কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
রূপ দেখি আখি তিল আধ পালটিতে নারি
রূপ দেখি আঁখি নাহি নেউটই
রূপ দেখি লোচন নাহি নেউটায় ক্ষণ

কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৬৯৩ শকাব্দে (১১৭৮ বঙ্গাদে বা ১৭৭১খৃষ্টাব্দে) পদকর্তা দীনবন্ধু দাস সংকলিত, অধ্যাপক অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ দ্বারা ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে (১৯২৯ খৃষ্টাব্দে) সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সংকীর্ত্তনামৃত” এর ৬৫ পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (১৯২০) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর সংগ্রহের ৪২৪টি পুথি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর হাতে দান করেন। এই পুথিটি দেশবন্ধুর সেই দান করা পুথিগুলির মধ্যে একটি।

॥ কামোদ॥

রূপ দেখি আখি তিল   আধ পালটিতে নারি
মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই     পরশ-সুখ-সম্পদ
শ্যামর সহজ সভাবে॥
সজনী পিরিতিমুরতিবরদাতা।
প্রতি অঙ্গে অখিল     অনঙ্গ-সুখ-সায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥
লীলা-লাবণি     অবনি অলঙ্কুরু
কি মধুর মন্থর গমনে।
লহুঁ অবলোকনে     কত কুল-কামিনী
শূতল মনসিজ-শয়নে॥
অলখিতে হৃদয়     অন্তর অপহর
বিছুরল না হএ সপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তব কৈছন হএ
যব হএ তনু তনু মিলনে॥

ই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, রূপানুরাগ, ১৩১পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

রূপ দেখি আখি তিল     আধ পালটিতে নারি
মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই     পরশ-সুখ-সম্পদ
শ্যামর সহজ স্বভাবে॥
সজনী পিরিতি মুরতি বরদাতা।
প্রতি অঙ্গে অখিল     অনঙ্গ-সুখ-সায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥
লীলা-লাবণি     অবনি অলঙ্কুরু
কি মধুর মন্থর গমনে।
লহু অবলোকনে     কত কুল-কামিনী
শূতল মনসিজ-শয়নে॥
অলখিত হৃদয়     অন্তর অপহর
বিছুরল না হএ সপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তব কৈছন হএ
যব হএ তনু তনু মিলনে॥

টীকা---
শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণের রূপ দেখিয়া আর তিলার্দ্ধের জন্যও চোখ ফিরাইতে পারিতেছেন না। মন তাহার লাভের জিনিষ পাইয়া তাহাতেই অনুগত হইয়া আছে। শ্যামের সহজাত স্বভাবই এমন যে স্পর্শ না করিলেও স্পর্শজনিত যে সুখ ও সম্পদ জাগে তাহা পাওয়া যায়। সখি ! শ্যাম যেন প্রেমের বরদ মূর্ত্তিস্বরূপ। বিধাতা তাঁহাকে এমন এক নায়ক ( নায়র ) করিয়াছেন যে তাঁহার প্রত্যেক অঙ্গে যেন অখিল কামসুখের সমুদ্র রহিয়াছে। তাঁহার লীলালাবণ্য যেন পৃথিবীকে অলঙ্কৃত করিয়াছে। কি মধুর মন্থর তাঁহার চলনভঙ্গী ! তাঁহার একটু অপাঙ্গ দৃষ্টিতে কত কুল-বতী রমণী মদন-শয়নে শায়িত হইল। তিনি অলক্ষ্যে হৃদয় হরণ করেন, তাঁহাকে স্বপ্নেও ভুলা যায় না। জ্ঞানদাস জিজ্ঞাসা করিতেছেন বিনাস্পর্শেই যদি এমন ঘটে, তাহা হইলে তনুর সহিত মিলন হইলে কিরূপ হয় বলতো?

ই পদটি ১৯২৬ সালে প্রকাশিত, সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী”, ৪১-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে। পদটি তিনি পেয়েছিলেন উনিশ শতকে প্রকাশিত, নিমানন্দদাস সংকলিত “পদরসসার” পুথিতে এই রূপে।

শ্রীরাধার পূর্ব্ব রাগ
॥ গৌরী॥

রূপ দেখি আঁখি     নাহি নেউটই
মন অনুগত নিজ-লাভে।
অপরশে দেই     পরশ সুখ-সম্পদ
শ্যামর সহজ সভাবে @॥
সখি হে মুরতি পিরিতি-সুখ-দাতা।
প্রতি অঙ্গ অখিল-     অনঙ্গ-সুখ সায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥ ধ্রূ॥
লীলা লাবণি     অবনি অলঙ্করু
কি মধুর মন্থর গমনে।
লহু অবলোকনে     কত কুল কামিনি
শূতল মনসিজ-শয়নে॥
অলখিতে হৃদয়ক     অন্তর অপহরু
বিছরণ না হয়ে সপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তব কৈছন হয়ে
তনু-তনু যব হব মিলনে॥

