কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
গোবর্দ্ধন গিরি বাম করে ধরি
রামা হে কি আর বোলসি আন

কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, মান, ২৪০ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

গোবর্দ্ধন গিরি     বাম করে ধরি
যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ     করের কঙ্কণ
মানয়ে গুরুয়া ভার॥
রামা হে কি আর বোলসি আন॥
তোহারি চরণ     শরণ সো-হরি
তবহুঁ না মিটে মান॥
কালিয় দমন     করল যে জন
পদযুগ-পরহারে॥
সহজে চাতক     না ছাড়য়ে ব্রত
না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর     বরিখন বিনু
না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈব দোষে     অধিক পিয়াসে
পিয়য়ে হেরিয়া থোর।
জ্ঞানদাস কহ     নাম সোঙরিয়া
গলে শতগুণ লোর॥

টীকা ---
গোবর্দ্ধনগিরি গুরুয়া ভার --- যে কৃষ্ণ বাম হাতে গোবর্দ্ধন গিরি ধরিয়া গোকুলকে বিপদ হইতে (ইন্দ্রের ক্রোধ হইতে) রক্ষা করিল, সে আজ বিরহে এমন দুর্ব্বল হইয়াছে যে হাতের কঙ্কণকেও ভীষণ ভারী বলিয়া মনে করিতেছে।
পদযুগ পরহারে --- দু পা দিয়া প্রহার করিয়া।
নব জলধর ইত্যাদি --- চাতক নবীন মেঘের জল ছাড়া নদীর জল খায় না ; যদি দৈবদোষে অধিক তৃষ্ণা পায় তো মেঘের দিকে তকাইয়া একটু জল খায়।
জ্ঞানদাস কহ নাম সোঙরিয়া গলে শতগুণ লোর --- জ্ঞানদাস বলিতেছেন যে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধার নাম স্মরণ করিয়া শতগুণ অশ্রু ত্যাগ করেন। (ব্যঞ্জনা এই যে শ্রীকৃষ্ণ অন্য নারীর সঙ্গ করেন না।)

ই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, "বৈষ্ণব পদাবলী" সংকলনের, ৪৩২-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

গাঢ় মান
॥ গান্ধার ॥

গোবর্দ্ধন গিরি     বাম করে ধরি
যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ     করের কঙ্কণ
মানয়ে গুরুয়া ভার॥
রামা হে কি আর বোলসি আন।
তোহারি চরণ-     শরণ সো হরি
তবহুঁ না মিটে মান॥ ধ্রু॥
কালিয় দমন     করল যে জন
পদযুগ পরহারে।
এবে সে ভুজঙ্গ-     ভরমে ভুলল
হৃদয়ে না ধরে হারে॥
সহজে চাতক     না ছাড়য়ে ব্রত
না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর     বরিখন বিনু
না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈবদোষে     অধিক পিয়াসে
পিয়রে হেরিয়া থোর।
জ্ঞানদাস কহ     নাম সোঙরিয়া
গলে শতগুণ লোর॥

ই পদটি ১৯৫৩ সালে (?) প্রকাশিত, নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন “শ্রীপদামৃতমাধুরী”, ২য় খণ্ড এর ৪০৯ পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

মানপ্রকরণ
॥ করুণ সুহই - ধড়া তাল॥

রামা হে কি আর বোলসি আন।
তোহারি চরণ,     শরণ সো হরি,
অবহুঁ না মিটে মান॥ ধ্রু॥
গোবর্দ্ধন গিরি,     বাম করে ধরি,
যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ,     করের কঙ্কণ,
মানয়ে গুরুয়া ভার॥
কালিয় দমন,     করল যেজন,
চরণ যুগল বরে।
এবে সে ভুজঙ্গ-     ভরমে ভুলল,
হৃদয়ে না ধরে হারে॥
সহজে চাতক,     না ছাড়য়ে ব্রত,
না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর,     বরিখন বিনু,
না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈব দোষে,     অধিক পিয়াসে,
পিয়রে হেরিয়া থোর।
তবহুঁ তাহারি,     নাম সোঙরিয়া,
গলে শতগুণ লোর॥

ই পদটি ১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ২৪৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

মান (চ) গাঢ় মান
॥ গান্ধার ॥

গোবর্দ্ধন গিরি     বাম করে ধরি
যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ     করের কঙ্কণ
মানয়ে গুরুয়া ভার॥
রামা হে কি আর বোলসি আন।
তোহারি চরণ-     শরণ সো হরি
তবহুঁ না মিটে মান॥ ধ্রু॥
কালিয় দমন     করল যে জন
পদযুগ-পরহারে।
এবে সে ভুজঙ্গ-     ভরমে ভুলল
হৃদয়ে না ধরে হারে॥ ১
সহজে চাতক     না ছাড়য়ে ব্রত
না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর     বরিখন বিনু
না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈব-দোষে     অধিক পিয়াসে
পিয়রে হেরিয়া থোর। ২
জ্ঞানদাস কহ     নাম সোঙরিয়া
গলে শতগুণ লোর॥

