কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
শ্রীকৃষ্ণের সহচরগণ --- ষোড়শ গোপালের রূপবর্ণনা
এ সম্বন্ধে বিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্নর লেখা পড়ুন এখানে ক্লিক করে...। এই পদগুলি ভণিতাহীন।
উজ্জ্বল সুবাহু গোপাল দুই জন
কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত, রমণীমোহন মল্লিক দ্বারা সম্পাদিত “জ্ঞানদাস” গ্রন্থের ৫২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ সুহই॥

উজ্জ্বল সুবাহু গোপাল দুই জন।
লোহিত বরণ নীল পদ্মের বরণ॥
দোঁহা কটি তটে নীল বিচিত্র বসন।
নানা আভরণ অঙ্গে মাণিক রতন॥
সপত্র কদম্ব ফুল দোঁহার কাণে।
কপোলে চুম্বন করে অগিম দোলনে॥
চাঁচর চিকুরে বেড়ি নব গুঞ্জা মালে।
টালনী বিনোদ চূড়া ডাহিন কপালে॥
গোক্ষুরের ধূলা দোঁহা অঙ্গে বিভূষিত।
অবিরত মুরলী মধুর গায় গীত॥
সুবর্ণ চম্পক মালা দোলে উড়ে বায়।
মধুর চলনি মত্ত করিবর ভাঙায়॥
সংক্ষেপে কহিনু এই ষোড়শ গোপাল।
লক্ষ লক্ষ গোপ আছে বিনোদ রাখাল॥
জ্ঞানদাসেতে কহে সে দিন কবে হব।
যে দিন রাখাল পদে আশ্রিত হইব॥

এই পদটি ১৩২৭ সালে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, ১০৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। গোষ্ঠলীলা, সখ্য ও বাত্সল্য রসের পদ।

উজ্জ্বল সুবাহু গোপাল দুইজন।
লোহিত বরণ নীল পদ্মের বরণ॥
দোঁহা কটি তটে নীল বিচিত্র বসন।
নানা আভরণ অঙ্গে মাণিক রতন॥
সপত্র কদম ফুল দোঁহাকার কানে।
কপোল চুম্বন করে অগিম দোলনে॥
চাঁচর চিকুরে বেড়ি নব গুঞ্জামালে।
টালনী বিনোদ চূড়া ডাহিন কপালে॥
গোক্ষুরের ধূলা অঙ্গে বিভূষিত।
অবিরত মুরলী মধুর গায় গীত॥
সুবর্ণ চম্পক মালা দোলে উড়ে যায়।
মধুর চলনি মত্ত করিবর ভাঙায়॥
সংক্ষেপে কহিনু এই ষোড়শ গোপাল।
লক্ষ লক্ষ গোপ আছে বিনোদ রাখাল॥
জ্ঞানদাসেতে কহে সে দিন কবে হব।
যে দিন রাখাল পদে আশ্রিত হইব॥

টীকা ---
জ্ঞানদাস নিম্নলিখিত ষোলজন সখার রূপগুণ বর্ণনা করিয়াছেন। শ্রীদাম, সুদাম, স্তোককৃষ্ণ শ্রীদাম, সুদাম, স্তোককৃষ্ণ, সুবল, অংশুমান, বসুদাম, কিঙ্কিণী, অর্জ্জুন, দেবদত্ত, সুনন্দ, বরু-থপ, নন্দক, বিশালা, বিষয়া, উজ্জ্বল, এবং সুবাহু। ইহাদের মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতে ( ১০। ২২। ৩১। ৩২ ) স্তোককৃষ্ণ, অংশুমান, শ্রীদাম, সুবল, অর্জ্জুন, বিশালা এবং বরুথপের নাম আছে। দেবদত্তের পরিবর্তে ভাগবত দেবপ্রস্থের নাম আছে। ভাগবত বর্ণিত বৃষভ এবং ওজস্বিনের নাম জ্ঞানদাস উল্লেখ করেন নাই। শ্রীরূপ কৃষ্ণগণোদ্দেশদীপিকায় বলিয়াছেন যে বিশালা, দেবপ্রস্থ, বরুথপ শ্রীকৃষ্ণ অপেক্ষা বয়েস কিছু ছোট এবং তাঁহাদের ভাব হইতেছে দাস্যমিশ্রিত ও সখ্য। শ্রীরূপ শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়সখাদের মধ্যে শ্রীদাম, সুদাম, কিঙ্কিণী, স্তোককৃষ্ণ, অংশুর নাম করিয়াছেন। শ্রীজীব গোস্বামী গোপালচম্পুতে (পূর্ব্ব ২১ / ২৬) বলিয়াছেন যে, “শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ দাম, সুদাম, বসুদাম, এব কিঙ্কিণীসংজ্ঞক চারিজন সখাকে শ্রীকৃষ্ণের দেহের বহিঃস্থিত ও প্রকাশমান মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার বলিয়া জানেন।” শ্রীরূপ ভক্তিরসা-মৃতসিন্ধুতে সুবল, অর্জ্জুন, গন্ধর্ব, বসন্ত এবং উজ্জ্বলকে শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়নর্ম্মসখা বলিয়াছেন।

কবি কর্ণপূর গৌরগণোদ্দেশদীপিকায় লিখিয়াছেন যে শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়নর্ম্মসখা অর্জ্জুনগোপাল রামানন্দ রায় রূপে, শ্রীদাম অভিরাম রূপে, সুদাম সুন্দর ঠাক্কুররূপে, বসুদাম ধনঞ্জয় পণ্ডিত-রূপে সুবল গৌরীদজাস পণ্ডিতরূপে, সুবাহু উদ্ধারণ দত্তরূপে, স্তোককৃষ্ণ পুরুষোত্তমদাসরূপে, দাম নাগর পুরুষোত্তমরূপে, অর্জ্জুন পরমেশ্বরদাসরূপে, বরুথর্প রুদ্রপণ্ডিতরূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে রামানন্দ বায় এবং রুদ্রপণ্ডিত ছাড়া অন্য সকলেই নিত্যানন্দের সহচর। শ্রীচৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবনদাস ইহাদের সম্বন্ধে লিখিয়াছেন ---

প্রেমরসসমুদ্র সুন্দরানন্দ নাম।
নিত্যানন্দস্বরূপের পার্ষদ প্রধান॥
পণ্ডিত কমলাকান্ত পরম উদ্দাম।
যাঁহারে দিলেন নিত্যানন্দ সপ্তগ্রাম॥
গৌরীদাসপণ্ডিত পরম ভাগ্যবান।
কায়মনোবাক্যে নিত্যানন্দ যাঁর প্রাণ॥
বড়গাছিনিবাসী সুকৃতি কৃষ্ণদাস।
যাঁহার মন্দিরে নিত্যানন্দের বিলাস॥
পুরন্দর পণ্ডিত পরম শান্ত দান্ত।
নিত্যানন্দস্বরূপের বল্লভ একান্ত॥
নিত্যানন্দজীবন পরমেশ্বর দাস।
যাঁহার বিগ্রহে নিত্যানন্দের বিলাস॥
ধনঞ্জয় পণ্ডিত মহান্ত বিলক্ষণ।
যাঁহার হৃদয়ে নিত্যানন্দ অনুক্ষণ॥

এইরূপে বৃন্দাবনদাস নিত্যানন্দের ৩৭ জন সহচরের গুণগান করিয়াছেন। বৃন্দাবনদাসের সময়েও ইঁহারা কৃষ্ণলীলায় কে কি ছিলেন তাহা নির্ণীত হয় নাই ---

ভাগবতরূপে জন্ম হিল সভার।
কৃষ্ণ সে জানেন, যায় অংশে জন্ম যায়॥

*********************