@ - “অপরশে” ইত্যাদি ---শ্রীকৃষ্ণ স্বাভাবিক (আনন্দ-জনক) স্বভাব দ্বারা অস্পর্শেও (অর্থাৎ দর্শন মাত্রেই) স্পর্শের বিপুল আনন্দ প্রদান করেন। তুলনা করুন,---
“দরশে পরশ-সুখ-দাতা”
জ্ঞানদাস, --- ১৩১ সং পদ। অর্থাৎ “শিরে শিখি পঙ্খ সঙ্গে নব মালতি” পদে দৃষ্টব্য।

ই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, "বৈষ্ণব পদাবলী" সংকলনের, ৩৮১-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

সাক্ষাৎদর্শন
॥ শ্রীরাগ॥

রূপ দেখি লোচন     নাহি নেউটায় ক্ষণ
মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই     পরশরসসম্পদ
শ্যামর সহজ স্বভাবে॥
সখি হে মুরতি পিরীতিসুখদাতা।
প্রতি অঙ্গ অখিল-     অনঙ্গরসসায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥
লীলা লাবণি     অবণী অলঙ্করু
কি মধুর মন্থর গমনে।
লহু অবলোকনে     কত কুলকামিনী
শুতল মনসিজ-শয়নে॥
অলখিতে আকুল     অন্তর অপহর
বিদুরণ না হয় স্বপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তবহুঁ কৈছন হয়ে
যব হব তনু তনু মিলনে॥

ই পদটি ১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ৫৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ শ্রীরাগ॥

রূপ দেখি লোচন     নাহি নেউটায় ক্ষণ
মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই     পরশ-রস-সম্পদ
শ্যামর সহজ স্বভাবে॥
সখি হে মুরতি পিরিতিসুখদাতা।
প্রতি অঙ্গ অখিল-     অনঙ্গরসসায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥
লীলা লাবণি     অবণী অলঙ্করু
কি মধুর মন্থর গমনে।
লহু অবলোকনে     কত কুলকামিনী
শুতল মনসিজ-শয়নে॥
অলখিতে আকুল     অন্তর অপহর
বিদুরণ না হয় স্বপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তবহুঁ কৈছন হয়ে
যব হব তনু তনু মিলনে॥

ই পদটি ১৯৫৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সংকলিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, ৫৬ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

রূপসতৃষ্ণা

রূপ দেখি আঁখি     নাহি নেউটই
মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই     পরশ-রসসম্পদ
শ্যামর সহজ সভাবে॥
সখিহে মুরতি পীরিতি-সুখদাতা।
প্রতি অঙ্গ অখিল     অনঙ্গসুখসায়র
নায়র নিরমিল ধাতা॥ ধ্রু॥
লীলা-লাবণি     অবনি অলঙ্করু
কি মধুর মন্থরগমনে।
লহু-অবলোকনে     কত কুল কামিনী
শূতল মনসিজশয়নে॥
অলখিতে হৃদয়ক     অন্তর অপহরু
বিছুরণ না হয় স্বপনে।
জ্ঞানদাস কহে     তব কৈছন হয়ে
তনু তনু যব হব মিলনে॥

ই পদটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, ৩৪৪৫টি পদ বিশিষ্ট, কাঞ্চন বসু সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী” সঙ্কলনের ৬৫৩ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

রূপ দেখি লোচন নাহি নেউটায় ক্ষণ
      মন অনুগত নিজ লাভে।
অপরশে দেই পরশরসসম্পদ
      শ্যামর সহজ স্বভাবে॥
সখি হে মুরতি পিরীতিসুখদাতা।
প্রতি অঙ্গ অখিল অনঙ্গরসসায়র
      নায়র নিরমিল ধাতা॥
লীলা লাবণি অবনি অলঙ্করু
      কি মধুর মন্থর গমনে।
লহু অবলোকনে কত কুলকামিনী
      শুতল মনসিজ শয়নে॥
অলখিতে আকুল অন্তর অপহর
      বিছুরণ না হয় স্বপনে।
জ্ঞানদাস কহে তবহুঁ কৈছন হয়ে
      যব হব তনু তনু মিলনে॥

*********************
^^এই পাতার উপরে ফেরত^^