টীকা---
গোবর্ধনগিরি বাম করে ধবিয়া যে (বজ্রধরের ক্রোধ হইতে) ব্রজভুমিকে উদ্ধার করিল, সে তোমার বিরহে এত দুর্বল হইয়াছে, করের কঙ্কণকে ও গুরুভার মনে করিতেছে। রামা হে, অন্য আর কি বলিতেছ, সেই শ্রীহরি তোমার চবণে শরণ লইলেন, তথাপি মান মিটিল না। পদযুগ-প্রহারে যে কালীয় সর্পকে দমন করিয়াছিল, সেই এখন ভুজঙ্গভ্রমে ভুলিয়া হৃদয়ে হার ধারণ করে না। চাতক তো সহজে আপন ব্রত ত্যাগ করে না, নদীর তীরে বসে না, নব জলধরের বৃষ্টিবারি ভিন নদীর নীরও পান করে না। যদি কখনো দৈবদোষে অত্যন্ত পিপাসায় সম্মুখে (নদীর) জল দেখিয়া কিঞ্চিৎ পান করে, জ্ঞানদাস বলিতেছেন--- (পরক্ষণেই জলধরের) নাম স্মরণে (চাতকের চক্ষু হইতে) অশ্রুরূপে তাহার শতগুণ বারি নির্গত হয়।

১ - শ্রীকৃষ্ণের হার-পরিত্যাগ তাঁহার চরিত্রের দুর্বলতা সূচিত করে। তোমার দ্বারা প্রত্যাখ্যানের ফলে তাঁহার এমন চরিত্র-বিপর্যয় ধটিয়াছে যে, কালীয়-দমনকারী হারকে সর্প ভ্রম করিয়া তাহা হৃদয়ে ধারণ করিতে চাহেন না।

২ - যদি বিশেষ প্রলোভনে মহাপুরুষের ঈষৎ আদর্শ চ্যুতি ঘটে, তবে সে অনুতাপের আতিশয্যে সেই বিরল পাপের প্রারশ্চিত্ত সাধন করে। যেটুকু পাপ করিয়াছিল, তাহার শতগুণ প্রায়শ্চিত্ত করে।

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায় (গোকুলানন্দ সেন) বৈষ্ণবদাস, সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫ সাল) ১ম খণ্ড, ২য় শাখা, ১৭শ পল্লব, দুর্জ্জয় মান, ৫১৬ নং পদসংখ্যায়, ৩৪৮-পৃষ্ঠায়, ৩য় কলি কে প্রথম কলির স্থানে দিয়ে, অজ্ঞাত পদকর্তার ভণিতাহীন পদ হিসেবে এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ গান্ধার ॥

রামা হে কি আর বোলসি আন।
তোহারি চরণ-     শরণ সো হরি
অবহুঁ না মিটে মান॥ ধ্রু॥
গোবর্দ্ধন গিরি     বাম করে ধরি
যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ     করের কঙ্কণ
মানয়ে গুরুয়া ভার॥
কালিয় দমন     করল যে জন
চরণ-যুগল-বরে।
এবে সে ভুজঙ্গ-     ভরমে ভুলল
হৃদয়ে না ধরে হারে॥ ১
সহজে চাতক     না ছাড়য়ে ব্রত
না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর     বরিখন বিনু
না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈব-দোষে     অধিক পিয়াসে
পিয়রে হেরিয়া থোর। ২
তবহুঁ তাহারি     নাম সোঙরিয়া
গলে শতগুণ লোর॥

ই পদটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, ৩৪৪৫টি পদ বিশিষ্ট, কাঞ্চন বসু সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী” সঙ্কলনের ৬১৭ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

গোবর্দ্ধন গিরি বাম করে ধরি
        যে কৈল গোকুল পার।
বিরহে সে ক্ষীণ করের কঙ্কণ
        মানয়ে গুরুয়া ভার॥
রামা হে কি আর বোলসি আন।
তোহারি চরণ শরণ সো হরি
        তবহুঁ না মিটে মান॥
কালিয় দমন করল যে জন
        পদযুগ পরহারে।
এবে সে ভুজঙ্গ ভরমে ভুলল
        হৃদয়ে না ধরে হারে॥
সহজে চাতক না ছাড়য়ে ব্রত
        না বৈসে নদীর তীরে।
নব জলধর বরিখন বিনু
        না পিয়ে তাহার নীরে॥
যদি দৈবদোষে অধিক পিয়াসে
        পিয়রে হেরিয়া থোর।
জ্ঞানদাস কহ নাম সোঙরিয়া
        গলে শতগুণ লোর॥

*********************
^^এই পাতার উপরে ফেরত^^