কবি বৃন্দাবন দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
কবি শ্রীবৃন্দাবনদাস-বিরচিতা শ্রীশ্রীবৈষ্ণব-বন্দনা
১৯১১ সালে প্রকাশিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত চৈতন্য সমকালীন কবি দৈবকীনন্দন দাস ও বৃন্দাবন
দাসের “শ্রীশ্রীবৈষ্ণব বন্দনা” গ্রন্থের তৃতীয় বন্দনা। অতুলকৃষ্ণ গোস্বামীর মতে ইনি ভিন্ন কোন বৃন্দাবন দাস।

বন্দে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য-নিত্যানন্দৌ কৃপাময়ৌ।
সর্ব্ববতারে সদ্ভক্তৌ সর্ব্বভক্তজনাশ্রয়ৌ॥

যথারাগঃ॥

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচন্দ্র,                     বলরাম নিত্যানন্দ,
গাওনারে ভরিয়া বদন।
সুখে জন্ম গোঙাইবে,                বৈষ্ণবের সঙ্গ পাবে,
না হইবে শমন-দর্শন॥
কলিকাল সর্পরূপে,                 দংশিল সকল লোকে,
বিষজ্বালায় জগত ঢলিল।
গৌরাঙ্গ গুণের ধাম,                   হরেকৃষ্ণরাম-নাম,
মহামন্ত্রবলে জীয়াইল॥
বিশেষ বৈষ্ণবগণ,                        ত্রিভুবন-পাবন,
পতিত দুঃখিত জীব দেখি।
করুণা বাঢ়ল হিয়া,                    কৃষ্ণ উপদেশ দিয়া,
কৃষ্ণসুখে করাইল সুখী॥
শুনবে পামর নর,                     মিছামায়া পরিহর,
ধরধর বৈষ্ণবের পায়।
বৈষ্ণবকৃপার বলে,                গরাসিতে নারে কালে,
ভালেভালে কুলাইয়া যায়॥
বৈষ্ণবের সঙ্গ কর                 বৈষ্ণবের অঙ্গ হের,
বৈষ্ণবের বাক্য শুন কাণে।
বিচারিয়া দেখ মনে,                ঠাকুর বৈষ্ণব বিনে,
হরিভক্তি দিতে নারে আনে॥


( ২৯ )

বৈষ্ণব-মহত্ত্ব যত,               লোক-বেদে অবিদিত,
দেবগণে তত্ত্ব নাহি পায়।
মুঞি সে হীনের হীন,                পতঙ্গ হইতে ক্ষীণ,
ক্ষুদ্রমুখে কি বলিব তায়॥
তথাপি এহেন শক্তি,             অনুরূপে দিবারাতি,
নিতিনিতি করিয়া ভাবনা।
শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দ,                সঙ্গে যত ভক্তবৃন্দ,
তাহা কিছু করিব বর্ণনা॥
আপন অন্তর কহি,              যে রসের যোগ্য নহি,
তাহাতেই লুব্ধ ভেল মন।
সন্ধি বা যশের দোষে,             না করিহ উপহাসে,
ভাবগ্রাহী প্রভু জনার্দ্দন॥
সহজেই মুগ্ধ প্রাণে,                 পূর্ব্বাপর নাহি জানে,
ক্রমে সে বন্দনা নাহি যবে।
অতএব পরিহার,                বাক্যে করোঁ নমস্কার,
অপরাধ কেহ না লইবে॥
অবনী লোটাঞা কায়,                শচী-জগন্নাথ-পায়,
প্রথমে করিব পরণাম।
তবে বন্দোঁ বিশ্বরূপ,               ঠাকুর সন্ন্যাসিভূপ,
শ্রীশঙ্করারণ্য ধন্য নাম॥
একান্ত ভকতি করি,              বন্দোঁ গৌরচন্দ্র হরি,
ভুবনমঙ্গল অবতার।
যুগধর্ম্ম পালিবারে,                 জন্মিলা নদীয়াপুরে,
সঙ্কীর্ত্তন করিতে প্রচার॥



( ৩০ )

