কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
সখি মুখে শুনি শ্যামনাম মুরলী এক মূরতিক
নামে মুরলীরবে গুণী গানে স্বপনেহুঁ

কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৩১৭ বঙ্গাব্দে (১৯১০ সালে) প্রকাশিত, নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন “শ্রীপদামৃতমাধুরী”, ১ম খণ্ড এর ৯৩ পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

শ্রীরাধিকার পূর্ব্বরাগ
॥ শ্রীললিত - মধ্যম দশকুশী॥

সখি মুখে শুনি শ্যামনাম   মুরলী এক মুরতিক
হিয়া মাহ হোয়ল আশ।
কাতর অন্তরে     প্রিয়সখী মুখ হেরি
গদ গদ কহতহি ভাষ॥
সজনি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম     নাম দুই আখর
তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥ ধ্রু॥
মুনি-মন-মোহন     মুরলী খুরলী শুনি
ধৈরয ধরণ না যাতি।
মনোরম গুণগণ     গুণিজন গানে শুনি
চিত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর     কহত দূতীবর
ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত     চিতে ভেল মনমথ
চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ড-শেখর শ্যাম     রূপে গুণে অনুপাম
স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাঁহারি রূপ     মদন মোহন ভূপ
বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে     সকল সখার সনে
দিঠিতে পড়িলাম আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ     লাজ ভয় হারাইলু
জ্ঞানদাস কম্প অনিবার॥

এই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, শ্রীরাধার পূর্বরাগ, ১১০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

সখি মুখে শুনি শ্যামনাম   মুরলী এক মুরতিক
হিয়া মাহ হোয়ল আশ।
কাতর অন্তরে     প্রিয়সখী মুখ হেরি
গদ গদ কহতহি ভাষ॥
(সজনি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম     নাম দুই আখর
তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনি-মন-মোহন     মুরলী খুরলী শুনি
ধৈরজ ধরন না যাতি।
মনোরম গুণগণ     গুণিজন গানে শুনি
চিত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর     কহত দূতীবর
ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত     চিতে ভেল মনমথ
চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ড শেখর শ্যাম     রূপে গুণে অনুপাম
স্বপনে দেখুলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাঁহারি রূপ     মদন মোহন ভূপ
বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে     সকল সখার সনে
দিঠিতে পড়িলাম আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ     লাজ ভয় হারাইলুঁ
জ্ঞানদাস কম্প অনিবার॥)

বন্ধনীর ভিতরের অংশ পরের পদের সহিত অভিন্ন। --- শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার॥
আমরা নীচে সেই পরের পদটিও এখানে তুলে দিলাম। --- মিলন সেনগুপ্ত। মিলনসাগর॥

টীকা--- মুরলী খুরলী শুনি --- মুরলীর অভ্যাস বা আলাপ শুনিয়া।

নামে, মুরলীরবে     গুণী গানে স্বপনেহুঁ
চিত্রে দরশে প্রতিআশ।
কাতর অন্তরে     সখী-মুখ চাহি ধনী
কহতহি গদ গদ ভাষ॥
সখি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম     নাম দুই আঁখর
তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনি-মন-মোহন     মুরলী খুরলী শুনি
ধৈরজ ধরন না যাতি।
মনোরম গুণগণ     গুণিজন-গানে শুনি
চিত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর     কহত দূতী মোহে
ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত     চিতে ভেল মনমথ
চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ড-শেখর শ্যাম     রূপে গুণে অনুপাম
স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাঁহারি রূপ     মদন-মোহন ভূপ
বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে     সকল সখার সনে
দিঠিতে পড়িলুঁ আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ     লাজ-ভয় হারাইলুঁ
জ্ঞানদাস কম্প অনিবার॥

এই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, শ্রীরাধার পূর্বরাগ, ১১১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

