কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণব পদাবলী
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি জ্ঞানদাস-এর পরিচিতির পাতায় . . .
উলসল উরথল অব ভেল রে
কবি জ্ঞানদাস
এই পদটি ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, "বৈষ্ণব পদাবলী" সংকলনের, শ্রীগৌরচন্দ্র, ৩৭৫-পৃষ্ঠায় এই রূপে দেওয়া রয়েছে।

সখীর প্রতি সখীর উক্তি
॥ শ্রীরাগ॥

উলসল উরথল অব ভেল রে।
আয়ত হোয়ত নয়ান রে॥
গতি অতি তুরিত সমাপন রে।
শৈশব কয়ল পয়ান রে॥
তোরে নিবেদলোঁ শুন সখি অব রে।
চির দিন হৃদয়ক দন্দা রে॥
বালা বাঢ়ল দারিদ টুটব।
মিলাওব শ্যামরচন্দা রে॥
হাস অধর-পাশ মিলিত রে,
রতিপতি অনুবন্ধা রে।
উনমিত নিতম্ব সুললিত রে
ভাষা অতি ভেল মন্দা রে॥
কেশ-পাশ-দিগ কালিম রে
শ্রবণে লেল অবতংশ রে॥
জ্ঞানদাস কহ নব তনু-রুহ রে
মনমথ গাড়ল বংশ রে॥

ই পদটি ১৯৫৬ সালে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত, “জ্ঞানদাসের পদাবলী” গ্রন্থের ৩৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

শ্রীরাধার বয়ঃসন্ধি ও পূর্বরাগ
সখীর প্রতি সখীর উক্তি
॥ শ্রীরাগ॥

উলসল উরথল অব ভেল রে।   আয়ত হোয়ত নয়ান রে।
গতি অতি তুরিত সমাপন রে।   শৈশব কয়ল পয়ান রে॥
তোরে নিবেদলোঁ শুন সখি অব রে।   চির দিন হৃদয়ক দন্দা রে।
বালা বাঢ়ল দারিদ টুটব।   মিলাওব শ্যামরচন্দা রে॥
হাস অধর-পাশ মিলিত রে,   রতিপতি অনুবন্ধা রে।
উনমিত নিতম্ব সুললিত রে   ভাষা অতি ভেল মন্দা রে॥
কেশ-পাশ-দিগ কালিম রে   শ্রবণে লেল অবতংশ রে।
জ্ঞানদাস কহ নব তনু-রুহ রে   মনমথ গাড়ল বংশ রে॥

টীকা---
৪। (শ্রীরাধার) উরস্থল উচ্ছ্বসিত (কুচকোরক প্রকাশিত) এবং নয়ন আয়ত হইল। গমনের চাঞ্চল্য-সমাপ্তির সঙ্গে শৈশব প্রস্থান করিল। সখি এখন তোমাকে নিবেদন করিতেছি চিরদিনের হৃদয়দ্বন্দ্ব (এইবার মিটিল)।
বালা বাড়িয়াছে, দারিদ্র্য দূর হইবে, শ্যামচান্দের সঙ্গে মিলাইয়া দিবে । হাসি অধর-পাশে মিশিয়াা রহিল। মদনের অনুশাসন। সুন্দর নিতম্ব সুডৌল ও ভাষা মৃদু হইল। কেশপাশ ঘন কৃষ্ণবর্ণ হইল। কর্ণে কর্ণ-ভূষণ গ্রহণ করিল। জ্ঞানদাস বলিতেছেন, ধনীর নব তনুরুহ (স্তনদ্বয়) মদনের অধিকার-প্রতিষ্ঠার নিদর্শন।
বালা বাল দারিদ টুটব --- এ দেশে একটা কথা আছে, “বালা বাড়ে দারিদ্র্য খণ্ডে”। অর্থাৎ দরিদ্রের গৃহে পুত্র বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে তাহার উপার্জনে দারিদ্র্যদুঃখ দূর হয়। (অথবা পুত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাইলে পাঁচজনের
উপার্জনে গৃহস্থের উন্নতি হয়।) কবি এখানে অন্য অর্থে এই প্রবচনটি প্রয়োগ করিয়া বলিতেছেন, শ্রীরাধা বয়ঃপাপ্তা হইয়াছেন, আমাদের দারিদ্র্য দূর হইবে, আমরা শ্যামধনে ধনী হইব।
মনমথ গাড়ল বংশবে --- মদন “বাঁশগাড়ি” করিল। দখল-প্রতিষ্ঠার জন্য বংশখণ্ড প্রোথিত করাকে “বাঁশ-গাড়া” বা "বাঁশগাড়ি” বলে। বাঁশেব নূতন অঙ্কুরের সঙ্গে স্তনের সাদৃশ্য কল্পনা করা হইয়াছে।

ই পদটি ১৩২৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯২০ সালে প্রথম প্রকাশ এবং পরবর্তী সংস্করণ ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ বা ১৯৫৬ সালের পরে প্রকাশিত, শ্রীবিমানবিহারী মজুমদার ভাগবতরত্ন, সংকলিত ও সম্পাদিত বৈষ্ণব-পদাবলী সংকলন, “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”, বিদ্যাপতির অনুসরণে জ্ঞানদাস, ৬৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

উলসল উরথল অব ভেল রে।
আয়ত হোয়ত নয়ান রে॥
গতি অতি তুরিত সমাপন রে।
শৈশব কয়ল পয়ান রে॥
তোরে নিবেদ লোঁ শুন সখি অব রে।
চিরদিন হৃদয়ক দন্দা রে॥
বালা বাঢ়ল দারিদ টূটব।
মিলাওব শ্যামরচন্দা রে॥
হাস অধর পাশ মিলিত রে।
রতিপতি অনুবন্ধা রে॥
উনমিত নিতম্ব সুললিত রে।
ভাষা অতি ভেল মন্দা রে॥
কেশ-পাশ-দিগ কালিম রে।
শ্রবণে লেল অবতংশ রে॥
জ্ঞানদাস কহ নব তনু-রুহ রে।
মনমথ গাড়ল বংশ রে॥

টীকা ---
শ্রীরাধার বক্ষস্থল (উরণল) উল্লসিত (উলসল) বা উচ্ছ্বসিত হইল এবং নয়ন বিস্তৃত হইল। তাহার ত্বরিত-গতি সমাপ্ত হইল এবং শৈশব প্রস্থান করিল।

তুলনীয় --- চরণচপলতা লোচন লোমস--- বিদ্যাপতি (১৭)

পদ্ভ্যাং মুক্তাস্তরলগতয়ঃ সংশ্রিতা লোচনাভ্যাং
(শার্ঙ্গধর পন্ধতি ৩২৮২)

হে সখি তোমাকে বলি শুন। মনের অনেকদিনের দ্বন্দ্ব মিটিল। বালার বয়োবৃদ্ধি হইল, এইবার (শ্যামচন্দ্রের) দারিদ্র্য দূর হইল, শ্যামচন্দ্রের সঙ্গে ইহার মিলন ঘটাইব। ইহার অধরপানে এখন হাসি মিশিল, কামদেবের সে অবলম্বন-স্বরূপ (অনুবন্ধা) হইল। তাহার নিতম্ব বর্দ্ধিত ও সুললিত হইল এবং ভাষা মৃদু হইল। তাহার কেশপাশ আরও কৃষ্ণবর্ণ হইল। কানে এধন অলঙ্কার পরিল। জ্ঞানদাস বলেন তাহার নবীন রোম (তনু-রুহ) হইল, মন্মথ নিজের অধিকারের চিহ্নস্বরূপ যেন বংশদণ্ড প্রেথিত করিল।

ই পদটি ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত, ৩৪৪৫টি পদ বিশিষ্ট, কাঞ্চন বসু সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী” সঙ্কলনের ৫৯৯ পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

উলসল উরথল অব ভেল রে
        আয়ত হোয়ত নয়ান রে।
গতি অতি তুরিত সমাপল রে
        শৈশব কয়ল পয়ান রে॥
তোরে নিবেদলোঁ শুন সখি অব রে
        চির দিন হৃদয়ক দন্দা রে।
বালা বাঢ়ল দারিদ টুটব রে
        মিলাওব শ্যামরচন্দা রে॥
হাস অধরপাশ মিলিত রে
        রতিপতি অনবন্ধা রে।
উনমিত নিতম্ব সুললিত রে
        ভাষা অতি ভেল মন্দা রে॥
কেশপাশদিগ কালিম রে
        শ্রবণে লেল অবতংশ রে।
জ্ঞানদাস কহ নব তনু রুহ রে
        মনমথ গাড়ল বংশ রে॥

*********************
^^এই পাতার উপরে ফেরত^^