পরম সম্ভ্রম হৈঞা,             বন্দোঁ লক্ষ্ণী বিষ্ণুপ্রিয়া,
তবে বন্দোঁ দেব গদাধর।
যতেক বৈষ্ণবচয়,                  তত প্রিয় কেহ নয়,
দ্বিতীয় চৈতন্যকলেবর॥
বন্দোঁ পদ্মাবতী মাতা,               হাড়াইপণ্ডিত পিতা,
নিত্যানন্দ হেন পুত্র যাঁর।
বন্দোঁ প্রভু নিত্যানন্দ,                অভয় আনন্দকন্দ,
যে করিল সভার নিস্তার॥
বারুণী যাঁহার নাম,                      অনঙ্গমঞ্জরী-ধাম,
তছু-পদে করি পরণাম।
অনঙ্গমঞ্জরী যেঁহ,                জাহ্নবা গোসাঞি তেঁহ,
বারুণী তাঁহার পূর্ব্ব-নাম॥
সানন্দে পড়িয়া ভূমি,                 বন্দোঁ বসু-জাহ্নবিনী,
বীরচন্দ্র যাঁহার নন্দন।
বন্দিব ঠাকুর বীর-                        ভদ্র গম্ভীর ধীর,
যাঁর গুণে ভরিল ভুবন॥
নীলাচলে গৌরহরি,                  নিত্যানন্দ সঙ্গে করি,
নিভৃতে কহিল যুক্তি সার।
তাহার কারণ এই,                     বীরচন্দ্র প্রভু সেই,
গৌরাঙ্গ আপনি অবতার॥
সন্দেহ না কর ইথে,                    শ্রীচৈতন্যভাগবতে,
লিখিলেন বৃন্দাবনদাস।
এইসব অনুভব                      অভিরাম জানে সব,
প্রণমিয়া করিল প্রকাশ॥


( ৩১ )

রাধাকৃষ্ণ দ্রব্যরূপ,            আছিল ব্রহ্মার কূপ,
তিনলোকে স্থিতি জগন্মাতা।
দ্রবব্রহ্ম ভগবান,                গঙ্গাদেবী তাঁর নাম,
বন্দোঁ সেই নিত্যানন্দসুতা॥
গোবিন্দের প্রেমধাম,           আচার্য্য মাধব নাম,
প্রেমানন্দময় তনুখানি।
জোড় করি করদ্বন্দ্ব,          বন্দোঁ সে পদারবিন্দ,
গঙ্গাদেবী যাঁহার গৃহিণী॥
ভালিরে গৌরাঙ্গচান্দ,        পাকিয়া প্রেমের ফান্দ,
বান্ধিল জীবের মনখানি
হরিনামগুণধ্যানে,               ধন্য কৈল জগজনে,
মরি যাঙ তোমার নিছনি॥



বন্দোঁ শ্রীমাধবপুরী                অবনীতে অবতরি,
বিষ্ণুভক্তি যে করিল ব্যত্ত।
প্রাচীন যে আদিগুরু,                  করুণাকলপতরু,
যেঁহ মহাপ্রভুর আদি ভক্ত॥
বন্দোঁ শান্তিপুরপতি,                শ্রীঅদ্বৈত মহামতি,
সদাশিবসম তেজ যাঁর।
যাঁহার তপের বলে,              আনিঞা মহীমণ্ডলে,
পাতিল চৈতন্য অবতার॥


( ৩২ )

কৈলাশের আদ্যাশক্তি,            বন্দোঁ সীতা ভগবতী,
ভক্তিশক্তিসম তেজ যাঁর।
যাঁহার প্রতিজ্ঞা হৈতে,                অবতীর্ণ জগন্নাথে,
করিলা প্রসাদ-পরচার॥
সীতার চরণধূলি,                  বন্দিব মস্তকে তুলি,
আপনাকে মানিয়ে শালাঘ্য।
তছু প্রিয়সুত বন্দোঁ,                শ্রীযুত অচ্যুতানন্দ,
শিশুকালে যাঁহার বৈরাগ্য॥
পুরিয়া মনের আশ,                  বন্দিব সে শ্রীবাস,
অভেদ নারদ মুনিবর।
বন্দোঁ দেবী মালিনীরে,        মা বলি ডাকিলা যাঁরে,
নিত্যানন্দ প্রভু বিশ্বম্ভর॥
বন্দোঁ নারায়ণী দেবী,               চৈতন্যচরণ সেবি,
অধরামৃত যে জন পাইল।
বন্দিব শ্রীহরিদাস,                স্বয়ং ব্রহ্মা পরকাশ,
উচ্চস্বরে নাম লওয়াইল॥
বন্দিব পরমানন্দ,                   পণ্ডিত জগদানন্দ,
মূর্ত্তিভেদে যেন সরস্বতী।
ঠাকুর শ্রীগোপীনাথ-,              পদে কৈল প্রণিপাত,
প্রভুরে যে কৈল বহুস্তুতি॥
বন্দিব মুরারি গুপ্ত,                  যেন সেই হমুমন্ত,
রঘুনাথ যাঁর প্রাণধন।
শ্রীচন্দ্রশেখর বন্দোঁ,        শীতল চন্দ্রের সম ( ?? )
তবে বন্দোঁ আচার্য্য রতন॥