নামে, মুরলীরবে     গুণী গানে স্বপনেহুঁ
চিত্রে দরশে প্রতিআশ।
কাতর অন্তরে     সখী-মুখ চাহি ধনী
কহতহি গদ গদ ভাষ॥
সখি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম     নাম দুই আঁখর
তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনি-মন মোহন     মূরলী খুরলি শুনি
ধৈরয ধরণ না যাতি।
মনোরম গুণগণ     গুণীজন-গানে শুনি
চিত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর     কহত দূতী মোহে
ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত     চিতে ভেল মনমথ
এ চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ড-শেখর শ্যাম     রূপ গুণে অনুপাম
স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাহারি রূপ     মদন-মোহন ভূপ
বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে     সকল সখার সনে
দিঠিতে পড়িলুঁ আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ     লাজ-ভয় হারাইলুঁ
জ্ঞানদাস কম্পে অনিবার॥

টীকা---
তাহার নাম শুনিয়া, মুরলীধ্বনি শুনিয়া, গুণিজনের মুখে তাহার গুণগান শুনিয়া এবং স্বপ্নে ও চিত্রে তাহাকে দেখিয়া প্রত্যাশা জাগিল। তাই কাতর-হৃদয়ে সখীর মুখের দিকে চাহিয়া সুন্দরী গদগদ স্বরে বলিলেন --- সখি ! কি বলিব, বলা যায় না। শ্যামের নাম অপূর্ব্ব, সেই নামের দুই অক্ষর প্রতিক্ষণে আমার মনের উত্কন্ঠা বাড়াইতেছে। তাঁহার মুরলীর আলাপ এমন যে মুনিদেরও মন মোহিত হয় -কাজেই আমি তাহা শুনিয়া আর ধৈর্য্য ধরিয়া ঘরে থাকিতে পারি না। গুণীব্যক্তিদের গানে তাঁহার চিত্তাকর্যক গুণরাশির কথা শুনিয়া তাহাতেই চিত্ত মত্ত হইয়া রহিল। এদিকে আবার দূতী বলিতেছে এবং ভাটেরা তাঁহার যশ-কীর্ত্তি গান করিতেছে যে তিনি রসিক এবং সুন্দর। এই কথা শুনিয়া শুনিয়া আমার হৃদয়ে কাম উন্মত্ত হইয়া উঠিল ; আমার এ চপল জীবনকে যেন দোলাইতেছে। আবার চূড়ায় ময়ূরপুচ্ছ ধারী রূপে গুণে অতুলনীয় শ্যামযুবরাজকে স্বপ্নে দেখিলাম। চিত্রে অঙ্কিত তাহার সেই মদনমোহন রাজরূপ যেন সজোরে আমাকে ধরিতে আসিতেছে। যেদিন তিনি ধেনুক বধ করেন সেইদিন তিনি সকল সখার সঙ্গে যাইতেছিলেন এমন সময় তাঁহার দৃষ্টিপথে আমি পড়িলাম। তখন নিজেকে ভুলিয়া গেলাম ; লজ্জা এবং ভয়ও আমার হারাইয়া গেল। শ্রীরাধার অবস্থা দেখিয়া জ্ঞানদাস ‘ভয়ে’ কাঁপিতে লাগিলেন (পাছে রাধাকে দেখিয়া লোকে কলঙ্ক রটনা করে) --- সে কাঁপুনি আর থামে না (অনিবার)।

শ্রীরূপ গোস্বামী উজ্জ্বল নীলমণির শৃঙ্গার ভেদ প্রকরণে পূর্ব্বরাগ বিচারের সময় বলিয়াছেন যে দক্শন শ্রবনাদি দ্বারা পূর্ব্বরাগের উত্পত্তি হয়। দর্শন তিন প্রকারের ---সাক্ষাত্ , চিত্রপটে এবং স্বপ্নে। শ্রবণ দূতী, সখী এবং বন্দীজনের মুখ হইতে হয়। জ্ঞানদাস শ্রীরূপের এই বিচার-ধারার সহিত পরিচিত ছিলেন। একটি পদেই তিনি এই ছয় প্রকারে জাত পূর্ব্বরাগের বর্ণনা করিয়াছেন।

ধেনুরাসুর বধ ---
শ্রীমদ্ভাগবতে (১০ / ১৫ / ১ ) বর্ণিত আছে যে শ্রীকৃষ্ণ পৌগণ্ড বয়সে ( পাঁচ বত্সরের পর দশম বর্ষ পর্যন্ত ) সখাদের সহিত গোচারণ করিতেন। একদিন বলরাম গোচারণকালে গর্দ্দভরূপধারী এবং নরমাংসভোজী ধেনুকাসুরকে বধ করিয়া তাহার রক্ষিত তালবন হইতে তাল পাড়িয়া সখাদিগকে খাওয়াইলেন।

এই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, "বৈষ্ণব পদাবলী" সংকলনের, ৩৮৩-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ শ্রীললিত॥

নামে, মুরলীরবে     গুণীগানে স্বপনেহুঁ
চিত্রে দরশে প্রতিআশ।
কাতর অন্তরে     সখীমুখ চাহি ধনী
কহতহি গদ গদ ভাষ॥
সখি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম     নাম দুই আঁখর
তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনিমনমোহন     মূরলীখুরলি শুনি
ধৈরজ ধরণ না যাতি।
মনোরম গুণগণ     গুণীজনগানে শুনি
চীত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর     কহত দূতী মোহে
ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত     চিতে ভেল মনমথ
এ চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ডশেখর শ্যাম     রূপে গুণে অনুপাম
স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাহারি রূপ     মদন-মোহন ভূপ
বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে     সকল সখার সনে
দিঠিতে পড়িলুঁ আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ     লাজভয় হারাইলুঁ
জ্ঞানদাস কম্পে অনিবার॥

এই পদটি ১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ৪৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ শ্রীললিত॥

নামে, মুরলীরবে   গুণী-গানে স্বপনে হুঁ   চিত্রে দরশে প্রতিআশ।
কাতর অন্তরে   সখী-মুখ চাহি ধনী   কহতহি গদ গদ ভাষ॥
সখি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম   নাম দুই আঁখর   তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনি-মন-মোহন   মুরলী-খুরলি শুনি   ধৈরয ধরণ না যাতি।
মনোরম গুণগণ   গুণীজন-গানে শুনি   চিত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর   কহত দূতী মোহে   ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত   চিতে ভেল মনমথ   এ চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ড-শেখর শ্যাম   রূপেগুণে অনুপাম   স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাহারি রূপ   মদন-মোহন ভূপ   বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে   সকল সখার সনে   দিঠিতে পড়িলুঁ আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ   লাজ-ভয় হারাইলুঁ   জ্ঞানদাস কম্পে অনিবার॥

এই পদটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, ৩৪৪৫টি পদ বিশিষ্ট, কাঞ্চন বসু সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী” সঙ্কলনের ৬৩১ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

নামে মুরলীরবে গুণীগানে স্বপনেহুঁ
      চিত্রে দরশে প্রতিআশ।
কাতর অন্তরে সখীমুখ চাহি ধনী
      কহতহি গদগদ ভাষ॥
সখি কি কহব কহন না যায়।
অপরূপ শ্যাম নাম দুই আঁখর
      তিলে তিলে আরতি বাঢ়ায়॥
মুনিমনোমোহন মূরলীখুরলি শুনি
      ধৈরজ ধরণ না যাতি।
মনোরম গুণগণ গুণীজনগানে শুনি
      চীত রহল তঁহি মাতি॥
বিদগধ সুন্দর কহত দূতী মোহে
      ভট্ট কীরিতি যশ গায়।
শুনি শুনি উনমত চিতে ভেল মনমথ
      এ চপল জীবন দোলায়॥
শিখণ্ডশেখর শ্যাম রূপে গুণে অনুপাম
      স্বপনে দেখিলুঁ যুবরায়।
ফলকে তাহারি রূপ মদনমোহন ভূপ
      বলে উঠি ধরিবারে ধায়॥
ধেনুক বধের দিনে সকল সখার সনে
      দিঠিতে পড়িলুঁ আমি তার।
আপনা ভুলিয়া গেলুঁ লাজভয়
      হারাইলুঁ জ্ঞানদাস কম্পে অনিবার॥

*********************