কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
সখী হের দেখ আসিয়া
সখি হের দেখ আসিয়া
সখি হে দেখ আসিয়া

কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৮৯৩ সালে নব্যভারত পত্রিকার কার্ত্তিক ১৩০০ সংখ্যায় প্রকাশিত, হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির “বঙ্গের বৈষ্ণব কবি।(৪) শ্রীজ্ঞানদাস” প্রবন্ধের ৩৭০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই পদটি তিনি আউল মনোহর দাস সংকলিত ১৫০০০ পদবিশিষ্ট “পদসমুদ্র” গ্রন্থের বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এই “পদসমুদ্র” গ্রন্থটির অস্তিত্ব নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই গ্রন্থ সম্বন্ধে বিবিন্ন বিশেষজ্ঞর লেখা পড়তে মিলনসাগরের পদকর্তা আউল মনোহর দাসের পদাবলীর পাতা যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .

সখী হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে,   এচারু পঙ্কজ,   নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে,   বিংশ শশধর,   চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের,   উপর শোভিত,   যুগল কেশরী রাজ॥
কেশরী উপরে,   এ দুই সায়র,   সায়র উপরে গিরি।
গিরির উপরে,   এদুই তমাল,   চারি শাখা আছে ধরি।
তাহে দেখ সখী,   একটী তমাল,   নবঘন সম দেখি।
একটী তমাল,   সোনার বরণ,   শুনলো মরম সখী॥
তাহে ফলিয়াছে,   অরুণ বরণ,   এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর,   ফুল ফুটিয়াছে,   নাহি তার শাখাদল॥
তা’পর এ দুই,   কীরের বসতি,   তা’পর চকোর চারি।
তা’পর এ দুই,   চাঁদের বসতি,   পিবইতে ইহ বারি॥
তা’পর দেখহ,   বিধু সে অরুণ,   তা’পর ময়ূর অহি।
জ্ঞানদাসে কহে,   মরমক বাত,   একথা জানে না কহি॥

ই পদটি ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত, রমণীমোহন মল্লিক দ্বারা সম্পাদিত “জ্ঞানদাস” গ্রন্থের ২৫৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

যুগল রূপ
॥ --॥

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে,     এ চারু পঙ্কজ,
নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে,     বিংশ শশধর,
চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের,     উপরে শোভিত,
যুগল কেশরী রাজ॥
কেশরী উপরে,     এ দুই সায়র,
সায়র উপরে গিরি।
গিরির উপরে,     এই দুই তমাল,
চারি শাখা আছে ধরি।
তাহে আছে সখি,     একটি তমাল,
নব ঘন সম দেখি।
একটী তমাল,     সোণার বরণ,
শুনলো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে,     অরুণ বরণ,
এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর,     ফুল ফুটিয়াছে,
নাহি তার শাখা দল ॥
তা পর এ দুই,     কীরের বসতি,
তা পর চকোর চারি।
তা পর এ দুই,     চাঁদের বসতি,
পিবইতে ইহ বারি॥
তাপর দেখহ,     বিধু সে অরুণ,
তাপর ময়ূর অহি ।
জ্ঞানদাস কহে,     মরমক বাত,
একথা জানে না কহি॥

ই পদটি ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯ সালে) অরুণোদয় রায় দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত, “সংগীত-সার-সংগ্রহ”, ১ম খণ্ড, ২৫৬ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

যুগল রূপ।

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে,     এ চারু পঙ্কজ,
নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে,     বিংশ শশধর,
চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের,     উপরে শোভিত,
যুগল কেশরী রাজ॥
কেশরী উপরে,     এ দুই উদর,
উদর উপরে গিরি।
গিরির উপরে,     এই দুই তমাল,
চারি শাখা আছে ধরি।
তাহে আছে সখি,     একটি তমাল,
নব ঘন সম দেখি।
একটী তমাল,     সোণার বরণ,
শুনলো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে,     অরুণ বরণ,
এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর,     ফুল ফুটিয়াছে,
নাহি তার শাখা দল ॥
তা পর এ দুই,     কীরের বসতি,
তা পর চকোর চারি।
তা পর এ দুই,     চাঁদের বসতি,
পিবইতে ইহ বারি॥
তাপর দেখহ,     বিধু সে অরুণ,
তাপর ময়ূর অহি।
জ্ঞানদাস কহে,     মরমক বাত,
একথা জানে না কহি॥

ই পদটি ১৩০৭ বঙ্গাব্দে (১৯০০ সালে) প্রকাশিত, বঙ্গবাসীর সহ-সম্পাদক হরিমোহন মুখোপাধ্যায় দ্বারা সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-গ্রন্থ” ১ম খণ্ড, এর ১৮৪ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