( ৩৩ )

গোবিন্দ গরুড় প্রতি,         বন্দিব করিয়া স্তুতি,
গৌরপাদ যাঁহার ধেয়ান।
বন্দিব মুকুন্দ দত্ত,                কৃষ্ণগুণে উনমত্ত,
কিন্নর গঞ্জয়ে যাঁর গান॥
বন্দোঁ বাসুদেব দত্ত,             যাহার নিগূঢ় তত্ত্ব,
মহত্ত্বতা কহনে না যায়।
যাঁহার অঙ্গের বায়ে,           কৃষ্ণপ্রেমভক্তি হয়ে,
উপমা কি দিব আর তায়॥
দামোদর পীতাম্বর,                 জগন্নাথ শঙ্কর,
নারায়ণ এই পঞ্চ ভাই।
সকল-বাসনা-হীন,                নিরপেক্ষ উদাসীন,
বন্দনা করিব একঠাঞি॥
প্রভু-মাতামহ-খ্যাতি,               নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী,
সাবধানে করিব বন্দন ।
সর্ব্বজ্ঞ জিনিয়া দৃষ্টি,          প্রভুর শুভ জন্মকোষ্ঠি,
যে লিখিল ভবিষ্য-কথন॥
সকল গুণের ধাম,             বন্দিব পণ্ডিত রাম,
অহিংসক পরহিতকারী।
একচিত্ত-কায়মনে,             বন্দোঁ গুপ্ত নারায়ণে,
চরণে ধরিয়া শিরোপরি॥
নদীয়ানগরে বাস,             বন্দোঁ গুরু গঙ্গাদাস,
যাঁর স্থানে প্রভুর অধ্যয়ন।
দশনে ধরিয়া তৃণ,               বিষ্ণুদাস সুদর্শন,
দৈন্যভাবে করিল বন্দন॥


( ৩৪ )


সদাসিব বিদ্যানিধি,          শ্রীগর্ভ আর শ্রীনিধি,
বুদ্ধিমন্তখান মহাশয়।
শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারী,            প্রেমধনের অধিকারী,
বন্দোঁ এই ছয় মহাশয়॥
রামদাস কবিচন্দ্র,               লেখক বিজয়ানন্দ,
বন্দিব আচার্য্য রত্নেশ্বর।
বন্দিব শ্রীধর উদার,             গৌরাঙ্গ গ্রাহক যার,
থোড়-কলা-মোচার পসার॥
বন্দোঁ করপুটাঞ্জলি,                    পুত্রসহ বনমালী,
ভক্তির ভিক্ষুক দুইজন।
হলায়ুধ বাসুদেবে,                 বন্দনা করিব তবে,
চৈতন্যে একান্ত যাঁর মন॥
আইর কৃপার পাত্র,                 বন্দিব ঈশান মাত্র,
আই যাঁরে করিল পালন।
গরুড়াই কাশীশ্বরে,                বন্দিব তাহার পরে,
জগদীশের বন্দিয়া চরণ॥
গঙ্গাদাস কৃষ্ণানন্দ,                 বন্দোঁ রায় শ্রীমুকুন্দ,
বিশেষতঃ পরম সাদরে।
বন্দোঁ শ্রীবল্লভাচার্য্য,               সার্থক যাঁহার কার্য্য,
লক্ষ্মী কন্যা যে দিল প্রভুরে॥
বন্দিব ভকতিমনে,                     পণ্ডিত শ্রীসনাতনে,
বিষ্ণপ্রিয়া যাঁহার দুহিতা।
কোন্ তপস্যার বলে,              না জানি কি পুণ্যফলে,
মহাপ্রভু হইল জামাতা॥


( ৩৫ )

করিয়া যুগল হাথ,              বন্দো দ্বিজ কাশীনাথ,
বন্দিব আচার্য্য বনমালী।
প্রভুসঙ্গে লক্ষ্মীদেবী,                 শুভবিবাহের লাগি,
যে আসিয়া কৈল ঘটকালী॥
বন্দিব ঈশ্বরপুরী,                প্রভু যাঁরে গুরু করি,
আপনাকে দৈন্য হেন বাসি।
কেশবভারতী প্রতি,              বন্দোঁ নম্র হৈয়া অতি,
যে করিল প্রভুকে সন্ন্যাসী॥
বন্দোঁ রামচন্দ্রপুরী,                 যাঁহার বিক্রম হেরি,
নির্বত্ত করিল প্রভু সব ।
শ্রীপুরী পরমানন্দ,                     বন্দোঁ তছু-পদদ্বন্দ্ব,
যাঁরে বলি ঠাকুর উদ্ধব॥
বন্দোঁ দামোদর পুরী,                   যাঁর বশ গৌরহরি,
সত্যভ্যামা-সম যাঁর রীতি।
শ্রীনৃসিংহানন্দ ন্যাসী,                   সংকীর্ত্তন-সুবিলাসী,
বন্দোঁ সত্যানন্দ মহামতি॥
বন্দোঁ গরুড় অবধূত,                  যাঁর প্রেম অদভুত,
চমত্কার দেখিতে-শুনিতে।
বন্দিব শ্রীবিষ্ণুপুরী,                     ‘বিষ্ণুভক্তি-রত্মালী’,
যে করিল লোক নিস্তারিতে॥
বন্দোঁ বিশ্বেশ্বরানন্দ,                  যাঁর প্রাণ গৌরচন্দ্র,
তবে বন্দোঁ শ্রীকেশব পুরী।
বন্দোঁ অনুভবানন্দ,                    ভারতী সচ্চিদানন্দ,
তবে বন্দোঁ মনোরথপুরী॥


( ৩৬ )

বন্দোঁ রূপ সনাতন,                   বসতি শ্রীবৃন্দাবন,
পরম বিরক্ত উদাসীন।
রাজ্যপদ পরিহরি,                  ভিক্ষুকের বেশ ধরি,
যে লইল করঙ্গ কৌপীন॥
বন্দোঁ জীব গোসাঞিরে,             সকল বৈষ্ণব যাঁরে,
জিজ্ঞাসিলে ‘কোন্ তত্ত্বসার ?’।
বিচারিয়া সর্ব্বশাস্ত্র,                  কহিলেন ‘একমাত্র,
ভক্তিযোগ-পর নাহি আর’॥
শ্রীরাধাকুণ্ডেতে বাস,                   বন্দোঁ রঘুনাথদাস,
যে জন চৈতন্যমর্ম্ম জানে।
রাঘব গোসাঞি তবে,              বন্দোঁ বড় ভক্তিভাবে,
যাঁহার বিলাস গোবর্দ্ধনে॥
বন্দিব গোপাল ভট্ট,                       সনাতন-নিকট,
বসতি কেবল একস্থানে।
অন্যকথা নাহি মুখে,                    দিবসরজনী সুখে,
বঞ্চিল গোবিন্দ-নাম-গুণে॥
বন্দোঁ রঘুনাথ ভট্ট,                     কৃষ্ণপ্রেমে উনমত্ত,
বৃন্দাবনে ব্রজবাসি-সঙ্গে।
ভাগবত পঢ়েন যবে,          প্রেমে অঙ্গ আউলায় তবে,
মধুকন্ঠ ধরেন প্রসঙ্গে॥
বন্দোঁ প্রভু লোকনাথ,                    ভূগর্ভঠাকুর-সাথ,
সদা বিলসই বৃন্দাবনে।
দেখিয়া কাতর জন,                     সদাই ব্যাকুল মন,
সুখী কৈল দিয়া প্রেমধনে॥


( ৩৭ )

বন্দোঁ করিয়া ভক্তি,            প্রবোধানন্দ সরস্বতী,
পরম মহত্ত্ব গুণধাম।
‘শ্রীচৈতন্যচন্দ্রামৃত’,                  পুস্তক যাঁহার কৃত,
এই পুঁথি ভক্ত-ধন-প্রাণ॥
বন্দোঁ হরষিত-মতি,               কাশীশ্বর মহামতি,
খ্যাতি ‘ভক্ত’ যারে বোলে সভে।
বন্দোঁ শুদ্ধ সরস্বতী,               গৌরপদে দৃঢৃ ভক্তি,
পশুপক্ষী বন্দী যার ভাবে॥
বন্দিব রাঘবানন্দ,                 যাঁর ঘরে নিত্যানন্দ,
অনুভাব করিল বিদিত।
বাড়ীর জাম্বীরগাছে,                 কদম্ব ফুটিয়া আছে,
সর্ব্বলোক দেখিতে বিস্মিত॥
বন্দোঁ মূর্ত্তি মনোহর,                   ঠাকুর শ্রীপুরন্দর,
যেন সেই অঙ্গদ ঠাকুর।
এক বিপ্র ল’য়ে তাঁরে,             অতিথি করিল ঘরে,
গোষ্ঠি-সহ দেখিল লাঙ্গুল॥
বন্দোঁ কাশী মিশ্রবর,               উত্কলে যাঁহার ঘর,
যাঁহার আশ্রমে গৌররায়।
পট্টনায়ক বাণীনাথ,                      যাঁর প্রাণ জগন্নাথ,
বন্দনা করিব তাঁর পায়॥
বন্দোঁ রায় রামানন্দ,                   যাঁর সঙ্গে গৌরচন্দ্র,
বিচারিলা ভক্তির লক্ষ্মণ।
বন্দিব শ্রীবক্রেশ্বর,         যাঁর নৃত্যে বিশ্বম্ভর,
মহানন্দে  করিলা কীর্ত্তন॥


( ৩৮ )

বন্দিব সুবুদ্ধি মিশ্র,           শ্রীগোবিন্দানন্দ বিপ্র,
যার মনমানস-জাঙ্গালে।
কুলিয়ানগর হৈতে,           গৌড় পর্য্যন্ত যাইতে,
প্রভু চলি গেলা কুতূহলে॥
বৃষভানুসুতা যেহোঁ,                গদাধরদাস তেহোঁ
এবে নাম করিল প্রকাশ।
গৌরাঙ্গ-যুগল-দেহ,                  সন্দ না করিহ-কেহ,
এইরূপ গদাধরদাস॥
বন্দোঁ গদাধরদাস,                     অপরূপ সুবিলাস,
প্রেমরসময় তনুখানি।
বন্দোঁ সদাশিব বৈদ্য,          যাহার প্রসাদে সদ্য,
পাষাণ গলিয়া হয় পানি॥
বন্দোঁ সেন শিরানন্দ,            চৈতন্য-পদারবিন্দ,
বিনু যার নাহিক ভাবন।
বৈদ্য খণ্ডেতে বাস,                      বন্দিব মুকুন্দদাস,
যাঁর পুত্র শ্রীরঘুনন্দন॥
মুকুন্দদাসের ভক্তি,          অকথ্য কৃষ্ণের শক্তি,
অদ্যাবধি বিদিত সংসারে।
ময়ূরের পাখা দেখি,              চঞ্চল হইল আঁখি,
বিহ্বোলে পড়িলা প্রেমভরে॥
বন্দিব শ্রীনরহরি,                      দাস ধন্য বলিহারি,
চৈতন্যবিলাস যার ঘটে।
বন্দোঁ রঘুনন্দন,                        মূরতি মদন-সম,
জগত মোহিত যার নাটে॥


( ৩৯ )

বন্দোঁ রঘুনাথদাস,              প্রেমসুখ-সুবিলাস,
যে পিরীতি-ফান্দে মন বান্ধে।
বন্দোঁ আচার্য্য পুরন্দর,           কৃষ্ণভাবে নিরন্তর,
ফুকরি ফুকরি সদা কান্দে॥
ঠাকুর শ্রীকৃষ্ণদাস,        আকাইহাটেতে বাস,
শান্ত পরম অকিঞ্চন।
মহাপ্রভুর সতীর্থ,                   পরমানন্দ পণ্ডিত,
ভক্তিভাবে করিল বন্দন॥
বন্দিব পরমানন্দে,        পণ্ডিত শ্রীদেবানন্দে,
যার পাঠ সদা ভাগবত।
বন্দিব আচার্য্যচন্দ্র,        যে জানে প্রেমের মর্ম্ম,
গুণ-কর্ম্ম জগতে বিদিত॥
গোবিন্দ মাধবানন্দ,            বাসুদেব ঘোষ বন্দ,
তিনভাই গুণের সাগর।
শুনিয়া যাহার গান,        ধরিতে না পারে প্রাণ,
সর্ব্বগণে প্রভু বিশ্বম্ভর॥
গদাধরদাস বন্দ,                       বাসুদেবঘোষ-সঙ্গ,
দোঁহারে বন্দিব সাবধানে।
করবীমঞ্জরী-কলি,             আছিল কর্ণের’পরি,
পদ্মগন্ধ হৈল সভা-স্থানে॥
ধন্যাধন্য নাম-গুণ,                  ধন্যধন্য সংকীর্ত্তন,
ধন্য কলিযুগে এ সকল॥



( ৪০ )

বন্দোঁ ভক্ত-অগ্রগণ্য ঠাকুর রামদাস।
বিশ্ব ভরি খ্যাতি যার অদ্ভুত প্রকাশ॥
ষোলসাঙ্গের কাষ্ঠ গোটা পড়িয়া আছিল।
অবহেলে দু-অঙ্গুলে ধরিয়া তুলিল॥
ত্রিভঙ্গ হইয়া তাহা করিয়া মুরলী।
করিলা বিনোদ বাদ্য মধুর পদাবলী ॥
শ্রীদাম গোপাল সেই অভিরাম গোসাঞি।
দ্বিতীয় চৈতন্য—মহিমার অন্ত নাঞি॥
ব্রজের সুদাম বন্দোঁ ঠাকুর সুন্দর।
অগ্নিসম তেজ যার মূর্ত্তি মনোহর॥
যার দাসে ধরিয়া বনের ব্যাঘ্র আনে।
কোল দিয়া হরিনাম শোনায় তার কাণে॥
বন্দিব শ্রীগৌরীদাস পণ্ডিত ঠাকুর।
নিত্যানন্দ-প্রিয়পাত্র মহিমা-প্রচুর॥
প্রভু-আজ্ঞা শিরে ধরি গিয়া শান্তিপুরে।
যে আনিল উত্কলেতে আচার্য্যপ্রভুরে॥
যারে বলি গোকুলের সুবল গোপাল।
সুজনের শরণদাতা দুর্জ্জনের কাল।\
যার কৃষ্ণ-ভক্তি-শক্তি বিদিত জগতে।
পাষণ্ড পাতাল ( ? )  নাগি হৈল যাহা হৈতে॥
অম্বিকানগর-মাঝে যার অবস্থিতি।
যার ঘরে নিত্যানন্দ-চৈতন্য-মূরতি॥
প্রভুবিদ্যমানে মূর্ত্তি করিল প্রকাশ।
যে মূর্ত্তি দেখিলে কর্ম্মবন্ধের বিনাশ॥


( ৪১ )

দিব্য মাল্য চন্দন বসন অলঙ্কারে।
যে করিল বিভূষিত নিতাইচান্দেরে॥
পরম সাদরে বন্দোঁ দত্ত উদ্ধারণ।
নিত্যানন্দ-সঙ্গে তীর্থ যে কৈলা ভ্রমণ॥
পরমেশ্বরদাস ঠাকুর বন্দিব সাবহিতে।
যে কৈল আপন ব্যক্ত কীর্ত্তনে নাচিতে॥
গণ্ডাদশ শৃগাল ডাকিয়া একেএকে।
ষোল নাম রোলাইল সভাকার মুখে॥
পিপিলাই ঠাকুর বন্দোঁ বাল্যভাবে ভোলা।
বালকের প্রায় যার সব লীলা-খেলা॥
তবে বন্দোঁ ঠাকুর কমলাকর দাস।
কৃষ্ণসংকীর্ত্তনে যার পরম উল্লাস॥
পুরুষোত্তম তীর্থ বন্দোঁ রসিকশেখর।
শ্রীকৃষ্ণরসে যেহো মত্ত গরগর॥
উন্মাদী বিনোদী বন্দোঁ কালা কৃষ্ণদাস।
প্রেমেতে বিভোল সদা না সম্বরে বাস॥
শ্রীসারঙ্গ ঠাকুর বন্দিব কর জুড়ি।
গুধড়ীতে ছিল যার সর্প ছয়-কুড়ি॥
মকরধ্বজ কর বন্দোঁ গুণের নিধান।
প্রভুস্থানে কৃষ্ণগুণ সদা যার গান॥
ভাগবত আচার্য্য বন্দোঁ মিশ্র কবিরাজ।
অনন্ত আচার্য্য বন্দোঁ নবদ্বীপ-মাঝ॥
তবেত বন্দিব মধুপণ্ডিত-চরণ।
বৈষ্ণবপণ্ডিত যারে বোলে সর্ব্বজন॥



( ৪২  )

গোবিন্দ-আচার্য্য-পদ করিব বন্দন।
রাধাকৃষ্ণের রহস্য যে করিল বর্ণন॥
বন্দোঁ সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য মহামতি।
যাহারে বলিয়ে দেবগুরু বৃহস্পতি॥
নৃপতি প্রতাপরুদ্র করিব বন্দন।
যে পাইল মহাপ্রভুর যড়্ভুজ-দর্শন॥
বিপ্র-রঘুনাথদাসের চরণ বন্দিয়া।
বৈদ্য বিষ্ণুদাস বিপ্রদাস উত্কলিয়া॥
কানাই খুটিয়া বন্দোঁ প্রেমরসধার।
প্রকৃতিস্বভাব ভাব যেন গোপিকার॥
যার পুত্র জগন্নাথ দাস রলরাম।
তার মহত্ত্বের কিবা কহিব – অনুপাম॥
জগন্নাথদাস বন্দোঁ গানরসে গুরু।
যার গানে অরণ্যের ঝুরে লতা-তরু॥
বন্দোঁ বলরামদাস উড়িয়া বৈষ্ণবে।
জগন্নাথ-বলরাম বন্দী যার ভাবে॥
সুগ্রীব-নামক গোবিন্দানন্দ ঠাকুর।
প্রভুলাগি সেতুবন্ধ করিলা প্রচুর॥
বন্দোঁ কাশীশ্বর সিংহেশ্বর শিবানন্দ।
শ্রীচন্দনেশ্বর বন্দোঁ করিয়া আনন্দ॥
বন্দনা করিব পট্টনায়ক মাধব।
হরিভট্ট বন্দিব মাহাতি বলদেব॥
সুবুদ্ধি মিশ্র বন্দোঁ নির্ব্বুদ্ধি-বুদ্ধিদাতা।
শ্রীনাথ মিশ্র বন্দোঁ কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা॥



( ৪৩ )

তুলসী মিশ্র বন্দনা করিব সাবধানে।
কাশীনাথ মাহাতি বন্দোঁ কায়বাক্যমনে॥
বসুবংশের তিলক বন্দিব রামানন্দে।
যার গোষ্ঠী ভ্রমর গৌরপদারবিন্দে॥
পুরুষোত্তম ব্রহ্মচারী শ্রীমধুপণ্ডিত।
বন্দোঁ দুই মহাশয় চৈতন্যের ভৃত্য॥
দ্বিজ রামচন্দ্র বন্দোঁ পণ্ডিত শ্রীকর।
যদু-কবিচন্দ্র বন্দোঁ সুখের সাগর॥
পণ্ডিত শ্রীধনঞ্জয় করিব বন্দনা।
প্রসিদ্ধ বৈরাগ্য যার সংসারে ঘোষণা॥
লক্ষকের গারিস্থ যে প্রভুপায় দিয়া।
ভাণ্ড হাথে করিলেক কৌপীন পরিয়া॥
সূর্য্যদাসপণ্ডিতের বন্দোঁ পদদ্বন্দ্ব।
যাহার জামাতা হৈলা প্রভু নিত্যানন্দ॥
বন্দিব ঠাকুর-বংশীবদন-চরণে।
পূর্ব্বে যে আছিলা বংশী কৃষ্ণের বদনে॥
মুরারি-চৈতন্যদাস বন্দিব যতনে।
যার লীলাখেলা অজগরসর্পসনে॥
সেন জগন্নাথ বন্দোঁ গুপ্ত পরমানন্দ।
বন্দিব বালক রামদাস কবিচন্দ্র॥
বন্দিব বল্লভাচার্য্য সেন কংসারি।
বন্দিব ভাস্কর বিশ্বকর্ম্মা-অবতারি॥
বলরামদাস বন্দোঁ সঙ্গীত-আচার্য্য।
নিত্যানন্দসেবা বিনু নাহি যার কার্য্য॥



( ৪৪ )

বন্দে কৃষ্ণ-উনমাদী মহেশ পণ্ডিত।
নর্ত্তনবিনোদী বন্দোঁ জগদীশ পণ্ডিত॥
নারায়ণীসুত বন্দোঁ বৃন্দাবন দাস।
সর্ব্বভক্ত যাহারে বোলেন বেদব্যাস॥
‘শ্রীচৈতন্যভাগবত’ যাহার গ্রন্থন।
যে গ্রন্থ মোহিত কৈল এ তিনভুবন॥
বন্দিব বেহারি কৃষ্ণদাস মহামতি।
বড়গাছিগ্রামেতে যাহার অবস্থিতি॥
যেজন পীরিতিফান্দে নিতাইচান্দেরে।
বন্দী করি রাখিয়াছিলেন নিজঘরে॥
পণ্ডিতঠাকুর গিয়া বুকে দিয়া তালি।
কোঁচে ধরি লৈয়া গেলা ‘মোর প্রভু’ বলি॥
নিত্যানন্দবিরহে ঠাকুর কৃষ্ণদাস।
পাগলের প্রায় গোঙাইলা সাতমাস॥
পুনরপি নিত্যানন্দ তার ঘরে গেলা।
নিত্যানন্দ-দরশন পাই সাম্য হইলা॥
বন্দিব পরমানন্দ অবধৌতবর।
প্রেমরসে পরিপূর্ণ যার কলেবর॥
পণ্ডিত গঙ্গাদাস বন্দেোঁ অনাদী-নিবাসী।
যদুনাথ দাস বন্দোঁ মধুর-বিলাসী॥
পুরুষোত্তম তীর্থ বন্দোঁ তীর্থ শ্রীরাম।
রঘুনাথ পুরী বন্দোঁ পূরি মনস্কাম॥
আশ্রম উপেন্দ্র বন্দোঁ হরিহরানন্দ।
তীর্থ বাসুদেব বন্দোঁ পুরী শ্রীঅনন্ত॥



(  ৪৫ )

মধুরমূরতি বন্দোঁ মুকুন্দ কবিরাজ।
রাজীব ( ? ) পণ্ডিত বন্দোঁ নবদ্বীপমাঝ॥
শিশু কৃষ্ণদাস বন্দোঁ গোপশিশু যনু।
নিত্যানন্দ স্বহস্তে পালিলা যার তনু॥
তবেত বন্দনা কৈল মাধব আচার্য্য।
কৃষ্ণগুণ-বর্ণন সদাই যার কার্য্য॥
যে ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ কৈল ভাগবতামৃতে।
যে গীত বিদিত হৈল সকল জগতে॥
নৃসিংহ চৈতন্যদাস আর কৃষ্ণদাস।
বন্দোঁ দুই মহাশয় পীরিতি-আওআস॥
বড় অকিঞ্চন বন্দোঁ শ্রীশঙ্কর ঘোষ।
যাহার ডম্ফের বাদ্যে প্রভুর সন্তোষ॥
মাধব আচার্য্য বন্দোঁ দ্বিজকুলমণি।
নিত্যানন্দসুতা গঙ্গা যাহার গৃহিণী॥
বন্দনা করিব গঙ্গাদেবীর চরণ।
শিবানন্দ চক্রবর্ত্তী পড়িয়ারী নারায়ণ॥
এই হৈতে হৈল কিছু বৈষ্ণববন্দনা।
অসংখ্য চৈতন্যভক্ত না যায় গণনা॥
আর কত শতশত সহস্র বৈষ্ণব।
ত্রিভুবন জুড়িয়া আছেন কত সব॥
উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব্ব-পশ্চিম-ভূমিতে।
অনন্ত বৈষ্ণব অবতীর্ণ অবনীতে॥
কলিযুগের প্রথমে চৈতন্য অবতারে।
চৈতন্যের কৃপায় বৈষ্ণব ঘরেঘরে॥



( ৪৬ )

অতএব বৈষ্ণবের অসংখ্য গণন ।
স্বচ্ছন্দে বিহরে সব পতিতপাবন॥
সভাকার ঠাকুর চৈতন্য-নিত্যানন্দ।
দুই মহাপ্রভুর এসব ভক্তবৃন্দ॥
কেবা জানিবারে পারে বৈষ্ণবের তত্ত্ব।
শ্রীভাগবতে কহে বৈষ্ণবমাহাত্ম্য॥
হেন সব বৈষ্ণবের চরণ-বন্দন।
পঢ়িলে-শুনিলে হয় দুঃখ-বিমোচন॥
পাপমুক্ত হয়—হয় শুদ্ধ কলেবর।
পঠনে-শ্রবণে হয় প্রসন্ন অন্তর॥
বদনে স্ফুরয়ে তার ‘কৃষ্ণ’ হেন নাম।
পরিপূর্ণ হয় তার যেবা মনস্কাম॥
কন্ঠে বিলসয়ে তার দেবী সরস্বতী।
কমলা করেন আসি গৃহে অবস্থিতি॥
যথাতথা যায় পরাভব নাহি পায়।
সর্ব্বস্থানে জয়যুক্ত হইয়া বেড়ায়॥
ব্যাধি-জরা-জ্বালা তার দেহে না পরশে।
আরোগ্য হইয়া থাকে সদাই সন্তোষে॥
নির্ম্মল ভকতি তার হয় সুনিশ্চিত।
এই লোভে বৃন্দাবনদাস-বিরচিত॥

ইতি শ্রীবৃন্দাবনদাস-বিরচিতা
বৈষ্ণববন্দনা সমাপ্তা।


.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর