিত্যানন্দ সপ্তগ্রাম॥
বসুদাম করি যারে পুরাণে কহিল।
কমলাকর সেই বস্তু সকলে জানিল॥
উদ্ধারণদত্ত মহা বৈষ্ণব উদার।
নিত্যানন্দসেবায় যাঁহার অধিকার॥


          ( ৪ )

মহাবল করি যারে ভাগবতে কয়।
উদ্ধারণ সেই বস্তু জানিহ নিশ্চয়॥
নিত্যানন্দজীবন শ্রীপরমেশ্বরদাস।
যাঁহার বিগ্রহে নিত্যানন্দের বিলাস॥
সুবাহু করিয়া যারে পুরাণে কহিল।
পরমেশ্বর সেই বস্তু সকলে জানিল॥
বাহ্য নাহি পুরুষোত্তমদাসের শরীরে।
নিত্যানন্দচন্দ্র যাঁর হৃদয়ে বিহরে॥
স্তোককৃষ্ণ করি যাঁরে পুরাণে বাখানে।
পুরুষোত্তম সেই বস্তু জানে সর্ব্বজনে॥
গৌরীদাসপণ্ডিত পরম ভাগ্যবান্।
কায়মনোবাক্যে যাঁর নিত্যানন্দ প্রাণ॥
সুবল করিয়া যারে পুরাণে কহিল।
গৌরীদাসপণ্ডিতেরে সকলে জানিল॥
পুরুষোত্তমপণ্ডিতের নবদ্বীপে জন্ম।
নিত্যানন্দস্বরূপের হয় মহা মর্ম্ম॥
অর্জ্জুন করিয়া যারে ভাগবতে কয়।
পুরুষোত্তম সেই বস্তু জানিহ নিশ্চয়॥
রতাইর পুত্র বলি সর্ব্বলোকে কয়।
নিত্যানন্দপারিষদ সেই মহাশয়॥
লবঙ্গ করিয়া যারে পুরাণে বাখানে।
পুরুষোত্তম সেই বস্তু জানে সর্ব্বজনে॥
প্রসিদ্ধ কালিয়াকৃষ্ণদাস ত্রিভুবনে।
গৌরচন্দ্র-স্ফুর্ত্তি হয় যাঁর দরশনে॥


          ( ৫ )

মহাবাহু করি যারে ভাগবতে কয়।
কালিয়াকৃষ্ণ সেই বস্তু জানিহ নির্ণয়॥
( ইতি শ্রীগোপাল-নির্ণয়।  )

প্রেমভক্তিরসময় গদাধরদাস।
যাঁর দরশণে সর্ব্বপাপ হয় নাশ॥
রাধিকা করিয়া তাঁরে জানে সর্ব্বজনে।
গৌরচন্দ্র লভ্য হয় যাঁর দরশনে॥
সদাশিবকবিরাজ মহাভাগ্যবান্।
গৌরচন্দ্র নিত্যানন্দ যার ধনপ্রাণ॥
চন্দ্রাবলী করি যারে পুরাণে বাখানে।
সদাশিব-কবিরাজ জানে সর্ব্বজনে॥
ধনঞ্জয়পণ্ডিত মহান্ত বিলক্ষণ।
যাঁহার হৃদয়ে নিত্যানন্দ সর্ব্বক্ষণ॥
মহেশপণ্ডিত অতি পরম মহান্ত।
নিত্যানন্দপ্রিয় বড় কহিল একান্ত॥
প্রেমময় মহামত্ত বলরামদাস।
যাঁহার বাতাসে সর্ব্বপাপ হয় নাশ॥
রাঢ়ে জন্ম মহাশয় বিপ্র কৃষ্ণদাস।
নিত্যানন্দ-পারিষদে যাঁহার বিলাস॥
জগদীশ-পণ্ডিত পরম জ্যোতির্ধাম।
নিত্যানন্দ-পারিষদে কহি তাঁর নাম॥
বড়গাছি-আলয় সুকৃতি কৃষ্ণদাস।
যাঁহার গ্রামেতে নিত্যানন্দের বিলাস॥


        ( ৬ )