যুগলরূপ।

সখি হে দেখ আসিয়া। ধরণী উপরে,
এ চারু পঙ্কজ, নয়নে দেখ চাহিয়া॥ পঙ্কজ
উপরে, বিংশ শশধর, চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের, উপরে শোভিত, যুগল
কেশরী রাজ॥ কেশরী উপরে, এই দুই
উদর, উদর উপরে গিরি। গিরির উপরে,
এ দুই তমাল, চারি শাখা আছে ধরি।
তাহে আছে সখি, একটি তমাল, নব ঘন
সম দেখি। একটী তমাল, সোণার বরণ,
শুনলো মরম সখি॥ তাহে ফলিয়াছে,
অরুণ বরণ, এ চারি উত্তম ফল। ফলের
ভিতর, ফুল ফুটিয়াছে, নাহি তার শাখা-
দল॥ তা পর এ দুই, কীরের বসতি,
তাপর চকোর চারি। তাপর এ দুই, চাঁদের
বসতি, পিবইতে ইহ বারি॥ তাপর দেখহ,
বিধু সে অরুণ, তাপর ময়ূর অহি। জ্ঞান-
দাস কহে, মরমক বাত, একথা জানে
না কহি॥

ই পদটি ১৩১২ সালে (১৯০৫) প্রকাশিত, দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত, "বৈষ্ণব-পদলহরী" গ্রন্থের ১৯৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

যুগল রূপ।

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী-উপরে     এ চারু পঙ্কজ
নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ-উপরে,     বিংশ শশধর,
চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের     উপরে শোভিত,
যুগল কেশরি-রাজ॥
কেশরী উপরে,     এ দুই উদর,
উদর-উপরে গিরি।
গিরির উপরে,     এই দুই তমাল,
চারি শাখা আছে ধরি॥
তাহে আছে সখি,     একটি তমাল,
নব ঘন সম দেখি।
একটি তমাল,     সোণার বরণ,
শুনলো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে,     তরুণ বরণ,
এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর,     ফুল ফুটিয়াছে,
নাহি তার শাখা দল ॥
তা-পর এ দুই,     কীরের বসতি,
তা পর চকোর চারি।
তা-পর এ দুই     চাঁদের বসতি
পিবইতে ইহ বারি॥
তা পর দেখহ,     বিধু সে অরুণ,
তাপর ময়ূর অহি।
জ্ঞানদাস কহে,     মরমক বাত,
একথা জানে না কহি॥

ই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, ৮২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

বিদ্যাপতির অনুসরণে জ্ঞানদাস।

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে     এ চারি পঙ্কজ
নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে,     বিংশ শশধর,
চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের     উপরে শোভিত
যুগল কেশরী রাজ॥
কেশরী উপরে,     এ দুই উদয়
উদয় উপরে গিরি।
গিরির উপরে,     এই দুই তমাল,
চারি শাখা আছে ধরি॥
তাহে আছে সখি,     একটি তমাল,
নবঘন সম দেখি।
একটি তমাল,     সোনার বরণ
শুনলো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে     তরুণ বরণ,
এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর     ফুল ফুটিয়াছে,
নাহি তার শাখা দল ॥
তা পর এ দুই,     কীরের বসতি,
তা পর চকোর চারি।
তা-পর এ দুই     চাঁদের বসতি
পিবইতে ইহ বারি॥
তা পর দেখহ,     বিধু সে অরুণ,
তাপর ময়ূর অহি ।
জ্ঞানদাস কহে,     মরমক বাত,
একথা জানে না কোহি॥

টীকা ---
এটি বিদ্যাপতির “সজনী, অপুরুব পেখল রামা কণক-লতা অবলম্বন উঅল হরিণ-হীন হিমধামা” ইত্যাদি পদের (মিত্র-মজুমদার ৬২৩) আদর্শে রচিত রাধাকৃষের যুগল রূপের বর্ণনা।
ধরণীর উপরে শ্রীরাধাকৃষ্ণের চরণযুগল যেন চারিটি পঙ্কজ। সেই চরণ পঙ্কজে বিশটি নখ যেন কুড়িটি চন্দ্র। চন্দ্রের উপরে আবার হস্তীর শুঙের মতন চারিটি উরু (চাঁদের উপরে গজ)। উরুর উপরে যুগল কেশরিরাজ, অর্থাৎ রাধাকৃষ্ণের সিংহের ন্যায় ক্ষীণ মাজা। মাজার উপরে আবার ‘এ দুই উদয়’ অর্থাৎ স্তনযুগল। তাহার উপরে গিরিসদৃশ চুচুকদ্বয়। তাহার উপর দুই তমাল, অর্থাৎ উভয়ের সুবিস্তৃত স্রন্ধদ্বয়। তাহাতে আবার চারিটি শাখা অর্থাৎ উভয়ের দুইখানি করিয়া চারিখানি হাত। একটি (কৃষ্ণের) তমালের বর্ণ নবজলধরের তুল্য, অন্য একটি তমালের (শ্রীরাধার) রং সোনার মতন। তাহাতে আবার অরুণ বরণ (পক্কবিম্বতুল্য) চারি ওষ্ঠাধররূপ ফল ফলিয়াছে। সেই ফলের ভিতর ফুল ফুটয়াছে অর্থাৎ কুন্দকলিতুল্য দন্তপংক্তি, কিন্তু সেই ফুলের শাখাদল নাই। তাহার উপর দুই কীর বা শুক পক্ষীর চঞ্চুর ন্যায় নাসিকা যুগল রহিয়াছে। তাহার উপর আবার চকোররূপ চারিটি চক্ষু। তাহার পর দুই জনের দুই মুখরূপ চন্দের বসতি। চক্ষুরূপ চকোর মুখচন্দ্রের বারি বা সুখাপানে সমুৎসুক। তাহার উপর 'বিধু সে অরুণ’ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের কপালে শ্বেত চন্দনের ফোটাতুল্য বিধু এবং শ্রীরাধার অরুণ বর্ণ সিন্দূর বিন্দু। তাহার উপর শ্রীকৃষ্ণের শিখিপুচ্ছের চূড়া এবং শ্রীরাধার সর্পাকার বেণী। জ্ঞানদাস বলিতেছেন এটি একেবারে মর্ম্মের কথা, ইহার রহস্য কেহ জানে না।

ই পদটি ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত বিভূতিভূষণ মিত্র সম্পাদিত “কাব্য-রত্নমালা” গ্রন্থের, মিলন, ২৪৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

(যুগলরূপ)

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে     এ চারু পঙ্কজ
নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে,     বিংশ শশধর,
চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের     উপরে শোভিত
যুগল কেশরী-রাজ॥
কেশরী উপরে     এ দুই উদর
উদর উপরে গিরি।
গিরির উপরে     এই দুই তমাল
চারি শাখা আছে ধরি॥
তাহে আছে সখি,     একটি তমাল,
নব ঘন সম দেখি।
একটি তমাল     সোণার বরণ
শুনলো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে     অরুণ বরণ,
এ চারি উত্তম ফল।
ফলের ভিতরে     ফুল ফুটিয়াছে,
নাহি তার শাখা দল॥
তা পর এ দুই     কীরের বসতি
তা পর চকোর চারি।
তা-পর এ দুই     চাঁদের বসতি
পিবইতে ইহ বারি॥
তাপর দেখহ     বিধু সে অরুণ
তা পর ময়ূর অহি।
জ্ঞানদাস কহে     মরমক বাত
এ কথা জানে না কহি॥

ই পদটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ৩১৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ যুগলমিলন॥

সখি হের দেখ আসিয়া।
ধরণী উপরে   এ চারু পঙ্কজ   নয়নে দেখ চাহিয়া॥
পঙ্কজ উপরে   বিংশ শশধর   চাঁদের উপরে গজ।
এ চারু গজের   উপরে শোভিত   যুগল কেশরী রাজ॥
কেশরী উপরে   এ দুই উদর   উদর উপরে গিরি।
গিরির উপরে   এ দুই তমাল   চারিশাখা আছে ধরি॥
তাহে আছে সখি   একটি তমাল   নব ধন সম দেখি।
একটি তমাল   সোনার বরণ   শুন লো মরম সখি॥
তাহে ফলিয়াছে   অরুণ বরণ   এ চাবি উত্তম ফল।
ফলের ভিতর   ফুল ফুটিয়াছে   নাহি তার শাখা দল॥
তা পর এ দুই   কীরের বসতি   তা পর চকোর চারি।
তা পব এ দুই   চাঁদের বসতি   পিবইতে ইহ বারি॥
তা পর দেখহ   বিধু সে অরুণ   তা পর ময়ূর অহি।
জ্ঞানদাস কহে   মরমক বাত   এ কথা জানেনা মোহি॥

এই পদটি এই গ্রন্থের “অসম্পূর্ণ পদাবলী” অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। অধ্যায়ের শুরুতে লেখা আছে --- “এই অসম্পূর্ণ পদগুলি বিভিন্ন পুঁথি হইতে সংগৃহিত ও সর্বপ্রথম প্রকাশিত হইল। দুঃখের বিষয়, ইহাদের পূর্ণ রূপটি উদ্ধার করিতে পারা গেল না।”

*********************
^^এই পাতার উপরে ফেরত^^