জগন্নাথ কবিচন্দ্র প্রেমরসময়।
নিরবধি নিত্যানন্দ যাঁহার হৃদয়॥
প্রসিদ্ধ চৈতন্যদাস মুরারিপণ্ডিত।
যাঁর খেলা মহাসর্প-ব্যাঘ্রের সহিত॥
রঘুনাথবৈদ্য-উপাধ্যায় মহামতি।
যাঁর দৃষ্টিমাত্রে হয় কৃষ্ণে রতি-মতি॥
চতুর্ভুজপণ্ডিত, নন্দন, গঙ্গাদাস।
পূর্ব্বে যাঁর ঘরে নিত্যানন্দের বিলাস॥
আচার্য্য বৈষ্ণবানন্দ পরম উদার।
পূর্ব্বে রঘুনাথপুরী নাম খ্যাতি যাঁর॥
পরমানন্দ উপাধ্যায় বৈষ্ণব একান্ত।
নিত্যানন্দপ্রেমে তিঁহ হইলা মহান্ত॥
প্রসিদ্ধ পরমানন্দগুপ্ত মহাশয়।
পূর্ব্বে যাঁর ঘরে নিত্যানন্দের আলয়॥
মহান্ত আচার্য্যচন্দ্র ধরে সর্ব্বশক্তি।
নিত্যানন্দ বহি তার অন্য নাহি গতি॥
কৃষ্ণানন্দ দেবানন্দ দুই শুদ্ধ-দাস।
নিত্যানন্দ-পারিষদে যাঁহার বিলাস॥
আচার্য্য বৈষ্ণবানন্দ পরম উদার।
নিত্যানন্দচন্দ্র-বিনু গতি নাহি যাঁর॥
গায়ন মাধবানন্দঘোষ মহাশয়।
বাসুদেবঘোষ অতি প্রেমরসময়॥
নিত্যানন্দপ্রিয় বড় মনোহর বাএন।
কৃষ্ণানন্দ দেবানন্দ এই চারিজন॥


         ( ৭ )

মহাভাগ্যবন্ত এই চারি পণ্ডিত উদার।
বাসভার ঘরে নিত্যানন্দের বিহার॥
পুণ্ডরীকবিদ্যানিধি বন্দিলাঙ আনন্দে।
উচ্চস্বরে যাঁরে স্মরি গৌরচন্দ্র কান্দে॥
বন্দিলাঙ আনন্দে ঠাকুর হরিদাস।
আর হরিদাস বন্দোঁ সিন্ধুকূলে বাস॥
বন্দিলাঙ মুকুন্দদত্ত কৃষ্ণের গায়ন।
শিবানন্দসেন-আদি মহা-আপ্তগণ॥
বন্দিলাঙ শ্রীগোবিন্দ হরষিত-মনে।
মূল হৈয়া কীর্ত্তন করিল প্রভুর সনে॥
বন্দিলাঙ আখরিয়া শ্রীবিজয়দাস।
রত্নবাহু যারে প্রভু করিল প্রসাদ॥
সদাশিবপণ্ডিত বন্দিলাঙ মহামতি।
যাঁর ঘরে পূর্ব্বে নিত্যানন্দের বসতি॥
পুরুষোত্তম অঞ্জয় বন্দোঁ হরষিত-মনে।
নিত্যানন্দ যাঁর গৃহে আইলা প্রথমে॥
অচ্যুতানন্দ বন্দি যার চরিত্র অদ্ভুত।
ব্রহ্মনন্দভারতী আর সনাতন রূপ ॥
বন্দিলাঙ গরুড়পণ্ডিত হরষিতে।
নাম লইলে যাঁর না লয় সর্পবিষে॥
যত ভৃত্য প্রিয়সখা নিত্যানন্দ-সঙ্গে।
কে তাহা লিখিতে পারে সমুদ্রতরঙ্গে॥
যত সঙ্গী নিত্যানন্দচন্দ্রের সহিতে ।
শতবত্সরেও তাহা না পারি লিখিতে॥


          ( ৮ )

সহস্রসহস্র এক-সেবকের গণ।
নিত্যানন্দপ্রসাদে তাঁরাও গুরুজন॥
চৈতন্যরসেতে সব পরম উদ্দাম।
সভার চৈতন্য-নিত্যানন্দ ধনপ্রাণ॥
অবশেষ-ভৃত্য শ্রীবৃন্দাবনদাস।
যাঁর শেষপাত্র নারায়ণীর গর্ভবাস॥
জ্ঞানেতে পণ্ডিত হৈল দাসপদ পাই।
জন্মেজন্মে বৃন্দাবনচন্দ্র-গুণ গাই॥
নিত্যানন্দ শ্রীচৈতন্য দুই মহাজন।
জন্মেজন্মে ভজি দুই প্রভুর চরণ॥
নবধাপ্রকারেতে করিব ভজনা।
এই দান দেহ প্রভু মাগে নিজজনা॥
জয়জয় গৌরচন্দ্র জয় নিত্যানন্দ।
জয়জয় প্রভুর যতেক ভক্তবৃন্দ॥
জয়জয় অদ্বৈতাদি জয় হরিদাস।
জয়জয় গদাধর জয় শ্রীনিবাস॥
এবে শুন বৈষ্ণবসভার আগমন।
আচার্য্যগোসাঞি-আদি যত প্রিয়গণ॥
রথ-আরোহণ-যাত্রা হইল সময়।
নীলাচলে ভক্তগোষ্ঠী করিল বিজয়॥
ঈশ্বরের আজ্ঞা --- প্রতি বত্সরেবত্সরে।
সভে আসিবেন রথযাত্রা দেখিবারে॥
আচার্য্যেগোসাঞি--আদি করি ভক্তগণ।
সভে নীলাচলপ্রতি করিল গমন॥


           ( ৯ )

চলিলেন ঠাকুর পণ্ডিত শ্রীনিবাস।
যাঁহার মন্দিরে হৈল চৈতন্যপ্রকাশ॥
তবে চলিলেন শ্রীপণ্ডিত বক্রেশ্বর।
যাঁর মন্দিরে নাচিলেন গৌরাঙ্গসুন্দর॥
চলিলেন আনন্দে ঠাকুর হরিদাস।
বিগ্রহে ব্রহ্মবস্তু ভক্তির প্রকাশ॥
চলিলেন প্রদ্যুন্মব্রহ্মচারী মহাশয়।
সাক্ষাতে নৃসিংহ যাঁর সনে কথা কয়॥
চলিলেন বাসুদেবদত্ত মহাশয়।
যাঁর স্থানে কৃষ্ণ হয় আপনে বিক্রয়॥
চলিলা আচার্য্যচন্দ্র শ্রীচন্দ্রশেখর।
দেবীভাবে যাঁর গৃহে নাচিলা ঈশ্বর॥
চলিলেন হরিষে পণ্ডিত গঙ্গাদাস।
যাঁহার স্মরণে সর্ব্বপাপ হয় নাশ॥
পুরুষোত্তম অঞ্জয় চলিলা হর্ষ-মনে।
মহাপ্রভুর মুখ্য শিষ্য পূর্ব্ব অধ্যয়নে॥
হরি বলি চলিলেন পণ্ডিত শ্রীমান্।
প্রভুর নৃত্যে ধরে দেউটী সাবধান॥
নন্দনআচার্য্য-আদি চলিলা প্রিয়জনে।
প্রথমে নিত্যানন্দ আইলা যাঁহার ভবনে॥
চলিলেন লেখক পণ্ডিত ভাগ্যবান্।
যাঁর দেহে কৃষ্ণ হৈয়াছিলা অধিষ্ঠান॥
গোপীনাথপণ্ডিত আর শ্রীগর্ভপণ্ডিত।
চলিলেন হই কৃষ্ণবিগ্রহে নিশ্চিত॥


        ( ১০ )

হরিষে চলিলা শুক্লাস্বরব্রহ্মচারী ।
যাঁর অন্ন খাইলেন প্রভু গৌরহরি॥
অকিঞ্চন কৃষ্ণদাস চলিলা শ্রীধর।
যাঁর জল পান কৈল শ্রীগৌরসুন্দর॥
চলিলা শ্রীবনমালিপণ্ডিত মঙ্গল।
যে দেখিল নিত্যানন্দের হল আর মুষল॥
জগদীশপণ্ডিত আর হিরণ্য ভাগবত।
আনন্দে চলিলা দুঁহে কৃষ্ণরসে মত্ত॥
পূর্ব্বে শিণ্ডরূপে যঁ র য ই দুই-ঘরে।
নৈবেদ্য খাইলা আনি শ্রীহরিবাসরে॥
চলিলেন বুদ্ধিমন্তখান মহাশয়।
আজন্ম চৈতন্য-আজ্ঞা যাঁহার বিষয়॥
হরি বলি চলিলা আচার্য্য পুরন্দর।
হরি বলি যাঁরে ডাকে শ্রীগৌরসুন্দর॥
চলিলেন পণ্ডিত শ্রীর ঘর উদার।
গুপ্তে যাঁর ঘরে হৈল চৈতন্যবিহার॥
চলিলেন গোপীনাথসিংহ মহাশয়।
অক্রূর করিয়া যাঁরে গৌরচন্দ্র কয়॥
ভবরোগবৈদ্যসিংহ চলিলা মুরারি।
গৌরচন্দ্র-অ বির্ভ ব-অনুমানকারী॥
প্রভুর পরম প্রিয় শ্রীম ন্ পণ্ডিত।
চলিলেন বনম লিপণ্ডিত-সহিত॥
আই-দরশন-ল গি পণ্ডিত দামোদর।
আসিছিলা আই দেখি চলিলা সত্বর॥


          ( ১১ )

অনন্ত চৈতন্যভক্ত—কত নিব নাম।
সভেই চলিলা হৈয়া আনন্দের ধাম॥
আই-স্থানে ভক্তি করিন বিদায় করিয়া।
চলিলা অদ্বৈতসিংহ ভক্তগোষ্ঠী লয়্যা॥
যে দ্রব্যে জানেন প্রভুর পূর্ব্বের পীরিত।
সেই দ্রব্য লইলেন ভিক্ষার নিমিত্ত॥
সর্ব্বপথে শ্রীআনন্দে কীর্ত্তন করিতে।
চলিলা পবিত্র করি সর্ব্ব পথেপথে॥
উলসিতে হরিধ্বনি করে ভক্তগণ।
শুনিয়া পবিত্র হয় এ তিন ভুবন॥
পত্নী-পুত্র-দাস-দাসীগণের সহিতে।
আইলা পরমানন্দে চৈতন্য দেখিতে॥
যে স্থানেতে রহে আসি সভে বাসা করি।
সেই স্থানে হয় যেন শ্রীবৈকুন্ঠপুরী॥
যাঁহা গায়েন মহাপ্রভু সেই ভগবান্।
*        *        *        *
ভগবান্-রূপে প্রভু অনন্ত লীলায়।
একরূপ ভগবান্ প্রভুর কৃপায়॥
অনন্ত মাধব-রূপে খেলা-লীলা করে।
অনন্ত করয়ে সেবা মুকুন্দের ঘরে॥
মহাপ্রভু করেন ভক্তি আদর করিয়া।
শিলা-মধ্যে বস্তু যেন আছে লুকাইয়া॥
আদ্যাশক্তিরূপে মহী বৈষ্ণবী জননী।
যাহার আত্মজ গঙ্গা ধরেন মহামণি॥


     ( ১২ )

এইসব আদিমূর্ত্তি ভক্তিপ্রসবিতা।
প্রভুর বল্লভা ভক্তি --- এই মর্ম্ম কথা॥
বেদের নিগূঢ় এই চরিত্র অগাধ।
সুকৃতির ভাল দুষ্কৃতির কার্য্যবাধ॥
সভে শুনে এসকল নিগূঢ় আখ্যান।
তাহার সহায় মহাপ্রভু ভগবান্॥
জয়জয় ভগবান্ জয় হলধর।
জয়জয় ভগবান্ ত্রিমল্ল সুন্দর॥
জয়জয় হরিহর জয় বলরাম।
জয়জয় জগন্নাথ আনন্দের ধাম॥
জয়জয় মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য।
জয়জয় নিত্যানন্দপ্রভু ধন্যধন্য॥
এইমতে রঙ্গে মহাপুরুষসকলে।
সকল মঙ্গলে সব আসি নীলাচলে॥
কমলপুরেতে ধ্বজপতাকা দেখিয়া।
কান্দিয়া পড়িল সব দণ্ডবত হৈয়া॥
মহাপ্রভু শুনি ভক্তগোষ্ঠীর বিজয়।
আগুবাঢ়িবারে চিত্ত হৈল ইচ্ছাময়॥
কি অদ্ভুত প্রীতি সে—তাহার নাহি অন্ত।
মহাপ্রসাদ চলে যার কটক-পর্য্যন্ত॥
‘অদ্বৈত-নিমিত্ত মোর এই অবতার’।
এইমতে মহাপ্রভু বলেন বারেবার॥
শয়নে আছিলুঁ মুঞি ক্ষীরোদসাগরে।
নিদ্রাভঙ্গ হৈল মোর নাঢ়ার হুঙ্কারে॥


         ( ১৩ )

নাঢ়া নাঢ়া বলি প্রভু করেন হুঙ্কার।
অদ্বৈতনিমিত্ত মোর এই অবতার॥
নাঢ়ার কারণ কেহ না পারে বুঝিতে।
নাঢ়া লাগি অবতার ধরি ত্রিজগতে॥
নাঢ়ার কারণ প্রভু চৈতন্য-নিতাই।
অনন্ত-ব্রহ্মাণ্ডমাঝে যার গুণ গাই॥
অনন্ত চৈতন্যভৃত্য – কত নাম জানি।
সভার চরণ বন্দোঁ জোড় করি পাণি॥
প্রভাতে উঠিয়া পঢ়ে-শুনে যেইজন।
অদ্বৈত-চৈতন্য পায় --- না যায় খণ্ডন॥
শ্রীনিত্যানন্দ শ্রীচৈতন্যচন্দ্র জান।
বৃন্দাবনদাস তছু পদযুগে গান॥


ইতি শ্রীমদ্বৃন্দাবনদাসঠক্কুর-বিরচিতা
শ্রীবৈষ্ণববন্দনা সমাপ্তা।

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর